বনগ্রামে ভাই-ছেলেকে নিয়ে বিধবা মা-মেয়েকে আশ্রয়দাতার ধর্ষণ!

আমাদের নিকলী ডেস্ক ।।

বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে গৃহকর্তা, তার ভাই ও ছেলে মিলে এক বিধবা নারী এবং তার স্কুলপড়ুয়া মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনা আড়াল করতে ওই বিধবা নারীকে আটকে রেখে তার ওপর চালানো হয় মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন।

খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে মধ্যরাতে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করলেও এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি এবং জড়িত কাউকে গ্রেফতারও করেনি পুলিশ।

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নে এ চাঞ্চল্যকর ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত মামলা দায়ের এবং জড়িতদের গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন জেলা মহিলা পরিষদ ও পূজা উদযাপন কমিটির নেতারা।

জানা গেছে, চৌদ্দ বছর আগে সন্তানসম্ভবা অবস্থায় স্বামী মারা যাওয়ার পর অসহায় হয়ে পড়া কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার ওই নারী জীবিকা নির্বাহ ও কন্যাসন্তানের ভবিষ্যতের জন্য ইউনিয়ন পরিষদের রাস্তায় মাটিকাটার কাজ করার পাশাপাশি পাড়া-প্রতিবেশীর বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করতে থাকেন।

বর্তমানে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া একমাত্র কন্যাসন্তানের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে সম্প্রতি একই গ্রামের ব্যবসায়ী ধনু মিয়া তার বাড়িতে কাজ দিয়ে আশ্রয়দাতা সাজেন। আর সেই সুযোগে এলাকার এ ধনাঢ্য ও প্রভাবশালী পরিবারের লোকজনের কুদৃষ্টি পড়ে ওই চল্লিশোর্ধ্ব বিধবা নারী ও তার ১৪ বছরের কিশোরী মেয়ের ওপর।

একপর্যায়ে ব্যবসায়ী ধনু মিয়া ও তার ভাই ১নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছেলু মিয়া ওই বিধবা গৃহপরিচারিকাকে এবং ধনু মিয়ার ছেলে ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সুমন মিয়া ওই বিধবার কিশোরী মেয়েকে ধর্ষণ করে। পাশবিক নির্যাতনের এ ঘটনায় এলাকাবাসীকে বলে দেয়া এবং মামলা করার কথা বললে ওই বিধবা গৃহপরিচারিকাকে বাড়িতে আটকে রেখে মধ্যযুগীয় কায়দায় চালানো হয় নির্যাতন। ওই নারীর শরীরের স্পর্শকাতর অঙ্গসহ বিভিন্ন স্থানে রয়েছে নিষ্ঠুর নির্যাতনের অসংখ্য ক্ষত। অবশেষে পুলিশের হস্তক্ষেপে মুক্তি মিললেও এ ঘটনায় সোমবার পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি এবং পুলিশ কাউকে গ্রেফতারও করেনি।

নির্যাতিতা নারীর দাবি, পুলিশকে তিনি এবং তার মেয়ের ওপর পাশবিক ও শারীরিক নির্যাতনের কথা জানালেও তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

পাশবিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার ওই নারী জানান, তার এমন কোনো স্বজন নেই যে থানায় গিয়ে মামলা দায়ের করবে। এ ছাড়া ওই প্রভাবশালী বাবা-চাচা ও ছেলে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতা হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলারও কারও সাহস নেই।

তবে গ্রামের কিছু লোকজন সালিশের মাধ্যমে এ বিষয় শেষ করার জন্য চাপ ও হুমকি দিচ্ছে বলেও জানান ওই নারী।

সোমবার দুপুরেও নির্যাতনের যন্ত্রণায় হাসপাতাল শয্যায় ছটফট করছিলেন ও বুকফাটা কান্নায় বুক ভাসাচ্ছিলেন ওই হতভাগ্য বিধবা নারী। আর বলছিলেন, সরকার ছাড়া তাকে দেখার আর কেউ নেই।

এ ব্যাপারে অভিযুক্তদের মধ্যে ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সুমন মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হলেও তিনি তাদের বিরুদ্ধে পাশবিক নির্যাতনের বিষয়কে ভিত্তিহীন দাবি করে জানান, খারাপ আচরণ করায় তার বাবা শুধুমাত্র কয়েকটি আঘাত করেছিলেন। এছাড়া প্রতিপক্ষের লোকজন তার ও তাদের পরিবারের লোকজনের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলাচ্ছে। গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।

এ ব্যাপারে কথা হলে কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তপন চন্দ্র সাহা জানান, শুক্রবার রাত পৌনে ২টার দিকে দুজন পুলিশ অফিসার এক কিশোরী মেয়েসহ ওই নির্যাতিত নারীকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে এলে তিনি প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ভর্তি করেন।

এ সময় বিস্তারিত না জানানোর কারণে শুধু শারীরিক নির্যাতনের রোগী হিসেবে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে ধর্ষণের বিষয় জেনে আবাসিক চিকিৎসক ডা. তাজরিনা তৈয়ব ও ডা. খুশবো নাহারকে দিয়ে ওই নারীর প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা করানো হয়। এ পরীক্ষায় ধর্ষণের প্রমাণ মিললে অধিকতর পরীক্ষার জন্য ওই নারীকে কিশোরগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালের গাইনি বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো হবে।

কিশোরগঞ্জ জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট মায়া ভৌমিক ও জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ভূপেন্দ্র চন্দ্র ভৌমিক দোলন জানান, তারা কটিয়াদী উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি দীলিপ সাহার মাধ্যমে শুনেছেন। এ ঘটনা দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্তপূর্বক মামলা রুজু করে জড়িতদের গ্রেফতার দাবি করেন।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে কটিয়াদী মডেল থানার ওসি জাকির রাব্বানী জানান, কটিয়াদী উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি দীলিপ সাহার মাধ্যমে খবর পেয়ে তিনি শুক্রবার রাতে গচিহাটা তদন্ত কেন্দ্রের কর্মকর্তা উত্তম কুমারকে সঙ্গে নিয়ে ওই নির্যাতিত নারী ও তার মেয়েকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। সোমবার পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো অভিযোগ না পাওয়ায় মামলা এবং কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।

ওসির ভাষ্য, এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি আইনানুগ ব্যবস্থা নেবেন এবং জড়িতদের গ্রেফতার করবেন।

সূত্র : কিশোরগঞ্জে ভাই-ছেলেকে নিয়ে মা-মেয়েকে গৃহকর্তার ধর্ষণ!  [যুগান্তর, ১৯ জুন ২০১৮]