মনে হয় বিএনপি ভুল পথে হাঁটছে

এবনে গোলাম সামাদ

বিএনপি জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল তার বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, উদার গণতন্ত্র ও মিশ্র অর্থনীতি গ্রহণের কারণে। বিএনপিকে দেশের মানুষ সাধারণভাবে ভেবেছে ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী দল। আর তাই বাংলাদেশে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব পেতে পারে সুরা। প্রেসিডেন্ট জিয়া মতায় এসে কখনো বর্তমান পাকিস্তানবিরোধী কোনো উক্তি করেননি; বরং চেয়েছেন বর্তমান পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে। একটা কথা প্রচলিত ছিল, এবং এখনো অনেক পরিমাণে আছে, তা হলো বাংলাদেশ ভারতের দ্বারা আক্রান্ত হয়নি। কারণ, পাকিস্তানের হাতে আছে পারমাণবিক অস্ত্র। পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রের ছত্রছায়ায় বাংলাদেশ একটা পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে তার আপন অস্তিত্ব রা করে চলতে পারছে; কিন্তু বর্তমানে বিএনপি নেতা তারেক রহমান এমন কিছু কথা বলছেন, যা বিএনপির মৌল নীতির পরিপন্থী বলে মনে হচ্ছে। তাই বর্তমান প্রবন্ধে আমরা বিএনপির নীতির কিছু সমালোচনা করতে চাচ্ছি। আমাদের সমালোচনা জিয়াউর রহমানের বিএনপির বিরুদ্ধে নয়, আমাদের সমালোচনা তারেক রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত বিএনপির বর্তমান নীতির। তারেক রহমান বলছেন, শেখ মুজিবুর ছিলেন পাকিস্তানপন্থী। তিনি চাননি বাংলাদেশের স্বাধীনতা; কিন্তু জিয়াউর রহমান চেয়েছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। তিনি ছিলেন না পাকিস্তানপন্থী; কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এ যুক্তিকে এখন আর আগের মতো মেনে নিতে পারেন না। শেখ মুজিব সাবেক পাকিস্তান ভেঙে দিতে চাননি। এ েেত্র তার নীতি ছিল সঠিক। তিনি সাবেক পাকিস্তানের মধ্যেই দাবি করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের জন্য অধিক স্বায়ত্তশাসন। জিয়াউর রহমান, মেজর জিয়া হিসেবে শেখ মুজিবুরের নামে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। নিজের নামে নয়। শেখ মুজিব যদি স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে না বলে যান, তবে জিয়া যা করেছেন সেটাকে বলতে হবে হঠকারী কাজ। বলতে হবে তিনি শেখ মুজিবের নামে করেছিলেন মিথ্যাচার; যেটা ছিল দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। তবে জিয়া পরে চেয়েছিলেন তার ভুল শুধরে নিতে। তিনি চাননি ভারতের কাছে নতজানু হতে। এখানে জিয়াকে আমরা সাধুবাদ জানাতে বাধ্য; কিন্তু তারেক রহমান বলছেন, শেখ মুজিব ছিলেন
পাকিস্তানপন্থী। আর তার পিতা ছিলেন স্বাধীনতাপন্থী; কিন্তু আজকের বাংলাদেশের মানুষ জানে যে, ১৯৭১-এ ভারত চেয়েছিল তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানকে জয় করে তাকে ভারতের অংশে পরিণত করতে। ১৯৭১-এর কথা টেনে এনে আজকের রাজনীতি করতে যাওয়া হবে খুবই বিভ্রান্তিকর। তাই মনে হচ্ছে বিএনপি যেন হাঁটতে চাচ্ছে ভুল পথে। বিএনপিকে তার নীতি নির্ধারণ করতে হবে বর্তমান পরিস্থিতিকে বিবেচনা করে। ১৯৭১-এর পরিস্থিতিকে টেনে এনে রাজনীতি করতে গেলে সেটা হবে ভুল কাজ করা।
তারেক রহমান রাজনীতি করছেন লন্ডন শহরে বসে; কিন্তু লন্ডন এখন আর আগের মতো বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে নেই। বর্তমান বিশ্বের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হলো ওয়াশিংটন ডিসি। তারেক জিয়া তার বক্তব্য দিচ্ছেন এমনভাবে, যেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো প্রভাব রাখে না; কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন কোনো বিদেশী রাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখলে, সেটা রাখছে বলতে হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন জনমতকে বৈরী করে তুলে বিএনপি কখনোই বাংলাদেশে মতায় আসতে পারবে বলে মনে হয় না। একসময় মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি নিরূপিত হতো কমিউনিজম ভীতি দিয়ে; কিন্তু কমিউনিজম এখন আর মার্কিন ভীতির কারণ হয়ে নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পেয়ে বসেছে জঙ্গি মুসলিম মৌলবাদভীতি। আওয়ামী লীগ প্রমাণ করতে চাচ্ছে যে, বিএনপি হলো একটি জঙ্গি মুসলিম মৌলবাদী দল। আমরা দেখলাম, এককালের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী হাসানুল হক ইনুকে হজ করতে যেতে। আমরা দেখলাম, এককালের মার্কসবাদী রাশেদ খান মেননকে হজ করতে যেতে। দেশের প্রেসিডেন্টও গেলেন হজ করতে। ঠিক এমনই এক সময় আওয়ামী লীগের এক নেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে করে বসলেন হজ করা নিয়ে বিরূপ মন্তব্য। ব্যাপারটিকে আমার কাছে মনে হচ্ছে খুবই সাজানো। তিনি এ রকম মন্তব্য করেছেন, যাতে বিএনপি করে তার বক্তব্যের প্রতিবাদ। আর তার ফলে প্রমাণ করা যেতে পারে যে, বিএনপি একটি জঙ্গি মুসলিম মৌলবাদী দল। বিএনপি যে ভাষায় আবদুুল লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্যের প্রতিবাদ করছে ও চাচ্ছে তার মৃত্যুদণ্ড, তাতে মার্কিন জনমত ভাবতে পারে বিএনপি আসলেই একটা জঙ্গি মুসলিম মৌলবাদী দল। বিএনপির নেতারা কিছু না ভেবেই যেন পা দিলেন আওয়ামী লীগের পাতা ফাঁদে। এক দিকে আওয়ামী লীগ নেতারা পালন করছেন হজব্রত, অন্য দিকে আবার তাদেরই একজন প্রথম সারির নেতা হজের বিরুদ্ধে করলেন বিরূপ মন্তব্য। এই কৌশলটিকে বিএনপির নেতারা কেন বিবেচনায় নিতে পারলেন না, সেটা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়।
কয়েক সপ্তাহ আগে ভারতের একশ্রেণীর সংবাদপত্রে বলা হচ্ছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি মহল নাকি শেখ হাসিনাকে মতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত; কিন্তু শেখ হাসিনা মতাচ্যুত হওয়া মানেই খালেদা জিয়া মতা লাভ করা নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর কোনো তৃতীয় শক্তিকে মতায় আনতে পারে। সে সম্ভাবনাকে একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যায় না। আমরা জানি, বাংলাদেশের সেনা বাহিনী যেহেতু জাতিসঙ্ঘের শান্তিরী বাহিনীতে সৈন্য সরবরাহ করছে, তাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রতি বছর আয় করতে পারছে ৫০ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ সেনা বাহিনীর সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিরাজ করছে বিশেষ হার্দিক সম্পর্ক। এ কথাটিও বিবেচনায় রাখা উচিত বিএনপির নীতিনির্ধারকদের। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জন্ম ইতিহাস একরকম নয়। আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছে রাজনৈতিকভাবে, গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে। পান্তরে বিএনপির জন্ম হয়েছিল পাকিস্তান থেকে ফিরে আসা ভারতবিরোধী ২৪ হাজার সৈন্যের সমর্থনের মধ্য দিয়ে। সেনাবাহিনীর সমর্থন দল হিসেবে বিএনপিকে প্রতিষ্ঠিত করতে ও রাখতে সহায়ক হয়েছিল। সেনাবাহিনীকে চটিয়ে বিএনপি এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সেটা হবে তার জন্যে আত্মঘাতী।
লন্ডন থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক The Economist একটি বিখ্যাত পত্রিকা। ইংরেজি ভাষাভাষী অঞ্চলে জনমত সৃষ্টিতে এর রয়েছে বিশেষ প্রভাব। The Economist-এর একটি সংখায় (২০ সেপ্টেম্বর ২০১৪) লেখা হয়েছে, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের জনসমর্থন আগের তুলনায় কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। আমার মনে হয় The Economist যা লিখেছে তা মিথ্যা নয়। প্রকৃত
প্রস্তাবে আওয়ামী লীগের জনসমর্থন কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে আমার কাছেও প্রতিভাত হচ্ছে। এ জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির একটা প্রধান কারণ হলো আওয়ামী লীগের সমুদ্রনীতি। বিএনপি যখন মতায় ছিল, সে তখন সমুদ্র নিয়ে বেশি মাথা ঘামায়নি; কিন্তু আওয়ামী লীগ বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নিরূপণে বিশেষভাবে তৎপর ছিল। সে এখন বলছে, সমুদ্র-আর্থনীতি (Blue-Economy) গড়ার কথা; যা বিএনপি এতটা জোর দিয়ে বলেনি। অথচ, বাংলাদেশের মানুষকে আগামীতে বাস্তব কারণেই হতে হবে অনেক বেশি সমুদ্রনির্ভর। কেননা বাংলাদেশের ভৌগোলিক আয়তন হলো বিশ্বের মোট স্থলভাগের শতকরা ০.১ ভাগ মাত্র। অথচ বাংলাদেশে বাস করছে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার শতকরা দুই ভাগের বেশি মানুষ। এত অধিকসংখ্যক মানুষ এত অল্প জায়গায়ার মধ্যে বাস করার দৃষ্টান্ত বিশ্বে বেশি নেই। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের হয়তো অদূর ভবিষ্যতে প্রয়োজন হবে অগভীর সমুদ্রের মধ্যে প্লাস্টিক দিয়ে বাড়িঘর নির্মাণ করে বাস করার। আর প্রয়োজন হবে আহার্য হিসেবে সামুদ্রিক মাছ ও শৈবাল গ্রহণ। জাপানে অনেকেই সামুদ্রিক শৈবাল খেয়ে সবজি হিসেবে আহার করে থাকে। আওয়ামী লীগের সামুদ্রিক অর্থনীতি গড়ার পরিকল্পনাকে তাই শুধু কল্পনাবিলাসী হিসেবে চিহ্নিত করা চলে না। পান্তরে বিএনপি দেশের মানুষের কাছে এ রকম কোনো পরিকল্পনাকে তুলে ধরতে কার্পণ্য করছে। বিএনপিতে পরিলতি হচ্ছে চিন্তক মানুষের ঘাটতি, যা তাকে পূরণ করতে হবে।
প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট