প্রসঙ্গ এনটিআরসি : প্রধানমন্ত্রীর নিকট খোলা চিঠি

রাখী গোপাল দেবনাথ ।।

দিনবদলের অঙ্গীকার নিয়ে দশ বছর আগে আপনার ডিজিটালাইজেশনের যাত্রা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামোসহ সকল ক্ষেত্রেই উন্নয়ন দৃশ্যমান। মহাকাশেও এখন লাল-সবুজের পতাকা উড়ে। আধুনিকায়নের ফলে দুর্নীতি অনেক কমে গেছে। স্বল্প খরচে এখন অনলাইনে অনেক কাজ সম্পাদন করা যায়।

আপনার হাতেই পিএসসি আজ পরিপূর্ণ। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এসেছে স্বচ্ছতা। কিন্তু নন-গভর্নমেন্ট টিচার্স রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড সার্টিফিকেশন অথরিটি (এনটিআরসিএ-বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ) প্রতিষ্ঠানে চলছে অনিয়ম আর দুর্নীতির মহাযজ্ঞ। ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন দেশের লাখ লাখ চাকরিপ্রত্যাশী বেকার।

২০০৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত একটি বিশেষ পরীক্ষাসহ মোট ১৫টি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা হয়েছে (তথ্য সূত্রে প্রথম আলো)। একনায়কতন্ত্র আর অদক্ষতার কারণে এনটিআরসিএ প্রায় দেড় শতাধিক মামলায় পড়েছিল। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ চাকরিপ্রার্থীদের একটি সম্মিলিত মেধাতালিকা প্রকাশ করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ।

নিয়োগ প্রক্রিয়াতে কখনো সারাদেশে পদ শূন্যসাপেক্ষে নিয়োগের কথা বলা হয়েছিল, কখনো বলা হয়েছিল উপজেলাভিত্তিক শূন্য পদের কথা। উর্ত্তীর্ণ ও বঞ্চিত প্রার্থীদের মধ্যে মেধার ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। উপজেলাভিত্তিক নিয়োগে কেউ ৫০ নাম্বার পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে আবার কেউ অন্য উপজেলায় ৭০ নাম্বার পেয়েও বঞ্চিত হয়েছে।

কোনো নিবন্ধন পরীক্ষায় পাস করানো হয়েছে অনেক, কখনো সামান্যই। কোনো বছর পাসের হার ছিল ৫২ শতাংশ, কোনো বছর ২ শতাংশের কম। (তথ্য সূত্রে প্রথম আলো)।

দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও অদক্ষতার মূল জায়গাটি হলো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে যতটি পদ শূন্য আছে, তার বিপরীতে পদের জন্য আলাদা আবেদন করার শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে। উত্তীর্ণ প্রার্থী যতটি পদের জন্য আবেদন করবেন, ততটি পদের জন্য প্রার্থীকে বিবেচনা করা হবে। একেকটি পদের বিপরীতে আবেদনকৃত ব্যক্তিদের মেধাক্রম বিচার করে নিয়োগের সুপারিশ করবে এনটিআরসিএ।

উত্তীর্ণ প্রার্থীরা যতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পছন্দক্রমে উল্লেখ করবেন, তাঁকে প্রতিটির জন্য ১৮০ টাকা ফি দিতে হবে। যা খুবই কষ্টকর বেকারদের পক্ষে। অথচ নিবন্ধন পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য প্রত্যেক পরীক্ষার্থী একবার ৩৫০ টাকা ফি প্রদানসাপেক্ষে আবেদন করেছিলেন। এরপর তাঁদের প্রাথমিক বাছাই, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। যাঁরা এসব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, তাঁদের কাছ থেকে পছন্দক্রম চাওয়া হয়েছে। এই পছন্দক্রম অনুযায়ী কাজ করার জন্য এ প্রতিষ্ঠানের এক টাকাও অতিরিক্ত প্রয়োজন নেই। তারপরও এই টাকা ফি ধার্য করাটা বেকারদের ওপর জুলুম। দেশের সব চাকরিতে বেকারদের বিনা টাকায় আবেদন করার সুযোগটাই এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রতি মাসে একজন বেকারের চাকরির আবেদনের জন্য মোটা অঙ্কের টাকার ব্যাংক ড্রাফট করতে হয়। এই টাকা একজন বেকারের প‌ক্ষে সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন।

একজন চাকরিপ্রার্থী পছন্দক্রমে ৫০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবেদন করলে প্রয়োজন হবে ১০ হাজার ৫০০ টাকা। আমাদের দেশে একজন বেকার চাকরিপ্রার্থীর পক্ষে কি এত টাকা দিয়ে চাকরির আবেদন করা সম্ভব?

পাবলিক সার্ভিস কমিশন এক আবেদনে ভিন্ন ভিন্ন ক্যাডারে, নন-ক্যাডারে। পিএসসি যদি এক আবেদনে হাজার হাজার পদ উন্মুক্ত রাখতে পারে প্রতিযোগিতার জন্য, তাহলে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের জন্য আলাদা আবেদন করতে বলা প্রহসনই বটে।

ধরা যাক, ইংরেজি বিভাগের একজন প্রার্থী দেশের যেকোনো এলাকায় চাকরি করতে চান। ইংরেজি বিভাগে পদ শূন্য আছে ৫০০টি। তাঁর মেধাক্রম ৫০০তম। তিনি কি তাহলে ৫০০টি প্রতিষ্ঠানের জন্য আবেদন করবেন? এটা কি হয় কখনো? এনটিআরসিএ গত ডিসেম্বর মাসে ৩৯ হাজার ৫৩৫টি পদে কলেজ-স্কুল পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগের জন্য নিবন্ধনধারীদের কাছ থেকে পছন্দক্রম ঠিক করে আবেদনের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। আবেদন জমা পড়ে প্রায় ৩১ লাখ। প্রতিটি পদের বিপরীতে প্রায় ৭৮টি। সেই হিসাব করলে এনটিআরসিএ প্রায় ৫৬ কোটি টাকা আয় করছে।

সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সেবা প্রতিষ্ঠাকরণে ও সমস্যা সৃষ্টিকারীদের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণে আপনার হস্তক্ষেপ কামনা করছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।

(তথ্য সংগ্রহে দৈনিক প্রথম আলো ও তুহিন ওয়াদুদ, পরিচালক রিভারাইন পিপল মহোদয় লিখা)
লেখক : দক্ষিণ কোরিয়া প্রবাসী
rakhi.gopal4@gmail.com