তারুণ্য : কী বলে ইসলাম

এহসান বিন মুজাহির

 

তারুণ্য হচ্ছে কাঁচা বয়সের একটি উদ্দীপনার নাম। তারুণ্য অর্থ হচ্ছে বাধা না মানা। তীব্র স্রোতে উজান সাঁতারে পাড়ি দেয়াই তরুণদের কর্ম। তারুণ্য একটি অদম্য শক্তি। এটি অপ্রতিরোধ্য ঝড়। একটি দৃপ্ত শপথ। একটি অপারেজয় দুর্জেয় ঘাঁটি। তারুণ্য এক আসাধ্য সাধনের কারিগর। অফুরন্ত প্রাণশক্তি আর সৃষ্টির উন্মাদনাই তারুণ্যের গৌরব। বদ্ধ কুটিরের দুয়ার চূর্ণ করে চাওয়াটা অর্জন করাই তার ধর্ম। চেতনাদৃপ্ত তরুণেরা যখন জেগে ওঠে, তখন সব প্রতিবন্ধকতার চড়াই-উতরাই মাড়িয়ে তারা বিজয় ছিনিয়ে আনে। বিজয়ের পুষ্পমালা তাদের পদচুম্বন করে। ইতিবাচক অর্জনসহ সব সেক্টরেই রয়েছে তাদের অবদান। এটা সর্বজন বিদিত যে, কেবল তরুণেরাই পারবে জাতিকে একটি শান্তির সমাজ উপহার দিতে। যে সমাজে থাকবে না কোনো ধরনের অন্যায়-অবিচার, শোষণ, জুলুম, গুম, খুন, ইভটিজিং, চুরি-ডাকাতি ইত্যাদি পাপাচার। যে সমাজের মানুষ শান্তিতে আল্লাহর হুকুম-আহকাম ও রাসূলুল্লাহ সা:-এর জীবনাদর্শ অনুসরণ ও পালনে সর্বদা থাকবে বিভোর। যে সমাজে থাকবে না নাস্তিক-মুরতাদদের কোনো প্রকারের আসফালন। এহেন সুন্দর সমাজ কেবল তরুণেরাই বিনির্মাণ করতে পারবে।
তারুণ্যের গুরুত্ব : ইসলামে তারুণ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। তারুণ্য মানবজীবনের অমূল্য সম্পদ। এটা জীবন মহীরুহের বিকশিত চারাগাছ। তারুণ্য তথা যৌবনকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে ইহকালে কল্যাণ ও পরকালীন জীবনে মুক্তির বিশাল বাগিচায় উপনীত হবে। মানবজীবন মানুষের মহামূল্যবান এক সম্পদ। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হচ্ছে তারুণ্য তথা যৌবন। এ কারণে হাদিসের মধ্যে রাসূল সা: ইরশাদ করেছেন, ‘কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে আল্লাহর আরশের ছায়ায় ওই সব তরুণের বসার সুযোগ দিবেন, যারা তরুণ বয়সের সময়কে আল্লাহর রাহে ব্যয় করে কাটিয়েছে।’
অন্য এক হাদিসের মধ্যে আছে, ‘তরুণ বয়সের ইবাদতকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হবে। একজন বৃদ্ধের ইবাদতের চেয়ে আল্লাহ বেশি খুশি হন যেসব তরুণ যৌবন বয়সে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত থাকে।’ রাসূল সা: ইরশাদ করেন, ‘হাশরের ময়দানে মানুষকে পাঁচটি বিষয়ের হিসাব দিতে হবে। তার মধ্যে একটি হচ্ছে সে তার যৌবনকাল কিভাবে ব্যয় করেছে।’ তরুণকাল অত্যন্ত মূল্যবান ও মর্যাদাপূর্ণ। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রতিটি আন্দোলনে বিজয়ের সাফ্যলের পেছনে রয়েছে তরুণ সমাজের আত্মত্যাগ। এই তরুণদের রক্তের বিনিময়ে ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছে অসংখ্য সরকারের রাজ্যসীমা। ইতিহাসে চির অম্লান হয়ে আছে তরুণদের আত্মত্যাগের স্মৃতি।
বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মাদ সা: বিশ্বমানবতার কল্যাণে তরুণদের নিয়েই তাঁর তরুণ বয়সে পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম সংগঠন ‘হিলফুল ফুজুল যুব সঙ্ঘ’ গঠন করেছিলেন। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মাদ সা: যখন দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে মাঠে নেমেছেন সর্বাগ্রে তরুণরাই এগিয়ে এসেছেন। হজরত আবু বকর রা:, হজরত উমর রা: তরুণ বয়সে ইসলাম কবুল করেন। আসহাবে কাহাফে যারা ছিলেন তারাও ছিলেন তরুণ। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, ‘হে নবী! আপনার কাছে আমি তাদের (আসহাবে কাহাফ) ইতিবৃত্তান্ত সঠিকভাবে বর্ণনা করেছি, তারা ছিল কয়েকজন তরুণ। তারা তাদের পালনকর্তার প্রতি ঈমান আনয়ন করেছিল এবং আমি তাদের সৎপথে চলার শক্তি বৃদ্ধি করে দিয়েছি।’ (সূরা কাহাফ : ১৩)
ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন বেলাল রা: ছিলেন তরুণ। হজরত ইব্রাহিম আ: যখন মূর্তি পূজার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে পাষণ্ড নমরুদের তৈরীকৃত আগুনে নিপ্তি হন তখন তিনি ছিলেন তরুণ। হজরত ইউসুফ আ: যখন কারাগারে ছিলেন তখন তিনি তরুণ ছিলেন। হজরত ইউনুস আ: ’কে যখন সমুদ্রের মাছ গিলে ফেলে তখন তিনি ছিলেন তরুণ। হজরত দাউদ আ: যখন জালিম শাসক জালুতকে হত্যা করেন তখন তিনিও ছিলেন তরুণ।
জিহাদের ময়দানে তরুণেরা : যুদ্ধের ময়দানেও তরুণেরা ছিলেন সক্রিয়। বদরের যুদ্ধে হজরত মুআজ ও মুআওয়িজ নামে দু’জন তরুণ সাহাবি ইসলামের ঘোর দুশমন আবু জাহেলকে হত্যা করেন। তখন তারা ছিলেন তরুণ।
খায়বার বিজয়ী বীর সেনানী শেরে খোদা হজরত আলী রা: যিনি কামুছ দুর্গের লৌহকপাট উপড়িয়ে ফেলে এক মুষ্টিতে নিয়ে এটাকে যুদ্ধের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন, তখন তিনিও ছিলেন তরুণ। মু’তার যুদ্ধে সেনাপতি ছিলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ। তিনিও ছিলেন তরুণ। স্পেন বিজয়ী সেনাপতি তারেক বিন জিয়াদ, তিনিও ছিলেন তরুণ। এ ছাড়া অন্যান্য যুদ্ধের সেনাপতি হজরত আবু বকর রা:, হজরত উমর রা:, হজরত উসমান রা:, আলী রা:, হজরত জাফর রা:, হজরত যায়েদ ইবনে হারিস রা:, হজরত তাইয়ার রা:, হজরত যুবায়ের রা:, হজরত তালহা রা:, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা:, হজরত আবদুল্লা ইবনে মাসউদ রা:সহ প্রায় সাহবায়ে কেরামি রা. ছিলেন তরুণ।
এমনিভাবে ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা রয়েছে তরুণদের আত্মত্যাগের কথা। ভারত বিজয়ী সেনাপতি মুহাম্মাদ বিন কাসিম যখন ভারতে ইসলাম প্রচার করেন তখন তিনিও ছিলেন তরুণ। কুতাইবা বিন মুসলিম যিনি এশিয়ার মধ্যে ইসলামের বিস্তার ঘটান, তখন তিনিও ছিলেন তরুণ। বাংলাদেশে ও অনেক আলেম-উলামা, ওলী-আউলিয়া ইসলামের প্রচার-প্রসার করেন তাদের প্রায় সবাই ছিলেন তরুণ।
১৯২৯ সালে যখন ভারতের কুখ্যাত কাফির ‘রাজপাল’ ‘রঙ্গিলা রাসূল’ নামে একটি বই প্রকাশ করে এবং এ বইটিতে মহানবী সা:-এর চরিত্র হনন ও রাসূল সা সম্পর্কে কটূক্তি করে, তার প্রতিবাদ করতে গিয়ে আলিম উদ্দিন নামে এক ভাই শহীদ হন, তিনিও ছিলেন তরুণ। আমাদের বাংলার ইতিহাসে যে কটি সংগ্রাম হয়েছে, যেমন- ১৯৫২ সালের রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ১৯৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, ১৯৯২-এর বাবরী মসজিদ রার আন্দোলন, ১৯৯৪ -এর নাস্তিক-মুরতাদ বিরোধী আন্দোলন, ২০০১-এর ফাতওয়াবিরোধী আন্দোলন, ২০১১-এর কুরআনবিরোধী রায় বাতিলের প্রতিবাদে আন্দোলন, সবশেষে চলমান ২০১৩ নব্য নাস্তিকমুরতাদবিরোধী আন্দোলনসহ সব আন্দোলনেই তরুণরাই বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে আসছে।
এ ধরনের আরো অসংখ্য উপমা পেশ করা যাবে। সবগুলোর পেছনে রয়েছে তরুণদের বলিষ্ঠ ভূমিকা। এখনো তরুণেরাই ইসলাম, রাসূল, দেশ ও জাতির মুক্তির জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে। পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে তরুণদের পদচারণায় আজ মুখরিত। বিশ্বে চলছে আজ তরুণদের জয় জয়কার। জাতির প্রাণের স্পন্দন তরুণসমাজ। তরুণেরা যে উদ্দেশ্যেই জেগেছে সে উদ্দেশই হাসিল করেছে। তারা যে আন্দোলনে নেমেছে সে আন্দোলনেই সফলতা তথা বিজয় এনেছে। দেশ ও জাতির সঙ্কটময় মুহূর্তে আল্লাহ, রাসূল সা. ও ইসলামের দুশমনদের উৎখাত করে শান্তির সমাজ তথা ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য তরুণদেরই ভাবতে হবে।
আজ চার দিকে শুধু মাজলুমানের বুকফাটা করুণ আর্তনাদ। ইসলামের সব শত্রু ঐক্যবদ্ধ হয়েছে ইসলাম ও মুসলমানদের নস্যাৎ করে দিতে। তাই তরুণদের মায়ের আঁচলে লুকিয়ে নয়, বোনের স্নেহের ডোরে বাধা পড়ে নয়, বাবার শক্ত চাহনিতে ঘরের আড়ালে লুকিয়ে নয়। সব চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়ে শাহাদাতের তামান্না নিয়ে ছুটে আসতে হবে ইসলামী সমাজ কায়েমের সংগ্রামে।
লেখক : প্রাবন্ধিক

 

সূত্র : নয়া দিগন্ত