লাল শাপলার সমাহার নয়, যেন লাল গালিচা

রাজীব সরকার পলাশ, বিশেষ প্রতিনিধি ।।

অপরূপ বৈচিত্র্যের লীলাভূমি আমাদের এই বাংলাদেশ। বিভিন্ন ধরনের ফুলের সোন্দর্য্য বাংলার বৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। বিভিন্নরকম ফুলের মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় ফুলের স্বীকৃতি নিয়ে ‘শাপলা’ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। শুধুমাত্র বাংলাদেশ নয়, শ্রীলংকার জাতীয় ফুলও এই শাপলা। শ্রীলংকায় শাপলাকে নীল-মাহানেল বলে ডাকা হয়। ইংরেজিতে শাপলাকে বলা হয় Water lily; যার বৈজ্ঞানিক নাম Nymphaea nouchali। বাংলাদেশের জাতীয় ফুল সাদা শাপলা হলেও অযত্ন আর অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে নয়নাভিরাম এই ফুল। আবহাওয়ার দিক থেকে সাদা, লাল, বেগুনি, হলুদ ও নীল এই পাঁচ রঙের শাপলা আমদের দেশে জন্মে।

বিভিন্ন জায়গায় শাপলা চোখে পড়লেও কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া বাজারসংলগ্ন রৌয়াডুবি বিলে ‘লাল শাপলা’র দৃশ্য যেন অপরূপ সোন্দর্য্যের এক বিশাল আয়োজন। সকাল বেলায় ফোটে থাকা লাল শাপলা দেখলে মনে হবে লালগালিচা বিছিয়ে রাখা হয়েছে পুরো বিল জুড়ে। চোখ জুড়িয়ে যায় এই দৃশ্য দেখে।

রৌয়াডুবি বিল পাড়ের বাসিন্দা ও মসূয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক আমিনুল হক জানান, ‘মুক্তিযুদ্ধকালীন এই বিলে পদ্মফুলের গড় ছিল। প্রচুর পদ্মফুল ফুটতো। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে ‘পদ্মফুল’ বিলীন হয়ে যায়। এরপর পুরো বিল জুড়ে প্রচুর ‘সাদা শাপলা’ ফুটতে দেখা গেছে। গত একদশক ধরে এই বিলে ‘লাল শাপলা’ ফোটে। কয়েকদিন আগে কিছু লোক ভ্যানগাড়ি ভরে এই ‘লাল শাপলা’ নিয়ে যেতে দেখেছি। পরবর্তীতে জেনেছি এই লাল শাপলা ঢাকায় বিক্রির উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। আমরা কয়েকজন মিলে বাধা দেই। এখন দেখা যায় বিলের দুই পাশে পুকুর, জমি ও ঘর নির্মাণের কারণে রৌয়াডুবি বিল এখন জমি এবং পুকুরে পরিণত হয়েছে।’

উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জাকির হোসেন জানান, শাপলা বর্ষাকালে জন্মে ও ফুল ফোটে। জুন মাসের শেষের দিকে ফুল ফোটা শুরু হয় এবং সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে শেষ হয়। জাতীয় ফুল শাপলা সাধারণত আবদ্ধ অগভীর জলাশয়, খাল-বিলে জন্মে থাকে। শাপলা ফুলের বংশবৃদ্ধি মূলত শিকড় থেকেই হয়ে থাকে।

মসূয়া পরিবার পরিকল্পনা পরির্দশক আলম মিয়া জানান, বর্ষাকালে ফুল থেকে যে অংশ ফলে রূপান্তরিত হয় তাকে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় ‘বেট’ বলি। এ ‘বেট’র ভিতরে অনেক ছোট ছোট বীজ থাকে। এগুলো উঠিয়ে নিয়ে ভেঙ্গে শুকিয়ে খই একসময় ভেজে খেতাম। এ খই খুবই সুস্বাদু।

স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোঃ কামরুল ইসলাম বলেন, আমি বিদ্যালয়ে আসার সময় অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে অপরূপ দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হই। জাতীয় ফুল শাপলা হলেও এক সময় হয়তো পাঠ্যবইয়ে বা কাগজে-কলমে লেখা থাকবে। দ্রুত বিলুপ্তির কারণে বাস্তবে আর শাপলা খুঁজে পাওয়া যাবে না। এক সময় বিলে ঝিলে পুকুরে বর্ষা মৌসুমে নানা রঙের শাপলার বাহারী রূপে নয়ন জুড়িয়ে যেত। শাপলা ছোট, বড় সকলের খুব প্রিয় ফুল। গ্রামের মানুষের কাছে সবজি হিসেবেও খুব জনপ্রিয় ছিল এই শাপলা। একসময় অনেকেই বিল থেকে শাপলা তুলে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতো।

স্থানীয় অনেকের ধারণা, নদী-নালা, খাল-বিল ও আবদ্ধ জলাশয় ভরাটের কারণে বিভিন্ন এলাকা থেকে এই জাতীয় ফুল শাপলা ক্রমান্বয়ে বিলুপ্ত হওয়ার পথে। এছাড়াও অযত্ন অবহেলায় আর কৃষি জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। সংরক্ষণেরও নেই কোনো উদ্যোগ।