লিজেন্ডারি হেডমাস্টার আবদুল হামিদ স্যার

মাজহারুল ইসলাম (উজ্জ্বল) ।।

জ্ঞানতাপস হেডমাস্টার আবদুল হামিদ। নিকলীর শিক্ষাকাশে সূর্যের মতো প্রজ্জ্বলিত একটি নাম। যিনি রেখে গেছেন অসংখ্য গুণগ্রাহী এবং অগণিত ভক্ত-ছাত্র।

আবদুল হামিদ কিশোরগঞ্জের প্রত্যন্ত জনপদ নিকলী উপজেলা সদরের পুকুরপাড় গ্রামে ১৯২৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা কারার এন্তাজ উদ্দিন ছিলেন একজন সাধারণ কৃষক। তাঁর এক মেয়ে এক ছেলের সংসারে আবদুল হামিদ স্যার ছিলেন ছোট। তিনি ১৯৪৬ সালে নিকলী গোরাচাঁদ পাইলট হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ১৯৪৮ সালে কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে ইন্টার মিডিয়েট পাস করেন। গুরুদয়াল কলেজ থেকেই ১৯৫০ সালে প্রথম বিভাগে বিএ পাস করেন। এছাড়া ১৯৫৫ সালে বিএড এবং ১৯৬৪ সালে এমএড পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন।

নিকলী জিসি পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র ও ঢাকাস্থ নিকলী ছাত্রপরিষদ-এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে নিকলীর কৃতি সন্তানদের নিয়ে বিভিন্ন প্রোগ্রাম আয়োজন করেছি। সরাসরি স্যারের ছাত্র না হতে পারলেও প্রোগ্রামে আগত স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত নিকলীর সিনিয়র সিটিজেনদের প্রত্যেকের মুখেই সবসময় স্যারের প্রশংসা শুনে এসেছি। নিকলীর শিক্ষা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্যারের অবদান অনস্বীকার্য।

স্যারের ছাত্রদের মধ্যে নিকলীর কৃতিসন্তান সাবেক সচিব কারার মাহমুদুল হাসান মহোদয়, বিচারপতি আমির হোসেন মহোদয় ও ঢাকাস্থ নিকলী সমিতির সম্মানিত সভাপতি বাবু সুনীল সাহা মহোদয়দের মুখ থেকে স্যারের বর্ণাঢ্য জীবনের দিক ও স্মৃতিগুলো শুনেছি বহুবার।

উনাদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলতে শুনেছি- নিকলী গোরাচাঁদ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা দিয়েই হেডমাস্টার আবদুল হামিদ স্যার শুরু করেন তার কর্মজীবন। ব্যয় নির্বাহে এ প্রতিষ্ঠানটি যখন বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছে তখন তিনি পরিচালনা পর্ষদের কাছ থেকে বিদ্যালয় পরিচালনার দায়িত্ব চেয়ে নেন। শিক্ষার আলো ছড়াতে বিসর্জন দেন নিজের জীবনের সকল চাওয়া-পাওয়াকে। বিদ্যালয়ের ব্যয় মেটাতে সমমনা কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ধান সংগ্রহ শুরু করেন। হাজারো প্রতিকূলতায় স্কুলটিকে টেনে নিতে একসময় সঙ্গীরা হাঁফিয়ে উঠেন, কয়েকজন ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। অকুতোভয় আবদুল হামিদ স্যার তেলের পিদিমের মতো জ্বলে যান নিভু নিভু। কত শত ছাত্রকে নিজের অর্থ ব্যয় করে পড়িয়েছেন, তার কোন হিসেব নেই।

শুনেছি এ সময় সারাদিন স্কুলে কর্মব্যস্ততা শেষে রাতে হারিকেন হাতে আবদুল হামিদ স্যার ছাত্রদের বাড়ি বাড়ি ছুটেছেন বছরের পর বছর। স্কুলের বাইরে দৈনন্দিন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, সমস্যা সমাধান করে স্কুলমুখী করেছেন ছাত্রদের। অভিভাবকদের সাথেও তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। দূর-দূরান্তের ছাত্রদের লজিংয়ের ব্যবস্থা করতে ঘুরেছেন বিত্তশালীদের দ্বারে দ্বারে।

ইংরেজি, গণিত ও আরবী ভাষার উপর উনার ছিলো বিশেষ দক্ষতা। অক্লান্ত শ্রম, মেধা দিয়ে নিজ হাতে গড়েছেন উচ্চপদস্থ সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। গড়েছেন বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের মতো সফল রাজনীতিকও।

আশির দশকে কিশোরগঞ্জের আজিমউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে দু’বছর প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে ৯০ এর দশকে আবারও চলে যান বাংলাদেশ কমিউনিটি স্কুলের প্রিন্সিপাল হিসাবে লিবিয়ার ত্রিপলীতে। দেশে ফিরে যেখানেই দেখেছেন শিক্ষার বৈরী পরিবেশ সেখানেই জীবনের সঞ্চিত অর্থে ফিরিয়েছেন অনুকূলতা। শিক্ষার পরিবেশ তৈরি, সুবিধাবঞ্চিতদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়েছেন। নিজের বা পরিবারের দিকে তাকাবার প্রয়োজন মনে করেননি এই মহান শিক্ষাবিদ।

নিকলীর শিক্ষাকাশে স্যারের শূন্যতা কখনোই পূরণ হবার নয়। পরবর্তী প্রজন্মকে স্যারের বর্ণাঢ্য জীবন সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দিতে, স্যারের প্রাক্তন ছাত্ররা যদি একটি লাইব্রেরি বা আবদুল হামিদ শিক্ষা ফাউন্ডেশনকে একটি প্লাটফর্মে দাঁড় করিয়ে দেন, আগামী প্রজন্ম নিঃসন্দেহে অনুপ্রাণিত ও নতুন পথের আলোর দিশা পাবে।

আজ ২১ জুলাই, ২০২০। স্যারের ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা চাই, হাওরের প্রত্যন্ত জনপদ নিকলীর শিক্ষার আলোকবর্তিকা, হেডমাস্টার আবদুল হামিদ স্যার চির ভাস্বর, চির উজ্জ্বল একটি নাম হয়ে আমাদের পথ দেখাবেন।

 

লেখক : সভাপতি, ঢাকাস্থ নিকলী ছাত্রপরিষদ।