কারখানার বর্জ্যে নষ্ট ধ্বংসের পথে হালদার পরিবেশ

মাহমুদ আল আজাদ, হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি ।।

বন্যার পানিতে ১০দিন ধরে হাটহাজারীসহ হালদা নদীর আশপাশের এলাকা ডুবে পানিবন্দি হয়ে থাকার কারণে বিষাক্ত বর্জ্য ও নদী পাড়ের আগাছাগুলো পঁচে পানি দূষণের কারণে হালদা নদীর মাছ মরে যাওয়ার কারণ বলে মনে করছেন মৎস্যবিজ্ঞানী ও হালদা বিশেষজ্ঞরা। হাটহাজারীসহ বিভিন্ন উপজেলার বেশ কয়েকটি মিল-কারখানা, মুরগীর ফার্ম ও ক্ষেত-খামারে বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহার করার ফলে বন্যার পানি ও পাহাড়ি ঢলের স্রোতে ভেসে হালদায় প্রবেশ করে। অবিরাম বৃষ্টির পানি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে হালদা নদীর দুই তীর পানি পরিপূর্ণ হয়ে আশেপাশের এলাকা বন্যার পানি থৈ থৈ করলেও কিন্তু পানি নিষ্কাশন হওয়ার কোনো পথ না থাকায় দীর্ঘ ১০দিন ধরে পানি জমে থাকে হালদাসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে। তাই চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে হালদা। হালদা নদীতে ৯৩ প্রজাতির বিভিন্ন মাছ রয়েছে। তার মধ্যে ১০-১২ প্রজাতির মা-মাছ রয়েছে। রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউশ সহ কার্পজাতীয় মা-মাছ হালদা নদীতে প্রতি মৌসুমে ডিম দেয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. গাজী সৈয়দ মোহাম্মদ আসমত হালদা নদীর বিষয়ে বলেন, নদীর আশপাশের বিভিন্ন কল-কারখানার কারণে দীর্ঘদিন ধরে নদীকে দূষিত করছে। দীর্ঘদিন থেকে হালদায় বর্জ্য’র বিষাক্ত পানির কারণে নদীর মিষ্টি পানিকে মারাত্মকভাবে দূষিত করেছে। ফলে মাছগুলো মারা পড়ে। হালদাকে দূষণ থেকে রক্ষা করতে হলে আগে বিভিন্ন কল-কারখানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি কারখানাগুলোতে বর্জ্য নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে ইপিসি’র আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

হালদা বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী আজাদী বলেন, টানা ভারী বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢলের সাথে হাটহাজারী উপজেলাসহ আশপাশের এলাকাগুলো পানিতে ডুবে যায়। ফলে হালদার সাথে সংযুক্ত শতাধিক খাল, ছরায় দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বিভিন্ন কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য, মানুষের বাসা-বাড়ির ময়লা-আবর্জনা, বন্যায় পানিবন্দী থাকা প্রায় ২ লক্ষ মানুষের মল-মূত্র ও হালদা পাড়ের আগাছা, লতাপাতা ও ন্যাকিয়াল গাছ (দল)গুলো পানিতে ডুবে থাকার ফলে পঁচে বিষাক্ত হয়ে পানির সাথে মিশে পানি দূষিত হয়ে পানির অক্সিজেন কমে যাওয়ায় মাছগুলো মারা যায়। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মিল-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য হালদা দূষিত হওয়া ও বন্যার পানির সাথে মিশে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ হালদার তলদেশে পড়ার কারণে নদীর তলদেশের কিছু মাছ মারা যায়। তিনি বলেন, পানি দূষর্ণের কারণে গত কয়েকদিন যে মাছ মারা গেছে সেগুলো বেশিরভাগ বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া বিভিন্ন উপজেলার মাছের প্রজেক্ট (মাছ চাষের পুকুর), চিংড়ি ঘের ও ডোবাগুলোতে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পানি দূষণের কারণে মারা যায়। তবে এতে হালদা নদীরও কিছু মারা মারা গেছে। হালদার পানি গত শনিবার থেকে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। যদি সামনে কয়েক দিন বৃষ্টি হয় তাহলে এই সমস্যা দূর হয়ে যাবে।

এদিকে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পুরো হালদা নদীকে মাছের অভয়াশ্রম ঘোষণা না করে যদি আগের মতো নদীর ২০ কিলোমিটার বিভিন্ন প্রজাতির মাছসহ মা-মাছের অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয় তাহলে হালদার উন্নতির পাশাপাশি হালদা নির্ভর মানুষের জীবিকা নির্বাহ করতে তেমন সমস্যা হবে না। হালদার বিভিন্ন পয়েন্টে ডুবোচর ও চর উঠা স্থানগুলো জরুরিভাবে খনন করার জন্য কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি কামনা করেন।

হালদা বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢলের সৃষ্ট বন্যায় বিভিন্ন এলাকা ডুবে যাওয়া বিভিন্ন কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য, বাসা-বাড়ির ময়লা-আর্বজনা, মানুষের মল-মূত্র পানির সাথে মিশে পানি বিষাক্ত হয়ে মাছ মারা যায়। কয়েকদিনের বৃষ্টিতে দুষিত পানি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।

হালদা পাড়ের বাসিন্দারা জানান, হালদা নদী দূষণের জন্য দায়ী হাটহাজারীসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন কল-কারখানার বর্জ্য। এগুলো হালদায় প্রবেশ করার কারণে চরম বির্পযয়ের মুখে হালদা। নামমাত্র একটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলেও আরো বহু কল-কারখানা রয়েছে। নদীকে বাঁচাতে এসব কল-কারখানর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন। উপজেলার মধুনাঘাট মাছুয়াঘোনা হ্যাচারীর মোঃ নাছির জানান, কারখানার বর্জ্য ও বিভিন্ন ছরা, খালে জমে থাকা বিভিন্ন বিষাক্ত বর্জ্য হালদা নদীতে প্রবেশ করে দীর্ঘ ৮-১০ দিন বন্দি থাকার কারণে হালদা নদীর মিষ্টি পানি বিষাক্ত হয়ে পড়ে। ফলে পানির অক্সিজেন কমে যাওয়ায় কিছু কিছু মাছ মারা যায়।

মৎস্য চাষী ও ডিম সংগ্রহকারী মোঃ শফি, মোঃ কামাল ও ওসমান গণি বলেন, এসব কল-কারখানার বর্জ্য যাতে হালদায় না ঢুকে এর একটা বিহীত হওয়া জরুরি। বর্তমানে হালদা নদী চরম বির্পযয়ের মুখে। এখন থেকে যদি হালদাকে রক্ষা করা না যায় তাহলে একদিন হালদার মা-মাছ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। মাছ মরে যাওয়ার কারণে আগামী মৌসুমে নদীতে মা-মাছ ডিম ছাড়া নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা।

হাটহাজারী উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আজাহারুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে হালদা নদীর অবস্থা স্বাভাবিক হতে চলেছে। আমরা সার্বক্ষণিক নদীর বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছি এবং হালদা দূষণের জন্য দায়ী কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিত আকারে সুপারিশ করেছি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আক্তার উননেছা শিউলী বলেন, মিল-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য ও পোল্ট্রি ফার্মের ময়লা-আবর্জনা হালদা নদীতে প্রবেশ না করার মতো আমরা কয়েক দিনের মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়ে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করবো। এই অভিযানে যদি কোন মিল-কারখানার বর্জ্য হালদায় প্রবেশ করছে এমন তথ্য বা সরেজমিনে দেখলে ওই কারখানার বিরুদ্ধে তৎক্ষাণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। হালদা নদী দেশের সম্পদ। এই সম্পদ রক্ষা করতে এলাকার মানুষসহ সকলের নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

এবিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মোঃ ফকরুদ্দিন বলেন, হালদা নদীর পরিবেশ দূষণকারী চট্টগ্রামের একটি পেপার মিলের বিষাক্ত বর্জ্য যাওয়ার কারণে ইতিমধ্যে আমরা কারখানাটি বন্ধ করে দিয়েছি। আমরা আরো তদন্ত করে দেখছি অন্য কোন কারখানার বর্জ্য’র কারণে হালদার পানি বিষাক্ত হচ্ছে কিনা।