মানুষ গড়ার কারিগর “হেডমাস্টার” স্যার

সুনীল সাহা ।।

ধূমপানমুক্ত এলাকা নিকলী হাই স্কুল। অর্থাৎ স্কুল ও স্কুলের ধারে ধূমপান নিষিদ্ধ। এ নিয়ে সিনিয়র ছাত্ররা বিপাকে। একদিকে শিক্ষকমণ্ডলী, অন্যদিকে গার্জিয়ান বড় ভাইয়েরা সাঁড়াশি অভিযানের শিকার। অতএব, ধূমপানের গোপন আস্তানা অন্বেষণে এরা সদা ব্যস্ত থাকে। এরা সবাই নতুন ধূমপায়ী, নেশার নয় নেহাৎই সখের। কিশোরদের কৌতূহল বড় ভাইয়েরা ধূমপান করছে আমরা করলে কেমন হয়? এর বশবর্তী হয়ে এ রকম ইচ্ছেটা ওদের কচিমনে উঁকি দেয়। বিড়ি, সিগারেট কেনাতে মেলা ঝামেলা। ওরা পয়সা পাবে কোথায়? তাই বাপের পকেট থেকে দু’-চার পয়সা এদিক-ওদিক সরিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। সিনিয়র ভাইদেরও সমস্যা-
এক. হেড-স্যারের অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি;
দুই. ঠোঁট কালো দেখলেই ওমনি হেড-স্যারের জেরা।
তখনই ‘গুরুদণ্ড’।
দণ্ড পাওয়ার পর বাড়ি ফেরার পথে নিচু ক্লাসের ছোট ভাইয়েরা মিছিল করে স্লোগান দিতে দিতে বলতে থাকে নাচতে নাচতে-
“বড় ভাই বিড়ি খাইছে
এর লাইগ্যা মাইর খাইছে”
স্কুলে বেত খেয়ে বড় ভাইটি দাদীর আঁচলে মুখ লুকানোর মতো। কারণ, বাচ্চাদের স্লোগান গার্জিয়ানের কানে পৌঁছে গেছে।
ফোকলা দাঁতে কটকট করে দাদীরা নাতিদের মাথায় হাত বুলিয়ে বলছেন:
“ও ছেরা (ছেলে) বিড়ি খাস কিয়ের লাইগ্যা? জানস না বিড়ি খাইলে কইলজা কানা (ফুটো) হইয়া যায়?”
“তাহলে ভাইরে ডাকতর খানা (হাসপাতাল) লইয়া যাই”? আরেক নাতি ফোঁড়ন কাটলে-
“এ্যাই মুখপোড়া! তুই অত মাতব্বরী করস কেরে!” এমনি ধারার ধূমপানের কিশোর জগত।
বাইরে অঝোরে বৃষিট ঝরছে। রাত প্রায় ১১টা। ঘুটঘুটে অন্ধকার চারদিকে। হামিদের (বর্তমান রাষ্ট্রপতি) হোস্টেল রুম। জমিয়ে আড্ডা ইয়ার বন্ধুদের নিয়ে। দু’জন ইয়ারের বিড়ির নেশা পেয়ে বসল, কিন্তু হামিদের রুমে সে রাতে ধূমপানের কোনো ব্যবস্থা নেই। তাহলে এখন উপায়! বিড়ি ছাড়া আড্ডা জুতসই হচ্ছে না।
বাইরে শ্রাবণের সূচিভেদ্য অন্ধকার, তারপর বিরামহীন মুষলধারায় বৃষ্টি। বাজারে দোকানপাট বন্ধ। ঝাঁপ ফেলে দোকানিরা যার যার বাড়িতে। সঙ্গীদের মধ্যে একজন বলে উঠল-
“হেড-স্যার খাম্বিরা তামাক খান বাসাতে।”
খাম্বিরা তামাক মানে যে তামাকের ধোয়া থেকে সুগন্ধ ছড়ায়। নাইট গার্ডকে ডাকা হলো-
“তুমি হেড-স্যারের বাসা থেকে এক ছিলিম খাম্বিরা তামাক চুরি করে আনতে পার?”
“ওরে বাবারে!” নাইট গার্ড ভয়ে ছিটকে গেল।
“আরে বাবা, স্যার তো এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছেন।”
“না ভাই আমি পারব না!”
“কেন?”
“ধরা পড়লে স্যার আমায় মেরে ফেলবেন।”
চার আপা ২৫টা বিড়ির (এক প্যাকেটের দাম) পয়সা ওর হাতে গুঁজে দিয়ে অনেক বুঝিয়ে-শুঝিয়ে রাজি করানো গেল।
ওদিকে ওদের বিড়ির নেশা চেপে বসেছে তাই তাগাদা দিল নাইট গার্ডকে।
“কই যাও না কেন?”
“এই তো যাচ্ছি।”
বলে হ্যারিকেন, ছাতা নিয়ে নাইট গার্ড যে না পা বাড়িয়েছে অমনি “পড়বি তো পড় মালীর ঘাড়ে”। অন্ধকার ভেদ করে শোনা গেল হেড-স্যারের গলা-
“স্যারের বাসায় খাম্বিরা তামাক নাইরে।”
হেড-স্যার এই অন্ধকারে বৃষ্টির মধ্যে কখন যে হামিদের রুমের বারান্দায় খুঁটির আড়ালে দাঁড়িয়েছেন কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি।
এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত! হামিদের রুমের দরজা খোলা। স্যার তো একদম দোরগোড়ায়। স্যার শুধু পর পর ক’টা শব্দ শুনলেন।
“ঝপাং ঝপাং” সব কয়জন জানালা দিয়ে পাশের পুকুরে দিল ঝাঁপ। কে কোথায় গেল এই গভীল রাতে ভিজে জবুথবু হয়ে কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। নাইট গার্ডটা হ্যারিকেন-ছাতা ফেলে দে দৌড়! হেড-স্যার হামিদের রুমে ঢুকে দেখলেন রুম ফাঁকা, একজনও রুমে নেই।
“বন্ধুগণ! দেখা হবে সকালে।”
স্যার মনে মনে বলে ফিরে এলেন বাড়ি। সেকালের ধূমপান কাহিনী এরকম বিচিত্র। বড় ভাই ছোট সবাইকে একবার না একবার নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে বাড়ি বা স্কুলে। তবুও গোপনে ধূমপানের আসর বসে জ্যেষ্ঠ কনিষ্ঠ ফারাক রেখে।

অংকের টিচার ভুবন স্যারকে দেখলে হামিদ, আমার ও হাসান কারারের গায়ে জ্বর এসে যেত। কারণ আমরা তিনজনই অংকে সরস্বতী। অংকটা কোন মতেই মগজে ঢুকত না। অংকে কোন পরীক্ষাতেই ৩০-এর কোটা পেরুতে পারতাম না আর অন্যান্য সাবজেক্ট ৬০-৭০-এর ঘরে নাম্বারের মিটারটা উঠানামা করত। ভুবন স্যার ক্লাসে ঢুকলেই হামিদের দুষ্টুমি বেড়ে যেত। সদানন্দের সঙ্গে খোঁচাখুঁচি। সদানন্দ অংকে ভাল। তাই ভুবন স্যারের অংকের হোমওয়ার্কটা সদানন্দের খাতা থেকেই টুকলিফাই হত নিয়মিত। ভুবন স্যার আমাদের কোয়ালিটি মাপতেন। স্কেল ওঠে না বলেই বকাঝকা তো ছিলই, কপালে বেত্রাঘাতও জুটত।
হেড-স্যারের কপালে ভাঁজ পড়ল। আমরা তিনজনকে কেমনে স্যার অংকের বৈতরণী পার করে দেবেন ম্যাট্রিক পরীক্ষায়! স্যারের ঘুম হারাম হয়ে গেল। আমরা “ত্রিরত্নই” ঘুম হরণ করার একমাত্র কারণ।
স্যার শিক্ষাদানে দারুণ টেকনিশিয়ান। তাই উপায় একটা বের করবেনই। একদিন টেস্ট পরীক্ষার পরে আমাদের ডাক পড়লো তাঁর রুমে।
তখন ম্যাট্রিক ক্যানডিডেটদের কোচিং চলছে অন্য সব বিষয়ের। গোপাল স্যার, ভুবন স্যার ইংরেজি ও অংক কোচিং করে বিকেলের দিকে বাড়ি যান। এ সময় আমাদের ডাক পড়ল হেড-স্যারের রুমে। কিন্তু কেন!
দুরু দুরু বুকে আমরা ত্রিরত্ন স্যারের কামরার দিকে এগুচ্ছি। হামিদ একটা খোঁচা দিয়ে হাসান কারারকে বললো-
“হাসান তুমি আগে ঢোকো।”
“কেন?”
“তুমি আমাদের মধ্যে সাইজে ছোট।”
“এখানে ছোট-বড় এর কথা হচ্ছে কেন? স্যার তো আমাদের তিনজনকেই ডেকেছেন।”
“তবুও তুমি আগে স্যারের রুমে ঢোকো।”
হাসান একটু হেলেদুলে একটা হাত হাফপ্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে হেড স্যারের দরজার পর্দা ফাঁক করতেই স্যারের আহ্বান-
“আসুন! আসুন! আমার ত্রিরত্ন।”
আমরা তিনজনই হেড স্যারের টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম কাঁচু মাচু হয়ে। স্যারের এতক্ষণের উৎফুল্ল চেহারা ক্রমে কঠিন হয়ে উঠল। চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, চশমার ফ্রেমের উপর দিয়ে আমাদের দিকে তাকালেন কঠিন দৃষ্টিতে।
“শোন! তোমাদের অংকের ক্লাস টিচার রিপোর্ট দিয়েছেন তিনি তোমাদের অংক ক্লাস নিতে অপারগ। কারণ কোচিং-এ অন্য ছেলেদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছ না। ভুবন বাবু তোমাদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।” বলেই হেড স্যার একটু থামলেন।
“আমি ঠিক করেছি তোমাদের জন্য একটা কয়েদখানা করব। কোচিং-এর পর টানা তিন ঘণ্টা তোমাদের অংক প্র্যাকটিস করতে হবে আর সাধারণ কোচিং তো আছেই। অর্থাৎ টানা আট ঘণ্টা তোমাদের কোচিং, রাতে আরো আট ঘণ্টা মোট ষোল ঘণ্টা স্টাডি। এর মধ্যে কোন “সময়” ছাড় দেয়া হবে না। বুঝেছ?”
আমাদের গলা শুকিয়ে কাঠ। কোচিং-এর পর টানা তিন ঘণ্টা অংক প্র্যাকটিস! তক্ষুণি জ্বর এসে গেল। হাসান কারার কি একটা বলতে চাইছিল। ধমক দিয়ে থামিয়ে দিলেন স্যার।
“নো কথা।”
ভয়ে ভয়েই হামিদ বললো, “স্যার কয়েদখানা?”
“হ্যাঁ, জেলখানা। ওখানে তোমরা তিনজন আসামি আর জেলার (Jailer) অর্থাৎ কোচিং-এর কোচ। অন্য কারোর No Admission! এটাই হবে তোমাদের মগজ ধোলাইয়ের কারখানা। দিনে তিন ঘণ্টার কয়েদখানা।”
আমাদের স্কুলের উত্তর ব্লকের একদম পশ্চিম প্রান্তে স্কুলের স্থায়ী নাট্যমঞ্চ। এটাই হেড স্যার আমাদের কয়েদখানা বানালেন। আমরা তিন জন একটা লম্বা বেঞ্চে বসব আর হেড স্যার একটা চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসবেন। নাট্যমঞ্চের ড্রপ সীন ফেলানো কারণ, এরপরই টেন-এর ক্লাস রুম।
স্যার আগেই বলে দিয়েছেন, “নো টক”। তাই আমরা বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
একটু বাদে স্যার উঠে বললেন-
“Follow me.”
আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো পিছ পিছ আসছি স্যারের।
“এটা তোমাদের কয়েদখানা” স্টেজে ঢুকে স্যার বললেন। স্যার আরও বললেন-
“ম্যাট্রিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত এই লম্বা বেঞ্চে বসে তিনজনে অংক প্র্যাকটিস করবে। বুঝেছ?”
স্যার এর মধ্যে প্রকৃতির ডাকে… হাসানের কথা শেষ হওয়ার আগেই স্যার মুখের কথা লুফে নিয়ে বললেন-
“পারমিশন স্লিপ নিতে হবে এবং এতে টাইম লেখা থাকবে In and out.”
বেশি চেপে গেলে হামিদ বলতেই স্যার গর্জে উঠলেন-
“Shut up”.
চমকে উঠলাম আমরা। অগত্যা স্যারের ধমক খেয়ে সুবোধ বালকের মতো লম্বা বেঞ্চে বসলাম আর স্যার বসলেন সামনে রাখা চেয়ারটা টেনে।
“তোমাদের জন্য ব্রিফিং! প্রতি সপ্তাহে তিনটি এক দিস্তা কাগজের লম্বা খাতা আনবে। অংক কষতে হবে, শুধু প্র্যাকটিস আর প্র্যাকটিস।”
“শুধু প্র্যাকটিস জ্যামিতি মুখস্থ করতে হবে না স্যার!”
আমার প্রশ্নের জবাবে স্যার-
“সেটাতেই আসছি।”
“জ্বি স্যার।”
তোমাদের কোচিং সিলেবাস এরকম : পাটিগণিতের চারটা নিয়ম ২দিন, বীজগণিতে ৪টা নিয়ম সপ্তাহে ২ দিন, জ্যামিতি ১ দিন ও রিভিশন ১ দিন। মোট ৬ দিন। শুক্রবার ছুটি। কিন্তু Standby ready at call, ডাকিবা মাত্রই আসবে।”
“স্যার এত সময় কেবলমাত্র অংকের জন্যে অর্থাৎ আরো ৮টা সাবজেক্ট?”- হাসানের প্রশ্ন।
“যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে। বুঝেছ ছোট বয়?” এই বলে হেড স্যার তাঁর কক্ষে গেলেন।
আমাদের তিনজনেরই মুখ শুকিয়ে গেছে। হেড স্যার নিজেই অংক কোচিংয়ের কোচ। কি সাংঘাতিক! পান থেকে চুন খসলেই গুরুদণ্ড!
হামিদ ফিসফিস করে বললো-
“ক্ষিধে পেলে স্যার ঠিকই বাড়ি যাবেন, এই ফাঁকে আমরা…”
কথা কেড়ে নিলে বললাম-
“সে গুড়েবালি।”
“তুই চুপ কর।”
ধমক খেলাম।

হেড স্যার আমাদের বিষয়ে কত সিরিয়াস! এ বয়সে স্কুল শেষে টানা তিন ঘণ্টা আমাদের নিয়ে পরে থাকবেন তাঁর সব কাজ ফেলে রেখে? ভাবতে গেলে আজ চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে আমাদের।
আমরা সাধারণ কোচিং দু’টা পর্যন্ত করে দৌড়ে বাড়ি গিয়ে নাকে-মুখে দুটো ভাত গুঁজে আবার কোচিংয়ে বিকেল ৩টায়। চলে একটানা ছয়টা পর্যন্ত। বিকেল পাঁচটায় সন্ধ্যা নেমে আসে- অন্ধকার হয় সব, স্কুল বাড়ি সেই সঙ্গে আমাদের কয়েদখানাও। কিছুক্ষণের মধ্যে ক্ষিধেয় পেট চোঁ চোঁ করে। হামিদ ১০ মিনিটের বিরতি পায় দু’বার চা খাওয়ার জন্যে- সাথে হালকা নাশতা।
স্যার পাটিগণিতের একটা নিয়ম ধরলেন। প্রথম প্রথম খটখটে লাগত। কিন্তু স্যারের পরশ পাথরে ছোঁয়ায় অংকের কালো পর্দাটা ক্রমে সরে যাচ্ছে। একটু একটু ইন্টারেস্ট পাচ্ছি আমরা তিনজনই। আগে অংক দেখলেই জ্বর আসত গায়ে। রুটিন মোতাবেক আস্তে আস্তে এগুচ্ছি। কেউ ঠেকে গেলে তিনজন Group Discussion করে অনেকটা সমাধান করতে চেষ্টা করতাম- নইলে স্যার।
ক্ষিধে লাগলে হামিদ বিস্কুট কলা দেয়। হেড স্যারকে চা দিয়ে রুমে নিজে চা খায়। চায়ে চুমুক দেন স্যার কিন্তু মুখে কিছু বলেন না।
এদিকে আমরা খুব পরিশ্রান্ত দুপুরের পর কোচিংয়ে। বিরতি না দিলে চলছে না। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম “পোস্টারিং করব!”
“কিসের পোস্টারিং?”
৪টা থেকে সাড়ে ৪টা বিরতি। বাজার থেকে বা সদাগরের দোকান থেকে মিষ্টি খেয়ে আসব। হামিদকে বললাম। হামিদ বললেন, “পোস্টিং লাগবে না স্যারকে আমি বলব।”
স্যারকে বলতেই স্যার তিড়িং মেরে লাফিয়ে উঠলেন, চোখ পাকিয়ে বললেন –
“নো, হবে না।”
“স্যার ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়।”
“কাব্যি হচ্ছে?”
“আমি বলিনি, বলেছেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য।”
স্যার একটু ভেবে নিলেন। কিছু বললেন না।
পাটিগণিত ও বীজগণিতের সম্ভাব্য প্রশ্নাবলী আমরা সমাধান করতে এর মধ্যে পেরেছি। চারটের মধ্যে দুটো নিয়ম অর্থাৎ ৫০% এগিয়েছি।
অনবরত অংক কষা আর বিড়বিড় করে মুখস্থ করা- দুয়ে মিলে মনের মধ্যে ওগুলো গেঁথে আছে। এবার জ্যামিতি। মাত্র কয়েকটা সম্পাদ্য আর উপপাদ্য স্যার মার্ক করে দিলেন।
“ঝাড়া মুখস্থ করো।”
জ্যামিতির এক্সট্রা করবে না, এতে মাথা গুলিয়ে যাবে।
কোচিং থেমে নেই। ইতোমধ্যে দুপুরে বাড়িতে ভাত, বিকেলে বাজারে কিছু খাওয়া পূর্ণিমার চাঁদটা ঝলমলে রুটি থেকে স্নিগ্ধ আলোর গোলকে পরিণত হল। আমার একটা তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। স্যারও খুশি। খাতা চেকআপ করতে করতে তাঁর মুখে মৃদু হাসির রেখা।
“স্যার আমাদের একটু উন্নতি হয়েছে?”
“হু!”
আমরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছি এর মধ্যে স্যার বললেন-
“পরশু তোমাদের অংক টেস্ট পরীক্ষা।”
“ঠিক আছে স্যার।”
স্যার টেস্ট নিলেন- টেস্ট-এ ৭০% মার্ক ক্যারি করতে সক্ষম হয়েছি। লাল কালির আঁচড়ে খাতাগুলো চেক করে হেড স্যার বললেন-
“একটু ইমপ্রুভ হয়েছে, কিন্তু ভুলে যাবে না তো?”
“মাঝে মাঝে ঝাঁলিয়ে নেব স্যার।”- হাসান কারারের মন্তব্য।
স্যার তার রুমে চলে গেলেন। আমরা নাট্যমঞ্চে এসে কোরাস গান ধরলাম-
“দিন ফুরায়ে যায়রে আমার দিন ফুরায়ে যায়”
“এ্যাঁও।”
হুঙ্কার ছেড়ে স্যার ছুটে এলেণ স্টেজে-
“কি হচ্ছে এগুলো?”
আমরা অংকে আপগ্রেড হয়েছি তা সেলিব্রেট করছি! হামিদের জবাব।
“অংকে আপগ্রেড হয়েছো?”
“জ্বি স্যার।”
“এখনও অনেক বাকি। তখন সেলিব্রেট করবে।”
ছোট হয়ে আসছে দিন ৪.৩০-এ সন্ধ্যা হয়ে যায়। স্যার দুটো হ্যারিকেনের ব্যবস্থা করলেন ছ’টা পর্যন্ত।
“স্যার আলোটা কম হয়ে যায়।”
“মানে?”
“ইনসাফিসিয়েন্ট লাইট” ফুটবল খেলার মাঠ থেকে কথাটি শেখা। আমি বললাম।
“তবে সাইকেল মেকারের দোকান থেকে হ্যাজাক লাইট এনে জ্বালিয়ে দেব?”
“তাহলে তো স্যার পাবলিক এসে বলবে- গান অইবো?”
শেষ পর্যন্ত দুটো হ্যারিকেন আমাদের আলোর ষষ্ঠী!
কোচিং চলছে- বিকেল ৪টা। পাশের ঈদগা মাঠে সিনিয়র ছাত্র আর পাবলিকের ভলিবল খেলা। মাঠের চারপাশে কিছু উৎসুক জনতা। সারা মাঠ জুড়ে বাচ্চাদের খেলা- চেঁচামেচি হৈ হুল্লোড়। আমরা তিন কয়েদী কয়েদখানায়। এক সময় মন ছুটে যায় খেলার মাঠে। কিন্তু স্যারের দিকদড়ি (ডিগড়া) ছিঁড়ে ছুটে চলার শক্তি নেই- সাহসও নেই।
অংক কষার মাঝে মাঝে ছেদ পড়ে। নিরস এক শাস্ত্র। যাদব চক্রবর্তী আর কেপি বোস কি সব অংক বই লিখেছেন ওদিকে আমরা মাথা খুঁড়ে মরছি!
হেড স্যারের যাদুর ছোঁয়ায় অংক তরী তরতর করে চলছে সামনের দিকে। অপরূপ কৌশল হেড স্যারের অংক শেখাতে। আমরা যতই এগুচ্ছি স্যার ততই খুশি হচ্ছেন। তাঁর হাসিটা দ্য ভিঞ্চির বিশ্ব বিখ্যাত পেইন্টিং “মোনালিসা”-এর মতো। এ হাসি ফুটিয়ে ছিলেন সত্যজিৎ রায় পথের প্যাঁচালিতে সর্বজয়ার মুখে।
আমরা খুবই পুলকিত স্যারের এ পরিবর্তনে। মাঝে মাঝে আবার হামিদ অংক ভুল করে বসে। স্যার খাতাটাতে লাল কালির আঁচড় টেনে তিরস্কারের ছলে বলেন-
“নেতাজী, রাজনীতির ফাইলটা লাল ফিতেয় বেঁধে রেখ! নো পলিটিক্স পরীক্ষা পর্যন্ত।”
স্যারকে আমরা উস্কে দিই-
“স্যার, হামিদ এখনো মাঝে মাঝে ‘পাকিস্তান মুর্দাবাদ, আয়ুব শাহী নিপাত যাক’ বলে স্লোগান দেন হাত উঁচিয়ে।”
“বললাম তো এখন রাজনীতি অফ”। বলে স্যার তার রুমে চলে গেলেন।
এর মধ্যে সদানন্দ স্টেজে ঢুকে গেল, হামিদের খাতাটা টান দিয়ে পাতা উল্টাতে লাগল, কোথাও কোথাও আবার থেমে গেল।
“এই পণ্ডিত, এটা তো ভুল করেছিস। দেব নাকি স্যারের মত কানমলা?” বলেই অংকের কয়েকটা জায়গা শুদ্ধ করে দিল সদানন্দ।
আগেই বলেছি, সদানন্দ হামিদের চোখের বালি। আবার জানের জান। একজন আরেকজনকে না দেখলে হাঁসফাঁস করতে থাকে।
মাঠের খেলা শেষে দু’চারজন আবার স্যারের অজান্তে এসে উঁকি দেয়। বলে-
“কি স্যারেরা! সবাই কুশলে আছেন তো?”
বলেই বিদ্রূপ করত- আমরা অপমানে লজ্জায় চুপ করে থাকতাম বাধ্য হয়েই।
সদানন্দ হামিদের জন্য কিছু বড়ই (কুল) হাফপ্যান্টের দু’ পকেট ভরে এনেছে।
“এ্যাই হামিদ বড়ই (কুল) খাবি?”
“চুরি করে এনেছিস?”
“আমাদের নিজের গাছের বড়ই।”
“সত্যি বলছিস?”
“সদ্যি! মা কালীর দিব্যি!”
“তোকে বিশ্বাস করা যায় না। তোর জ্বালায় কারো গাছের ফল থাকে না, রাতের অন্ধকারে সব সাবার করে দিস।”
“বললাম তো, সত্যি বলছি। আবার বলছি মা কালির দিব্যি।”
“ঠিক তো?”
“মা কালীর দিব্যি দিয়ে কেউ মিছে কথা বলে? সব পুড়ে ভষ্ম হয়ে যাবে না?”
সদানন্দ এই বলে আমাদের সাক্ষী মানল। আমরা হো হো করে হেসে উঠলাম। হেড স্যারের কানে আমাদের কথাগুলো অস্পষ্ট যাচ্ছিল। তিনি স্বভাবজাত “এ্যাঁও” হুঙ্কার ছেড়ে ছুটে এলেন নাট্যমঞ্চে। সদানন্দ বানরের লম্ফ দিয়ে জানালা টপকে ভোঁ দৌড় বড়ইগুলো ফেলে। স্যার এসে জিজ্ঞেস করলেন-
“কে এসেছিল এখানে?”
আমরা চুপ করে রইলাম।
“Speak out- কে এসেছিল?”
তবুও আমরা চুপ।
“You speak out” স্যার গর্জে উঠলেন।
সদানন্দ, স্যার। তোঁতলাতে তোঁতলাতে হাসান কারার বলল।

শীতের এক দুপুরে সিক্স টু টেন ক্লাস চলছে। আমরা কোচিংয়ে। হঠাৎ হামিদের হুঁইসেল বেজে উঠল। সবাই অবাক, অকাল বর্ষা? আমরা ছাড়া অন্য ছাত্ররা মাত্র নতুন ক্লাসে প্রমোশন পেয়েছে। বছরের প্রথম দিকে পড়াশোনার তেমন কোন চাপ নেই। তাই তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে উচ্ছ্বসিত। মওকা মিলেছে একটা। হুঁইসেল শোনার সাথে সাথে হুড়মুড় করে বেরিয়ে এল সবাই মাঠে। ছাত্ররা আগে থেকে ট্রেনিংপ্রাপ্ত। ব্যস, লাইন আপ হয়ে দু’ কাতারে মিছিলের প্রস্তুতি। হামিদ আজ কোচিংয়ে আসেনি।
আমরা মেট্রিক ক্যানডিডেটরা উভয় সংকটে পড়লাম- মিছিল না কোচিং? তখনও আমরা বেরুইনি- কোচিংয়ে বসা। স্যার কোচিং নিচ্ছেন। স্যারের দৃষ্টি বাইরে মাঠের দিকে। ছেলেরা লাইনে দাঁড়িয়ে, কিন্তু চুপচাপ। এখনো কোন কমান্ড আসেনি। মুখে টিনের হর্ন লাগিয়ে হামিদের ঘোষণা-
“আজকের মিছিলটা শুধু নিকলী নয়, দামপাড়া মজলিশপুর প্রদক্ষিণ করবে। তোমরা রাজি?”
“জ্বি, হামিদ ভাই, রাজি”- এক সুরে সবাই বলল।
মিছিল শুরু। দু’ লাইনের বিরাট মিছিল হামিদের নেতৃত্বে এগিয়ে চলেছে। স্লোগানে স্লোগানে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে। স্যারেরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখলেন এ দৃশ্য। হেড স্যার নির্বাক!

 

আমাদের হেড স্যার ছিলেন “শিক্ষাতরীর হেড মাঝি”। পুরো স্কুলের (ষষ্ঠ-দশম) শিক্ষার্থীদের নিয়ে তিনি সহকারী স্যারদের সহযোগিতায় এগিয়ে চলছেন বৃহত্তর সীমানার দিকে। হেড স্যার শিক্ষাতরীর হাল ধরেছেন, অন্য স্যারেরা দাঁড় টানছেন। গন্তব্যস্থল ভৈরব রেলওয়ে ব্রিজের পূর্বপাড়। নিকলী থেকে নৌকা ছেড়েছেন স্যারেরা। যারা ক্লাস সিক্স-এ ফাইনাল পরীক্ষায় ফেল করেছে ছাতিরচর পৌছতেই গোপাল স্যারের নির্দেশ-
“ফেল করা স্টুডেন্ট গেড ডাউন।”
হেড স্যার ছৈ-এর উপর হাল ধরেই হুঙ্কার দিলেন-
“হ্যারি আপ!”
ওদের নামিয়ে দিয়ে ঐ তরী চলল ফের দিঘিরপাড় ঘাটে গোপাল স্যারের নির্দেশ-
“Failed students in class vii get down.”
একটু দেরি করলেই হেড স্যারের হুঙ্কার উপর থেকে-
“কুইক!”
এভাবে ফেল করাদের দিলালপুর ঘাটে এবং সাদকপুর নামিয়ে দিয়ে শিক্ষাতরীতে পাল তুলে দিলেন। ভৈরব রেলওয়ে ব্রিজের পূর্বপাড়ে শিক্ষাতরী ভিড়িয়ে গোপাল স্যার চেঁচিয়ে বললেন-
“Attention Matric candidates, Get ready!”
হেড স্যার হাল ছেড়ে ছৈ থেকে নেমে এলেন। Matric candidates নামছে নৌকা থেকে। সব নমে গেলে গোপাল স্যার কমান্ড দিলেন-
“Forward March.”
Matric candidates-দের উদ্দেশে হেড স্যারের বিদায়ী ভাষণ-
“তোমাদের বৃহত্তর কর্মক্ষেত্রের গেটওয়েতে পৌছে দিলাম। Go ahead, Don’t Look back’ ডাকছে তোমায় বৃহত্তর কর্মক্ষেত্র, ডাকছে তোমায় উজ্জ্বল ভবিষ্যত, যে ভবিষ্যতে আমি আমার সহকর্মীগণ বেঁচে থাকব না। তোমাদের ভবিষ্যত জীবনের ফাউন্ডেশন স্থাপন করে দিলাম যার উপর দাঁড়িয়ে কালের আহ্বানে তোমরা সাড়া দেবে। এগিয়ে যাবে সম্মুখভাগে সগৌরবে। Good Bye my students, Good Bye বলে হেড স্যার ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন। অন্য স্যারেরা হাত নেড়ে বিদায় দিচ্ছেন অশ্রুসিক্ত নয়নে। অস্পষ্ট স্বরে বেরিয়ে এল Good Bye.”
হেড স্যার ও অন্য স্যারদের মন খারাপ। তাঁরা মানুষ গড়ার দক্ষ কারিগর। ক্লাস সিক্সে যারা ছিল কাঁচা মাটি, এদের পাঁচটি বছর ধরে তিলেতিলে গড়ে তুলেছেন। মন মত না হলে আবার ভেঙ্গেছেন, নতুনরূপে নতুন আঙ্গিকে এদের ভিত মজবুত করেছেন। “সময়ের ডাকে” ওদের আজ ছেড়ে দিতে হল। বৃহত্তর কল্যাণে ওরা গ্রাম থেকে শহরে, শহর থেকে রাজধানীতে তারপর দেশের সীমানা পেরিয়ে যাবে বৃহৎ পরিসরে।
কাঁচা মাটিতে গড়া ওরা এখন কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের দ্বারপ্রান্তে। হাতছানি দিচ্ছে ওদের বিশাল কর্মযজ্ঞ। স্যারেরা এদের প্রাণ ভরে দু’হাত তুলে আশীষ বর্ষণ করছেন নিঃস্বার্থ-নির্মল মনোবৃত্তি নিয়ে। স্যারদের আশীর্বাদপুষ্ট ছাত্রগণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন বিশ্বজুড়ে, জন্মভূমিতে, জন্ম মাটিতে।
হেড স্যার তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে “শিক্ষাতরী” বাইছেন বছরের পর বছর, সময়ের হাত ধরে। “সময়” শেষ পর্যন্ত নস্টালজিয়াতে পরিণত হয়, কালের ঘুর্ণিপাকে এমন সব ঘটনা ঘটে যায় যা পরে ইতিহাস হয়ে যায়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই ইতিহাসের পাতা উল্টায় আর ইতিহাসের নায়ক-নায়িকাদের খুঁজে বেড়ায়, মনে মনে তাঁদের ছবি আঁকে। পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ পাল্টায় কালের বিবর্তনে, কালের কণ্ঠ জানিয়ে দেয় ভূত-ভবিষ্যত। এ কণ্ঠে- এর প্রভাব স্যারদের উপরেও পড়ে।
শিক্ষাতরীর মাঝি অনবরত বেয়ে চলেছেন শিক্ষাতরীটি বছরের পর বছর ফি বছর। ‘সময়’ স্যারদের দেহমনে হাত দিল। বয়সের ভারে অনেক স্যারের দেহে ক্লান্তির ছাপ দেখা দেয়। কিন্তু শিক্ষাদানে ব্রতী শিক্ষকগণের মনে কর্তব্যনিষ্ঠা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতেই স্যারেরা টানটান হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ান। গুনগুন করে গেয়ে ওঠেন-
“ক্লান্তি আমায় ক্ষমা করো প্রভু’

 

অবশেষে এল ১৯৬১ সাল। হেড স্যার ও অন্য স্যারদের কঠোর অনুশাসনে শাসিত হয়ে কিশোরগঞ্জ পিটিআই ইনস্টিটিউটে বহু প্রতীক্ষিত ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অংশ নিই আমরা ২৭ জন ছাত্র-ছাত্রী। পূর্ব পাকিস্তানে আমরাই সর্বশেষ ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী। এরপর ১৯৬২ সাল থেকে সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি SSC) চালু হয়ে যায়।
স্কুলের ২৭ বছর বয়সে আমরাই ম্যাট্রিকে ১০০% (শতভাগ) উত্তীর্ণ হওয়ার গৌরব অর্জন করি।

ম্যাট্রিকে উত্তীর্ণ (১৯৬১) ছাত্রছাত্রীদের বিবরণ:-

 

লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সভাপতি, ঢাকাস্থ নিকলী সমিতি।