‘ক্ষমা চাইলেই মানুষ বড় হয়’

বিশ্বকাপের কামড়-কাণ্ডের পর অমানিশা আঁধারের চারটি মাস কেটে গেছে, সুড়ঙ্গ শেষে আলোর মুখ দেখতে পাচ্ছেন লুইস সুয়ারেজ। ২৫ অক্টোবর এল ক্লাসিকো দিয়েই আবার ফিরছেন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ফুটবলে। পরশু বার্সা ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সুয়ারেজ কথা বলেছেন সেই দুঃসময় নিয়ে, জানিয়েছেন বার্সার জার্সি গায়ে সাফল্যক্ষুধার কথাও।

মাঠে ফিরে আসায় কেমন লাগছে? নিশ্চয়ই মনে মনে এর জন্য অপেক্ষা করছিলেন?
সুয়ারেজ : এখনো ঘোর কাটছে না। বিশ্বাসই হচ্ছে না, এটা সত্যি। আমি হুয়ান গ্যাম্পার ম্যাচে ১৫ মিনিটের জন্য খেলেছিলাম, কিন্তু সত্যি বলতে কি নিজেকে অতিথি খেলোয়াড় মনে হয়েছে, বার্সা খেলোয়াড় মনে হয়নি। আমি কল্পনা করতে চেষ্টা করছি, (এল ক্লাসিকোতে) যখন বার্সার জার্সি গায়ে চড়িয়ে ম্যাচের আগে দলের সবার সঙ্গে ড্রেসিংরুমে থাকব, প্রস্তুত হব এমন একটা স্টেডিয়ামে (সান্তিয়াগো বার্নাব্যু) খেলতে নামার জন্য—তখন না জানি কেমন লাগবে! এটা কাকতালীয়, কিন্তু এই অভিজ্ঞতার জন্য আমি মুখিয়ে আছি। আমি সব সময়ই বিশ্বাস করি, কারণ ছাড়া কিছু হয় না। লিগে ১৯টি দল আছে, অথচ রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষেই কিনা বার্নাব্যুতে প্রত্যাবর্তন করতে যাচ্ছি! নিশ্চয়ই এর পেছনে কারণ আছে।

আপনি আয়াক্সের হয়ে এক শরও বেশি গোল করেছেন। রেকর্ড বইয়ে জায়গা করে নিয়েছেন ক্রুইফ, ফন বাস্তেন, বার্গক্যাম্পদের পাশে। আপনার চ্যাম্পিয়নস লিগের প্রথম ম্যাচও আয়াক্সের বিপক্ষেই। এটাও কি ভাগ্যের খেল?
সুয়ারেজ : কাকতালীয় অনেক কিছুই হচ্ছে, তার ওপর কিনা খেলাটা আমস্টারডামে! এত দিন পর ফিরে আমি ওখানেই চ্যাম্পিয়নস লিগে আমার প্রথম ম্যাচ খেলতে নামব, যেখানে থাকাকালে আমি সব সময় স্বপ্ন দেখেছি বার্সেলোনার হয়ে খেলার! হ্যাঁ, এটা আবারও নিয়তির খেলাই। নিঃসন্দেহে আমার জন্য বিশেষ ম্যাচ হতে যাচ্ছে এটি, ক্লাবের সবার সঙ্গে আবার দেখা হবে, সমর্থকদের সঙ্গেও। সত্যিই দারুণ!

সেই যে ন্যাসিওনালের হয়ে প্রথম মৌসুমে ১০টি গোল পেলেন (২০০৫-০৬), তার পর থেকে কখনোই এক মৌসুমে ১০টির কম গোল করেননি। সবচেয়ে বেশি গোল করেছেন ২০০৯-১০ মৌসুমে আয়াক্সের হয়ে, ৩৫টি। সব সময় গোল করাটা কি আপনার নেশা?
সুয়ারেজ : একজন স্ট্রাইকার গোল করতেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। এবং এটা নির্ভর করে তাঁর দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস, ক্ষিপ্রতা, সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় থাকার ওপর…কিন্তু স্ট্রাইকারও দলের একজন সদস্যই। আমি বল নিয়ে কারিকুরি করতে ও সতীর্থদের পাস দিয়ে গোল পেতে সাহায্য করতে ভালোবাসি। কেউ কেউ হয়তো বিশ্বাস করবে না, অনেক স্ট্রাইকারই সুবিধাজনক জায়গায় থাকা সতীর্থদের বল বানিয়ে দিতে ভালোবাসে। যেসব দলের হয়ে আমি খেলেছি, সব সময়ই দলকে শুধু গোল করেই নয়, গোল করিয়েও সাহায্য করতে চেয়েছি।

আপনি এখন সতীর্থ হিসেবে পাচ্ছেন মেসি, নেইমার, জাভি, ইনিয়েস্তা, বুসকেটসদের মতো খেলোয়াড়দের। তর্কাতীতভাবে বিশ্বের সেরা আক্রমণভাগ যদি না-ও হয়, তবুও সেরা আক্রমণত্রয়ী এখন বার্সার। এটা আপনার কাছে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ?
সুয়ারেজ : আমি এখন শুধু আবারও মাঠে নামা এবং দলকে সাহায্য করার কথা ভাবছি। প্রথম একাদশে জায়গা করে নিতে চাই এবং ম্যানেজারকে দেখাতে চাই, আমি বার্সাকে অনেকগুলো শিরোপা জেতাতেই এসেছি। তবে আমাদের দলের খেলোয়াড়দের মান দুর্দান্ত, সত্যিই বিস্ময়কর।

সমর্থকেরা সুয়ারেজের কাছে কী আশা করতে পারে?
সুয়ারেজ : আমি যা বলতে পারি তা হচ্ছে, বার্সেলোনায় আমি এসেছি সাফল্যের তৃষ্ণা নিয়ে। শিরোপাগুলো জিততে ক্ষুধার্ত হয়ে আছি। বেশ কয়েক বছর ধরে আমি ইউরোপে খেলিনি। তাই প্রতিটি ম্যাচেই দলে থাকতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। আমি কোনো কিছুই হেলায় হারাতে রাজি নই, কারণ জীবনে সবকিছুই আমাকে কষ্ট করে আদায় করতে হয়েছে। এখন সুযোগের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করতে চাই।

মেজাজ হারিয়ে ফেলার জন্য বিগত বছরগুলোয় আপনাকে নানা সমস্যায় পড়তে হয়েছে। এটা নিয়ে কি কোনো খারাপ লাগা কাজ করে?
সুয়ারেজ : যখন আমি দুঃখিত বলি, তা বলি আমার অনুশোচনাবোধ আছে বলেই। ক্ষমা চাইলেই মানুষ বড় হয়। কিন্তু তার পরও আমাকে এমন কিছু ব্যাপারে ভুগতে হয়েছে, যেখানে আমার কোনো দোষ ছিল না। যেমন বর্ণবাদের বিষয়টি। কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই আমাকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে। বাকিগুলোয় দোষ আমারই ছিল। আমি সেটা মেনে নিয়েছি এবং ক্ষমা চেয়েছি। কিন্তু বর্ণবাদের বিষয়টি আমাকে খুব পীড়া দিয়েছে।

https://www.flickr.com/photos/128704290@N04/15558038675/

বিশ্বকাপে যা হয়েছে, তাতে ক্ষমা চাওয়া কি নিজের অনুশোচনাবোধ থেকেই এসেছে?
সুয়ারেজ : এটা মেনে নেওয়াই সব সময় ভালো যে, আপনি ভুলটি করেছেন। আমিও সেটিই করেছিলাম। আপনাকে মনে রাখতে হবে, আমিও একজন মানুষ ও কখনো কখনো সত্যের মুখোমুখি হওয়া ভীষণ কঠিন। আমার মেনে নিতে কষ্ট হয়েছে যে, আমি এ কী করেছি! দিনগুলো এমন ছিল যে, আমি এটা ভুলে থাকতে চেয়েছি। শুধু আমার স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গেই থাকতে চেয়েছি, ওরাই আমার পাশে থেকেছে। আমি আর কারও কাছ থেকে কিছু শুনতে চাইনি, কাউকে কিছু বলতেও চাইনি। আমি এটা মেনে নিতে পারছিলাম না।