পরশ পাথর : আবদুল হামিদ স্যার

মামুনুর রশীদ নীরব ।।

আঃ হামিদ স্যার সরাসরি আমাদের শিক্ষক ছিলেন না। তবে স্যারের অনেক বিষয় গল্পের মতো মনে হয়। চাচা করিম স্যারসহ নিকলী জি.সি পাইলট হাইস্কুলের অনেক স্যারের কাছে শুনেছি তিনি এমন একজন পরশ পাথর যার সংস্পর্শে এলে ছাত্র ভালো না হয়ে পারে না। আমার কিছু স্মৃতি শুধু মনে পড়ে। সে সময় আমি ৭ম/৮ম শ্রেণীর ছাত্র।

রাস্তায় স্যারের সাথে দেখা হলে সালাম দিতাম। স্যার হাত তুলে সালামের উত্তর নিতেন। এর আগে এমন দেখিনি। আমরা জানতাম সালাম দিলে মুখে উত্তর নিতে হয়। কিন্তু তাঁর কাছে শিখলাম উত্তরদানকারীও হাত তুলে উত্তর নেয়। কখনো কখনো রাস্তায় দেখা হলে Tense জিজ্ঞেস করতেন। ইংলিশে কত পেয়েছি তা জানতে চাইতেন। “ফার্স্ট” হই নাকি “ফাস্ট” হই। অর্থাৎ উচ্চারণের বিষয়ে জানতে চাইতেন।

স্যারের কাছে কিছুদিন মিল্কী, বাবু পড়তো। ওদের সাথে একদিন পড়তে গিয়েছিলাম। দেখি ইংলিশে প্যাসেজ দিয়েছে লিখতে। আবার ইংলিশে কথা বলতে হবে। ঐ সময়ে (১৯৯৪) ইংলিশের প্রতি ভীতি ছিল। সঙ্গত কারণে আর যাইনি। বলাবাহুল্য, তিনি প্রতি ক্লাসের প্রথম দিকের ছাত্রদের টানতেন। অবশ্য এই পড়ালেখার বিনিময়ে টাকা দেয়ার কোন বিষয় ছিল না।

একদিন ক্লাসে এলেন। কয়েকজন স্যারসহ। ইংলিশ ক্লাস নিলেন। তাঁর প্রশ্নের উত্তর যা-ই দিই, তাতে তিনি মোটেও সন্তুষ্ট নন। আমরাও সবাই বিরক্ত। যাওয়ার পর জানলাম আমরা যে ইংলিশে গল্প পড়ি সেই বই তিনি লিখেছেন। ইংলিশে বই লিখেছেন তা ঐ সময়ে ছিল অকল্পনীয়। সম্ভবত বইটির নাম ছিল “Tales from stories.”।

গোপাল স্যার একদিন ক্লাসে বললেন, তিনি (আঃ হামিদ স্যার) এ.এড এ প্রথম হয়েছিলেন। Stand করা বুঝি। বোর্ডে মেধাতালিকায় ১ম ২০জনকে স্ট্যান্ড বলে। সর্বনিম্ন শিক্ষার হার যে উপজেলায় সেখান থেকে তৎকালীন সময়ে এমন রেজাল্ট করা অবিশ্বাস্য বৈকি। একেবারে প্রথম! এই প্রথম অসম্ভব একটা শ্রদ্ধা এল তাঁর প্রতি।

করিম স্যারের কাছে শুনেছি যে, ছাত্রের বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিতেন ছাত্ররা পড়ছে কিনা। হোস্টেলে (বোর্ডিং) থাকার ব্যবস্থাও করতেন। তখন নিকলী জি.সি হাইস্কুলে বোর্ডিং ছিল। দূরের ছাত্ররা সেখানে থেকে পড়াশোনা করত।

মাঝে মাঝে হাইস্কুলের বারান্দায় বসে অন্য স্যারদের সাথে পত্রিকা পড়তেন। সুযোগ পেলে সেদিকে বল গেলে প্রশ্ন করতেন। আমরা দূরে থাকার চেষ্টা করতাম। এখন আফসোস হয় না বুঝার জন্য।

বিকালে তিনি হাঁটতেন দ্রুত। হাঁটার মধ্যে একটা আর্ট ছিল। সাধারণত ডানে বামে কম তাকাতেন। তবে দৃষ্টি ছিল তীক্ষ্ণ। যে কেউ দেখা হলে সালাম দিলে কখনো তাঁর নজর এড়িয়ে যেত না। তিনি ছাত্রদের বৃত্তি পাওয়ানোর চেষ্টা করতেন। দেশের জন্য সমাজের জন্য ভাবতেন।

আগের ইউএনও ফজলুর রহমান সাহেব একবার চিঠিতে বলেছিলেন, আঃ হামিদ শিক্ষা বৃত্তির ব্যবস্থা করেন। তার আলোয় আলোকিত হতে কতটুকু আমরা পেরেছি।

কোন রকম ভণিতা ছাড়া স্যার সব সময় মূল বিষয়ে বলতেন। সাধারণ বিষয়ে ছিলেন অসম্ভব সচেতন। কোন ছাত্র Past tense কে Fast tense বললে স্যারের দুঃখের সীমা থাকতো না। খুব আফসোস করতেন। সঠিক উত্তর দিতে পারলে অসম্ভব খুশি হতেন। আমাদের উৎসাহ দিতেন।

তাঁর সম্পর্কে অনেক কিছুই করার আছে। বিশেষ করে বছরে অন্তত একটি দিন নিকলীর সকল স্কুল-কলেজে তাঁর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে আলোকপাত করা যেতে পারে। যাতে নতুন প্রজন্ম সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে।

তাঁর কমান্ডিং ভয়েস ছিল। কি যে ভয় পেতাম। আমাদের সিনিয়ররাই ভয় পেত। ক্লাসে কোনো ভালো ছাত্রকে পড়া (ইংলিশ) জিজ্ঞেস করলে না পারলে তার খবর ছিল। তিনি শিখিয়ে ছাড়তেন। বিশেষ করে আমাদেরকে প্রশ্ন করে দুর্বলতা বের করতেন। আর আমরা জানতাম প্রশ্ন করে স্যার আমাদের আটকাবেনই। তবে স্যার সেই দুর্বলতাগুলো ক্লিয়ার করে দিতেন তা যখন যেখানেই হোক না কেন; রাস্তায় বা স্কুলে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষককেই জিজ্ঞেস করতেন কি পড়ান যে ছাত্ররা পড়া পারে না। স্যার ছিলেন সৎ ও ব্যক্তিত্বশীল। তাঁর ব্যক্তিত্বের সামনে কেউ দাঁড়াতেই পারতো না। বর্তমান সময়ে এমন ব্যক্তি কল্পনা করা যায় না।

স্যার গতানুগতিক পড়ালেখার বাইরে বাস্তবভিত্তিক চিন্তা করতেন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, সরাসরি স্যার কখনো বইয়ের পড়া ধরতেন না। স্যার ধরতেন গ্রামার বা ইংলিশের বেসিক বিষয়ে কেমন তা বুঝার চেষ্টা করেন। ইংলিশে ভালো না হলে ভবিষ্যতে পড়াশোনা বা চাকুরীর ক্ষেত্রে যে সমস্যা হবে তা তো আমরা বুঝতাম না। কিন্তু স্যারের চিন্তা-ভাবনা ছিল সূদূরপ্রসারী। এইচএসসি পাসের পর ডাক্তার/ইঞ্জিনিয়ার বা ভালো বিষয়ে অনার্স ভর্তি হলে তা ইংরেজি মাধ্যমে পড়তে হয় সে ধারণা বা বিষয়ে স্কুলে অর্থাৎ এসএসসি পাসের আগ পর্যন্ত আমি নিজেই জানতাম না।

ছাত্রদের তিনি শাসন করলে বা বকা দিলে অভিভাবকরা খুশি হতো। মনে করতো তার সন্তান জীবনে সফল হবেই। হুমায়ুন আহমেদের গল্পে পড়েছি, একজন শিক্ষক বলতেন আমি যাকে বেত্রাঘাত করি সে সফল হবেই। তিনি সফল হয়েছিলেন। স্যারের ক্ষেত্রেও তাই। তিনি যাদের বকেছেন বা সঠিক উত্তর দিতে না পারায় বা দিয়েছেন তারা আমার দেখা মতে সবাই সর্বোচ্চ শ্রেণীর সফল মানুষ। কারণ তিনি অপাত্রে জ্ঞানদান করতেন না।

অনেকটা আবদুল্লাহ আবু সাঈদ স্যারের মতো তিনি ছিলেন জ্ঞানের ফেরীওয়ালা। তবে লাইব্রেরি দিয়ে নয়। তিনি নিজেই ছিলেন একটি লাইব্রেরি। বিশেষ করে ইংলিশের শব্দার্থ জিজ্ঞেস করে তাকে আটকানো যাবে ভাবাই যায় না। হুমায়ুন আহমেদ তার একটি লেখায় ডিকশনারী স্যারের কথা উল্লেখ করেন। যিনি সমগ্র ডিকশনারী মুখস্ত করেছিলেন। তিনিও আমাদের কাছে তেমনই ছিলেন। আমি বলবো তিনি উপযুক্ত মূল্যায়ন পাননি। তাঁর চেয়ে কম মেধার অনেক ব্যক্তি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে মূল্যায়িত হয়েছে। খায়রুল আলম বাদল তাঁর জারীগানের বন্দনায় আঃ হামিদ স্যারকে অবশ্য সম্মান দিয়েছেন।

তিনি পরশ পাথরের মতো। তাঁর ছোঁয়ায় সর্বত্র সোনা ফলেছে। আমরা সে দান পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করতে পারিনি। তারপরও আমাদের কাছে স্যার ছিলেন অনুপ্রেরণা। নতুন প্রজন্ম সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত। পাদ প্রদীপের আলো থাকেন কেউ কেউ। তিনি তেমনই একজন মানুষ। একজন পরশ পাথর।

 

লেখক : চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, মাদারীপুর।