ভাটির গান ভাটিয়ালী গান


মহিবুর রহিম ।।

বাংলা লোকগানের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় গান ভাটিয়ালী। ভাব, বিষয় ও সুরের বৈচিত্র্য বিবেচনা করে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। অনেকে এ গানকে সারিগানের সগোত্রীয় বলেছেন। কারণ সারিগানের মতো এ গানেও নদী, নৌকা ও মাঝির ব্যবহার লক্ষ্যণীয়। ভাটিয়ালী গানের বিষয় লৌকিক ও আধ্যাত্মিক প্রেম, যা সারি গানেও লক্ষ্য করা যায়। তবে গভীর ভাবে বিচার বিশ্লেষণ করলে ভাটিয়ালী ও সারিগানের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায়। সারিগান শ্রম সংগীতের অন্তর্গত, অন্যদিকে ভাটিয়ালী অবসর কালের গান। যে কারণে এ উভয় সঙ্গীতের সুর ও ভাব দুই দিকে টার্ন করেছে। সারিগান দ্রুত লয়ের গান, কিন্তু ভাটিয়ালী সব সময় ধীর লয়ের ভাবধর্মী গান। ভাটি অঞ্চলের যে মানুষেরা নৌকা যোগে ব্যবসা বাণিজ্য তথা দূর যাত্রাপথের কর্মে নিয়োজিত ছিলেন তারাই ভাটিয়ালী গানের প্রকৃত উদ্ভাবক। বিশেষত শান্ত নদীতে পাল তোলে মাঝিরা যে অবসর সময়টুকু পেতেন সে সময়ে তারা ভাটিয়ালী গান গেয়ে উঠতেন। অবসর সময়ের নির্জনতা, একাকীত্ব বা বিরহবোধ, আদিগন্ত পথের হাতছানি, নারীর নায়র যাওয়ার আকুতি এ গানকে বিশেষ মহিমা দিয়েছে। ভাটিয়ালী গান সর্বদাই গুরু গম্ভীর, বেদনার্ত ও অতলাশ্রয়ী। সুতরাং সারিগান থেকে ভাটিয়ালী সম্পূর্ণ পৃথক প্রবণতার গান।

ভাটিয়ালী গানের নামকরণ নিয়েও নানা বিতর্ক আছে। কেউ কেউ বলেছেন নদীর ভাটির স্রোতের টানে নৌকা ভাসিয়ে অবসর মাঝিরা যে গান করে তাই হচ্ছে ভাটিয়ালী গান। এ ক্ষেত্রে ড. আশরাফ সিদ্দিকীর মত প্রণিধান যোগ্য। তিনি বলেছেন- ‘নদীর ভাটি দিয়ে নৌকা বেয়ে যেতে সাধারণত নৌকার মাঝিগণ যে গান গাইত তাকেই ভাটিয়ালী গান বলা হত। দিগন্তব্যাপী নদীর শূন্যতার ওপর নায়ের বাদাম উড়িয়ে একক ভাবেই এ গান গাওয়া হত- যন্ত্রের কোনই ব্যবহার ছিল না। দিগন্তব্যাপী ঢেউয়ের ওপর ‘মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে আমি আর বাইতে পারলাম না’ প্রভৃতি গানের কলিগুলো যখন ছড়িয়ে পড়তো তখন তা চিত্ত নদীতেও ভাবের তুফান তুলতো।’ অন্য অনেকে বলেছেন ভাটি বাংলার মাঝিরা যে গান করে তাই হচ্ছে ভাটিয়ালী গান। এ ক্ষেত্রে গবেষক নির্মলেন্দু ভৌমিকের বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন- ‘ভাটিয়ালী গান যতো না নদী প্রান্তরের গান, তার চেয়ে কোনো বিশেষ একটি অঞ্চলের (যেমন পূর্ববঙ্গীয় অঞ্চল) গান। এই অর্থে ভাটিয়ালি বিশেষভাবে পূর্ববঙ্গের গান, যে পূর্ববঙ্গ পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় নিম্নভূমি এবং সে কারণেই নদী হাওরে পরিপূর্ণ।’

বাংলা লোকসাহিত্য বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন আশুতোষ ভট্টাচার্য। তিনি তার ‘বাংলার লোকসাহিত্য’ গ্রন্থে লিখেছেন- ‘ভাটি অঞ্চলের সঙ্গীত বলিয়া ইহার নাম ভাটিয়ালী, ইহাই সাধারণের বিশ্বাস। ..একদিকে নদী কিংবা জলাভূমির বিস্তৃতি আর এক দিক দিয়া উহার অলস মন্থর গতি, এই উভয়ের সহযোগেই ভাটিয়ালীর উদ্ভব হইয়া থাকে; এই অবস্থার মধ্য দিয়াই মাঝি কর্মে যথার্থ অবসর লাভ করিতে পারে, এই অবসরের মুহূর্তই ভাটিয়ালীর পক্ষে অনুকূল মুহূর্ত। সেই জন্য নদীর ভাটিতে নৌকা ছাড়িয়া দিয়া অলস বৈঠাটি এক হাতে স্থির ধরিয়া রাখিয়া মাঝি এই গান গাহে বলিয়াই ইহা ভাটিয়ালী গান’।

অন্যদিকে ‘বাংলাদেশের লোকসঙ্গীত পরিচিতি’ গ্রন্থে সিরাজুদ্দিন কাশিমপুরী বলেন- ‘ভাটিয়ালী একটি সুর; কথার বাঁধনে কোন বিশেষ গান নহে বলিয়াই আমার ধারণা’। প্রসঙ্গত, ‘ভাটিয়ালী’ সঙ্গীত শাস্ত্রের একটি রাগীনিরও নাম। শ্রী কৃষ্ণকীর্ত্তন, মঙ্গলকাব্য এবং বৈষ্ণব ও সুফী পদেও ‘ভাটিয়ালী’ রাগের ব্যবহার আছে। অনেকের মতে ভাটিয়ালী গান হলো প্রকৃতিতত্ত্ব ভাগের গান। ভাটিয়ালী গানের মূল বৈশিষ্টা হলো এ গানগুলো রচিত হয় মূলত মাঝি, নৌকা, দাঁড়, গুন ইত্যাদি বিষয় অবলম্বনে। সাথে থাকে গ্রামীণ জীবন, গ্রামীণ নারীর প্রেমপ্রীতি, ভালবাসা, বিরহ, হারানোর আকুলতা ইত্যাদির সম্মিলন। অনেক বিতর্কের মধ্যেও এটি স্বীকৃত যে নদীতে ভাটির স্রোতের সঙ্গে নৌকা ভাসিয়ে মাঝি-মাল্লারা যে গান করেন সর্ব সাধারণের মতে সেগুলোই ভাটিয়ালী গান।

প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ভাটিয়ালী গানে ‘নদীর ভাটির টান’ এবং ‘ভাটি অঞ্চল’ উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ। ভাটি অঞ্চলের মাঝি-মাল্লা শ্রেণির মানুষজনেরাই এ গানের ধারক ও বাহক। নিকট অতীতে নদীবিধৌত ভাটি অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণ নৌকানির্ভর। তখন উজান স্রোতে ও উজান বাতাসে নৌকা চালানো ছিল কষ্টসাধ্য বিষয়। অন্যদিকে ভাটির স্রোতের অনুকূলে নৌকা চালাতে মাঝিদের তেমন বেগ পেতে হতো না। স্রোতের টানে পাল তোলা নৌকা ভাসিয়ে দিয়ে আলতো করে বৈঠার হাল ধরে রেখে ছঁইয়ের ওপর অনেকটা অলস সময় কাটত মাঝিদের। আর তাই মনের আনন্দে গেয়ে উঠত ভাটিয়ালী গান। মাঝির অলস মুহূর্তের গান বলে এর সুর-লয়ও বিলম্বিত। প্রতিটি গানের সুর করুণ, উদাসীন ও বিবাগী। যদিও একক কণ্ঠের গান, তবুও তা মনকে দারুণভাবে আন্দোলিত করে, সৃষ্টি করে মধুরতম এক আবেদন। এখনো ভাটিয়ালী নিবিষ্ট মনে শুনলে হৃদয় প্রায় উদ্বেলিত হয়।
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর-বাওর বেষ্টিত এক বিশাল ভূখণ্ডের নাম ভাটি অঞ্চল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনা এ জনপদের অন্তর্ভুক্ত। এই অঞ্চলগুলোতেই ভাটিয়ালী গানের মূল সৃষ্টি, চর্চাস্থল এবং এখানে এ গানের ব্যাপক প্রভাবও রয়েছে। তবে ভাটিয়ালী গানের চর্চা আরও বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে আছে। বিশেষত মেঘনা অববাহিকার সর্বত্র ভাটিয়ালী গান চর্চিত হয়েছে বলে অনেক গবেষদের ধারণা।

ষড়ঋতুর বাংলাদেশ হলেও ভাটি অঞ্চলে ঋতু মাত্র দু’টি। একটি বর্ষা, অন্যটি হেমন্ত। বর্ষায় উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর বৃষ্টির পানিতে ভাটির সকল নদ-নদী ফুলে-ফেঁপে ওঠে। ফলে সমুদ্রাকৃতির এক বিশাল জলাভূমিতে পরিণত হয় ভাটির জনপদ। তখন ভাটির মানুষজন অনেকটা কর্মহীন হয়ে পড়ে। বিস্তৃত জলরাশির ওপর গ্রামগুলো জেগে থাকে দ্বীপের মতো। এ সময় যোগাযোগের জন্য নির্ভর করতে হয় নৌকার ওপর। আবার হেমন্তে দিগন্ত বিস্তৃত বিশাল প্রান্তর জুড়ে চলে চাষাবাদ। ব্যস্ততার যেন আর সীমা থাকে না। ভাটির মানুষের জীবনসূচীও এর ঋতু বৈচিত্র্যের মতোই ব্যতিক্রম। এখানকার, জীবন-জীবিকা, সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি সবকিছু চলে প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে। তাই সঙ্গত কারণেই ভাটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও কিছুটা আলাদা বৈশিষ্ট্য মণ্ডিত। বিশ্বখ্যাত ময়মনসিংহ গীতিকার পালাগানসহ ভাটি অঞ্চলে জারি, মুর্শিদী, মারফতি, বাউল, ধামাইল, কবিগান ও যাত্রাগান যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে ভাটির নিজস্ব গীত। যেমন ‘ভাটিয়ালী’ ও ‘সারিগান’। বাংলা লোকগানের এ দু’টি উপাদান ভাটির জনপদের নিজস্ব সম্পদ। হাওর-বাওর ও নদী-নালা বেষ্টিত ভাটিতেই এসব গানের উৎপত্তি ও বিকাশ। অত্র অঞ্চল থেকে সংগৃহীত একটি ভাটিয়ালী গান-
‘আমি বইসা রইলাম নদীর কূলে
আমায় কে বা পার করে
আমি কান্দিয়া আকুল হইলাম
বইসা ঘাটের পাড়ে গ
আমায় কে বা পার করে।।
আশা নদীর তীরে গেলাম
পিপাসিত হইয়া
আশা নদীর জল শুকাইল
দুঃখিনী দেখিয়া গ
আমায় কে বা পার করে।।
নাও আছে কাণ্ডারী নাই
শুধু ডিঙা ভাসে
আমি খেয়ার মাঝির নাম জানি না
কি নামে ডাকিব তারে গ
আমায় কে বা পার করে।।’

ভাটি অঞ্চলের নদী, মাঠ, প্রান্তর পেরিয়ে এখানকার মানুষদের চলতে হয়। খেয়া পেরিয়ে যেতে হয় গন্তব্যে। খেয়া নৌকা ছাড়া অসহায়ের মতই তাদের বসে থাকতে হয়। এই ভাটিয়ালী গানে এসবই উঠে এসেছে। ভাটিয়ালী গান মানেই ভাটির প্রকৃতি, প্রেম-বিরহ ও ভাটিবাসীর দুঃখ-বেদনা এবং হতাশা-নৈরাশ্যের প্রতিচ্ছবি। রচনার দিক দিয়ে নিতান্ত সরল এবং সংক্ষিপ্ত হলেও দূরের নদী বা হাওর থেকে ভেসে আসা এ গানের সুর মনকে বিচলিত করে তুলে। হাওর-নদীর বাতাস ও ঢেউয়ের সঙ্গে মনের গহীন কোণের আবেগ মিশে গিয়ে এক অন্যরকম ভাবালুতার সৃষ্টি করে।

হয়ত এ কারণেই আশুতোষ ভট্টাচার্য বলতে চেয়েছেন- ‘অন্তরের সুগভীর ভাব ও সূক্ষ্মতম অনুভূতি প্রকাশ করিবার ভাটিয়ালীর যে শক্তি, তাহা বাংলার আর কোন লোকসঙ্গীতে নাই। জীবন-দর্শনের সুগভীর বিষয়সমূহ অতি সহজেই ইহার মধ্যে প্রবেশ করিয়াছে’। একদিকে লৌকিক প্রেম, অন্যদিকে আধ্যাত্মিক চেতনা দুই-ই প্রতিফলিত হয়ে আসছে ভাটিয়ালী গানে। ভাটিতে বিয়ে দেয়া উজানের মেয়ে সারা বছর অপেক্ষায় থাকে কখন বর্ষা আসবে, কখন নাইওর যাবে (বেড়াতে) বাবার বাড়িতে। কারণ হেমন্তকালে দিগন্ত জোড়া পথ হেঁটে বাবার বাড়িতে যাওয়া সম্ভব হয় না কুলবধূর। বর্ষার পানিতে নদ-নদী ও হাওড়-বাওর একাকার হয়ে উঠতে দেখে আনন্দে নেচে ওঠে তার মন। আর তখন থেকেই শুরু হয় তার দিন গোনা। দীর্ঘ সময় ধরে মা-বাবার আদর-সোহাগ বঞ্চিত ভাটির বধূর এই অপেক্ষার দিনগুলোকে ভাটিয়ালীর স্রষ্টারা তুলে এনেছেন তাদের সঙ্গীতে-

‘আষাঢ় মাসে ভাসান পানি রে পূবালী বাতাসে
বাদাম দেইখ্যা চাইয়া থাকি আমারনি কেউ আসে রে।
যেদিন হতে নয়া পানি আইল বাড়ির ঘাটে
অভাগিনীর মনে কত শত কথা উঠে রে।।
গাঙে দিয়া যায় রে কত নায় নাওরীর নৌকা
মায়ে ঝিয়ে বইনে বইনে হইতেছে যে দেখা রে।।
আমারে নি নিব নাইওর পানি থাকতে তাজা
আমি দীনের কথা বলে যাইতাম রাস্তা হইত সোজা রে।।
ভাগ্য যাহার ভালরে নাইওর যায় রে আষাঢ় মাসে
উকিল মুন্সির হইব নাইওর কার্তিক মাসের শেষে রে..।’

এই বিখ্যাত ভাটিয়ালী গানটির লেখক, সুরকার ও গায়ক নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুরি উপজেলার নূরপুর বোয়ালী গ্রামের উকিল মুন্সি (প্রকৃত নাম আবদুল হক আখন্দ ১৮৮৫-১৯৭৮)। তিনি ছিলেন খ্যাতিমান এক লোককবি। এ গানে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন- কার্তিক মাস চলে গেলে বর্ষাও শেষ হয়ে যাবে। নদ-নদী বা হাওরে আর তেমন নৌকা চলবে না। অন্যদিকে চাষাবাদকে কেন্দ্র করে কৃষক পরিবারগুলোর ব্যস্ততাও বেড়ে যাবে। আর এ কারণে হয়ত গ্রাম্য বধূর বাবার বাড়িতে নাইওর যাওয়ার লালিত স্বপ্ন এবার পূরণ হবে না। এই লৌকিক চিত্রের গভীরে তিনি আধ্যাত্মিক ভাবকেও ধরে রেখেছেন। এখানে নায়র অর্থে বুঝিয়েছেন মৃত্যুকে। ভাটি অঞ্চলে কার্তিককে মৃত্যুর মাস মনে করা হয়। আশা ও নৈরাশ্যের দ্বন্দ্বে ভারাক্রান্ত মানুষ শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করে। উকিল মুন্সিও তাই করছেন। নেত্রকোনার আরেকজন স্মরণীয় লোককবি জালাল উদ্দীন খাঁ (১৮৯৪-১৯৭২) লোকগানের জন্যে বিখ্যাত হয়েছেন। তার একটি ভাটিয়ালী গান-
আরে ও ভাটিয়াল গাঙের নাইয়া
ঠাকু ভাইরে কইও আমায় নাইয়র নিত আইয়া।।
ঐনা ঘাটে বইয়ারে কান্দি দেশের পানে চাইয়া
চক্ষের পানি নদীর জলে যাইতাছে মিশাইয়া রে।।
কোন পরানে আছে রে ভাই আমায় পাশরিয়া
জঙ্গলারই বাঘের মুখে গেল নির্বসা দিয়া রে।।
এই বাইশ্যাতে নাহি রে নিলে গলায় কলসি বান্ধিয়া
ঐ না গহীন গাঙের তলায় মরিব ডুবিয়া রে।।
জালালে কয় আর কত দিন থাক সইয়া রইয়া
জল শুকাইলে নিবে রে নাইয়র বাঁশের পালঙ্ক দিয়া রে।।

উকিল মুন্সির আর একটি বিখ্যাত ভাটিয়ালী গান, যা করুণ বিচ্ছেদের আবহ ছড়ায়।
আমার গায়ে যত দুঃখ সয়
বন্ধুয়ারে করো তোমার মনে যাহা লয়।।
নিঠুর বন্ধুরে বলেছিলে আমার হবে
মন দিয়াছি এই ভেবে
সাক্ষী কেউ ছিল না সে সময় ও বন্ধুরে
সাক্ষী শুধু চন্দ্র তারা একদিন তুমি পড়বে ধরা রে বন্ধু
ত্রিভুবনের বিচার যেদিন হয়।।
নিঠুর বন্ধুরে দুঃখ দিয়া হিয়ার ভিতর
একদিনও না রইলে খবর
একি তোমার প্রেমের পরিচয় ও বন্ধুরে
মিছামিছি আশা দিয়া কেন বা প্রেম শিখাইয়া রে বন্ধু
দূরে থাকা উচিত কি আর হয়।।
নিঠুর বন্ধুরে বিচ্ছেদের বাজারে গিয়া
তোমার প্রেম বিকি দিয়া
করবো না প্রেম আর যদি কেউ কয় ও বন্ধু রে
উকিলের হয়েছে জ্বালা কেবলই চোরের কারখানা
চোরে চোরে দেওয়া আলা হয়।।

নেত্রকোনা জেলার মতো সুনামগঞ্জ জেলাও নদ-নদী অধ্যুষিত। এখানকার গ্রাম জনপদগুলো অনেক দূরে দূরে অবস্থিত। এখানে আছে বিশাল আকৃতির হাওর-বাওর। এই ভৌগোলিক পরিবেশই একটি আলাদা সংস্কৃতির জানান দেয়। এ জেলায় জন্মেছেন দেওয়ান হাসন রাজা, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, শাহ আবদুল করিমের মতো বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞরা। ভাটিয়ালী গানের এক অমর শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস। এ জেলায়ও অনেক ভাটিয়ালী গানের প্রচলন রয়েছে। সে সব গানে ফোটে উঠেছে নাইওরের আশায় অপেক্ষমান নারী হৃদয়ের গভীর আর্তি। যেমন-

ওরে দূর বিদেশি নাইয়া যাওরে তরী বাইয়া
বুক ভরা দুঃখ রইল আমার অন্তরায় গাঁথিয়া।।
বাবারে কইও মাঝি নাইর নিতা আইয়া
আর কতদিন থাকতাম আমার মনরে বুঝাইয়া।।
আসবে বাবা নিবে নাইওর থাকি আশায় চাইয়া
কলসি নিয়া নদীর ঘাটে কাঁদি আমি বইয়া।।
পাখি যদি হইতাম আমি যাইতাম উড়িয়া
জনম মাটি দেইখ্যা আমার কলিজা ঠাণ্ডা হইত গিয়া।।
আমার কথা রাইখ স্মরণ যাইও না ভুলিয়া
আবদুল আজিজে কয় বাবা আইলে দিব তোরে সাজাইয়া।।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লোকগান নিয়ে কাজ করেছিলেন এস ডি বর্মণ (শচীনদেব বর্মণ)। এর মধ্যে ভাটিয়ালী গানও ছিল। ভাটি অঞ্চলের লোকগান থেকে রূপান্তরিত তাঁর সেই বিখ্যাত গানটি হচ্ছে-
কে যাস রে ভাটি গাং বাইয়া
আমার ভাইধন রে কইও নায়র নিত বইলা
তোরা কে যাস ….
বছরখানি ঘুইরা গেল গেল রে
ভাইয়ের দেখা পাইলাম না পাইলাম না
কইলজা আমার পুইড়া গেল গেল রে
ভাইয়ের দেখা পাইলাম না
ছিলাম রে কতই আশা লইয়া
ভাই না আইল গেল
গেল রথের মেলা চইলা।

প্রাণ কান্দে কান্দে প্রাণ কান্দে রে
নয়ন ঝরে ঝরে নয়ন ঝরে রে
ও পোড়া মন রে বুঝাইলে বুঝে না
নিদয় বিধি রে তুমি সদয় হইয়া
ভাইরে আইনো নইলে আমার
পরান যাবে জ্বইলা।

সুন্দরিয়া মেঘ উইড়া আইলো রে
ভাইয়ের খবর আনলো না
ভাটির তীরে নৌকা ফিরা আইলো রে
ভাইয়ের খবর আনলো না
সুজন মাঝি রে ভাইরে কইয়ো গিয়া
না আসিলে স্বপনেতে দেখা দিত বইলা।

এসডি বর্মণ ছাড়াও গিরীন চক্রবর্তী, মনোমোহন দত্ত, আবদুল ওয়াহেদ (তিতন শাহ), সৈয়দ আবদুল বারী, দুলা মিয়া মাস্টার, সৈয়দ বাহাউদ্দিন, শামছেল হক চিশতি প্রমুখ ভাটিয়ালী গান রচনা করেন। গিরীন চক্রবর্তীর ‘সুজনের গান’ (১৯৩৫) এ অনেক ভাটিয়ালী গান ছিল। তাঁর বিখ্যাত ভাটিয়ালী গান ‘নাও ছাড়িয়া দে, পাল উড়াইয়া দে/ছল ছলাইয়া চলুক রে নাও মাঝ দরিয়া দিয়া.. ’এককালে শিল্পী আব্বাস উদ্দীনের কণ্ঠে সারাদেশে জনপ্রিয়তা লাভ করে। তার আর একটি বিখ্যাত ভাটিয়ালী ধারার গান-
মাসির বাড়ি কিশোরগঞ্জে মামার বাড়ি চাতলপাড়
বাপের বাড়ি বাউনবাইরা নিজের বাড়ি নাই আমার।।
আমি রে যে জলের ঢেউ আমার বলতে নাই রে কেউ
চান্দের হাট ভাইঙ্গা গেছে একূল ওকূল অন্ধকার।।
আমি কই আমার আমার তারা কয় না
চিঠি নাই পত্র নাই খবর লয় না।।
ঢাকার তারা আনল টাকা মনে ভাবলাম ঘুরল চাকা
আইসা দেখি সবই ফাঁকা পোড়া কপাল অন্ধকার।।

এ অঞ্চলে প্রচলিত ভাটিয়ালি গানগুলোর আলাদা কিছু বিশেষত্ব আছে। এ গুলোর মর্মমূলে আছে সাধারণ মানুষের জীবন চেতনার সার নির্যাস। এ গানে লৌকিক প্রেম ও অধ্যাত্মপ্রেম মিশ্রিত হয়েছে। নদী নৌকা মাঝির রূপক ব্যাপক ভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। এ গানে জীবনের অন্তহীন গ্লানি থেকে ব্যর্থতা ও যাতনা থেকে পরিত্রাণের আকুল আহ্বানও আছে। কিন্তু সবই এসেছে গভীর এক জীবন দর্শনের আলোকে। যেমন-
আমার বাড়ি বন্ধুর বাড়ি রে
মধ্যে প্রেম নদী
পাখা নাই উড়িয়া যাইতাম রে
ওই না বন্ধুর বাড়ি রে
সোনা বন্ধুর পিড়িতে..
সখি গ পুরুষের বসন্তকালে
হাতে মোহন বাঁশি
নারীর বসন্তকালে
মুখে মুচকি হাসি
সোনা বন্ধুর পিড়িতে……
সখি গ বাড়ির শোভা বাগবাগিচা
ঘরের শোভা পিড়া
নারীর শোভা সিতাসিন্দুর
দরিয়ার শোভা ডিঙা
সোনা বন্ধুর পিরিতে…..

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সংস্কৃতি চেতনার একটি অবলম্বন হচ্ছে তিতাস নদী। এখানকার সংস্কৃতির পরতে পরতে এই নদীর অবদানের স্বাক্ষর খুঁজে পাওয়া যায়। অদ্বৈতের উপন্যাসেও আছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু নদী। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সেই ঐতিহ্যেরই একটি সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় লোককবি দুলামিয়া মাস্টারের একটি ভাটিয়ালী গানে। তিনি লিখেছেন-
“সাধের তিতাস নদীরে
গাঙে দইল ধোয়া পানি
একখান জাহাজে টানে
চল্লিশখান রপ্তানি
সাধের তিতাস নদীরে…
তিতাস নদীর মাঝে একখান
জাহাজ আসিল
কৈরা ইছা মুছ তাওয়াইয়া
বসিয়া রহিল।
এমন সময় দাড়িমাল্লা
নোঙর তুলিল
ভাসিতে ভাসিতে জাহাজ
নারাণগঞ্জে গেল
ইছা বলে সাধের জাহাজ
তিতাসেই রহিল
সাধের তিতাস নদীরে…॥”

হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জে লোকসঙ্গীতের সমৃদ্ধ ধারা আছে। এ অঞ্চলেও নদী ও নৌকা জীবন ও জীবিকায় প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। ফলে ভাটিয়ালী গানও এখানকার সঙ্গীত সাধকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কেল্লা শহীদের মাজার গোটা ভাটি অঞ্চলের মানুষের কাছে একটি তীর্থস্থান। এই মাজারকে কেন্দ্র করে একটি স্বতন্ত্র সঙ্গীত ঘরানা গড়ে উঠেছে। তাদের অনেকেই ভাটিয়ালী গান বেধেছেন। যেমন-
কেল্লা বাবার প্রেম নদীতে ঢেউ লাগে পাড়ে
নাও ভিড়ে কিনারে॥
ঝলমল ঝলমল করছে নাও
বুঝে সব নদীর ভাও
হালকা বায়ে চলছে বেয়ে
সময় মতো পার করে॥
কেল্লা বাবা প্রবীণ মাঝি
হারিয়ে গেলে নেয় খুঁজি
মালামাল হবে না ভেজাল
কেউ নেবে না চুরি করে॥
হালখাতা লিখে দিবে
লাভ দেখে খুশি হবে,
বাড়ি গিয়ে দেখবে চেয়ে
তোমায় কত আদার করে॥
আকূল বুদ্ধি সব হারাইয়া
কাইয়ূম শাহ কাঁদে পাড়ে বইয়া
কেল্লার নাও বুঝল না ভাও
পার হবে কেমন করে॥

পুরো ভাটি অঞ্চলের লোকসমাজের স্তরে স্তরে ভাটিয়ালী গানের নানা ধারা খুঁজে পাওয়া যায়। আবহমান বাংলার নদ-নদী, হাওর-বাওর যেভাবে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে, তেমনি অন্যান্য লোকগানের মতো হারিয়ে যাচ্ছে চিরায়ত ঐতিহ্যের ভাটিয়ালী গানও। ভাটির স্রোতের টানে এখন আর আগের মতো সচরাচর পাল তোলা নৌকা চলে না। যান্ত্রিকতা গ্রাস করেছে গ্রামের শান্ত-সুনিবিড় নদ-নদীর রূপ-বৈচিত্র্যকেও। পাল তোলা নৌকার হাল ধরে গান গাওয়ার সময় কোথায় আজ, ভট ভট শব্দের ইঞ্জিনচালিত নৌকা অনেক আগেই পৌঁছে দেয় গন্তব্যে। কিন্তু তাই বলে ভাটিয়ালী সুরের গান ভাটি অঞ্চল থেকে পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যায়নি আজও। নৌকা বা ছইয়ের ওপর না হলেও, বাউল বা লোক ধারার শিল্পীদের বৈঠকী গানের আসরে এবং রাখাল-কৃষকদের কণ্ঠে আজও টিকে আছে কিছু ভাটিয়ালী গান।
‘আরে মন-মাঝি তোর বৈঠা নেরে
আমি আর বাইতে পারলাম না
আমি জনম ভইরা বাইলাম বৈঠা রে
তরী ভাইট্যায় বয় আর উজায় না ‘,

অথবা

‘আরে ও, সুজন নাইয়া
কোন্ বা দেশে যাওরে তুমি
সোনার তরী বাইয়া’

প্রভৃতি গানগুলো এখনও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় নদীমাতৃক বাংলাদেশের কথা।

মহিবুর রহিম : কবি, প্রাবন্ধিক, লোকসংস্কৃতি গবেষক।