বর্জ্য থেকে জ্বালানি, দুই প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর উদ্ভাবন!

আমাদের নিকলী ডেস্ক ।।

প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল ডিজেল, লিকুইফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও অ্যাভিয়েশন বা জেট ফুয়েল উৎপাদন করার একটি প্ল্যান্ট তৈরি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে বাসবাসকারী দুই বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. মইনউদ্দিন সরকার ও ড. আনজুমান সেলী। তাদের গবেষণার মাধ্যমে যে প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে, তাতে মেশিনের ভেতর প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য দেয়ার ২ ঘণ্টার মধ্যেই তা ডিজেল, এলপিজি ও জেট ফুয়েল আকারে বেরিয়ে আসবে বলে জানিয়েছেন মইনউদ্দিন।

প্রিয়.কমকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এই তথ্য জানিয়েছেন বাংলাদেশি এই বিজ্ঞানী। ওই সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন বিষয়।

প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল, এলপিজি ও অ্যাভিয়েশন বা জেট ফুয়েল বাংলাদেশে উৎপাদনে প্ল্যান্ট স্থাপন বা সেই মেশিনের কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই…
মইনউদ্দিন সরকার : আমরা যে মেশিনটা বানিয়েছি, সেই মেশিনটা দিয়ে তিনটি পণ্য উৎপাদন করা হবে। মূলত এই মেশিনের মূল কাজ বর্জ্য থেকে ডিজেল তৈরি করা। আর ডিজেল উৎপাদন করতে যে খরচ হবে, সেই একই খরচে একই সাথে ওই মেশিন থেকে এলপিজি ও অ্যাভিয়েশন ফুয়েল এক্সট্রা (বাড়তি) উৎপাদিত হবে। অর্থাৎ এই মেশিনে এলপি গ্যাস উৎপাদনের জন্য আলাদা কোনো খরচ হবে না। আবার অ্যাভিয়েশন ফুয়েলের জন্যও আলাদা কোনো খরচ করতে হচ্ছে না। মানে একটার ভিতরেই সবকিছু হচ্ছে।

এই প্ল্যান্ট স্থাপনে কী পরিমাণ খরচ হবে?
মইনউদ্দিন সরকার : এটা ডিপেন্ড করে কী পরিমাণ ‘র মেটেরিয়ালস’ (কাঁচামাল) দিবেন, তার ওপর। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি প্রতিদিন ১০ টন বর্জ্য দিয়ে উৎপাদন করতে চান, তবে তিন থেকে চার মিলিয়ন ইউএস ডলার প্রয়োজন হবে।

১০ টন প্লাস্টিক বর্জ্যের জন্য প্ল্যান্ট বসানো হলে সেখান থেকে কী কী উৎপাদন করা সম্ভব হবে?
মইনউদ্দিন সরকার : ১০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে প্রতিদিন ১৩ হাজার লিটার ডিজেল, ১০০ সিলিন্ডার এলপিজি ও ২৩০ লিটার অ্যাভিয়েশন ফুয়েল পাওয়া যাবে। অর্থাৎ এক টন থেকে ১৩০০ লিটার ডিজেল পাওয়া যাবে। কাজেই ১০ টন থেকে হবে ১৩ হাজার লিটার। এভাবেই সবগুলোর উৎপাদন বর্জ্য অনুযায়ী বেড়ে যাবে।

১০ টন প্লাস্টিক বর্জ্যের জন্য বসানো প্ল্যান্টে কতজন মানুষকে কাজ করতে হবে অথবা এই প্ল্যান্ট পরিচালনার জন্য কতজন মানুষকে কাজে লাগাতে হবে?
মইনউদ্দিন সরকার : ১০ টন প্লাস্টিক বর্জ্যের জন্য বসানো প্ল্যান্টে একজন প্ল্যান্ট ম্যানেজার, তিনজন মেকানিক, তিনজন অপারেটর, ১২ জন প্ল্যান্ট লেবার ও একজন ইঞ্জিনিয়ারসহ মোট ২০ জন। এই ২০ জনকে ডাইরেক্টলি (সরাসরি) কাজ করতে হবে। এ ছাড়াও ইনডাইরেক্টলি আরও অনেককে কাজ করতে হবে। যেমন: প্লাস্টিক বর্জ্য ও কাঁচামাল সংগ্রহ ও সরবাহের জন্য প্রায় ৭০ থেকে ৮০ জন মানুষ প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ এমন একটি প্ল্যান্ট স্থাপন করলে শতাধিক লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।

বর্জ্য থেকে জ্বালানি তেল, এলপিজি ও অ্যাভিয়েশন উৎপাদনে প্ল্যান্টে কী পরিমাণ সময় লাগবে?
মইনউদ্দিন সরকার : আসলে এই প্ল্যান্ট একবার স্থাপন হয়ে গেলে এটা ২৪ ঘণ্টা কাজ করতে থাকবে। অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টা ধরেই উৎপাদন হবে। স্পষ্টভাবে বোঝাতে গেলে এই প্ল্যান্টের মেশিনের মধ্যে বর্জ্য দেবার ২ ঘণ্টার মধ্যেই তা ডিজেল, এলপিজি ও অ্যাভিয়েশন ফুয়েল আকারে উৎপাদিত হয়ে বেরিয়ে আসবে এবং এটা পুনরায় চলতে থাকবে।

এই মেশিন যেহেতু ২৪ ঘণ্টা চলবে, সেহেতু মেইনটেইন্যান্স করতে কী পরিমাণ সময় লাগবে?
মইনউদ্দিন সরকার : প্ল্যান্টে বসানো মেশিন সারা বছরের ৩৫০ দিন ২৪ ঘণ্টা কাজ করবে। আর বাকি ১৫ দিন শুধু মেনটেইন্যান্সের জন্য দরকার হবে।

এই প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য কী পরিমাণ জমি বা জায়গার দরকার হবে ?
মইনউদ্দিন সরকার : প্রতিদিন ১০ টন বর্জ্যের প্ল্যান্টের জন্য ১০ হাজার স্কয়ার ফিট জায়গাই যথেষ্ট। এটা কোনো শহরের মধ্যে বা শহরের বাইরে যেকোনো জায়গাতেই করা সম্ভব।

এই প্ল্যান্টে কোন ধরনের যোগ্যতা বা অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষ কাজ করার সুযোগ পাবেন?
মইনউদ্দিন সরকার : যেকোনো সাধারণ শিক্ষিত ব্যক্তিই কাজ করতে পারবেন। একজন ইঞ্জিনিয়ার, দুইজন মেনটেইন্যান্সের জন্য, দুইজন অপারেটর। যারা সদ্য মাত্র বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে বেরিয়েছেন, তারাই কাজ করার সুযোগ পাবেন। আমাদের কোনো অভিজ্ঞ মানুষের দরকার নেই। আজকাল যেকোনো জায়গাতেই কাজ করতে গেলে অভিজ্ঞতা লাগে। কিন্তু কেউ যদি কাজের সুযোগই না পায়, তবে তার অভিজ্ঞতা হবে কীভাবে?

আপনারা বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যোগাযোগ করছেন কেন?
মইনউদ্দিন সরকার : আমরা অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যোগাযোগ করেছি। আমরা অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছি। কেন যাচ্ছি? আসলে আমরা যেটা করতে চাচ্ছি, সেটা হলো একদম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেক শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে নিয়ে আসতে যাচ্ছি, যারা আমাদের এই প্ল্যান্টে কাজ করবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কোন বিভাগের শিক্ষার্থীদের আপনারা প্রশিক্ষণ দিয়ে এই প্ল্যান্টে কাজে আনতে চাচ্ছেন?
মইনউদ্দিন সরকার : রসায়ন, পরিবেশ বিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং, মাইক্রোবায়োলজির ছাত্রছাত্রীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছি।

দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে কি এই বিষয়ে কোনো প্রকার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে?
মইনউদ্দিন সরকার : হুম, বাংলাদেশের মেরুদণ্ড হলো বিশ্ববিদ্যালয়। স্কুলের বা কলেজের শিক্ষার্থীদের শিখিয়ে তো আমাদের কোনো লাভ নেই। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরই আমরা বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি। ইতোমধ্যে চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে আমার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। সেগুলো হলো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। এ ছাড়াও আমার আরও বাংলাদেশের আট থেকে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করার পরিকল্পনা রয়েছে। আমার মূল টার্গেট হলো সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়কে এই সম্পর্কে জানানো। এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সঙ্গেও আমার আলোচনা হয়েছে। তারাও এটিকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করে সার্বিক সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে এই বিষয়ে কাজ করবেন কি?
মইনউদ্দিন সরকার : প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথেও কাজ করার ইচ্ছা আছে। যদিও এখনো কেউ যোগাযোগ করেনি। যদি কেউ যোগাযোগ করে, তবে অবশ্যই করব। এখন আমি যে যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যাচ্ছি, তারা আগে থেকেই আমার সাথে যোগাযোগ করেছিল। আমি আমেরিকাতে থাকা অবস্থায় প্রায় দেড়/দুই বছর যাবত তারা আমার সাথে যোগাযোগ করে যাচ্ছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আর কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
মইনউদ্দিন সরকার : আমরা মূলত চাচ্ছি, পুরো বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপরে একটা কর্মশক্তি, জনবল তৈরি করা। এখনো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপরে কোনো ডিগ্রি দেওয়া হয় না। আমরা চাচ্ছি, এই বিষয়ে একটা ডিগ্রি দেওয়ার ব্যবস্থা করা; একটা বিভাগ খোলা। অর্থাৎ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপরে একটা সার্টিফায়েড ছেলে বের হয়ে আসুক; এটাই আমাদের চাওয়া। এটার ওপরে একটা কোর্স হবে, বিএসসি কোর্স হবে।

বাংলাদেশে সরকারিভাবে এই প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য কারো সাথে যোগাযোগ করেছিলেন কি?
মইনউদ্দিন সরকার : না, আমরা এখন পর্যন্ত নিজে থেকে কোনো যোগাযোগ করি নাই। সরকার জানে, আমরা এখানে এসেছি। এখন সরকারের কাছে থেকে আমরা কি চাইব? আমাদের তো একটা উদ্যোক্তা আসতে হবে, আমাদেরকে কাঁচামাল সাপ্লাই দেবার মতো লোক থাকতে হবে। আমরা টেকনোলজি দিলাম, কাঁচামাল আছে, জমি আছে। সবকিছু ঠিক করে যদি আমরা সরকারের কাছে যাই, আমাদের বিশ্বাস সরকার আমাদের না করবে না। আমরা আসলে কাজে বিশ্বাসী। আমরা আগে এমন একটা কিছু করতে চাচ্ছি, তাতে সরকার যেন বলে; এটা একটা ভালো প্রক্রিয়া।

সরকার যদি এই প্ল্যান্ট স্থাপনের অনুমতি না দেয়, তবে কী করবেন? যদি দেয়, তবে কেন দেবে?
মইনউদ্দিন সরকার : সরকার এই প্ল্যান্ট স্থাপনের অনুমতি দিবে। সরকারের কাছে কিন্ত এই বিষয়ে এখনো কোনো শক্ত প্ল্যান নেই বা দেওয়া হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই প্রজেক্টটা আমেরিকাতে ডেভলপ হয়েছে। আমেরিকার টেকনোলজি এবং প্যাটেন্ট আছে।

যুক্তরাষ্ট্রে সেই দেশের সরকারি সহায়তায় যে প্ল্যান্ট স্থাপন করেছেন, সেখানে কী ধরনের কাজ হচ্ছে?
মইনউদ্দিন সরকার : আমাদের ওই প্ল্যান্টে ১৫ জন মানুষ কাজ করছে। ১৫ জন ইঞ্জিনিয়ার। আমাদের এই মুহূর্তে প্রতি মেশিনে ১৫ গ্যালন প্রতি ঘণ্টায় উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু আমরা এটা আস্তে আস্তে বাড়াচ্ছি। আমরা তো সেখানে কিছুদিন আগে মাত্র মেশিন বানালাম। আমরা সেখানে ১০০ টনের বর্জ্যের সুবিধা তৈরি করছি। সেখানে ৬০ হাজার স্কয়ার ফিট জায়গায়, আমরা অফিস, আরএনডি ও মানুফ্যাকচার করছি। সেটা হচ্ছে সমুদ্রের তীরে।

আমাদের দেশে শহরের নানা রকমের বর্জ্য ছাড়াও গ্রামেও অনেক ধরনের বর্জ্য পাওয়া যায়। সেসব বর্জ্যকে কি কাজে লাগানো সম্ভব হবে?
মইনউদ্দিন সরকার : হুম, অবশ্যই হবে। গ্রামের বর্জ্যগুলো সংগ্রহ করে, সেগুলোকেও একইভাবে কাজে লাগানো যাবে। আমরা তো শুধু শহরে নয়, আমরা বাংলাদেশের প্রত্যেকটা কোনায় কোনায়, অর্থাৎ ৬৪ জেলাতেই কাজ করতে চাচ্ছি। আমরা প্রত্যেকটা জেলা শহরে কাজ করতে চাচ্ছি। অর্থাৎ পুরা বাংলাদেশকে আমরা ক্লিন (পরিষ্কার) করতে চাচ্ছি। অনেকে যে বলে বাসযোগ্য না, এটাকে আমরা বাসযোগ্য করতে চাচ্ছি। বর্জ্য নিয়ে আসলে আমাদের দেশে তেমন কোনো বড় আকারের কাজ হয়নি; আমরা সেই কাজটি করতে চাচ্ছি।

সূত্র : প্রিয় ডটকম, ২০ অক্টোবর ২০১৮