গিফট

মুনিরা ।।

ব্যাগটা হাতড়ে দেখি টাকা অল্প। তবুও কী কারণে যেন মাথায় ভূত চেপেছিলো আজকের ভিতরেই প্রিয় বান্ধবীটার জন্য গিফটটা কিনতে হবে। ক্লাস শেষে নীলক্ষেতের বিশাল এক মার্কেটে ঢুকলাম। পেটে ক্ষুধা আর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে এ দোকান ও দোকান ঘুরি। কিন্তু এই টাকায় যে কিছুই মেলাতে পারছিলাম না। তারপর হঠাৎ পেয়ে গেলাম খুব সুন্দর একটি টেবিল ক্যালেন্ডার আর একটি কলম! কেনার পর নীলক্ষেত থেকে ইমামগঞ্জ সেদিন হেঁটে হেঁটে গিয়েছিলাম। হালকা বৃষ্টিতে ভিজতে সেদিন খুব শান্তি লাগছিল। আহা প্রিয় মানুষের জন্য পছন্দের উপহার কিনেছি যে! (কাজিনের) বাসায় ফিরে আনাড়ি হাতে রঙিন পেপারে মুড়ে দিয়েছিলাম সেটা। পরদিন সকালে ও আমার উপহারটি হাতে নিয়ে বললো, ওওওওও টেবিল ক্যালেন্ডার! আরেহহ মোবাইল ইউজের পর থেকে তো আমি টাইম আর তারিখ দেখার জন্য না হাতঘড়ি ব্যবহার করি না ক্যালেন্ডার! বিরক্ত লাগে এখন এগুলো। এনিওয়ে থ্যাঙ্কস মুনিরা! তারপর সে অন্য প্রসংঙ্গে চলে যায়। কিন্তু আমি আর সেদিকে মনোযোগ দিতে পারিনি। খুব সম্ভবত সেদিন প্রতিটা ক্লাসেই অমনোযোগী ছিলাম। অথচ সেদিন আমাদের থার্ড ইয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সব লেকচার ছিলো। শুধু ওর ঠোঁট উল্টে বলা কথাগুলো বারবার কানে এসে বিঁধছিল! তারপর ক্লাস শেষে আবিষ্কার করলাম ও ক্যালেন্ডারটা ডেস্কের উপর রেখেই বাসায় চলে গেছে। মনকে খুব করে সান্ত্বনা দিলাম এটা সে ভুল করে রেখে গেছে। ইনফরম করলাম। তারপর কী হয়েছিল? নাইবা বললাম! বুঝলাম ভুলটা আসলে আমারই ছিলো। আমি কেন তার পছন্দ অপছন্দকে গভীরভাবে পড়তে পারিনি? তবে নিশ্চয়ই এটা ঘটতো না। আমি যেটাকে হীরা মনে করে দিচ্ছি সেটা তার কাছে তামা কাসাও মনে হতে পারে! আর গিফটকে গুরুত্ব দিতে বা ইউজ করতে কেউ বাধ্য না। আর এইসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মনে কষ্ট পাওয়া যে মানসিক বৈকল্য!

তারপর সময় অনেক গড়ালো… ফালতু ইমোশনের চর্চা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করলাম। চাকরিতে ঢুকে গেছি। এক গরীব রোগিনী আমায় বেশ ভালবাসতেন। আমার জন্য একদিন পিঠা নিয়ে হাজির। টেনিস বল সাইজের! না ঝাল না মিষ্টি। আমাকে দিতে পেরে তার সে কি আনন্দ! কিন্তু আমার এক কলিগ পিঠা মুখে নিয়েই বললো, ধুরররর এইটা কী!! ছি এগুলা মানুষ খায়? আরেকজন পিঠার চেহারা দেখেই নাক সিঁটকে দৌড় দিল। ঠিকই ত আছে রুচিতে না কুলালে কী করে খাবে? কোন যুক্তিতে খাবে? আরেকদিন এক বৃদ্ধা রোগী আমার জন্য নিজ হাতে কারুকার্য করা হাতপাখা উপহার দিলেন! কী সুন্দর আর নিঁখুত ছিলো সে নকশা। ঈদের গিফট হিসেবে দিয়েছিলেন। আমার কলিগ এটা দেখে হো হো করে হেসে উঠলেন! হাসাটা যৌক্তিক। অফিসে আইপিএস বাসায় জেনারেটর। এই হাতপাখা বড়জোর হাতের ব্যায়ামের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে! আজ হঠাৎ করে এইসব মনে পড়া অনুচিৎ।
অযৌক্তিক
এবং
অন্যায়।