কটিয়াদীতে দেশের অন্যতম দূরপাল্লার রথযাত্রা অনুষ্ঠিত

নিজস্ব প্রতিনিধি, কটিয়াদী ।।

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের ভোগবেতালে আজ (১৪ জুলাই ২০১৮) শনিবার বিকাল ৩টায় হিন্দু (সনাতন) ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। রথযাত্রার আগে মন্দির প্রাঙ্গনে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এম আফজল। অ্যাডভোকেট পরিতোষ কুমার চক্রবর্তীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় কটিয়াদী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াহাব আইন উদ্দিন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত জাহান কেয়া, কটিয়াদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ জাকির রব্বানী, অ্যাডভোকেট ভূপেন্দ্র চন্দ্র ভৌমিক দোলন, আচমিতা ইউপি চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান (বাচ্চু), আচমিতা ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মান্নান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। বক্তব্য শেষে বিকাল সাড়ে ৪টায় রথযাত্রার সূচনা করা হয়।

জনশ্রুতি আছে, ভারতের উড়িষ্যার পুরীতে জগন্নাথদেবের রথ যাত্রার পরই ছিল কিশোরগঞ্জের আচমিতার ভোগ বেতালের গোপীনাথের রথযাত্রা। আজও এখানে একটি প্রাচীন প্রবাদ প্রচলিত আছে- ‘পুরীর জগন্নাথ আর বঙ্গের গোপীনাথ’। বাংলাদেশের মধ্যে কটিয়াদীর আচমিতার রথযাত্রাই একমাত্র দূরপাল্লার রথযাত্রা।

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের ভোগবেতালে অবস্থিত শ্রী শ্রী গোপীনাথ মন্দির। প্রাচীন বাংলার ঐতিহাসিক এই মন্দির অত্র এলাকার সনাতন ধর্মালম্বীদের এক জনপ্রিয় তীর্থস্থান। সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায় স্বপ্নাদৃষ্ট হয়ে ১৫৮৫ খ্রীষ্টাব্দে এই মন্দির নির্মাণ করেন। মন্দিরে প্রায় ষোড়শ শতাব্দী থেকে শ্রী শ্রী গোপীনাথ, বলরাম ও শ্রী শ্রী সুভদ্রার সেবা পূজা আজও চলে আসছে।

জানা যায়, ষোড়শ শতকের বাংলার বার ভূঁইয়ার অন্যতম এবং প্রধান ভাটি রাজ্যের অধিপতি ঈশা খাঁ। তৎকালে তার এগারসিন্দুর দূর্গ হতে মন্দির সংলগ্ন রাস্তা দিয়ে জঙ্গলবাড়ি যাওয়ার পথে থেকে মন্দিরের ভোগ আরতির সুঘ্রাণে মুগ্ধ হয়ে যাত্রা বিরতি করেন এবং এই মন্দিরের আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে জঙ্গলবাড়ীর দেওয়ান বীর ঈশা খাঁ মন্দিরের জন্য লাখেরাজ জমি দান করেছিলেন। আর তখন থেকেই এলাকার নামকরণ করা হয় ভোগবেতাল।

১৫৯৫ সালে এগারসিন্দুর দূর্গে ঈশা খাঁ সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহ কর্তৃক এগারসিন্দুর দূর্গে অবরুদ্ধ হন। বিজয়ী সৈন্যরা জয়ের বিজয় উল্লাস করেন বর্তমান রথমেলার প্রশস্ত রাস্তায়। ১৮৯৭ খ্রীষ্টাব্দে এক প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে মূল মন্দিরটির তৎকালীন পঞ্চরত্নসহ বিধ্বস্ত হয়।

ষোড়শ শতকের দিকে কিশোরগঞ্জের কবি নিত্যানন্দ দাসের প্রেমবিলাস গ্রন্থে পাওয়া যায়, মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্য দেব পাকুন্দিয়ার এগারসিন্দুর হয়ে আচমিতার বৈষ্ণব লক্ষ্মীনাথ লাহিড়ীর আতিথ্য গ্রহণ করেন। ৩/৪ দিন ভোগবেতাল মন্দিরে নাম সংকীর্তন পরিবেশন করেছিলেন।

বর্তমানে, মাঘ মাসের প্রথম দিক থেকে ৭২ প্রহরব্যাপী অর্থাৎ ৯ মাঘ পর্যন্ত রাত দিন একনাগারে একনাম বা হরিনাম সংকীর্তনে হাজার হাজার ভক্তবৃন্দ নারী-পুরুষ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে উৎসবে অংশগ্রহণ করেন।

১২১৭ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত বাংলা পত্রিকা “উদ্বোধন” বিশ্বেশর দাস গুপ্তের লেখা প্রতিবেদনেও তৎকালীন গোপীনাথ বাড়ী সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য ধারণা করা যায়।

প্রায় ৫০০ বছর পূর্বে শ্রী শ্রী গোপীনাথ মন্দিরের কাছে বাউল সাগর নামক নদীতে বিভিন্ন জায়গা থেকে বজরা এবং নৌকার বহর আসত। এককালে মন্দিরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হতো এই বাউল সাগর নদী।

জনশ্রুতিতে রয়েছে, “মহাপ্রভু চৈতন্যদেবের সমসাময়িক তাঁরই ভক্ত শিষ্য পুরী নিবাসী জগন্নাথদেব এক রাতে স্বপ্ন দেখেন তার স্বগৃহে প্রতিষ্ঠিত গোপীনাথ বিগ্রহ তাকে বলছে, ‘জগন্নাথ আমাকে নিয়ে তুমি দক্ষিণ দেশে যাও এবং প্রেম ধর্ম প্রচার কর”।

জগন্নাথ পরদিনই কাল কাঠ খোদাই ছোট বিগ্রহটি কাপড়ে জড়িয়ে দক্ষিণ দেশে রওনা হন। প্রায় মাসাধিকাল পথ চলার পর একরাতে জগন্নাথ আবার স্বপ্ন দেখেন গোপীনাথ বলছে জগন্নাথ আর যেও না, এখানে আমাকে প্রতিষ্ঠা করে প্রেমধর্ম প্রচার কর। ঘুম থেকে জেগে জগন্নাথ চিন্তায় পড়েন। এই গভীর অরণ্যে তিনি কি করে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করবেন।

এই স্থানটি গভীর বনে আচ্ছাদিত থাকলেও অতি নিকটেই এ অঞ্চলের সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায়ের প্রাসাদ বাড়ি। জগন্নাথ রাজা নবরঙ্গ রায়ের প্রাসাদ বাড়িতে গমন করেন এবং বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার জন্য রাজার সহযোগীতা চান। রাজা নবরঙ্গ রায় বিগ্রহ মন্দিরসহ বেশ কয়েকটি দালান নির্মাণ করে দেন।

এককালে রথযাত্রা উপলক্ষে বসতো ১৫ দিনব্যাপী মেলা। ভাটি এলাকা ও হাওর অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসতো নৌকা ও বজরার বহর। জড়ো হতো বাউল সাগর নদীতে। এককালে ১০৫ ফুট উচ্চতাসম্পন্ন ৩২ চাকার রথ স্থানীয় জমিদারের পোষা হাতী দিয়ে গোপীনাথ মন্দির থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দীর্ঘ বিশাল সড়কপথ দিয়ে ভক্তবৃন্দ রথ টেনে নিয়ে যেতেন গুন্ডিচা বাড়িতে (শ্বশুর বাড়ি)। আবার ৮ দিন পর ফিরে আসত নিজ বাড়িতে। রথ ছিল ৩ টি, একটি পিতলের, অন্য দুইটি কাঠের তৈরি। ১৫৯৫ সালে এগারসিন্দুর দুর্গে ঈশা খাঁ সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহ কর্তৃক অবরুদ্ধ হন। মল্লযুদ্ধে সেনাপতি মানসিংহ ঈশা খাঁ কর্তৃক পরাজয় বরণ করেন। বিজয়ী সৈন্যরা বিজয় উল্লাস করেন রথ মেলায় সুপ্রশস্ত রাস্তায়।

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ২৫ একর ৮ শতাংশ ভূমি রয়েছে। ১৩৪২ বাংলা সালে রথটি ঝড়ে পতিত হলে এর সংস্কার করা হয়। ৩২ চাকার রথটি কালক্রমে ২৪ ও ১৬ চাকায় বর্তমানে ৯ চাকায় রথটি তৈরি হয়। বর্তমানে রথটি অতীত কারুকার্যের কিছু স্মৃতি বহন করছে। অদ্যাবধি প্রতি বছরই রথযাত্রা ও ৮ দিনব্যাপী গ্রামীণ মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। লক্ষাধিক মানুষ এতে অংশগ্রহণ করছেন। বর্তমানে বিভিন্ন অট্টালিকা নানা সমস্যায় দিন দিন ভেঙ্গে যাচ্ছে। আজ মূল মন্দির, ঝুলন মন্দির, আদি মন্দির, রন্ধন শালা, দোল, স্টোররুম, অফিস কক্ষ, গুন্ডিচা মন্দির, দুইটি পুকুর ও একটি দীঘি সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ । বর্তমানে মন্দিরের প্রায় ৩ একর ৮৩ শতাংশ ভূমি অবৈধ দখলে চলে গেছে। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন।

গোপীনাথ বাড়ীর নিকট এককালে ‘বাউল সাগর’ নামের একটি ছোট নদী ছিল। কিন্তু সে নদীর ঠিকানা আজ কোথায় এর কোন সঠিক তথ্য জানা নাই।