“শিক্ষার অনির্বাণ শিখা” আমাদের প্রিয় হেডমাস্টার স্যার

শচীন্দ্র চন্দ্র দেবনাথ ।।

নিকট অতীতে ষাট ও সত্তরের দশকে কিশোরগঞ্জ জেলায় (তখন মহকুমা) এমন লোক কমই ছিলেন, যিনি নিকলী স্কুলের হেডমাস্টার হামিদ স্যারকে চিনতেন না। কারণ কর্মসূত্রে তাঁর যোগাযোগ ছিল গ্রাম থেকে শহর, ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবার সাথে। তিনি ছিলেন শিক্ষা অন্তঃপ্রাণ এক ব্যক্তিত্ব। স্কুলের শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে বিদ্যুৎগতিতে সর্বত্র ছিল তাঁর বিচরণ। একদিকে আদর্শবান শিক্ষক, অভিভাবক, দক্ষ ব্যবস্থাপক, শিক্ষার তথা প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক আবার অন্যদিকে মানবতার প্রতীক এবং ক্রীড়া, শিল্প-সংস্কৃতি ও সৌকর্য বিকাশের নিপুণ সংগঠক। স্যার আজ আমাদের মাঝে নেই; কিন্তু তাঁর কর্মের মাঝে বেঁচে আছেন ও থাকবেন চিরদিন আমাদের হৃদয়ে।

তিনি আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় মরহুম জনাব মোঃ আব্দুল হামিদ, বিএ, বি.টি, এমএড, প্রাক্তণ প্রধান শিক্ষক নিকলী জি.সি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, নিকলী, কিশোরগঞ্জ। স্যারের অসংখ্য ছাত্র দেশের সর্বত্র সম্মানজনক অবস্থানে অধিষ্ঠিত যা স্যারের কৃতিত্ব ও অহংকার এবং আমাদের গৌরব। উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো বর্তমানে বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি জনাব আব্দুল হমিদ, প্রাক্তন সচিব জনাব কারার মাহমুদুল হাসান, সাবেক ডেপুটি হাইকমিশনার মরহুম জনাব আব্দুর রহিম। তাছাড়া উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং আছেন এমন অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুল-কলেজের শিক্ষক, বিচারক এবং আমলাসহ সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা। তখন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় স্কুলের ভৌত অবকাঠামো ছিল খুবই নাজুক। বাঁশের বেড়া, টিনের চালা, চটের পার্টিশন ও অপ্রতুল চেয়ার টেবিল। কিন্তু স্কুলে শিক্ষার মান ছিল মহকুমায় প্রথম সারিতে। কারণ ছিল মেধাবী ও দায়িত্বশীল শিক্ষক-মণ্ডলী এবং তাঁদের পুরোধা প্রধান শিক্ষক মহোদয়। সবার মধ্যে সম্পর্ক ছিল মধুর এবং শিক্ষায় সার্বিক পরিবেশ ছিল আনন্দময়। শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মানোন্নয়নে এবং শারীরিক ও মানসিক উৎকর্ষ সাধনে হেডমাস্টার স্যার ছিলেন সদা তৎপর ও সচেতন।

খেলাধুলার বিষয়ে হেডমাস্টার স্যার ছিলেন খুবই উৎসাহী এবং অনুরাগী। স্কুলে ফুটবল, ভলিবল, সাঁতার, জিমন্যাস্টিক্স, হা-ডু-ডু, দাড়িয়াবান্দাসহ সব খেলার আয়োজন ও ব্যবস্থা ছিল। আন্তঃস্কুল সাঁতার প্রতিযোগিতায় স্কুলের কয়েকজন ছাত্র বিভাগীয় পর্যায়ে পদক পেয়ে সুনাম কুঁড়িয়েছেন। স্কাউটিং টিম ছিল। স্কাউটগণ জেলা পর্যায়ে অংশগ্রহণ করে এবং স্থানীয়ভাবে জনসেবায় তৎপর থেকে মানুষের ভালবাসা পেয়েছেন। প্রতিবছর বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। রচনা, বিতর্ক, আবৃত্তি ও মঞ্চ নাটকের ব্যবস্থাও ছিল। প্রতি ক্লাসের সামনে ফুল বাগান তৈরি করে সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পুরস্কারের প্রচলন ছিল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খেলাধুলা, শিল্প-সংস্কৃতি বিকাশে সব উদ্যোগ ছিল হেডমাস্টার স্যারের চিন্তাপ্রসূত এবং তাঁরই অনুপ্রেরণায়। এখনকার সমাজ ব্যবস্থায় এবং মানুষের আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতায় এমন দৃষ্টান্ত কি খুঁজে পাওয়া যাবে?

আগেই বলেছি স্কুলের ভৌত অবকাঠামোর দৈন্যদশার অবস্থা। এ বিষয়টি স্যারের মনকে হয়তো নাড়া দিয়েছিল এবং নিজ থেকেই মনঃব্যথায় ভুগতেন। লক্ষ্য করলাম স্যার প্রায়ই ঢাকা যেতেন। সম্ভবত ১৯৬২ সনের দিকে জানতে পারলাম যে স্কুলের উন্নয়নে সরকারি একটি অনুদান পাওয়া গেছে। সে বছরই টিনের ঘর ভেঙ্গে ক্রমান্বয়ে বিল্ডিং তৈরি শুরু হলো। প্রায় এক বছরেই নিকলী হাইস্কুলের নামের সাথে পাইলট যুক্ত হলো এবং নতুন অবয়বে স্কুলের দৃশ্য শোভা পেল। দীর্ঘ ৩/৪ বছরের অক্লান্ত চেষ্টা, পরিশ্রম ও নিরবচ্ছিন্ন তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে নিকলী জি.সি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় বর্তমান অবস্থানে এবং কাঠামোতে এনে দাঁড় করালেন যে মহান ব্যক্তি তিনিই তো আমাদের গর্ব, প্রাণপুরুষ এবং শিক্ষাব্রতী আমাদের প্রিয় হেডমাস্টার স্যার শ্রদ্ধাভাজন মরহুম জনাব আব্দুল হামিদ। যার স্মৃতি স্কুলের প্রতিটি কোণায় মিশে আছে এবং চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে তাঁর অগণিত অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীর হৃদয়ে।

হেডমাস্টার স্যারের মানবতা ও দয়া-দাক্ষিণ্য সম্পর্কে কয়েকটি কথা অবশ্যই বলা সঙ্গত হবে। তাই সংক্ষেপে বলেই শেষ করবো।

বাইরের দিকে কঠোর ভাব পোষণ করলেও তাঁর মন ছিল কোমল ও স্নেহপ্রবণ। মেধাবী ও গরীব ছাত্রদের প্রতি সহানুভূতি, সহযোগিতা ও দান করার প্রবণতা ছিল স্যারের মহান ও মানবিক গুণ। এর প্রত্যক্ষ উদাহরণ আমি নিজে। স্যারের সার্বিক পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে আমার শিক্ষা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো না। এ বিষয়ে একটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই। ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার প্রায় ৩/৪ মাস পর অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষায় ইংরেজি ছাড়া সব বিষয়ে বড় ব্যবধানে সর্বোচ্চ নম্বর পাই। ব্যাপারটি শ্রদ্ধেয় শিক্ষকমণ্ডলী হেডমাস্টার স্যারকে অবহিত করেন এবং সব মহলে একটা উৎসুক ও কৌতুহলের সৃষ্টি হয়। কিন্তু ছাত্রটি তখনও সবার নিকট অপরিচিত। কে সেই ছেলে! তাই একদিন স্কুল ছুটির পর হেডমাস্টার স্যার আরও দুইজন শিক্ষকসহ (সম্ভবতঃ শ্রদ্ধেয় জব্বার স্যার ও বি.কম স্যার) হিন্দু বোর্ডিং-এ আসেন এবং সমবেত ছাত্রদের জিজ্ঞেস করেন “তোদের মধ্যে শচীন্দ্র দেবনাথ কে রে? শচীন্দ্র দেবনাথ কে?” আমি সবার পিছনে ভয়ে জড়সড়। সাথীদের দু’য়েকজন আমাকে স্যারের সামনে হাজির করলো। স্যার জিজ্ঞেস করলেন তোমার নাম শচীন্দ্র দেবনাথ? আমি ভয়ে ভয়ে মাথা নেড়ে শুধু বললাম “জি”। স্যার বললেন- “তুমি ভালভাবে মনোযোগ সহকারে পড়াশুনা করে যাও। কোন সমস্যা হলে আমাকে জানাবে। আর এখন থেকে তোমার বেতন দিতে হবে না।”

আরও একটি ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। অষ্টম শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষার আনুমানিক একমাস আগে হেড স্যার জানালেন যে, জুনিয়র স্কুল স্কলারশিপ পরীক্ষায় আমাকে অংশগ্রহণ করতে হবে। পরীক্ষার ফরম সংগ্রহ ও পূরণ করে যথাস্থানে পাঠানোর সব ব্যবস্থা স্যারই করে দিলেন। পরীক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে রুটিন ক্লাস মওকুফ করে ইংরেজি স্পেশাল ক্লাস শ্রদ্ধেয় স্যার গোপাল বাবুর (স্বর্গীয়) নিকট একমাস পড়ার সুযোগ করে দিলেন। পরীক্ষা শুরু হওয়ার দুইদিন আগে স্যার আমাকে নিয়ে ময়মনসিংহ রওনা দিলেন। পরীক্ষার ঠিক আগের দিন বিকালে প্রমোদ বাবু (প্রমোদ দেবনাথ) বি.এস.সি প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা শেষে আমার গাইড হিসেবে ময়মনসিংহে পৌঁছলেন। এই নির্দেশনা প্রমোদ স্যারকে হেডমাস্টার স্যার আগেই বলে নিশ্চিত করেছিলেন। আমি এ বিষয়ে কিছুই জানতাম না। প্রথম দিনের বাংলা ১ম পত্র পরীক্ষা কেমন হলো তা জেনে আমার সব দায়িত্ব প্রমোদ স্যারকে দিয়ে অফিসের অতিজরুরি কাজে হেডমাস্টার স্যার সেদিনই বিকালে ঢাকা রওনা দিলেন। সেই পরীক্ষার জন্য ময়মনসিংহে থাকা-খাওয়া যাতায়াত বাবদ সম্পূর্ণ খরচ হেডমাস্টার স্যার সংস্থান করেছিলেন।

ছাত্রের প্রতি এমন স্নেহ-মমতা, দয়া-দাক্ষিণ্য ও মঙ্গল কামনা এ যুগে কি কল্পনা করা যায়! এরূপ দৃষ্টান্ত একান্তই বিরল। তাই হেডমাস্টার স্যার শুধুই শিক্ষক ছিলেন না। আমার নিকট তিনি শিক্ষক, অভিভাবক এবং পিতৃতুল্য। স্যারের এই চেষ্টা ও শ্রম বৃথা যায়নি। বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিলাম এবং স্যার সেদিন খুবই আনন্দিত হয়েছিলেন। স্যারের কাছে আমি চিরঋণী। যদিও পিতৃ-ঋণ এবং শিক্ষক ঋণ কোনদিনই শোধ করা যায় না। নিকলী আমার জন্য এক তীর্থস্থান। নিকলী তথা নিকলীর জনগণের কাছ থেকে অনেক স্নেহ-ভালবাসা পেয়েছি। নিকলী হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে, এমন শিক্ষানুরাগী দেবতুল্য একজন প্রধান শিক্ষক এবং সে সময়কার মেধাবী ও জ্ঞানী যোগ্য আমার শিক্ষকমণ্ডলীর সান্নিধ্য পেয়ে আমি ধন্য ও সমৃদ্ধ এবং কৃতার্থ।

 

লেখক : পরিচালক (অবঃ), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।