“হেডমাস্টার খালু”

তৌহিদা আক্তার নাজনীন ।।

এক বিদ্যানুরাগী, প্রজ্ঞাবান ও ধর্মপরায়ণ সংশপ্তক-এর গল্প এটি। যার কথা বলছি, তিনি আমার “হেডমাস্টার খালু”। তাঁকে আমরা এ নামেই ডাকতাম। অনেক বড় হয়ে জেনেছি তাঁর নাম মোঃ আবদুল হামিদ। যখন থেকে কথা বলতে শিখেছি, আমি তাঁকে হেডমাস্টার খালু বলেই জানতাম।

আমাদের বাড়ি নিকলী উপজেলার দামপাড়া গ্রামে (জেলা- কিশোরগঞ্জ)। খালু আমার মায়ের দিকেরও আত্মীয়, আবার বাবার দিকেরও আত্মীয়। আব্বার দিক থেকে সম্পর্কটা একটু অন্যরকম হয়ে যেতো। তিনি ছিলেন আমার দাদার ভাই, আবার আম্মার দিক থেকে খালু। আব্বা সারাজীবন তাঁকে হেডমাস্টার চাচা ডেকেছেন, আম্মা ডেকেছেন হেডমাস্টার দুলাভাই। আম্মাকে (খুব ভয় পেতাম বলে) খুশি করার জন্য আমরা তাঁকে হেডমাস্টার খালুই ডাকতাম। আমরা সব সময় আম্মার কাছে শুনেছি খালু খুব মেধাবী, ইংরেজির জাহাজ।

আমাদের নিকলীর গর্ব সেই খালুকে যত দেখেছি ততই মুগ্ধ হয়েছি। কী অসাধারণ মেধাবী আর আন্তরিক ছিলেন তিনি। আমার অতি সহজ-সরল খালাকে নিয়ে পরম সুখে সংসার করেছেন। কখনো তার কোনো বিষয়ে অভিযোগ ছিল না। সব সময় আল্লাহর কাছে শোকরগুজার করতেন। শুধু তাঁর একটাই দুঃখ ছিলো- “আজকালের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করতে চায় না এবং ইংরেজিতে কাঁচা।”

আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলে থাকতাম, বারোরকম মেয়েদের সাথে মিশে থাকতে হয়েছে। জীবনে শিখেছিও হলজীবন থেকে অনেক কিছু। এক দিন আমার এক রুমমেট তার খালুর উপর রাগ করে আমাদের কাছে দুঃখ করেছিলো- “খালু আর ফুফাদেরকে বিয়ের সময় ছাড়া অন্য কখনোই কোন কাজে লাগে না।” আমি তখন তার কথার তীব্র প্রতিবাদ করে বলেছিলাম, আমাদের হেডমাস্টার খালু সারাজীবন আমাদের জন্য অনেক করেছেন।

আমরা বড় হয়েছি কিশোরগঞ্জ জেলা শহরে। Class One থেকেই আমরা আমাদের পরীক্ষার আগে অবধারিতভাবে খালুর Help পেয়েছি। খালু নিকলী থেকে এসে আমাদের পরীক্ষার পড়া পড়িয়েছেন। এটা যে শুধু আমাদের জন্য করেছেন তা-না। যখন যার প্রয়োজন হয়েছে সবার জন্য করেছেন। স্ব-উদ্দোগে নিকলীতে প্রথম কিন্ডারগার্টেন স্কুল করেছিলেন যার নাম “কুঁড়ি আদর্শ স্কুল”। নিকলী সদরেই খালুর বিশাল বাড়ি ছিলো। খালুর ছেলেমেয়ের সংখ্যা যেমন ছিলো অনেক, তেমনি আত্মিক শিক্ষার্থী সন্তানও ছিল অনেক। খালুর সে বিশাল বাড়িতে আমরাও অনেক থেকেছি। শুধু আমরা নই আরো অনেক শিক্ষার্থী থাকতো সে বাড়িতে।

আমার বড় বোন (বর্তমানে কবি নজরুল সরকারি কলেজের প্রফেসর) তার Class Eight-এর বৃত্তি পরীক্ষার আগে খালুর কাছে পড়াশোনার জন্য কয়েক মাস ছিলেন। আমার একমাত্র ভাই (I.W.M এ কর্মরত) এর ইংরেজির হাতেখড়ি খালুর কাছে। আমার বাকী বোনদের English এর Fotndationও খালুর হাতেই। আমার যখন এইচএসসি পরীক্ষা তখন খালু ছিলেন আজিমুদ্দিন (কিশোরগঞ্জ সদরে অবস্থিত) হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তখন খালুর পুরো পরিবার কিশোরগঞ্জ স্থানান্তরিত হয়। এর আগে তিনি নিকলীতে তাঁর জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিয়ে কিশোরগঞ্জ এসেছেন।

এরই মধ্যে লিবিয়ার একটি বাংলা স্কুল থেকে খালুর শিক্ষকতার প্রস্তাব এলো। খালু চলে গেলেন লিবিয়াতে। আমার তখন এইচএসসি পরীক্ষা। তিনি আমার সব Essay লিখে দিয়ে গেছেন কিন্তু “First day at College” Essayটা লিখে দিয়ে যাওয়া হয়নি। খালু লিবিয়াতে পৌঁছেই By Post-এ আমার জন্য লিখে পাঠালেন “First day at College”। আমার আম্মা আমাকে বললেন, দুলাভাই এতো কষ্ট করে এটা লিখে পাঠিয়েছেন, তুই A to Z মুখস্থ করবি। আমি আম্মার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করলাম। পুরোটা মুখস্থ করে ফেললাম। পরীক্ষায় এসেছিলও সে বছর First day at College-Essayটা। খালুকে চিঠি লিখে পাঠালাম লিবিয়াতে। খালু খুব খুশি হলেন। উপদেশ দিলেন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির আগে যেন বিভিন্ন Topics নিয়ে ইংরেজিতে লিখে রাখাটা অব্যাহত রাখি।

খালুর কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তিনি ছিলেন আদর্শ একজন মানুষের মডেল। আমৃত্যু তিনি তাঁর সব শিক্ষার্থীকে পড়িয়েছেন অকৃপণভাবে, কোনো ফাঁক রাখেননি। আল্লাহ তাঁকে বেহেস্ত নসিব করুন। পরম করুণাময়ের কাছে এটুকু প্রার্থনা রইল তাঁর জন্য।

 

লেখক : গবেষক ও অ্যাডভোকেট।