কিশোরগঞ্জে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে খুনখারাবি

আমাদের নিকলী ডেস্ক ।।

কিশোরগঞ্জে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে খুনখারাবি। দেশি অস্ত্রের পাশাপাশি বেড়ে গেছে বৈধ-অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার। জেলায় মাত্র ২২ দিনে ১১টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। একই দিন মাত্র সাড়ে আট ঘণ্টার ব্যবধানে চারটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। অবশ্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িতদের কয়েকজন পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। এসব নিয়ে জেলাজুড়ে চলছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা।

তবে পুলিশ প্রশাসন “আইন-শৃঙ্খলার অবনতি” হয়েছে বলে মানতে নারাজ। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, যারা মানুষ খুন করছে, যথারীতি তারা আইনের আওতায় আসছে। অপরাধীদের একটুও ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতরা ধরা পড়ে যাচ্ছে। একই দিনে চার উপজেলায় চারটি আলাদা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রধান চার অপরাধীসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া বাজিতপুরে দুই যুবক খুনের মামলার তিন আসামি ধরা পড়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডগুলোর বেশির ভাগই সামাজিক ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বের জেরে ঘটছে। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে আইন প্রয়োগে শিথিলতার অভিযোগও এনেছে অনেকে। জেলায় সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের তৎপরতা নেই বললেই চলে। খেলাধুলার চর্চাও একেবারে কমে গেছে। ফলে সমানতালে বাড়ছে মাদকসেবন। এসবের ফলে মানুষ অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠেছে।

সর্বশেষ গত ২১ আগস্ট পাকুন্দিয়া, মিঠামইন, কিশোরগঞ্জ সদর ও করিমগঞ্জে আলাদা চারটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। এদিন ভোর ৬টা থেকে দুপুর আড়াইটার মধ্যে ঘটে যাওয়া এই “সিরিজ” খুনের ঘটনায় হতবিহ্বল হয়ে পড়েছে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ। এর মধ্যে করিমগঞ্জে দক্ষিণ সুতারপাড়া গ্রামে চাচাতো ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে সুলাল মিয়া খুন হন। মিঠামইনে ঘাগড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতির লোকজনের বল্লমের আঘাতে খুন হন ভরা নয়াহাটির শাহজাহান মিয়া। কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের দানাপাটুলী গ্রামে মেয়ের জামাই হাবিবুল ইসলামের ছুরিকাঘাতে শাশুড়ি হালিমা খাতুন ও পাকুন্দিয়ার চরটেকি গ্রামে জমি নিয়ে বিরোধে ছোট ভাই মতির ছুরিকাঘাতে বড় ভাই মুকুল খুন হন। এর আগের দিন ২০ আগস্ট ভৈরবের শিমুলকান্দির মধ্যেরচর গ্রামের রফিক মিয়া প্রতিপক্ষের হাতে খুন হন। এর চার দিন আগে ১৬ আগস্ট বিকেলে ইটনার এলংজুরি বাজারে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাপ মিয়ার উপস্থিতিতে তাঁর ক্যাডার বাহিনী ইউনিয়ন তহশিল অফিসের পিয়ন মেরাজ মিয়াকে কুপিয়ে হত্যা করে। পুলিশ এ ঘটনায় হত্যা মামলায় চার আসামিকে গ্রেপ্তার করে।

গত ১৪ আগস্ট হাওর অধ্যুষিত বাজিতপুরের মাইজচর গ্রামে “ফারুক বাহিনী”র সন্ত্রাসীদের নির্বিচার গুলিতে শরীফ মিয়া ও ফোরকান মিয়া নিহত হন। এ ঘটনায় ছররা গুলিতে বিদ্ধ হয় শিশু, মহিলাসহ আরো ১৭ জন। এর আগে গত ৩১ জুলাই অষ্টগ্রামের দেওঘর ইউনিয়নের আলীনগর উত্তরপাড়ায় কিশোরী বধূ চায়নাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। একই দিন কুলিয়ারচর পৌর শহরের মাসকান্দি এলাকায় নীলয় নামে ছয় বছরের এক শিশুকে পিটিয়ে হত্যা করে প্রতিবেশী হাবিব। গত ২০ জুন করিমগঞ্জে বেড়াতে যাওয়ার পথে কাদিরজঙ্গল ইউনিয়নের আবু বাক্কার ও তাঁর স্ত্রী হিমা আক্তারকে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ২৯ মে জেলা সদরের পূর্ব তারাপাশায় পারিবারিক কলহের জেরে শ্বশুর আবু বকরের হাতে নির্মমভাবে খুন হন জামাতা ওমর ফারুক (৩৫)। একই দিন বাড়ির সীমানা নিয়ে বিরোধে খুন হন নিকলীর কারপাশা গ্রামের পাথরের নৌকার শ্রমিক শামসুদ্দিন। ২৬ মে নিকলীর সিংপুর ইউনিয়নের ভাটি বড়াটিয়া গ্রামে শিশুদের ফুটবল খেলা নিয়ে ঝগড়ার পর সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন কৃষক খোকন মিয়া। ২৪ মে নিকলী উপজেলার কারপাশা ইউনিয়নের মজলিশপুর গ্রামে মারধরে নিহত হন আল-আমিন।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডটি ঘটে গত ৬ মে। ওই দিন রাতে ঢাকার মহাখালী থেকে বাজিতপুরের পিরিজপুর রুটে চলাচলকারী ‘স্বর্ণলতা’ বাসের যাত্রী শাহীনূর আক্তার তানিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যা করে বাসের চালক, হেলপারসহ তিন দুর্বৃত্ত। কটিয়াদীর লোহাজুরির বাহেরচর গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের মেয়ে তানিয়া ইবনে সিনা হাসপাতালে সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এরও আগে ১৬ এপ্রিল শহরের হারুয়া এলাকায় ১২ বছর বয়সী শিশু সাগর মিয়াকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। গত ৫ এপ্রিল সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের ব্রাহ্মণকান্দি গ্রামের হাবিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, “পারিবারিক ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বের কারণে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো ঘটছে। তবে এ ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগও যথাযথভাবে করা হচ্ছে। হত্যাকারীদের অনেককে এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।” “পুলিশের একার পক্ষে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়”—এমন মন্তব্য করে পুলিশ সুপার আরো বলেন, “জেলার ৩৪ লাখ মানুষের জন্য মাত্র দুই হাজার পুলিশ রয়েছে। সেই হিসাবে প্রতিজন পুলিশকে এক হাজার ৭০০ জনকে নিরাপত্তা দিতে হচ্ছে।”

সূত্র : কালের কণ্ঠ