মৃতদের জন্য জীবিতদের করণীয়

মুফতি মুহাম্মাদ শোয়াইব

সবাইকে একদিন মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। মৃত্যু থেকে কেউই রেহাই পাবে না। মানুষ মৃত্যুবরণ করার সাথে সাথে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়। তাই পরকালে শান্তিময় জীবন লাভ করতে চাইলে অবশ্যই দুনিয়াতে তাকে ভালো আমল করে যেতে হবে। আমাদের সমাজের লোকেরা তাদের পরলোকগত বাবা-মা, আত্মীয়স্বজনের জন্য বিভিন্ন রকমের আমল করে থাকে। কিন্তু তাদের বেশির ভাগ সঠিক পদ্ধতি না জানার কারণে এ ক্ষেত্রে ভুল করে থাকে। তাই আমাদের জেনে রাখা উচিত, কোন কোন আমল দিয়ে আমাদের মৃত পিতা-মাতা ও আত্মীয়ের উপকার হতে পারে। মৃত্যুর সময় থেকে মৃত্যুর পরবর্তী সময়ে মৃত ব্যক্তির বিদেহী আত্মার রূহের মাগফিরাতের জন্য জীবিতরা কী কী করতে পারে এবং তাতে মৃত ব্যক্তির কতটুকু উপকার হয় তা আমাদের জানা উচিত।
সহিহ হাদিস দিয়ে প্রমাণিত যে, মানুষ মৃত্যুর পরও তার আমলনামায় দুই ধরনের আমল অব্যাহত থাকে। (ক) মৃতের এমন আমল যা তার জন্য সদকায়ে জারিয়া হতে পারে। (খ) এমন আমল যা মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিতরা করে থাকে। যেমন মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিতরা দোয়া মাগফিরাত করে থাকে। তার মাগফিরাতের জন্য দান-সদকা করে থাকে। কিংবা তার জন্য নফল হজ ও ওমরাহ করে থাকে।
সদকায়ে জারিয়ার বর্ণনা : মানুষ মৃত্যুর পরও জীবিত অবস্থায় তার কৃত আমলের মাধ্যমে উপকৃত হতে পারে। হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত, তিনি নবী করিম সা: থেকে বর্ণনা করেন, নবী করিম সা: বলেন, মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সব আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায় না। (১) সদকায়ে জারিয়া, (২) যদি কেউ এমন সন্তান রেখে যায়, যে সন্তান মা-বাবার জন্য দোয়া করবে, (৩) এমন দ্বীনি শিক্ষা রেখে যায়, যা দিয়ে মানুষ উপকৃত হতে থাকে (মুসলিম শরিফ)। যেমন- মসজিদ, মাদরাসা বা কোনো দ্বীনি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে যাওয়া। অথবা জনকল্যাণমূলক কোনো কাজ করে যাওয়া, যার উপকার মানুষ তার মৃত্যুর পরও ভোগ করতে পারে অথবা এমন সন্তান তৈরি করে যাওয়া, যারা মৃত্যুর পরও তাদের বাবা-মা, আত্মীয়ের জন্য দোয়া করতে থাকে। কিংবা সে নেক আমল করতে থাকে, যার সওয়াব মৃত ব্যক্তি পেতে থাকবে। অথবা এমন ছাত্র তৈরি করে যাওয়া, যারা শিক্ষাবিস্তারে রত থাকে, এতে ওস্তাদ তার সওয়াব পেতে থাকে। কিংবা এমন কোনো দ্বীনি কিতাবাদি রচনা করে যাওয়া, যা পড়ে মানুষ উপকৃত হতে থাকে।
মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিতদের করা আমলের বর্ণনা : দ্বিতীয় প্রকার এমন আমল, যা মৃত ব্যক্তি নিজে করে যায়নি বা সে ওই আমলের জন্য কারণ বা অছিলা ছিল না। কিন্তু তার পরও সে ওই আমলের সওয়াব পেতে থাকে। এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।
মৃত ব্যক্তির জন্য মুসলমানদের মাগফিরাতের দোয়া করা : কুরআন ও হাদিসের একাধিক জায়গায় মা-বাবার সাথে সব মুমিনের জন্য ও দোয়া করার শিক্ষা দেয়া হয়েছে। কুরআনে পাকে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে আমাদের প্রভু! আমাদেরকে ও আমাদের আগে যারা ঈমান এনেছেন, তাদের ক্ষমা করো। আর ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রেখো না’ (সূরা হাশর : ১০)। অন্য আয়াতে আছে, আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে আমার প্রভু! রোজ কিয়ামতে আমাকে, আমার পিতা-মাতা ও সব মুমিনকে ক্ষমা করে দিন’ (সূরা ইবরাহিম : ৪১)। অন্য আয়াতে আরো আছে, ‘হে আমার প্রতিপালক! তাদের উভয়ের প্রতি রহম করো, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছে’ (সূরা বনি ইসরাইল : ২৪)।
তা ছাড়া রাসূল সা: সাহাবায়ে কেরামকে ও মৃতদের জন্য দোয়া করার নির্দেশ দিয়েছেন। হাদিস শরিফে আছে, ‘হজরত উসমান বিন আফ্ফান রা: বলেন, নবী করিম সা: মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর তার কবরের পাশে দাঁড়াতেন এবং বলতেন, ‘তোমরা তোমাদের ভাইদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করো এবং তার জন্য ঈমানের ওপর অবিচল ও দৃঢ় থাকার দোয়া কামনা করো, কেননা এখনই তাকে প্রশ্ন করা হবে।’ মৃত ব্যক্তির জন্য যে জানাজার নামাজ পড়া হয়, সেটি তার জন্য দোয়া করার উদ্দেশ্যেই পড়া হয়। তা ছাড়া রাসূল সা: একাধিক হাদিসে কবর জিয়ারত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এসব কিছু প্রমাণ করে, মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিতদের পাঠানো দোয়া ও ইস্তিগফার তার কাছে পৌঁছে এবং এর মাধ্যমে তিনি উপকৃত হন। অন্যথায় তার জন্য জানাজার নামাজ পড়া তার কবর জিয়ারত করার কোনো অর্থ থাকে না।
মৃত ব্যক্তির জন্য সাধারণ দান সদকা করা : হাদিস শরিফে আছে, ‘হজরত আয়েশা রা: বলেন, জনৈক সাহাবি রাসূল সা: কাছে এসে জিজ্ঞেস করেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার মা হঠাৎ মারা যান। মৃত্যুকালে তিনি কোনো ওসিয়ত করে যেতে পারেননি। আমর ধারণা, তিনি যদি কথা বলার সুযোগ পেতেন, তাহলে দান সদকা করতেন। আমি তার পক্ষ থেকে দান সদকা করলে কি তিনি এর সওয়াব পাবেন? নবী করিম সা: বলেন, হ্যাঁ, অবশ্যই পাবেন’ (বুখারি ও মুসলিম)। এই হাদিস দিয়ে এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে, মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কেউ যদি দান সদকা করে তাহলে সে তার সওয়াব পাবেন। এবং এর মাধ্যমে তিনি উপকৃত হবেন।
মৃত ব্যক্তির পক্ষে হজ আদায় : মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ আদায় করা যেতে পারে। যদি মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ অথবা ওমরাহ আদায় করে তাহলে তার সওয়াব অবশ্যই মৃত ব্যক্তির কাছে যাবে। এর মাধ্যমে সে উপকৃত হবে। হাদিস শরিফে আছে : ‘রাসূল সা: এক ব্যক্তিকে এভাবে তালবিয়া পাঠ করতে শুনলেন, আমার শুবরুমার পক্ষ থেকে এ হজ। তখন রাসূল সা: তাকে জিজ্ঞেস করলেন, শুবরুমা কে? লোকটি বলল, সে আমার ভাই অথবা বলল, সে আমার আত্মীয়। হজরত রাসূল সা: তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি তোমার নিজের হজ আদায় করেছ?’ সে বলল- না, করিনি। তখন রাসূল সা: বললেন, আগে তোমার নিজের হজ করো, তারপর শুবরুমার হজ করো’ (আবু দাউদ ২/৯৭)। অন্য হাদিস শরিফে আছে, ‘হজরত ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল সা:-এর দরবারে এসে বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমার বোন হজের মান্নত করেছিলেন, কিন্তু তিনি হজ সম্পাদন করার আগেই মৃত্যুবরণ করেন। আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ আদায় করতে পারি?’ রাসূলুল্লাহ সা: এরশাদ করেন, ‘তোমার বোনের ওপর যদি ঋণ থাকত তবে কি তুমি আদায় করতে না?’ সে বলল, ‘অবশ্যই আদায় করতাম।’ রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘তা হলে তুমি তোমার বোনের পক্ষ থেকে হজ আদায় করো। কেননা আল্লাহর দাবি আদায় করার অধিক উপযোগী’ (বুখারি ৮/১৪২) উল্লিখিত হাদিস দু’টি দিয়ে বোঝা যায়, হজ এমন একটি ইবাদত যা একে অন্যের পক্ষ থেকে আদায় করতে পারে এবং এর সওয়াব তার কাছে পৌঁছে।
মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোরবানি করা : সহিহ হাদিস দিয়ে প্রমাণিত যে, মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোরবানি করা জায়েজ এবং এ জন্য মৃত ব্যক্তি সওয়াব পাবে। হাদিস শরিফে আছে, রাসূল সা: একটি দুম্বা কোরবানি করেন, জবাই করার সময় বললেন, এটি আমার উম্মতের ওই সব লোকের পক্ষ থেকে, যারা কোরবানি করতে পারেনি। মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোরবানি করা জায়েজ। সুতরাং কেউ যদি নিজের কোরবানির সওয়াবে তার বাবা-মা, আত্মীয় ও মৃত ব্যক্তির নিয়ত করে নেয়, তাহলে তার সওয়াব তারা পেয়ে যাবে।
মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে রোজা রাখা : মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে রোজা রাখলেই তার সওয়াব সে অবশ্যই পাবে। হজরত আয়েশা রা: বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করল এ অবস্থায় যে, তার ওপর রোজা ফরজ ছিল তবে তার পক্ষ থেকে তার ওয়ারিশগণ রোজা রাখবে’ (বুখারি ও মুসলিম)। ওপরের আমলগুলো ছাড়া মৃত ব্যক্তির নামে চল্লিশা করা, মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা, মিলাদ পাঠ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও বিদআত। বর্তমানে আমাদের দেশে অনেক স্থানে মৃত ব্যক্তির জন্য ভাড়া করা আলেম ও হাফেজ দিয়ে কুরআন পড়ানো হয়। অনেক স্থানে আলেম বা হাফেজদের সাথে টাকা নিয়ে দরদাম হয়। এ ধরনের কর্ম সম্পূর্ণ হারাম ও বিদআত। মৃত ব্যক্তির জন্য কোনো আলেম, মাওলানাকে ভাড়া করে এনে কুরআন খতম করানো একটি নিষিদ্ধ ও পরিত্যাজ্য কাজ।
পূর্ববর্তী কোনো আলেম এ ধরনের কাজের অনুমতি দেয়নি। পরে কোনো কোনো পূজারী আলেম নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য এ রকম অনুমতি দিয়েছেন। এ ধরনের কাজ সাধারণত লোক লজ্জার ভয়ে করে থাকে। আবার অনেকে ছোট ছোট ওয়ারিশ থাকা সত্ত্বেও তাদের মাল তাদের অনুমতি ছাড়া এসব কাজে খরচ করে, যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
লেখক : জামিয়া রহমানিয়া সওতুল হেরা, টঙ্গী, গাজীপুর

সূত্র : নয়া দিগন্ত