হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ৬

শেখ মোবারক হোসাইন সাদী ।।

 

অলদি যে বাডুইন গো ভাবী দ্যাইক্কা হুইন্না বাডুইন গো
অলদির বিত্তে ভরবাম যাদু ভুলাইবাম তাহারে গো…..

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি গত পর্বে আমরা আলোচনা করেছিলাম মেয়েলী গীত সম্পর্কে। মেয়েলী গীত হাওরপাড়ের বিয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ মেয়েলী গীত কবে, কখন, কোথায় উৎপত্তি হয়েছিল তার সঠিক কোন হদিস পাওয়া যায়নি। তবে কারপাশা ইউনিয়নের মজলিশপুর গ্রামের রেজি খাতুনের সাথে কথা বলে জানা যায়, তার গীত গুরু বলেছেন এ ধরনের গীত গ্রামের মহিলাদের নিজের জীবন থেকে নেওয়া। নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া এমন মর্মান্তিক কাহিনী থেকেই তাদের মনের ব্যক্ত অব্যক্ত কথা, প্রেম-ভালোবাসা প্রকাশ করতেন গীতের মাধ্যমে।

ঘরের থাইক্কা বারি হইলাম গো চালা লাগল মাথা
শাড়ির ও আঞ্চলে পাড়া এইকি
ভিষম বাধা গো ডালে যাইওনা-
কালা কচু দলা কচু গো কোন বা কচুর জাতি
কার সনে করিলা টাট্টা শনি
বাইরা রাত্রি গো ডালে যাইওনা।
নন্দের চাইলা ভাইগনা তুমি গো
আমি তোমার মামি গো ডালে যাইওনা।।
কেহ পিনদে লাল ও নীল গো
কেহ পিনদে সাদা রাধা কা সুন্দরী
পিনদে কৃষ্ণ নামটি লেখা ডালে যাইওনা।
কেহর হাতে লুটা ঘটি কেহর হাতে জারি
রাধেকা সুন্দরী কাঙ্কে হীরারও কলসি
ডালে যাইওনা।।
কেহ হাটে আস্তে ধীরে গো কেহ হাটে ধাইয়্যা
রাধেশ সুন্দরী হাটে বাওঅ লাড়া
দিয়া ডালে যাইওনা ।।
ছান করিতে নামলাম আমি গো
যমুনারও ঘাটে কলসি উড়াইয়া
নিল উতাইল ফরমাইয়ে জলে যাইওনা।

গীতের তথ্য সংগ্রহকালে রেজি আক্তারের মাতা ও তার চাচীর সাথে লেখক

হাওরপাড়ের মেয়েলী গীত শোনার জন্য কোন দর্শক-শ্রোতার আগমন ঘটে না। এ ধরনের গীতের গায়ক ও শ্রোতা নিজেরাই।

গায়েহলুদের রাতে যখন হলুদ শেষে কনের হাতে মেহেদী দিয়ে আল্পনা আঁকেন তখন কনের মা, চাচী ও ঘরের মুরুব্বী মহিলারা এসে যুক্ত হন গীতের সাথে। মেয়েকে করুণ রসাত্মক সুরে বিদায় জানান এবং আগাম দুঃখের বাণী শোনান গীতে গীতে।

কাচা বাশের বান্দনী গো বেতের ও না চাওনী গো
সেইনা ঘরে যাইয়া লাকি ঝুড়ি সে না কান্দন গো।
কতই কান্দন কান্দিবা গো বেলা হইল সারা গো
পায়ে পায়ে উইটা লাকি পরের দেশে চল গো।
পরের দেশে যাইয়া গো বাবা ডাকমু কারে গো
তোমার বাবার বদলী আমার বাবা আছে গো।
তোমার বাবারে ডাকিলে গো মধুর পানে চাবে গো
আমার বাবারে ডাকিলে হাটের সদায় দিবে গো।
কাঁচা বাশের বান্দবী গো বেতের ও না চাওনী গো
সেইনা ঘরে যাইয়া লাকি ঝুড়ি সে না কান্দন গো।
কতই কান্দন কান্দিবা গো বেলা হইল সারা গো
পায়ে পায়ে উইটা লাকি পরের দেশে চল গো।
পরের দেশে যাইয়া গো আম্মা ডাকমু কারে গো
তোমার আম্মার বদলী আমার আম্মা আছে গো।
তোমার আম্মারে ডাকিলে গো যেনত করিয়া উঠিবে গো
আমার আম্মারে ডাকিলে দুধ দে ভাত ও দিবে গো।
কাঁচা বাঁশের বান্দনী গো বেতের ও না চাওনী গো
সেইনা ঘরে যাইয়া লাকি ঝুড়ি সে না কান্দন গো।
কতই কান্দন কান্দিবা গো বেলা হইল সারা গো
পায়ে পায়ে উইটা লাকি পরের দেশে চল গো।
পরের দেশে যাইয়া গো ভাইও ডাকমু কারে গো
তোমার ভাইয়ের বদলী আমার ভাইও আছে গো।
তোমার ভাইরে ডাকিলে যেনত করিয়া উঠিবে গো
আমার ভাইওরে ডাকিলে হাটের সদায় দিবে গো।
কাচা বাশের বান্দনী গো বেতের ও না চাওনী গো
সেইনা ঘরে যাইয়া লাকি ঝুড়ি সে না কান্দন গো।
কতই কান্দন কান্দিবা গো বেলা হইল সারা গো
পায়ে পায়ে উইটা লাকি পরের দেশে চল গো।

এখালে লাকি হচ্ছে একজন কনের নাম। তবে যে কনের বিয়েতে এ গীত গাওয়া হতো সেখানে ওই কনের নাম জুড়ে দিত। যেমন কনের নাম যদি হয় রুজিনা/বানেছা তাহলে লাইনটি হবে এমন :
সেই ঘরে যাইয়া রুজিনা/বানেছা…

উপরোক্ত গীতগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার কারপাশা ইউনিয়নের মজলিশ গ্রামের রেজি আক্তারের কাছ থেকে। তার কাছে সংগ্রহ করা আরো কিছু গীত:

১। চিক্কণ বিবি গোছল গো করে শানে বান্দা ঘাটে গো
কইন্যা শানে বান্দা ঘাটে।
মনে মনো থাকলে গো কইন্যা
যাইয়ো আমার দ্যাশে গো
কইন্যা যায়ো আমার দ্যাশে।
ডাইল অ গো দিছি, চাইল অ গো দিছি
রসদ কইরা খায়ো গো
কইন্যা রসদ কইরা খায়ো।

২। এক অ সখি দুই অ গো সখি
সখি তিনজনে এ
হাসিতে খেলিতে চল গো সখি
কুলা কিনবার ছলে।

আগে কুলা আসছিলাম গো
ডুম অ বেডার দোকানে
অহন কুলা আইছো গো তুমি
বেলুকার সদনে।

কুলা দ্যাইকা বেলুকার মনগো
চইমকা চইমকা উডে
না জানি আল্লা আমার নসিবে
কেমুন নুলা সাজে।

হলুদ নিয়ে অনেক গীত থাকলেও সবগুলো শীত সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। তবে, আরো বিস্তারিত সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। অন্য কোনো পর্বেও মেয়েলী গীত সংযোগ করতে পারি।

জারইতলা ইউনিয়নের রুজিনা আক্তারের কাছ থেকে যে হলুদের গীত সংগ্রহ করা হয়েছে, কারপাশা ইউনিয়নে এসে তার পার্থক্য দেখতে পাই। যেমন:
আছিল আছিল গো মেন্দি জনম হিন্দুস্থান।।
রাসুলে আনিয়া মেন্দি বানাইল মুসলমান।।
মুসলমান হইয়া মেন্দি ভাবে মনে মনে।।
না জানি রাসুলুল্লাহ লাগাইব কোন কাজে।।
ভাইব না ভাইব না মেন্দি ভাবিয়ো না আর।।
তোমারে লাগাইয়াম মেন্দি নতুন দুলার গায়।।

 

সংগ্রহ সূত্র : রেজি আক্তার (নিকলী, কারপাশা, মজলিশপুর)।
সহযোগিতা : মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন, হানিফ রাজ, পরাগ বর্মন, মোঃ তানজিল মিয়া, লিপটন।

 

সকল পর্ব :

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ১

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ২

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ৩

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ৪

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ৫

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ৬

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ৭

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ৮

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ৯