আলো হাতে একজন…

আলহাজ্ব মোঃ হারুন অল কাইয়ুম ।।

মনটা খারাপ। মনটা খুবই খারাপ হয়ে আছে। আমার সাধের ঘুড়িটা কেটে দিয়েছে আমারই এক সহপাঠি। আমি ঘুড়ি কাটাকাটি করতে প্রস্তুত ছিলাম না, ইচ্ছুকও ছিলাম না। অথচ আমার ইচ্ছার তোয়াক্কা না করেই ওর ঘুড়িটাকে একটা গোত্তা দিয়ে নীচে নামিয়ে আনলো। আড়াআড়িভাবে ফেলেই এক হ্যাচকা টান দিয়ে আমার ঘুড়িটাকে কেটে দিল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমি, কাটা ঘুড়ির পিছনে ছুটতে গিয়েও থেমে গেলাম। যারা আগে দৌড় শুরু করেছে তাদের সাথে পারবো না, তাছাড়া ঘুড়ি কেটে গেলে যে ধরতে পারবে সে-ই মালিক। ওর দাঁত কেলানো হাসি দেখে ইচ্ছা হচ্ছিল লাটাই দিয়ে একটা বারি মেরে ওর মুখটা থেতলে দেই। কিন্তু ঘুড়িটা তো আর ফেরত পাবো না। তখন থেকেই মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে আছে। অবশিষ্ট সুতাটুকু পেঁচিয়ে শূণ্য লাটাইটা হাতে নিয়ে শেষ বিকেলের আলো ফুরিয়ে যাবার অনেক আগেই ধীরে ধীরে বাড়িতে ফিরলাম।

বিছানাহীন, কাঠের চৌকীর উপর কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলাম, অনেকক্ষণ বসে থাকলাম, পাঠ্যবইয়ের পাতা নাড়াচাড়া করলাম। কিছুতেই সময় যেন কাটে না। গোধুলীর সোনালী আলো আমার কাছে তখন বিবর্ণ হয়ে গেছে। টিনের ঘরের চালে টুপটাপ বড়ই পরার শব্দ অর্থহীন মনে হলো। অ-নে-ক-ক্ষ-ণ, অনেকক্ষণ মনমরা ভাবটা গেল না। তবুও অন্তহীন সময় পেরিয়ে একসময় সত্যি সত্যিই সন্ধ্যা হলো। হাত-মুখ ধুয়ে হারিকেনের আলোয় মায়ের কাছে রুটিনমাফিক আমি পড়তে বসলাম; কিন্তু আমার মন বসলো না। যথারীতি রাত হলো, ঘুম এলো, আর ঘুমের সাথে সাথে স্বপ্নও এলো…… আমার ঘুড়ি…।

পরদিন স্কুল থেকে ফিরে অগতির গতি মায়ের কাছে চার আনা পয়সা চাইলাম। একটা সাদা “ঘুড্ডির তাও” (ঘুড়ি তৈরির কাগজ)-এর দাম চার আনা। এটা দিয়ে একটা বড় ঘুড়ি হয়। আর একটি রঙিন পাতলা কাগজের দাম বার আনা। এটা দিয়ে ছোট সাইজের ছয়টা ঘুড়ি হয়। আমার দরকার বড়টা, তাই চার আনা। আটপৌরে ব্যস্ত জীবনের শত প্রতিকুলতার মাঝে মায়ের সযত্ন সঞ্চিত যৎসামান্য সম্বল থেকে দুটো দশ পয়সা আর একটা পাঁচ পয়সা আমি পেলাম। এর মূল্য আমার কাছে অপরিসীম। তিনটে চকচকে সাদা ধাতব মুদ্রা হাফপ্যান্টের পকেটে ফেলে ছুটলাম বাজারে “ঘুড্ডির তাও” কিনতে। মনে মনে ভাবছি, এইবার কোন ক্রমেই ঘুড়ি কাটাকাটিতে যাব না। শুধুই ঘুড়ি উড়িয়েই শখ করবো। আর কেউ যদি কাটাকাটি করতে আসে তাহলে…………..।

আমার ভাবনায় ছেদ পড়লো। “এ্যাডমাস্টর সাব” (হেডমাস্টার সাহেব)-এর বাংলাঘরের সামনে (বর্তমানে যেখানে সাজনী এন্টারপ্রাইজ) ছোটখাট একটা ভীড়। ভীড়ের ফাঁক-ফোকর গলে বেরিয়ে যাবার চেষ্টা করে বাধাগ্রস্ত হলাম। বড়দের কিছুটা ধমকও খেলাম। অগ্যতা থামতে হলো। তাকিয়ে দেখি বাংলাঘরের ভিতরে লুঙ্গি আর সাদা পাঞ্চাবী পরে চেয়ারে বসা হালকা পাতলা ছোটখাট গড়নের একজন মানুষ, থুতনীতে হালকা একটুখানি দাড়ি, চোখে কালো মোটা ফ্রেমের চশমা। তাকে ঘিরে ঘরের ভিতরে-বাইরে সবাই দাঁড়ানো। এর মধ্যে আমাদের প্রাইমারি ও হাইস্কুলের স্যারেরাও রয়েছেন। ওই ছোটখাট মানুষটি বসে বসে “গল্প” বলছেন আর বড়রা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে সেই গল্প শুনছে, আমরা যেভাবে মায়ের কাছে গল্প শুনি- সেভাবে। বড়রাও গল্প শোনে? ব্যাপারটা আমার কাছে খুব ইন্টারেস্টিং মনে হলো। ছোটবেলা থেকেই গল্পের পাগল আমি, গল্প শুনতে দাঁড়িয়ে গেলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো। এই লোকটি কিছুটা তোতলাতে তোতলাতে যা বলছে তা আমার বোধগম্য হচ্ছে না। “আরব দেশ”, “মরুভূমি”, “বালু”, “বিমান”, “লেখাপড়া”- এসব বিক্ষিপ্ত কিছু অর্থহীন শব্দই শুনতে পেলাম, বুঝলাম না কিছুই। ধ্যাত, আজাইরা সময় নষ্ট। এর চেয়ে ঘুড়ি উড়ানো অনেক মজার।

ঘুড়ির কাগজ কিনে বাড়ি ফিরলাম। আরেকজনের সহযোগিতায় নিজেই ঘুড়ি তৈরি করলাম। দিনের বেলায় স্কুল, ঘুড়ি উড়ানো আর মাঝে মাঝে মিসকিনা ভিটার পাশে দাড়িয়াবান্দা খেলা- এটুকুই ছিল রুটিন। যদিও দূরন্ত ছিলাম না, তবুও শৈশবের বসন্তের রঙ্গিন দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল রঙিনভাবেই। অবশেষে একদিন ছন্দপতন হলো। ঘাগটিয়া মাঠে (এখন যেখানে নগর-নাগারছিহাটি জামে মজসিদ, তার পাশে) ঘুড়ি উড়াতে গিয়ে ডান হাতের কনুই মচকে গেল।

দিন আসে রাত যায়, রাত যায় দিন আসে। চৈত্রের দাবদাহ শেষে বৈশাখ আসে। বাড়িতে নতুন ধান আসে। প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তি কম হওয়ায় মায়ের চোখে পানি আসে। পছন্দের ষাঁড়টিকে বিক্রি করতে চাইলে ছোটভাই-এর কান্না আসে। বাবার বুক ভেঙে যায় দীর্ঘ নিঃশ্বাসে। তবুও দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। এই বছর যায়, পরের বছর যায়। এক সময় প্রাইমারি স্কুলের “সেন্টার” পরীক্ষা ডিঙ্গিয়ে হাইস্কুলের গণ্ডিতে প্রবেশ করি। হাইস্কুল জীবনের প্রথম বছরেই অর্থাৎ ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় (১৯৮২ সালে) শিশু সংগঠন “চাঁদের হাট”-এর পক্ষ থেকে জারীগান প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে আমাদের দল থানা পর্যায়, মহকুমা পর্যায় ডিঙ্গিয়ে ময়মনসিংহ জেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। অচিরেই ঢাকা যাবো জাতীয় পর্যায়ে অংশ নিতে। সহপাঠিরা অনেকেই তখনো রেললাইন দেখেনি, কারেন্টের বাত্তির আলো দেখেনি। আর আমরা একাধিক বার মহকুমা এবং জেলা ঘুরে এসেছি। গর্বে আমরা চারজনের মাটিতে পা পড়ে না। ঢাকা যাবো, ঢাকা যাবো… আমাদের আনন্দ আর ধরে না। আজন্ম শৈশব-কৈশোরের ওই সময়ের স্মৃতিটাই আমার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে, ভীষণভাবে নাড়া দেয়। এই উজ্জ্বল, রঙিন স্মৃতির পাতাটির পাশে নিতান্তই বিবর্ণ, অস্পষ্ট, ধুলোমলিন একটা ছবি আবছাভাবে মনে পড়ে। কতটুকু সঠিক বলতে পারবো না। যতটুকু মনে পড়ে আমাদের পরিচালক লালমিয়া ভাই (মুক্তিযোদ্ধা শফিউদ্দিন লাল মিয়া, প্রয়াত) সম্ভবতঃ বলেছিলেন- “ছ্যার, কয়দিন পরে ছেরাইনডিরে লইয়া ঢাহা যাইয়াম, এট্টু দ’ হইরেন” (স্যার, কয়েকদিন পর ছেলেদের নিয়ে ঢাকা যাবো, একটু দোয়া করবেন)। যাকে “স্যার” বলে সম্বোধন করেছেন তিনি পূর্বে দেখা সেই ক্ষীণকায় ব্যক্তিটি। আমি ভাবছি উনি কে! সবাই তাঁকে এত তোয়াজ করে কেন? আমার সতীর্থরা আমার চেয়ে অনেক বেশি জানে। তারা জানালো, তিনি আমাদের হাইস্কুলের হেডস্যার ছিলেন। আরব দেশের সরকার তাঁকে সেই দেশে নিয়ে গিয়েছিল মাস্টারি করার জন্য। উনি আমাদের স্যারদেরও স্যার। স্যারদেরও স্যার? তাই তো বলি, উনাকে সবাই এত শ্রদ্ধা আর সমীহ করে কেন! সতীর্থদের কাছ থেকে আরও বিস্তারিত অনেক কিছু জানলাম। উনার মত মেধাবী নিকলীতে আর নেই, উনি বোর্ডে স্ট্যান্ড করেছিলেন, উনি চেষ্টা না করলে নিকলী গোড়াচাঁদ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় আজকের অবস্থানে পৌঁছাতো না… ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের চোখে উনি দূর আকাশের তারার মত, চেয়ে চেয়ে দেখা যায়; কিন্তু কাছে যাওয়া যায় না।

একটা চারা গাছ শুধু রোপন করলেই কাজ শেষ হয় না। সযতনে লালন করলেই একদিন তা মহীরুহে পরিণত হয়। মহৎ হৃদয়ের অধিকারী কিছু মানুষ একদিন “নিকলী গোড়াচাঁদ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়” নামের একটি চারাগাছ রোপন করেছিলেন। সময়ের পরিক্রমায় মৃতপ্রায় তাদের সেই চারাটিকে একটু একটু পানি ঢেলে, যত্ন করে যিনি বড় করেছিলেন তিনি মরহুম আবদুল হামিদ স্যার। আমার শৈশবে দেখা সেই ক্ষীণতনু ছোটখাট মানুষটি। প্রাচীন গুহাবাসী মানুষ যেভাবে একটু একটু করে পাথর ঘষে নিরন্তর সাধনায় আগুন জ্বালাতো, তেমনিভাবে তিনি নিজের জন্য সঞ্চয় করেছিলেন জ্ঞানের অফুরন্ত ভাণ্ডার। সমস্ত প্রতিকুলতা দু’হাতে ঠেলে সামনে এগিয়েছিলেন। তখন কোনো প্রকার সুযোগ সুবিধা ছিল না। প্রত্যন্ত হাওর অঞ্চলে যেখানে মানুষের মধ্যে ন্যূনতম শিক্ষার আগ্রহ নেই সেখানে একটি স্কুল চালু রাখা কতটা কঠিন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্কুলটিকে চালু রাখতে গিয়ে তিনি বিসর্জন দিয়েছেন ব্যক্তিগত জীবনের অনেক স্বপ্ন-সাধ। মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন আর্থিক সংস্থান আর ছাত্র সংগ্রহের জন্য। পাটের অফিসে গিয়েছেন নিয়মিত একটা নির্দিষ্ট হারে অনুদানের জন্য। মটিভেশনের মাধ্যমে অভিভাবকদেরকে উদ্বুদ্ধ করতেন ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করানোর জন্য। এখনকার মতো বাণিজ্যিকভাবে কোচিং/প্রাইভেট পড়ার কোন সিস্টেম ছিল না। তাই রাতের বেলায় নিজের হাতে হারিকেন নিয়ে ছাত্রদের বাড়িতে গিয়ে পড়াতেন তিনি। দুর্বল ছাত্রদের তদারকি করতেন, ঝরেপড়া ছাত্রদের ফিরিয়ে আনার জন্য কাউন্সেলিং করতেন। মানুষের একটাই জীবন, সেই জীবনটা তিনি ব্যয় করে গেছেন মানুষের কল্যাণে, মানুষের জন্য।

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলকে বলা হয় “Lady with the Lamp”, আলো হাতে নিয়ে যিনি ঘুরে বেড়াতেন মৃতপ্রায় রোগীদের পাশে। তাদের দেখাতেন বেঁচে থাকার আলো। কিছু মানুষ থাকে, যারা নিজেরা থেমে যাওয়ার আগে আলোর মশালটি ধরিয়ে দিয়ে যান অন্যের হাতে, সাথে কিছুটা শুভ কামনা… “তোমরা এগিয়ে যাও।” হামিদ স্যার ছিলেন তেমনি একজন। কষ্টার্জিত আলোর শিখাটি ধরিয়ে দিয়ে গেছেন পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। তাঁদের কাছ থেকে আমরা পেয়েছি নির্বিঘ্নে পথ চলার দিশা। আমাদের পূর্বসূরীরা আমাদের চলার পথকে মসৃণ করে দিয়ে গেছেন বলেই আজ আমরা এতদূর আসতে পেরেছি। কিন্তু আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আমরা কী করেছি? কিংবা করছি? উল্লেখযোগ্য কিছুই না। পূর্বসূরীদের কাছ থেকে যা পেয়েছি তা যদি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিয়ে না যাই, তাহলে তারা আমাদেরকে ক্ষমা করবে না। তাই কবি সুকান্তের সাথে সুর মিলিয়ে আজ আমাদের স্লোগান হোক-

“চলে যাব- তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি-
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গিকার।”

 

লেখক : বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট।