জামায়াত সঙ্গত্যাগে বিএনপির ভেতরে মৌন সম্মতি!

আমাদের নিকলী ডেস্ক ।।

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গত্যাগে বিএনপিকে আহ্বান জানানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে চাপ দেয়ার কথা জানিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দলটিকে ত্যাগ না করলে বিএনপির সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের যে জোটবদ্ধতা, তা-ও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে— এমন ইঙ্গিতও দিয়ে রেখেছেন তিনি।

রোববার (১৩ জানুয়ারি ২০১৯) রাতে ড. কামাল হোসেন বলেন, “যেহেতু প্রশ্নগুলো আসে এবং আমি তো জেনে যাইনি। এখন যেহেতু জেনেছি, জামায়াত থাকলে সেখানে আমি থাকবো না।”

জামায়াত প্রশ্নে নিজের এ অবস্থান ব্যক্ত করার পর বিএনপি সরে না এলে প্রভাব পড়বে কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে কামাল হোসেন বলেন, “বিএনপির ঐক্যফ্রন্টে প্রভাব পড়বে। আমি তো মনে করি, তারা কথাবার্তা শুরু করবে, আমিও করতে পারি। আজকে তো পত্রিকায় গেলো। এরপর দেখবো কী হয়।”

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে দুই ধরনের বক্তব্য। কামাল হোসেনের বক্তব্যকে বিএনপির একটি অংশ ভেতরে ভেতরে মৌন সমর্থন করলেও এখনই প্রকাশ্যে কোনও অবস্থানে যেতে চান না তারা। আবার বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও সম্পাদকদের মধ্যে কেউ কেউ মনে করেন, কামাল হোসেনের বক্তব্যে রহস্য সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে কয়েকটি বিষয় সামনে আসতে পারে।

দলের একজন ভাইস চেয়ারম্যান নাম ও পরিচয় উদ্ধৃত হতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে বলেন, বিএনপি এবং জামায়াতকে চাপের মধ্যে রাখতে তিনি এই বিষয়টা সামনে নিয়ে আসছেন। তাছাড়া তিনি সব সময় জামায়াতবিরোধী মানুষ। সেই হিসেবে হয়তো তিনি তার অবস্থানটা পরিষ্কার করছে। তবে তিনি যা বলছেন তা নতুন কিছু না। এটা তার রাজনৈতিক কৌশলগত দিকও হতে পারে।

দলের একজন কেন্দ্রীয় সম্পাদক বলেন, “এটাকে এখন নানাভাবে ব্যাখা করা যায়। যেমন, এর একটা কারণ হচ্ছে, তিনি সব সময় সংসদে যাওয়ার পক্ষে। তার এই চিন্তা-ভাবনাটা ইতোমধ্যে বেরিয়ে আসছে। এই জন্য তিনি জামায়াত ইস্যুতে বিএনপিকে চাপে রেখে, সংসদে যেতে চায় এমনও হতে পারে।”

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য এ বিষয়টি উড়িয়ে দিয়েছেন, “একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেভাবে হয়েছে, এরপর সংসদে যাওয়া বা শপথ নেয়ার কোনও প্রশ্নই আসে না।” তবে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্তত চারজন নেতার সঙ্গে কথা বলে স্পষ্ট, কামাল হোসেনের মুখ দিয়ে জামায়াতকে ছাড়ার যে প্রস্তাব তোলা হয়েছে, তাতে মৌন সম্মতি আছে। বিষয়টি এখন হাইকমান্ড বিবেচনায় নিতে পারে।

এই চারজনের সঙ্গে কথা বলে স্পষ্ট, বিএনপির কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বা লন্ডনে অবস্থানরত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সম্মতি ছাড়া কেউ-ই মুখ খুলতে চাইছেন না। বিএনপির প্রগতিশীল অংশের সিনিয়র নেতাদের চাওয়া, কামাল হোসেনের মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ঐক্যে জামায়াতকে যেভাবে বাধা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, তাতে করে খালেদা জিয়া বা তারেক রহমান— দু’জনকেই নতুন চিন্তার সামনে হাজির হতে হবে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অবশ্য এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি নন। রোববার বিকালে তিনি বলেন, “ড. কামাল হোসেন যে বক্তব্য দিয়েছেন, তিনি বা তার দল এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন। আমি কিছু বলতে পারছি না।” মির্জা ফখরুল এড়িয়ে গেলেও কামাল হোসেন স্পষ্ট করেই জানিয়েছেন, জামায়াতসঙ্গ ত্যাগ না করলে ঐক্যফ্রন্টে প্রভাব পড়তে পারে।

ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, “কামাল হোসেন যা বলেছেন, সুন্দর কথা বলেছেন, পরিষ্কার করেই বলেছেন। এখন বিএনপিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ম্যাডাম জেলে আছেন, তারেক রহমান লন্ডনে আছেন। বিএনপির কেউ কেউ তো তাদের দু’জনের ওপর সবকিছু ঠেলে দেন। আমি মনে করি, বিএনপির স্থায়ী কমিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুক, এরপর তারা ম্যাডামকে জানাক। একইসঙ্গে জামায়াতকে একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া উচিত, আমি মনে করি।”

ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির একজন সদস্যের দাবি, কামাল হোসেন জামায়াত প্রসঙ্গে বিএনপিকে চাপে রাখতেই নতুন করে প্রসঙ্গ তুলেছেন। তিনি সংসদে যাওয়ার পক্ষে এবং বিএনপির বিজয়ী ছয়জন সদস্যকে নিয়েই সংসদে গণফোরামের দুই প্রতিনিধির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাইছেন। স্টিয়ারিং কমিটির এই সদস্য অবশ্য জোর দিয়েই বলেছেন, “আমরা চাই জামায়াত ইস্যু সমাধান করতে।”

কামাল হোসেন নেতৃত্বাধীন গণফোরামের একজন কেন্দ্রীয় নেতার ভাষ্য, “জামায়াতের কারণে বাংলাদেশের প্রভাবশালী প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলো বিএনপিকে নেতিবাচকভাবে দেখে। সেই বিবেচনা থেকে বেরুতে জামায়াতকে ছাড়তে হবে।”

ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির একজন সদস্য বলেন, “সরকারের তরফে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হয় কিনা, এ বিষয়টি বিবেচনায় নিচ্ছে বিএনপি।” সরকার এ বিষয়ে উদ্যোগী হলে বিএনপিকে জোট ভেঙে দেয়ার দায় নিতে হবে না, এমনটিও বলছেন এই নেতা।

ঐক্যফ্রন্টের এই নেতার মতো বিএনপির তৃণমূলেরও দাবি ছিল জামায়াতকে ছাড়ার। গত বছরের ৩ আগস্ট বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তৃণমূল বিএনপি নেতারা স্পষ্ট করে বলেছেন, জামায়াতকে ছাড়তে হবে। যদিও হাইকমান্ড তৃণমূলের এ দাবিকে কানে তোলেনি। খালেদা জিয়ার অনড় অবস্থানের কারণে গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির ২২ জনকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করার সুযোগ দেয় বিএনপি। এছাড়া অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ কয়েকজন বুদ্ধিজীবী ২০১৬ সালে হলি আর্টিজানে হামলার পর খালেদা জিয়ার সামনেই জামায়াতকে ছাড়ার পরামর্শ দেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন প্রবীণ সদস্য বলেন, “কামাল হোসেনের বক্তব্যকে বিএনপি মৌলিকভাবে কীভাবে নেবে, তার জন্য স্থায়ী কমিটির সদস্যদের বৈঠক হতে হবে। সবাই কীভাবে নিয়েছে, তা সবার সামনেই পরিষ্কার হবে। বিএনপির পরবর্তী বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।”

এদিকে, জামায়াতের অসমর্থিত একটি সূত্রের খবর, জামায়াত নিজে থেকেই বিএনপিকে ছাড়তে চায়। গত শুক্রবার এ বিষয়ে জামায়াতের নীতিনির্ধারণী একটি বৈঠক হয়েছে। ওই বৈঠকেও এ বিষয়টি আলোচনায় ছিল। বিশেষ করে সংগঠন গোছানো এবং আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধাচরণ থেকে অন্ততপক্ষে বাঁচতে বিএনপিকে ছাড়তে চাইছে জামায়াত।

এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য না দিলেও দলটির কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য মাওলানা হাবিবুর রহমান বলেন, “আমরা তো এখন জোট নিয়ে ভাবছি না। আমরা নিজেদের সংগঠন গোছানোর কাজে হাত দিয়েছি। আর জোট থাকবে কিনা, কামাল হোসেন কী বলেছেন, তা নিয়ে হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত জানি না।”

সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন, ১৩ জানুয়ারি ২০১৯