‘কখনোই বিস্মৃত হওয়ার নয়’

মারাকানায় ট্রফি উঁচু করে ধরেছেন প্রায় আড়াই মাস হতে চলল। সব মিলিয়ে আপনার অনুভূতি কেমন?
জোয়াকিম লো : ফাইনালের শেষ বাঁশি বেজে ওঠার পরের মুহূর্তটি ছিল অপরিসীম আনন্দের। পরের দু-তিন দিন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম, আসলেই শিরোপা জিতেছি তো! অসাধারণ এক অনুভূতি! এ রকম একটা ফল নিয়ে আট সপ্তাহ পর দেশে ফেরার তৃপ্তিটা অন্য রকম। লাখ লাখ মানুষ বার্লিনের রাস্তায় আমাদের স্বাগত জানিয়েছিল। এটা ছিল অবিশ্বাস্য।

তারপর কী হলো?
লো : যেখানে যেতাম, সেখানেই লোকজন এই বিশ্বকাপ জয় নিয়েই কথা বলত। ধীরে ধীরে আমরা বুঝতে পারলাম, এই শিরোপা সবাইকে কতটা আবেগতাড়িত করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বোধটাও আসতে থাকল, এই শিরোপা এমন এক প্রাপ্তি যা অনন্তকাল টিকে থাকবে। এখন আমরা রেকর্ড বইয়ে জায়গা করে নিয়েছি, যা কখনোই বিস্মৃত হওয়ার নয়। এমন একটা ছাপ রেখে যাওয়া সত্যিই দারুণ প্রশান্তির।

কখন আপনি অনুভব করতে শুরু করলেন, এই দলটি বিশ্বজয়ী হিসেবে গড়ে উঠছে? এই পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো কী ছিল?
লো : এই দীর্ঘ কঠিন যাত্রার শুরু ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমানকে নিয়ে ২০০৪ সালে। ওই সময় পরিস্থিতি অনেক কঠিন ছিল, চারদিক থেকে সমালোচনার ঝড় বইছিল। আমরা আবারও একটি বড় শিরোপা জিততে চেয়েছি এবং সে জন্য যা যা করণীয় ছিল, সেভাবেই এগিয়েছি। বেশ কিছু ক্ষেত্রে দারুণ সাফল্য দেখিয়েছি। শুধু ‘ভালো’তেই সন্তুষ্ট থাকিনি। এটা ঠিক যে আমরা ২০০৮ ইউরোর ফাইনালে হেরেছি, সেমিফাইনাল থেকে বাদ পড়েছি ২০১০ বিশ্বকাপ ও ২০১২ ইউরো থেকে। তবু আমি সব সময়ই বলেছি, ২০০৪ থেকেই আমাদের ক্রমোন্নতি হচ্ছে এবং আমি নিশ্চিত ছিলাম, শেষ পর্যন্ত আমরা লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব। ২০১৪-তে আমরা তা পেরেছি। সময় আমাদের পক্ষে ছিল, প্রস্তুত ছিল দলও।

আপনি হয়তো সব সময়ই নিশ্চিত ছিলেন যে দল ঠিক পথে আছে। তবে জার্মান জনগণ কিন্তু দলের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছিল সাফল্যের জন্য। আপনি কি মনে করেন এই শিরোপা তাদের জন্য একটি জবাব?
লো : ঠিক তা নয়। তবে পুরো দেশ, কোচিং স্টাফ এবং খেলোয়াড়দের জন্য এটা অবশ্যই সন্তুষ্টির। আমরা একটি লক্ষ্য স্থির করেছিলাম। একজন কোচ হিসেবে এটি দারুণ প্রশান্তির যে, শেষ পর্যন্ত আমরা তাতে সফল হয়েছি এবং প্রত্যেক খেলোয়াড়কে আরও ভালো খেলতে সাহায্য করেছি।

মার্টেসেকার, ক্লোসা ও লামের মতো তিনজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় অবসর নিয়েছেন। তাঁদের অনুপস্থিতি দলে কেমন প্রভাব ফেলবে?
লো : বড় টুর্নামেন্টগুলোর পর দলে এ রকম পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এক অর্থে, তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য এটি দারুণ এক সুযোগও। আমি এই তিনজন খেলোয়াড়ের সঙ্গেই ১০ বছর ধরে কাজ করেছি এবং আমাদের মাঝে দারুণ সম্পর্ক। ভালো-খারাপ মুহূর্তগুলো আমরা একসঙ্গে কাটিয়েছি। তারা তাদের ব্যক্তিত্ব দিয়ে দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মার্টেসেকার ছিল রক্ষণের স্তম্ভ, ক্লোসা রেকর্ডসংখ্যক গোল করেছে আর লাম ধারাবাহিকভাবেই ১০ বছর ধরে ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলে গেছে। তাদের শূন্যতা অবশ্যই অনুভূত হবে।

জার্মানির এই দল তো তরুণ খেলোয়াড়দের নিয়ে সমৃদ্ধ, এরই মধ্যে যারা সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলে চলেছে। আপনার নতুন চুক্তিতে এটা কতখানি প্রভাব ফেলেছে?
লো : কিছু পজিশনে আমাদের সমস্যা আছে। কিন্তু সব সময় যেভাবে বলা হয় যে, আমাদের পাইপলাইনে অসংখ্য সর্বোচ্চ মানের খেলোয়াড় রয়েছে, তা ঠিক নয়। এটা ঠিক, দলে দারুণ প্রতিভাবান কয়েকজন খেলোয়াড় আছে। এই দলকে ইউরো ২০১৬-তে নিয়ে যেতে এখনো আমার মধ্যে অনেক অনুপ্রেরণা কাজ করছে, যে দলটি এরই মধ্যে অনেক কিছু অর্জন করেছে এবং যারা এখনো অনেক তারুণ। তবে এদের অনেকেই এখনো সর্বোচ্চ জায়গায় পৌঁছায়নি। কাজেই আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে বড় চ্যালেঞ্জ।

joachim_luo2

ইউরোর বাছাইপর্বের গ্রুপ ‘ডি’-এর প্রতিপক্ষদের কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
লো : পোল্যান্ডের বিপক্ষে আমরা এরই মধ্যে বেশ কয়েকবার খেলেছি। দারুণ সব খেলোয়াড় আছে ওদের দলে। আমি শুধু রবার্ট লেভানডফস্কি আর লুকাস পিসেকের কথা বলছি না। এদের অনেকেই বুন্দেসলিগা ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের লিগগুলোতে খেলছে। তারা আমাদের খেলোয়াড়দের খুব ভালো করেই চেনে ও তারা অভিজ্ঞও। দারুণ উন্নতি করেছে দলটি। আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডও ছেড়ে কথা বলার মতো দল নয়। গ্রুপটিতে কী হবে, তা আগে থেকেই বলা মুশকিল। আমরা মূলপর্বে যেতে পারি অবশ্যই। কিন্তু সেটিকে অবধারিত ভাবা যাবে না।

বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে চোখ রাঙাতে চাইবে সব দলই। এটা কতটা কঠিন, তা কি অনুভব করতে পারছেন?
লো : এটা বলা কঠিন। আমার মনে হয় কখনো কখনো বাকি দলগুলো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দলের সঙ্গে খেলার সময় নিজেদের অতিরিক্ত এক বা দুই শতাংশ উজাড় করে দেয়। যেহেতু দুই থেকে আমরা এক নম্বরে উঠেছি, সবার লক্ষ্য হব আমরাই। জার্মানির বিপক্ষে খেলার সময় প্রতিটি দলই বাড়তি অনুপ্রাণিত থাকে। এমনকি বাছাইপর্বে আমাদের হারাতে পারলেও সেটা ওই দলের জন্য দারুণ সাফল্য হিসেবেই বিবেচিত হয়। অনেক বছর ধরেই আমরা এতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি।