ছুটির দিনে ক্লাস নেন ধামইরহাটের এলজিইডি প্রকৌশলী আলী হোসেন

আবু মুছা স্বপন, ধামইরহাট ।।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, “সোনার বাংলা গড়তে সোনার মানুষ দরকার”- এমনই এক চিন্তা চেতনার অধিকারী নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলায় চাকুরীরত স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ আলী হোসেন; যিনি সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ছুটির দিনে বিশেষতঃ শনিবারে বিভিন্ন কাজের নির্মাণস্থল পরিদর্শন করতে গিয়ে কাছাকাছি অবস্থিত বিদ্যালয়গুলোতে কিছু সময় অতিবাহিত করেন। এসময় তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাথে মতবিনিময় করেন। নিজেই শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে গিয়ে প্রকৌশলী আলী হোসেন বিশেষ উপায়ে শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং তাদেরকে পড়াশোনায় উৎসাহ প্রদান করেন। জীবনের লক্ষস্থির করা এবং সে মোতাবেক নিজেকে প্রস্তুত করা যে সফলতার মূল চাবিকাঠি এই বার্তাটি তিনি শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করেন। সমাজের গরীব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর সহমর্মিতা প্রশংসার দাবী রাখে।

প্রজাতন্ত্রের এই সরকারি কর্মকর্তা উপজেলা প্রকৌশলী হওয়া সত্ত্বেও অবসর সময়ে কাজের ফাঁকে ছুটে চলেন বিভিন্ন স্কুল-কলেজপড়ুয়া মেধাবী শিক্ষার্থীদের খোঁজে। মাদক, জঙ্গিবাদ, বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং যে সমাজের চরম ব্যাধি এবং এসব খারাপ কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদেরকে বিরত রাখাই যে বুদ্ধিমানের কাজ তা তিনি ভালোভাবে শিক্ষার্থীদের অবগত করেন। শিক্ষানুরাগী, হাস্যোজ্জ্বল, সরল, সদালাপী ও ব্যাক্তিত্ববান প্রকৌশলী আলী হোসেন ৭ম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত রাজশাহী ক্যাডেট কলেজে পড়াশোনা করেছেন। পরবর্তীতে তিনি খুলনা প্রকৌশল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন।

খেলাধুলা ও সংস্কৃতিমনা এই কর্মকর্তা এলজিইডি’র চাকুরীর কারণে সমাজের প্রান্তিক পর্যায়ের জনমানুষের সাথে কাজ করবার সুযোগ পেয়েছেন বলে তিনি মনে করেন। আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীরা যাতে সুবিধাবঞ্চিত না হয়, সেদিকে তাঁর বিশেষ দৃষ্টি থাকে। তাঁর এই উদ্যোগ সম্পূর্ণই ব্যতিক্রমী। তিনি শিক্ষার্থীদের শুদ্ধ বর্ণশিক্ষা ও সহজ উপায়ে গাণিতিক সমস্যার সমাধান, বাংলা, ইংরেজিসহ বিভিন্ন বিষয়ের উপর শিক্ষাদান করেন এবং শিক্ষার্থীদের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভাকে জাগ্রত করার চেষ্টা করেন। প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে উপজেলার সকল স্তরের সিংহভাগ শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে তিনি কাজের ফাঁকে ফাঁকে পাঠদান করেছেন।

সরকারি ছুটির দিন শনিবারে বাংলা, ইংরেজি ব্যাকরণগত দক্ষতা ও সাধারণ জ্ঞান বিষয়ক কুইজের মাধ্যমে মেধা অন্বেষণ ও তাদের পুরস্কৃত করায় শিক্ষার্থীরা আরও মনোযোগী হয়ে উঠেন। শুধু তাই নয়- অর্থের অভাবে যেসব শিক্ষার্থীরা ঝরে পড়ার উপক্রম হয়, আর্থিক সাহায্য ও শিক্ষা-উপকরণ দিয়ে তাদের পাশে আশির্বাদ হয়ে দাড়ান উপজেলা প্রকৌশলী আলী হোসেন। শিক্ষার্থীদের পাঠ্য বই কিনে দেয়া, মেধাবী অথচ আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল ছাত্রদের মাসিক অনুদানও দিয়ে থাকেন তিনি। অবসর সময়ে যে কোন শিক্ষার্থী তাঁর শরণাপন্ন হলে তিনি পাঠদানসহ অবলীলায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অবিভাবক ও সুধিমহল তাঁর এই মহতী কার্যক্রমকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী মো. আলী হোসেন জানান, “ধামইরহাট উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণের কাজ পরির্দশনে গিয়ে কাজের ফাঁকে বিশেষ করে বিদ্যুৎ না থাকা বা শ্রমিক সংকটে নির্মাণ কাজ ব্যাহত হওয়ার উপক্রম হলে সে সময়টাতে ওই স্কুলের শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্লাস নিতে আমার ভাল লাগে। যা আমার দীর্ঘদিনের নেশা। আমি ছাত্রজীবন থেকে আমার গ্রামের বাড়ির স্কুলগুলোতেও এভাবেই আমার অবসর সময়ে শিক্ষাদান করে এসেছি। আমার নিজ উদ্যোগে একটি ছেলেকে অবসরে পাঠদান করিয়ে তাকে এসএসসি পাশের পর উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তিতে সহযোগিতা করেছি এবং প্রতিনিয়ত ছেলেটির খোঁজখবর রাখি। আমি চাই ঝরে পড়া শিশুরা আমার মাধ্যমে যেন শিক্ষার পরিবেশ ফিরে পায়। অন্তত একটি শিক্ষার্থী আমার মাধ্যমে আলোকিত হোক। পৃথিবীতে শুধু একটি জিনিসই কাউকে দিলে কমে যায়না, আর তা হলো জ্ঞান”। তিনি আরো বলেন, ‘অত্র এলাকার মাননীয় সংসদ সদস্য একজন অসাধারণ মানুষ, যিনি সর্বদা মানসম্মত শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। যে কোনো ভালো কাজে তিনি সর্বদা একজন অতি উঁচুমানের পৃষ্ঠপোষক। তিনিও আমার এসব কাজের প্রেরণার উৎস।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার গনপতি রায় বলেন, সরকারি কর্মকর্তাগণ বিভিন্ন স্কুলে ক্লাস নেবেন এমন সরকারি নির্দেশনাও আছে, তবে সাপ্তাহিক ছুটিতে ক্লাস নেয়া ও উপজেলা প্রকৌশলী আলী হোসেনের মত সরকারি বিভিন্ন কর্মকর্তা এবং সমাজের বিত্তশালীদের একটু সানুগ্রহই অনেক গরীব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জীবন পাল্টে দিতে পারে। আর প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা ২৪ ঘন্টা সেবা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।