বাংলা ভাষার মহত্তম কবি আল মাহমুদের ৮৩তম জন্মদিন আজ

মহিবুর রহিম ।।

আল মাহমুদ সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান প্রতিভা। তিনি একাধারে একজন কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্পকার, শিশুসাহিত্যিক এবং সাংবাদিক। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে তিনি আধুনিক বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে, চেতনায় ও বাক্‌ভঙ্গীতে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এনং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশ নিয়েছেন। স্বাধীনতা উত্তরকালে বাম ভাবাপন্ন দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন।

আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়াজ মুহম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়, কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানার সাধনা হাই স্কুল এবং পরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন। মূলত এই সময় থেকেই তার লেখালেখির শুরু। আল মাহমুদ বেড়ে উঠেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃষিনির্ভর লোকায়ত পরিবেশে। আজীবন আত্মপ্রত্যয়ী কবি ঢাকায় আসার পর কাব্য সাধনা করে সাফল্য লাভ করেন। তার উল্লেখযোগ্য রচনাবলি ‘লোক লোকান্তর’, ‘কালের কলস’, ‘সোনালি কাবিন’, ‘মায়াবী পর্দা দুলে উঠো’, ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’, ‘এক চক্ষু হরিণ’, ‘দ্বিতীয় ভাঙ্গন’ প্রভৃতি।

তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ‘কাবিলের বোন’, ‘উপমহাদেশ’, ‘যে পারো ভুলিয়ে দাও’, ‘নিষিন্ধা নারী’, ‘আগুনের মেয়ে’, ‘মোহিনীর জীবন ঝংকার’। আল মাহমুদের গল্পগ্রন্থ ‘পানকৌড়ির রক্ত’ (১৯৭৫), ‘সৌরভের কাছে পরাজিত’ (১৯৮৩), ‘গন্ধবণিক’ (১৯৮৮), ‘ময়ূরীর মুখ’ (১৯৯৪), ‘নদীর সতীন’ (২০০৪) প্রভৃতি।

আল মাহমুদ তাঁর সৃষ্টিশীল অবদানের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। এর মধ্যে ‘একুশে পদক’ (১৯৮৬), ‘ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার’ (১৯৮৭), অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১), অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৩), ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার, জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি পুরস্কার (১৯৭৪), সুফি মোতাহার হোসেন সাহিত্য স্বর্ণপদক (১৯৭৬), নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৯৩)সহ অসংখ্য সাহিত্যপদক ও সম্মাননা লাভ করেছেন। কলকাতা থেকে আল মাহমুদ পেয়েছেন জয়বাংলা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭২), কাফেলা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৪) এবং সমান্তরাল কর্তৃক গৌরবময় দ্বিতীয় ভানুসিংহ সম্মাননা পদক (২০০৪)।

১৯৫৪ সাল থেকে আল মাহমুদের কবিতা প্রকাশ পেতে থাকে। এ সময় তিনি ঢাকা আসেন এবং পত্রিকায় কাজ নেন ও সাহিত্যে পুরোদমে মনোযোগী হন। ঢাকা থেকে প্রকাশিত সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকা এবং কলকাতার নতুন সাহিত্য, চতুষ্কোণ, ময়ূখ ও কৃত্তিবাস এবং বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত বিখ্যাত ‘কবিতা’ পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে ঢাকা-কলকাতার পাঠকদের কাছে তাঁর নাম সুপরিচিত হয়ে ওঠে এবং তাকে নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়।

তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার শহরমুখী প্রবণতার মধ্যেই ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ এবং নর-নারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহকে তাঁর কবিতায় নতুন ব্যঞ্জনায় ধারণ করেন। আধুনিক বাংলা ভাষার প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততায় আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ তার অনন্য কীর্তি। ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র দুটি কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর সবচেয়ে সাড়া জাগানো সাহিত্যকর্ম ‘সোনালি কাবিন’। তবে আল মাহমুদ প্রতিটি গ্রন্থে অনন্য সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর সম্পর্কে বলা হয়, তিনি জসীমউদদীন ও জীবনানন্দ দাশের কবিতা থেকে সম্পূর্ণ এক পৃথক ধারার প্রবর্তক।

১৯৯০-এর দশক থেকে তাঁর কবিতায় বিশ্বস্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস উৎকীর্ণ হতে থাকে; এর জন্য তিনি প্রগতিশীলদের চরম সমালোচনার মুখোমুখি হন। তবে ঈশ্বরানুগত্যের কারণে তাঁর কবিতার কাব্যগুণ ব্যাহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বরং তা বাংলা কবিতার নতুন টার্ন বা বাঁক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কবিতার পাশাপাশি কথাসাহিত্যেও আল মাহমুদের অবদান একটি যুগান্তকারী ঘটনা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরে দেশের খ্যাতনামা পত্রপত্রিকায় আল মাহমুদের ‘পানকৌড়ির রক্ত’, ‘কালানৌকা’, ‘জলবেশ্যা’, ‘মীর বাড়ির কুরসিনামা’, ‘বুনো বৃষ্টির প্ররোচনা’ প্রভৃতি গল্প প্রকাশিত হলে সবাই একবাক্যে স্বীকার করে নেন তিনি আমাদের সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবিই শুধু নন, অপ্রতিদ্বন্দ্বী গল্পকারও। উপন্যাস, প্রবন্ধ, আত্মচরিত রচনায় তাঁর সাফল্য ঈর্ষণীয়। বাংলা সাহিত্যের এই বহুমুখী প্রতিভার ৮৩তম জন্মদিনে জানাই প্রাণঢালা শুভেচ্ছা।

মহিবুর রহিম : কবি, প্রাবন্ধিক, লোকসংস্কৃতি গবেষক।