নিকলীতে পর্যটন কেন্দ্র, সৌন্দর্য ও রাজস্ব দুই-ই বাড়াবে

মোঃ হেলাল উদ্দিন ।।

হাওরের একেবারে কুল ঘেঁষে কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার অবস্থান। মূল রাস্তা কুর্শা হতে বেড়ীবাঁধ পর্যন্ত প্রায় ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ প্রতিরক্ষা দেয়াল। এখন বর্ষা। হাওরের বিশাল বিশাল ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার দৃশ্য আর অবিরাম মুক্ত হাওয়া অবলোকনের জন্য প্রতিদিন নিকলীতে আসছেন আশপাশের উপজেলাসহ দূর-দূরান্ত থেকে শত শত ভ্রমণপিপাসু মানুষেরা।

কেউ চাঁদনী রাতে বেড়ীবাঁধে বসে কেউ-বা নৌকায় চড়ে হাওরের সৌন্দর্য্য উপভোগ করেন। বর্ষার শুরুতেই স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী ও দর্শনার্থীরা এ স্থানে আসছেন। বেড়ীবাঁধে দাঁড়িয়ে যতদূর দেখা যায় শুধুই পানি আর পানি। দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি ভেদ করে ভোরের সূর্যোদয়ের দৃশ্য অনেকটা কক্সবাজারের বা কুয়াকাটার সমুদ্র সৈকতেরই প্রতিরূপ বলে মনে হয়।

বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলাসহ কিশোরগঞ্জের তাড়াইল, কটিয়াদি, কুলিয়ারচর, ভৈরব, বাজিতপুর, করিমগঞ্জসহ অনেক উপজেলার লোকজন এখানে পিকনিক করতে বেড়ীবাঁধে আসছেন। দিন দিন বেড়ীবাঁধের গুরুত্ব ও আকর্ষণ বেড়েই চলেছে। দর্শনার্থীদের মধ্যে যারা দূর থেকে গাড়ি নিয়ে আসেন তাদের কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। কারণ বেড়ীবাঁধে গাড়ি পার্কিংয়ের পর্যাপ্ত পরিমাণে জায়গা নেই। এমনকি দর্শনার্থীদের সেবা প্রদানের জন্য কোনো অবকাঠামোগত ব্যবস্থা এখনো গড়ে উঠেনি।

পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার হোটেল, নিরাপত্তা, গাইডসহ আবাসিক সুবিধা না থাকায় পর্যটক-দর্শনার্থীরা ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও নিকলীতে রাত কাটাতে পারছেন না।

১৮২৩ সালে থানা এবং ১৯৮৩ সালে উপজেলায় উন্নীত হয় নিকলী। এখানে হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, সরকারি-বেসরকারি নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। হাওরসমৃদ্ধ কিশোরগঞ্জ জেলার কেন্দ্রস্থল ও হাওরের সেরা প্রবেশপথ বলা হয় নিকলীকে। উপজেলা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ঘোরাউত্রা নদী। আর এ নদীপথে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার মালামাল নদীপথে পরিবহন করে থাকে।

সর্বোপরি দেশে শতকরা ৮০ ভাগ ধান ও মৎস্যসম্পদ এ হাওর অঞ্চল থেকে আহরিত হয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার চাহিদা পূরণ করে থাকে। এ জেলার প্রাচীন ও ঐতিহাসিক নিদর্শনাদির মধ্যে নিকলীর গুরুই শাহী মসজিদ, পাহাড় খাঁর ভিটা, হযরত শাহ গুন (রঃ) মাজার, ছেত্রার আখড়া (বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান) সাইটদার লাল গোস্বামীর আখড়া, চন্দ্রনাথ গোস্বামীর আখড়া, হাওরের বুক চিড়ে বয়ে যাওয়া স্বপ্নের “রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ সড়ক”, কয়েক লাখ লোকসমাগমে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। তাছাড়া হাওরে মাছ ধরা, সাঁতার কাটা, নৌকা ভ্রমণ ইত্যাদি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় বিষয়।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, জেলা সদরের সাথে সড়কপথের যোগাযোগ বর্তমান সময়ে অনেক ভালো। এছাড়াও অন্যান্য জেলার সাথে নৌ-পথের যোগাযোগ যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক উন্নত।

হাওর অঞ্চলের প্রাচীন ও ঐতিহাসিক নিদর্শনাবলী প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিষয় যথাযথভাবে প্রচার না হওয়ায় এখন পর্যন্ত এ এলাকায় কোনো ধরনের পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠেনি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারকে হাওর অঞ্চলের ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং হাওরের বিচিত্র পর্যটন আকর্ষণ বিপণনের জন্য এগিয়ে আসতে হবে।

রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ সড়ক

ক্রমেই বাংলাদেশের প্রায় সকল জেলার ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে নিকলীর বেড়ীবাঁধ। সম্প্রতি বেড়ীবাঁধ এলাকায় সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, পড়ন্ত বিকালে সেখানে নানা বয়সের মানুষের উপচেপরা ভিড়। কেউ নৌকাবাইচ করছে, আবার কেউ মুক্ত বাতাসে প্রিয়জনদের সাথে নিয়ে আড্ডায় মেতে উঠেছেন। এমন সময় বেড়ীবাঁধ এলাকার পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে কথা হয় নিরসিংদী জেলার বেলাব উপজেলার ব্যাংকার তৌফিকুল ইসলাম ভুইয়া, নারায়ণগঞ্জ তুলারাম কলেজের ছাত্রী আফসানা মীম, গাজীপুর জেলার রড ব্যবসায়ী আলম, করিমগঞ্জ উপজেলার ঢাকাস্থ ব্যবসায়ী হাসানুল রেজা (শরিফ), নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার সরকারি শিক্ষা কর্মকর্তা ফয়সাল মাহমুদের সাথে।

কালি মন্দির। এখানে নিকলীর সবচে’ ঐতিহ্যবাহী বড়মেলা বসে। চলে প্রায় সপ্তাহব্যাপী

ঘুরতে আসা এই দর্শনার্থীরা জানান, নিকলীর এ বেড়ীবাঁধ একদিন বাংলাদেশের সেরা একটি দর্শনীয় স্থান হিসাবে রূপ ধারণ করবে। এখানকার পরিবেশ, নিরাপত্তা, স্থানীয় মানুষজনের আচরণ অত্যন্ত ভালো। এ অবস্থায় আমাদের কাছে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় তাহলো যদি এখানে একটি পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন করা হয় দর্শনার্থীরা আনন্দের সাথে এখানে সুন্দর পরিবেশে পানির আছড়েপরা ঢেউ এবং জ্যোৎস্না ভরা রাত উপভোগ করতে সহজ হবে। সুনির্দিষ্ট পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকলে গাড়ি নিয়ে আসাদের জন্য এ নিয়ে কোনো ঝামেলা থাকবে না। পাশাপাশি সরকারের লাখ লাখ টাকা রাজস্বও আসতে পারে। বর্তমান আধুনিক শিক্ষা বিনোদন সংস্কৃতিতে এ উপজেলার মানুষদের স্ব-স্ব ক্ষেত্রে তাদের প্রতিভা বিকাশে অগ্রগতি লাভ করবে।

দেশসেরা সাঁতারুরা উঠে আসছেন নিকলী থেকে। এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও রয়েছে এখানকার সাঁতারুদের পদচারণা

দীর্ঘদিন যাবত বেড়ীবাঁধ এলাকার গুরুত্ব ও আকর্ষণ চিন্তা করে একটি পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের জন্য নিকলীর আলোকিত মানুষ সাবেক সচিব কারার মাহমুদুল হাসান চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাঁর সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা হলে তিনি জানান, আবেদনের প্রেক্ষিতে সরকার নিকলীতে পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে স্মারক নং বাপকঃ প২(১২০)/২০০৮/৩৩৬ তারিখঃ ১৯-০৯-২০১৩ তে দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করে। এতে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা) মোঃ খালিদ বিন মজিদ ও নির্বাহী কর্মকর্তা (বাণিজ্য) মোঃ মুখলেসুর রহমান খান পরিদর্শন করে সরকারের উচ্চমহলে এ সংক্রান্ত একটি লিখিত পরিদর্শন প্রতিবেদন দাখিল করেছেন।

বেড়ীবাঁধের নয়নাভিরাম দৃশ্য

কমিটির সুপারিশপত্রে বলা হয়, (১) নিকলীতে পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত পূর্বগ্রাম এলাকায় স্থায়ীভাবে পিকনিক শেডসহ কতিপয় পর্যটন সুবিধা করা যেতে পারে। (২) হাওরের জীব বৈচিত্র্যময় পর্যটন আকর্ষণ এবং ঐতিহাসিক স্থানসমূহের প্রচার প্রচারণার জন্য বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড হতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

এলাকাবাসীর দাবি বর্ষা মৌসুম এলে বিভিন্ন এলাকার দর্শনার্থী যানবাহন নিয়ে ঘুরতে আসেন। তখন পর্যটকদের কারণে নানামুখী সমস্যায় পড়েন স্থানীয় লোকজন। যদি নিকলীতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় একটি পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণ করা হয় তবে দর্শনার্থীরা আনন্দের সাথে উপভোগ করতে পারবেন। বেড়ীবাঁধসহ হাওরের নানা বৈচিত্র্য ও নিকলীর উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক স্থাপনাসমূহ। সরকারের কাছে এলাকাবাসীর প্রাণের দাবি, এ এলাকায় একটি পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণ করা হোক। এতে করে নিকলীর সৌন্দর্য বাড়বে, পর্যটন আকর্ষণীয় হবে, তুলনামূলক বেশি দর্শনার্থীদের টানবে; পাশাপাশি সরকারও এ থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব উপার্জন করতে সক্ষম হবে।

লেখক : সাংবাদিক

ছবি সূত্র : এফবি পেজ ও গ্রুপ নিকলী প্রতিদিন