সাপে কাটার লক্ষণ ও প্রাথমিক চিকিৎসা

বাংলাদেশের গ্রামগুলোয় সর্পদংশন বা সাপে কাটার ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। বেশিরভাগ মানুষের সাপ সম্পর্কে অযথা ভীতি রয়েছে। এটি একটি অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা। দংশিত ব্যক্তি এরকম পরিস্থিতির জন্য মোটেই প্রস্তুত থাকেন না। সাপটি বিষধর হলে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। সাপে কাটার ফলে অনেক মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকে।

বাংলাদেশে যে কয়টি প্রজাতির বিষধর সাপ দেখা যায়
১. কোবরা (গোখরা)
২. কেউটে (ক্রেইট)
৩. চন্দ্রবোড়া (রাসেলস ভাইপার)
৪. সামুদ্রিক সাপ (সি স্নেক)
৫. রাজ গোখরা (কিং কোবরা)

কিভাবে বুঝবেন সাপে কামড়েছে
* দংশিত স্থানে ব্যথা নাও থাকতে পারে। তবে ক্ষতস্থান ফুলে গেলে কিংবা পঁচে গেলে ব্যথা হতে পারে।
* রোগীর ঘুমঘুম ভাব হতে পারে ও দুর্বলতা অনুভব হতে পারে।
* প্যারালাইসিস বা পক্ষাঘাত দেখা দিতে পারে। চোখের মাংসপেশী ও অক্ষিগোলকের মাংসপেশীতে প্যারালাইসিস হলে রোগীর চোখের পাতা ভারী হয়ে যায়। চোখ বুঁজে আসে, চোখে ঝাপসা দেখে।
* কথা বলতে অসুবিধা হওয়া, চোয়াল ও তালু অবশ হওয়ার কারণে ঢোক গিলতে অসুবিধা, হাঁটতে অসুবিধা হওয়া, হাত-পা অবশ হয়ে যাওয়া এমনকি মাংসপেশীও অবশ হতে পারে।
* শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হয়ে শরীর নীল হয়ে যেতে পারে।

সাপে কাটার প্রাথমিক চিকিৎসা
* আক্রান্ত ব্যক্তিকে আশ্বস্ত করতে হবে। বেশিরভাগ কবলিত মনে করেন মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। তাই জরুরিভিত্তিতে তাকে সাহস দেয়া ও প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে যথাযথ স্থানে/হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠালে রোগী বিশ্বাস ও সাহস ফিরে পাবে।
* দংশিত স্থান কিছুতেই কাটাছেড়া করা উচিত নয়। কেবল ভেজা কাপড় দিয়ে কিংবা জীবাণুনাশক লোশন দিয়ে ক্ষতস্থান মুছে দিতে হবে।
* দংশনকৃত স্থান থেকে ভিতরের দিকে সাথে সাথে গামছা বা কাপড় দিয়ে কেবল একটি গিঁট (পায়ে দংশন করলে রানে, হাতে দংশন করলে কনুইয়ের উপরে) এমনভাবে দিতে হবে যেন খুব আটসাঁট বা ঢিলে কোনটাই না হয় (একটি আঙুল একটু চেষ্টায় ভেতরে যেতে পারে)।
* সাপে কাটার স্থান বেশি নড়াচড়া করা যাবে না। কারণ মাংসপেশী সংকোচন করলে বিষ দ্রুত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
* রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে পাঠাতে হবে। স্থানান্তরের সময় আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাঁটতে দেয়া যাবে না। রোগীকে কঁাধে, খাটিয়ায় বা দোলনায় করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
* সম্ভব হলে সাপের প্রজাতি ও বিষধর কিনা তা নিরূপণের জন্য সাথে নিতে হবে। সাপ পরিবহনে খেয়াল রাখতে হবে, সাপটি মৃত নাকি মরে যাওয়ার ভান করে আছে।
* জরুরি কোনো উপসর্গ না থাকলে বিষদাতের চিহ্ন পরীক্ষার জন্য দংশিত স্থান পরীক্ষা করতে হবে। বিষ দাঁতের দাগ প্রায় আধা ইঞ্চি ফাকে দুটি খোচা দেয়ার চিহ্ন হিসাবে অথবা কেবল আচড়ের দাগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। দুটো বিষদাঁতের চিহ্ন পরিষ্কারভাবে থাকলে খুব সম্ভবত সাপটি বিষধর, তবু বিষদাঁতের চিহ্ন না থাকলে যে সাপটি বিষধর নয় তা বলা যাবে না।
* কামড়ানো স্থানে চামড়ার রঙের পরিবর্তন, কালচে হওয়া, ফুলে যাওয়া, ফোসকা পড়া, পচন ধরা ইত্যাদি হতে পারে। আবার কোনো পরিবর্তন নাও থাকতে পারে। প্রাথমিক চিকিৎসার ফলেও স্থানীয় পরিবর্তন হতে পারে।

কখনো করা উচিত নয়
আমাদের দেশে অনেক ক্ষতিকর প্রাথমিক চিকিৎসা প্রচলিত যা ওঝা ও সর্প-চিকিৎসকরা দিয়ে থাকেন। এ থেকে অনেক সময় রক্তপাত, ধনুষ্টংকার ও পঁচনসহ অন্যান্য অসুবিধা হয়।
* দংশিত স্থান ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে রক্তক্ষরণ করানো।
* একাধিক স্থানে খুব শক্ত করে গিঁট দেয়া।
* কার্বলিক এসিডজাতীয় রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে দংশিত জায়গা পোড়ানো।
* গাছ-গাছড়ার রস দিয়ে প্রলেপ দেয়া।
* বমি করানোর জন্য বিভিন্ন পদ্ধতির ব্যবহার।
* কানের ভেতর বা চোখের ভেতর কিছু ঢেলে দেয়া।

প্রতিরোধের চেষ্টা
* বেশিরভাগ সর্পদংশন করে থাকে পায়ে। কাজেই সাপ থাকতে পারে এমন জায়গায় হাটার সময় বিশেষ সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে। জুতা, লাইট ইত্যাদি সঙ্গে রাখতে হবে।
* সাপ সামনে পড়ে গেলে ধীর-স্থির হয়ে দাড়িয়ে থাকা উচিত। সাপ প্ররোচনা ছাড়া কাটে করে না। (শুধু সাপ নয় পৃথিবীতে কোনো প্রাণীই অনর্থক ক্ষতি করে না)
* দুর্ভাগ্যবশত যদি সাপ কামড় দিয়ে থাকে, শান্ত থেকে কারো সাহায্য নিতে হবে। সর্পদংশনের পর কখনো দৌড়ানো উচিত নয়। এতে বিষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।