১০ শতাংশ এমপি এক বছরে কোনো কথাই বলেননি

আমাদের নিকলী ডেস্ক ।।

● জাতীয় সংসদের মোট সদস্য ৩৫০
● এক বছরে কোনো ধরনের আলোচনায় অংশ নেননি ৩৬জন সংসদ সদস্য
● ৪ জন বিরোধী দলের, ২ জন স্বতন্ত্র, ৩০ জন সরকারি দলের।
● ৩৬ জনের মধ্যে ১৮ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত
● আরও ৩১ জন প্রশ্নোত্তর বা ৭১ বিধি ছাড়া অন্য আলোচনায় অংশ নেননি

জাতীয় সংসদের ৩৫০ জন সদস্যের মধ্যে অন্তত ৬৭ জন সদস্য সংসদীয় কার্যক্রমে অনেকটা নিষ্ক্রিয়। এর মধ্যে ৩৬ জন সাংসদ (১০ শতাংশ) গত এক বছরে সংসদ অধিবেশনে কোনো ধরনের আলোচনায় অংশ নেননি।

আইন প্রণয়নের কাজে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রেও সাংসদদের আগ্রহে ঘাটতি আছে। গত বছর মন্ত্রীরা ছাড়া ঘুরেফিরে মাত্র নয়জন সদস্য আইন প্রণয়নের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। বাকিরা দায়িত্ব শেষ করেছেন ‘হ্যাঁ-না’ ভোট দিয়ে।

২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের পাঁচটি (১৪তম থেকে ১৮তম) অধিবেশনের কার্যপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

২০১৭ সালের সংসদ অধিবেশন নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় (পার্লামেন্ট ওয়াচ) দেখা গেছে, এই পাঁচটি অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা, বাজেট আলোচনা, মন্ত্রীদের প্রশ্নোত্তর, প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর, ১৪৭ বিধিতে সাধারণ আলোচনা, পয়েন্ট অব অর্ডারে অনির্ধারিত আলোচনা, ৭১ ও ৭১-ক বিধিতে জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশ, সিদ্ধান্ত প্রস্তাব, আইন প্রণয়ন-কোনো পর্বেই কথা বলেননি ৩৬ জন সাংসদ। তবে তাঁরা সংসদে উপস্থিত ছিলেন।

৬৭ জনের মধ্যে ৩১ জন সদস্য কোনো না-কোনো পর্যায়ে প্রশ্নোত্তর ও ৭১ বিধিতে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। যে ৩৬ জন কোনো আলোচনায় অংশ নেননি তাঁদের মধ্যে চারজন বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সদস্য। দু’জন স্বতন্ত্র সাংসদ। বাকি ৩০ জন সরকারি দলের।

বিরোধী দল জাতীয় পার্টির চারজন হলেন এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান, শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ, লিয়াকত হোসেন ও সেলিম ওসমান।

শরিফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, গত বছর সংসদে তিনি কোনো কথা বলেননি-এই তথ্য সঠিক নয়। তিনি কবে কথা বলেছেন, তা মনে আছে কি না, জানতে চাইলে জিন্নাহ বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে তিনি তা মনে করতে পারছেন না।

গত বছর সংসদে নিষ্ক্রিয় ছিলেন দুই স্বতন্ত্র সাংসদ হাজি মো. সেলিম ও রাজী মোহাম্মদ ফখরুল। তবে এই সংসদের শুরু থেকে সরকার-বিরোধিতায় বেশ সোচ্চার ছিলেন হাজি সেলিম। দীর্ঘদিন ধরে তিনি অসুস্থ।

সরকারি দলের সদস্যদের মধ্যে যাঁরা নিষ্ক্রিয় ছিলেন তাঁরা হলেন ইকবালুর রহিম, আবু সালেহ মোহাম্মদ সাইদ, আবদুল ওদুদ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩), মো. আবদুল ওয়াদুদ (রাজশাহী-৫), আবদুল কুদ্দুস, হাসিবুর রহমান, আবদুর রউফ, সোলায়মান হক জোয়ার্দার, রণজিত কুমার রায়, মোজাম্মেল হোসেন, মন্নুজান সুফিয়ান, খন্দকার আসাদুজ্জামান, ইফতেখার উদ্দিন তালুকদার, রেবেকা মোমিন, রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক, নাজমুল হাসান, এ এম নাঈমুর রহমান, সাবের হোসেন চৌধুরী, আসলামুল হক, সিমিন হোসেন, রাজিউদ্দিন আহমেদ, নাহিম রাজ্জাক, নূর-ই-আলম চৌধুরী, ফয়জুর রহমান, এইচ এম ইব্রাহিম, মোহাম্মদ একরামুল করিম চৌধুরী, এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী, নারী সাংসদ হেপী বড়াল, অ্যাডভোকেট মমতাজ বেগম ও ফাতেমা তুজ্জহুরা।

তবে সংসদে আলোচনায় অংশ না নিলেও এই তালিকায় থাকা নূর-ই-আলম চৌধুরী, সাবের হোসেন চৌধুরী, রেবেকা মোমিন ও এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীসহ কয়েকজনকে সংসদীয় কমিটিতে সক্রিয় দেখা গেছে।

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ প্রথম আলোকে বলেন, সবাইকে কথা বলতেই হবে, এমন নয়। তবে সবাই কোনো না-কোনোভাবে ভূমিকা রাখেন। অধিবেশনের বাইরে সংসদীয় কমিটিতে সদস্যরা আলোচনা করেন। অনেকে এলাকার বিষয়ে মন্ত্রীদের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলেন। গত বছর কারা কারা আলোচনায় অংশ নেননি, তা তাঁর ‘নলেজে’ নেই।

সাংসদদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, তাঁরা বিভিন্ন সময় আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। হাসিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এই তথ্য সঠিক নয়। তিনি রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, এলাকার রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংসদে কথা বলেছেন। প্রতিটি অধিবেশনেই তিনি দু-চারটি প্রশ্ন করে থাকেন।

নাটোর-৪ আসনের সাংসদ আবদুল কুদ্দুস প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর কথা না বলার কারণ সংসদ নেতা ও স্পিকার জানেন। এ বিষয়ে তিনি কিছু বলতে চান না। তবে সর্বশেষ অধিবেশনে সভাপতিমণ্ডলীর (স্পিকার/ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য নির্ধারণ করা তালিকা) একজন ছিলেন তিনি।

গত বছরের অধিবেশনগুলোর কার্যপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১৭ সালের প্রথম অধিবেশনে কার্যদিবস ছিল ৩২ টি। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নেন ২৩১ জন। ওই অধিবেশনে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা নিয়ে ১৪৭ বিধির আলোচনায় অংশ নেন ৫৬ জন। ২৪ কার্যদিবসের বাজেট অধিবেশনে বাজেট আলোচনায় অংশ নেন ২০৭ জন।

২০১৭ সালের চতুর্থ অধিবেশনে (চলতি সংসদের ১৭ তম অধিবেশন) রোহিঙ্গাদের ফেরাতে আন্তর্জাতিক মহলের জোরালো কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানাতে আনা প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নেন ১৬ জন। একই অধিবেশনে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ে পর্যবেক্ষণ বাতিল করতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আনা প্রস্তাবের আলোচনায় ১৮ জন অংশ নেন।

পঞ্চম অধিবেশনে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেসকোর মেমোরি অব দ্য ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ধন্যবাদ জানিয়ে আনা প্রস্তাবের ওপর আলোচনা করেন ৫৮ জন সাংসদ।

এর বাইরে প্রায় প্রতিদিন ছিল প্রশ্নোত্তর, জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ, অনির্ধারিত আলোচনা, সপ্তাহে একটি বেসরকারি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব এবং আইন প্রণয়ন কার্যাবলি।

২০১৭ সালে দশম জাতীয় সংসদের পাঁচটি অধিবেশনে ২৪টি আইন পাস হয়। এর মধ্যে বাজেট-সংশ্লিষ্ট তিনটি বাদে ২১টি আইন পাসের প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঘুরেফিরে মাত্র নয়জন সদস্য বিভিন্ন ধরনের নোটিশ দিয়ে বিলের ওপর আলোচনা করেছেন। এর মধ্যে দুজন স্বতন্ত্র সাংসদ, অন্যরা বিরোধী দলের সদস্য। সরকারি দলের কোনো সদস্য নোটিশ দেননি। এই নয়জন ছাড়া অন্যরা বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিকবার ‘হ্যাঁ-না’ ভোট দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছেন।

সংসদ বিষয়ে বিশ্লেষক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের সংসদে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকারি দলের সদস্যদের কথা বলার সুযোগ থাকে না বললেই চলে। আর বর্তমান সংসদে কার্যকর বিরোধী দল না থাকায় প্রাণবন্ত বিতর্ক নেই। এখন সরকারের প্রশংসা করা আর সংসদের বাইরে বিএনপিকে নিন্দা করা হয়ে গেছে মূল কাজ। তবে সব পার্লামেন্টেই সদস্যদের একটি অংশ নিষ্ক্রিয় থাকে বলে জানান ওই অধ্যাপক।

টিআইবির গবেষণায় দেখা গেছে, অনির্ধারিত আলোচনায় ১০ শতাংশ সময় ব্যয় হয়েছে সরকার ও সরকারপ্রধানের জনপ্রিয়তা ও প্রশংসা করে। আর ২৬ শতাংশ সময় ব্যয় হয়েছে সংসদের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও সুশীল সমাজের সমালোচনায়।

সূত্র : প্রথম আলো, ৬ জুন ২০১৮