“বাবা কিংবা মা নন, আমরা দুজনকেই চাই”

আমাদের নিকলী ডেস্ক ।।

“আম্মু, আমরা তোমাদের দু’জনকে চাই। তোমরা এক সাথে হয়ে যাও। না হলে আমরা তোমাদের কারো কাছে থাকব না।” দুই বিচারপতির সামনে মাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে এমনিভাবে আকুতি জানায় শিশু মিয়া মো. সালিম সাদমান ধ্রুব (১২)। একই আকুতি জানায় ধ্রুবর ছোট ভাই মিয়া মো. সাকিব সাদমান লুব্ধকও (৯)।

এ সময় ধ্রুব তার বাবার দিকে হাত বাড়িয়ে ডাকতে থাকে, ‘বাবা তুমি এদিকে এসো। আম্মুকে সরি বলো। আমরা আর কিছু চাই না। তোমাদের একত্রে দেখতে চাই।’

দুই ছেলের আকুতি-মিনতি ও কান্নায় হাইকোর্টের বিচারকক্ষে আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। দুই শিশুর কান্না শুনে ওই কক্ষে ভিড় জমায় শত শত আইনজীবী ও গণমাধ্যমকর্মী। সবার চোখে তখন কান্নার দৃশ্য। দেখে মনে হয়, কোনো বাংলা ছায়াছবির দৃশ্য। তখন এক বিচারপতি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে থাকেন, “আজকের বিচার করবে এ দুই শিশু। আজকে তারা যে সিদ্ধান্ত দেবে সেটাই হবে রায়।”

অবশেষে মন গলে বাবা-মায়ের। এক পর্যায়ে বিচারপতিরা বাবা-মা দুইজনের সঙ্গে খাস কামরায় গিয়ে কথা বলেন। তাদের উভয়ের ও শিশুদের বক্তব্য শুনেন। এর পরই মনোমালিন্যের কারণে বিবাহ বিচ্ছেদে যাওয়া বাবা-মাকে একত্রে ফিরে পায় দুই শিশু।

গতকাল সোমবার (২৫ জুন ২০১৮) বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি খায়রুল আলমের বেঞ্চে এ মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে এক বছর ধরে বাবা-মায়ের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত দুই শিশুর আর্তনাদের জয় হলো।

মামলার বিবরণে জানা যায়, দুই শিশুর মা কামরুন্নাহার মল্লিকা রাজশাহীর মেয়ে। পড়তেন ঢাকা গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে। বাবা মিয়া মো. মেহেদী হাসান, মাগুরার ছেলে। পড়ালেখা করেছেন ঢাকা কলেজে। পড়ালেখা অবস্থায় দু’জনের পরিচয়। পরিচয় থেকে প্রেম। এরপর ২০০২ সালে বিয়ে হয় তাঁদের। শুরু হয় দাম্পত্য জীবন। দু’জনের ঘর আলোকিত করে আসে দু’টি ফুটফুটে সন্তান। ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে ভর্তি করে দেয়া হয় দুই ছেলেকে। পড়ালেখা শেষ করে মেহেদী একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন, মল্লিকা একটি বেসরকারি স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষিকা। ভালোই চলছিল সংসার। এক পর্যায়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য ঘটে। এ মনোমালিন্য শেষ হয় বিবাহ বিচ্ছেদের মাধ্যমে। ২০১৭ সালের ১২ মে তাঁদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। স্বামী মেহেদী হাসান স্ত্রীকে তালাক দেয়ার এক সপ্তাহ আগে দু’টি সন্তানকে গ্রামের বাড়ি মাগুরায় পাঠিয়ে দেন। বোনের তত্ত্বাবধানে মাগুরার জেলা শহরের একটি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়া হয়।

মেহেদী হাসান ঢাকার উত্তরায় থাকলেও দুই ছেলের সুখের জন্য তাঁর ব্যক্তিগত গাড়ি সন্তানদের ব্যবহারের জন্য দিয়ে দেন। মাগুরায় বড় হচ্ছিল শিশু দু’টি। এই এক বছর মা-সন্তানদের মধ্যে কোনো দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি।

মা কামরুন নাহার মল্লিকার অভিযোগ, সব রকম চেষ্টা করেও সন্তানের ফুপুর কারণে সন্তানদের সঙ্গে দেখা করতে পারেননি তিনি। শেষ পর্যন্ত সন্তানদের নিজের হেফাজতে নেয়ার জন্য হাইকোর্টের শরণাপন্ন হন। এজন্য নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করলে গত ২৯ মে আদালত শিশু দু’টিকে হাইকোর্টে হাজির করতে সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও শিশু দু’টির বাবাকে নির্দেশ দেন। ২৫ জুন তাদের হাজির করতে বলা হয়। একই সঙ্গে সন্তানকে কেন মায়ের হেফাজতে দেয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।

সেই নির্দেশ মোতাবেক শিশু দু’টিকে এদিন আদালতে হাজির করে পুলিশ। এ ছাড়া শিশু দু’টির বাবা-মা, মামা, নানি ও ফুপুসহ আত্মীয়-স্বজনরা আদালতে হাজির হন। সোমবার সকালে বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি খায়রুল আলমের কোর্টে এ বিষয়ে শুনানি শুরু হয়। শুনানির এক পর্যায়ে বিচারকরা শিশু দু’টির বক্তব্য শুনতে চান।

দুই শিশুর বড় ভাই সালিম সাদমান ধ্রুব আদালতকে বলেন, ‘আমরা আর কিছু চাই না, বাবা-মাকে একত্রে দেখতে চাই।’ শিশু দু’টির বক্তব্য শুনে আদালত ফের আইনজীবীদের বক্তব্য শুনেন।

এ সময় মায়ের পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল আদালতকে বলেন, আজকে একটা বছর ধরে মা তাঁর সন্তানকে দেখতে পাচ্ছে না। আজকে যখন কোর্টে হাজির করা হয়েছে তখনো শিশুর ফুপু মায়ের সঙ্গে কথা বলতে বাধা দিয়েছে। এ সময় তিনি সন্তানদের সঙ্গে মায়ের কথা বলার সুযোগ চান।

পরে আদালতের অনুমতি পেয়ে মা ছেলেদের কাছে এগিয়ে যেতেই মা দুই ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি শুরু করেন। এ সময় ছেলেরাও দীর্ঘদিন পর মাকে পেয়ে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। বড় ছেলে তখন হাত বাড়িয়ে বাবাকেও ডাকতে থাকে। ছেলে বলতে থাকে, ‘বাবা তুমি এসো। তুমি আমার কাছে এসো। আম্মুকে সরি বলো।’

এ সময় বাবা মেহেদী হাসান এগিয়ে এলে আদালতের ভেতর আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। বাবা-মা এবং তাদের সন্তানদের একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কান্নার দৃশ্য দেখে আদালতে উপস্থিত বিচারক, আইনজীবী, সাংবাদিকসহ সবার চোখে পানি চলে আসে। দীর্ঘ এক বছর পর বাবা-মাকে এক সঙ্গে পেয়ে ছেলেদের কান্না সবার হৃদয়কে নাড়া দেয়।

তখন আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারক আবার ওই শিশুদের ডেকে নেন। সঙ্গে মাকেও কাছে ডাকেন। আদালত বলেন, ‘এ দৃশ্য দেখেও কি আপনাদের মন গলে না? আপনারা কি সন্তানের জন্যও নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ করতে পারবেন না? সামনে তাকিয়ে দেখেন, এখানে যারা আছেন, সবাই এলিট পারসন। আপনাদের এ দৃশ্য দেখে সবারই চোখে পানি চলে আসছে।’

এ সময় আদালতে উভয়পক্ষের আইনজীবীসহ শতাধিক আইনজীবী দাঁড়িয়ে সমস্বরে সন্তানদের বিষয়টি চিন্তা করে বাবা-মাকে মেনে নেয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে সন্তানদের চাওয়া অনুযায়ী তাদের দাম্পত্য জীবন যাতে বজায় থাকে সে রকম একটি আদেশ দেয়ার দাবি জানান।

এ সময় শিশুদের মা মল্লিকা আদালতকে বলেন, ‘আমার সংসার করতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু ও (মেহেদী হাসান) শারীরিকভাবে অসুস্থ ও ড্রাগে আক্রান্ত। এক মাস সময় দিয়ে চিকিৎসা করানো উচিত।’

এরপর আদালত দুই ছেলে সন্তান, বাবা-মা, শিশু দু’টির নানি ও ফুপুকে এজলাসের কাছে ডেকে নেন। এ সময় একে একে প্রত্যেকের বক্তব্য শুনেন। পরে আরো বিস্তারিত শুনতে চেম্বারে ডেকে নিয়ে বাবা ও মায়ের একান্ত বক্তব্য শুনেন। তাঁদের বক্তব্য শুনে আদালত মধ্যাহ্ন বিরতির পর আদেশ দেন।

আদালত আদেশে বলেন, আগামী ৪ জুলাই পর্যন্ত শিশু সন্তান দু’টি মায়ের হেফাজতে থাকবে। তবে এই সময়ে বাবা শিশু দু’টির দেখাশোনা করার অবারিত সুযোগ পাবেন।

৪ জুলাই পরবর্তী দিন ঠিক করে সেদিন শিশু দু’টিকে হাজির করার নির্দেশ দিয়ে বিষয়টি মুলতবি করেন। একই সঙ্গে শিশুদের নিয়ে ঘুরতে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ সময় দেয়ার জন্য বাবা-মাকে নির্দেশ দেন।

রায়ের পর আদালত দুই শিশুকে কাছে ডেকে নিয়ে বলেন, তোমরা আবার আসবে। ওই দিন আমাদের জানাবে, তোমাদের বাবা-মা তোমাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে। ভালো থেক। এ সময় ছোট ছেলে সাকিব সাদমান বিচারককে বলতে থাকে, ‘আংকেল আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।’

আদালতে শিশু দু’টির বাবার পক্ষে ছিলেন আইনজীবী তাপস বল। মায়ের পক্ষে ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। সঙ্গে ছিলেন এ কে এম রিয়াদ সলিমুল্লাহ।

আদেশের পর শিশুদের বাবা মিয়া মো. মেহেদী হাসান বলেন, ‘অতীতে কী হয়েছে তা চিন্তা করছি না। এ মুহূর্তে আমার দুই সন্তানের চাওয়াটাই আমার চাওয়া।’ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুদের মা কামরুন্নাহার মল্লিকাও বলতে থাকেন, ‘এ মুহূর্তে আমি সবচেয়ে বেশি খুশি। আমার সন্তানদের কাছে পেয়েছি, এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া। দোয়া করবেন আমাদের জন্য।’

এ সময় দুই শিশুই বারবার বাবা-মায়ের হাত ধরে এক সঙ্গে হাঁটতে থাকে।

সূত্র : বিচারক বললেন, এ দুই শিশুর সিদ্ধান্তই হবে আজকের রায়  [এনটিভি অনলাইন, ২৫ জুন ২০১৮]