হাওর জলাশয়ে ফুটছে না শাপলা ফুল

আবদুল্লাহ আল মহসিন ।।
এক সময় হাওর জলাশয়, বিল ঝিল খাল পুকুর নিচু জমিতে বর্ষাকালে ফুটতো জাতীয় ফুল শাপলা। নিকলী উপজেলার বড় হাওর ছিল শাপলা বনের বিশাল প্লাবন ভূমি। রওয়ার বিল, মাহমুদপুরের হাওর, ছেত্রা, গুরুই, কারপাশা, নানশ্রী, দামপাড়া, সহরমূল, মজলিশপুর, নিকলীর কুর্শাসহ সবখানেই ছিল শাপলার সমারোহ। প্রকৃতির বৈরী আবহাওয়া আর কৃষি জমির আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ, জলাশয়ে সমন্বিত হাইব্রীড মুরগীর খামার ও মাছ চাষ করাসহ বিভিন্ন কারণে জলজ উদ্ভিদ শাপলা ফুল হারিয়ে যাওয়ার পথে।


এক সময় ভাটির শিশুরা দল বেধে উৎসব আর আনন্দে শাপলা হাওর তুলতো। ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক মাসে শাপলা ফুলের গন্ধ বাতাসে বয়ে বেড়াত। পাড়া গায়ে। নিকলীর থানার পুকুরে এক সময় লাল শাপলা ফুটতো। কারপাশার উজানিয়া হাটিতেও একটি শাপলা পুকুর ছিল। এখন সব জলাশয় থেকে শাপলা ফুল হারিয়ে গেছে। তবে জারুইতলা ইউনিয়নের রোদারপুড্ডা, ধারিশ্বর, সাজনপুর, শাহপুর ও রসুলপুরের ছোট ছোট খাল, অল্প পানিতে এ বছর কিছু শাপলা ফুল ফুটতে দেখা গেছে। আগের তুলনায় তা খুবই কম।


শাপলা এক প্রকার জলজ উদ্ভিদ। এই ফুল উপমহাদেশে দেখা যায়। প্রাচীন কাল থেকে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। থাইল্যান্ড, মায়ানমারে এই ফুল পুকুর ও বাগান সাজাতে খুবই জনপ্রিয়। কিস্তান, শ্রীলংকা, ইয়েমেন, তাইওয়ান, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া, লাওস, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশের পুকুর ও জলাশয়ে দেখা যায়। সারা পৃথিবীতে ৩৫ প্রজাতির শাপলা পাওয়া গেছে।
ইংরেজিতে শাপলাকে বলা হয় Water Lily. White water lily. what lotus. বাংলায় নীল শাপলা ফুলকে শালুক বা নীল কমল বলে, আর লাল শাপলাকে রক্তকমল বলা হয়। শাপলা ফুল দিনের বেলা ফোটে। এটি সরাসরি কাণ্ড ও মূলের সাথে যুক্ত থাকে। তার পাতা আর ফুলের কাণ্ড বা ভাটি (পুষ্প দণ্ড) পানির নিচে মূলের সাথে যুক্ত থাকে। আর এই মূল যুক্ত থাকে মাটির সঙ্গে এবং পাতা পানির ওপর ভেসে থাকে। মূল থেকেই নতুন পাতার জন্ম হয়। পাতাগুলো গোল এবং সবুজ রঙের হয়। তবে নিচের অংশ কালো রং থাকে। ভাসমান পাতাগুলো চারদিক ধারালো হয়। পাতার সাইজ ২০ থেকে ২৩ সেন্টিমিটার এবং এদের ব্যাপ্তি ০.৯ থেকে ১.৮ মিটার হয়ে থাকে। বাংলাদেশে নানা রঙের শাপলা দেখতে পাওয়া যায়। উল্লেখযোগ্য রঙের শাপলা হলো গোলাপী, সাদা, নীল। শাপলা ফুলে ৫টি বৃতি থাকে ও ১৩টি থেকে ১৫টি পাপড়ি থাকে। ফুলগুলো দেখতে তারার মতো মনে হয়।


সাদা শাপলা ফুল বাংলাদেশের জাতীয় ফুল। এছাড়া টাকায়, কয়েনে দলিলপত্রে শাপলার জলছাপ আঁকা থাকে। শ্রীলংকারও জাতীয় ফুল শাপলা। এই ফুলের বিবরণ প্রাচীন বই-পত্রে ও সাহিত্যে পাওয়া যায়। বৌদ্ধদের বিশ্বাস মতে, গৌতমবুদ্ধের পায়ের ছাপে পাওয়া ১০৮টি শুভ চিহ্নের মাঝে শাপলা ফুল ছিল একটি। গ্রীক দার্শনিক প্লেটো ও এরিস্টোটলের এক শিষ্য থিউফ্রাস্টাস বলেছেন, শাপলা ফুল প্রায় খৃষ্টপূর্ব ৩০০ বছরের পুরনো উদ্ভিদ। তিনি আরো বলেছেন, প্রাচীন গ্রীকে জলদেবীদের এই ফুল উৎসর্গ করার রীতি ছিল। প্রাচীন মিশরীয়রাও নীল, লাল, সাদা শাপলা ফুলের প্রতি অনুরাগী ছিল। বহু পূর্ব হতে ভারতে হিন্দু সম্প্রদায় তাদের সর্পদেবী মনসা পূজায় শাপলা ফুল ব্যবহার করে। আমাদের দেশে শাপলার কাণ্ড সবজী হিসাবে খাওয়া হয়। পূর্ণ বিকশিত শাপলা ফুলের গর্ভাশয়ে গুডি বা বীজ থাকে। গ্রামের শিশুদের কাছে এটি ঢ্যাপ নামে পরিচিত। ঢ্যাপের বীজ শুকিয়ে ভেজে এক ধরনের খাবার তৈরি করা যায়। একে ঢ্যাপের খৈ বলে। খৈ ও গুড় মিশিয়ে মোয়াও তৈরি করা হয়। খেদে বেশ সুস্বাদু। শাপলার গোড়ায় আলোর মতো কন্দ থাকে। একে বলে শালুক। শালুক সিদ্ধ করে খাওয়া যায়।


শাপলা ফুলের ঔষধি গুণাগুণও রয়েছে। ডায়েবেটিস, চুলকানি, প্রস্রাব জ্বালাপোড়া, আমাশয়ের জন্য শাপলা মহৌষধ। মানসিক রোগীর মাথা ঠাণ্ডা করে, মানবদেহকে স্নিগ্ধ ও শীতল করে। হৃদযন্ত্রের উপকার করে। শাপলা শুকিয়ে গবাদি পশুর খাবার প্রস্তুত করা যায়। আমাদের দেশের কবি-সাহিত্যিকরা তাদের লেখায় শাপলা ফুলের বর্ণনা ব্যবহার করেছেন। হাওরের বিল ঝিল জলাশয় থেকে যে কারণে শাপলা ফুল হারিয়ে যাচ্ছে এ সম্পর্কে আমদের নিকলীকে বিশিষ্ট কৃষি গবেষক, হাওর ভূমিপুত্র ডঃ নিয়াজ পাশা জানান, হাওরে যে সকল জমিতে এখন শাপলা শালুক ফুটছে না তার উল্লেখযোগ্য কারণ হলো, এখন হাওরে আগের মতো পতিত জমি নেই। সব জমি নিরবচ্ছিন্নভাবে চাষ করা হয়। এতে শাপলার বীজ নষ্ট হয়ে যায়। এজন্য নতুন করে শাপলা ফুল ফুটছে না। পরিবেশবিদরা এতে আশংকা প্রকাশ করছেন যে, বিলে ঝিলে শাপলা ফুল না ফুটলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। এ সম্পর্কে কৃষিবিদ ডঃ ওমর ইবনে হাছান বলেন, আমাদের পরিবেশ ভারসাম্য ঠিক রাখার জন্য জলজ ভূমিতে শাপলা ফুলের আবাদ করা দরকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *