মাইলের পর মাইল হেঁটে শিক্ষার্থীদের খোঁজ নিতেন

একেএম সারওয়ার ।।

আবদুল হামিদ স্যারের স্মৃতিকথা লিখতে হলে অনেক কিছুই মনে আসে। স্যারের সাথে আমাদের পরিবারের সম্পর্ক ছিল খুবই ঘনিষ্ট। আমার বড় চার ভাইয়েরও শিক্ষক ছিলেন। তাছাড়া আমার ছোট চাচা ঈচা চাচার ছিলেন সহপাঠী। সেই থেকেই আমাদের পরিবারের সাথে একটা নিবিড় যোগাযোগ ছিল। স্যারের সাথে আমার জীবনের বেশ কিছু ঘটনার কথা আজও মনে পড়ে।

আমি নিকলী স্কুলে সিক্স পাস করে ঢাকায় এসে ভর্তি হই। তখন উনি ঢাকায় এলে আমাদের বাসায় আসতেন। ২/১ দিন থেকে কাজ সেরে চলে যেতেন। তখন আমার বড় ভাইদের সাথে গল্প করতেন, আমি ভয়ে ভয়ে একটু দূরে থাকতাম। যখন আমি ক্লাস নাইন-এ উঠলাম তখন স্যার আমাদের বাসায় আসলেন। আমার পড়াশোনার খবরাখবর নিলেন। আমার তখন বাংলা সিনেমার প্রতি দারুণ আকর্ষণ। পড়াশোনার চাইতে সিনেমার নেশা ছিল বেশি। এসব শুনে স্যার আমার ভাইদের বললেন, ওকে আমার এখানে পাঠিয়ে দে। এভাবে সিনেমা দেখলে পড়াশোনা হবে না।

স্যারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমাকে আবার নিকলীতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। আমার ভেতর একটা ভয় কাজ করতো। নিকলীতে গিয়ে থাকতে পারবো কিনা। স্যার যাওয়ার আগে আমাকে সুন্দর বুঝিয়ে গেলেন যে, তুই চলে আয়। আমি দেখাশোনা করবো। কোনো অসুবিধা হবে না। এমনভাবে বুঝালো আমি হাসিমুখে রাজি হয়ে নিকলীতে চলে আসি। নিকলীতে আসার পর আমাকে ভর্তি করে বোর্ডিংয়ে একটা রুম দিয়ে বললেন, মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করবে। কোন সমস্যা হলে আমাকে জানাবে।

আমার যতটুকু মনে পড়ে স্যার ফজরের নামাজ পড়ে বোর্ডিংয়ে এসে সবার দরজায় বেত দিয়ে দুটো করে বারি দিয়ে আমাদের ওঠাতেন। আমার এভাবে কিছুদিন যাওয়ার পর এমন অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল যে আমি নিজেই স্যার আসার আগেই উঠে পড়তাম। উনার মাঝে যে দায়িত্ববোধ দেখেছি, বর্তমানে এমন শিক্ষক আছে কিনা আমার জানা নেই।

আরও একটি ঘটনা আমার মনে পড়ে। মেট্রিকে টেস্ট পরীক্ষার পর আমি আমার গ্রামের বাড়ি সহরমুল চলে যাই। তখন হঠাৎ একদিন ভোরবেলায় দরজায় ধাক্কা। আমি এত ভোরবেলা উঠি না। শীতের সকাল কুয়াশাচ্ছন্ন অবস্থা। বললাম কে? ওপাশ থেকে শব্দ হলো “দরজা খোল”। স্যারের গলার শব্দ শুনেই আমার ভিতর কাঁপুনি শুরু হয়ে গেছে। আমি দরজা খুলে দিলাম। তিনি বললেন ফজরের নামাজ পড়ে পড়তে বসবে। তারপর আমি বাড়িতে গিয়ে বাবাকে ডেকে আনলাম। কিছুক্ষণ বাবার সাথে কথা বলে চা-নাস্তা খেয়ে আমাকে পরীক্ষার ব্যাপারে আরও কিছু ব্রিফিং দিয়ে চলে যান।

এই যে স্যারের দায়িত্ববোধ, এত ভোরে তিন মাইল রাস্তা হেঁটে গিয়ে আমার খোঁজ নেওয়ার জন্য উনার কি প্রয়োজন ছিল? আজকাল এসব কথা বললে কেউ কি বিশ্বাস করবে? এখন তো শিক্ষা মানে বাণিজ্য। তখন শিক্ষার বাণিজ্য ছিল না। তারপর আমি আবার ঢাকায় চলে আসি। স্যারের সাথে যোগাযোগ কমে যায়। তবে খবরাখবর পেতাম। সম্ভবত উনি কিছুদিন কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে শিক্ষকতা করেছেন। তারপর শিক্ষকতার চাকরি নিয়ে লিবিয়ায় চলে গিয়েছিলেন। ইতিমধ্যে আমিও জীবিকার তাগিদে বিদেশে পাড়ি জমাই।

তারপর থেকে যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে যায়। স্যারের মৃত্যুর সংবাদ অনেক সময় পরে শুনতে পেরেছি। উনার মত আদর্শ নিয়ে চলা খুবই কঠিন। উনি আমাদের মাঝে চিরকাল আইডল ম্যান হিসাবে বেঁচে থাকবেন। আমার কাছে একটা প্রশ্ন জাগে, উনি কেন নিকলীকে আঁকড়ে ধরেছিলেন? উনি তো একটা বড়সড় সরকারি চাকরি করতে পারতেন? অথচ উনি সারাটা জীবন নিকলীতেই কাটালেন। সবশেষে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করি, আল্লাহ যেন উনাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের মেহমান বানিয়ে নেন।

 

লেখক : ইতালি প্রবাসী ব্যবসায়ী।