আলোকিত শিক্ষক “হামিদ স্যার”

কারার মাহমুদুল হাসান ।।

নিকলী গোরাচাঁদ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় তখন চলছিল ঠিকঠাকই। কিন্তু হঠাৎ করেই স্কুলটি হেডমাস্টারবিহীন হয়ে যায়। আব্দুল হামিদ স্যার কেবল তখন বিএ পরীক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু নিজের মাতৃভূমির বিদ্যালয়টি হেডমাস্টারবিহীন দেখে তিনি আর ঠিক থাকতে পারেননি। তাই বিএ পরীক্ষা দিয়েই নিকলী গোরাচাঁদ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত হেডমাস্টার হিসেবে বিদ্যালয়ের দায়িত্বভার নেন। তখন অনেকেই বলছিলেন আপনার তো এখনও বিএ পরীক্ষার রেজাল্টই হয়নি কিভাবে দায়িত্ব পালন করবেন? তাঁদের মধ্যে অনেকেই আবার বলছিলেন তাঁর ইন্টারমিডিয়েট রেজাল্ট ফার্স্ট ক্লাস রয়েছে, বিএ-তেও ভালোই হবে। ততদিনে রেজাল্ট হয়েছে এবং তিনি পূর্বের কৃতিত্ব ধরে রেখে বিএ-তেও ইংরেজিতে লেটার মার্কসসহ ফার্স্ট ক্লাস পান।

আমরা ক্লাস সিক্সে পড়াকালীন অর্থাৎ ১৯৫৬ সন থেকে স্যারকে হেডমাস্টার হিসেবেই পাই। তিনি এই স্কুলকে প্রতিষ্ঠা করতে অনেক শ্রম দিয়েছেন। ছাত্রদের ভালো ফলাফলের জন্য তিনি প্রতিনিয়ত বিভিন্ন এলাকায় ও ছাত্রদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে আমাদের (ছাত্রদের) খোঁজখবর রাখতেন। সেটি শুধুমাত্র স্কুলেই নিবদ্ধ ছিল না। প্রায় সময়ই রাতের বেলায় তিনি হাতে হারিকেনসহ তাঁর দপ্তরীকে নিয়ে নিকলী সদরেই নয়, নিকলীর অদূরে ভাটিবরাটিয়াসহ তিনি ছাত্রদের খোঁজ নেয়ার জন্য রাতে রাতে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। কিভাবে ছাত্রদের আরও ভাল রেজাল্ট করানো যায় সেই চিন্তায়। রাতের আঁধারে স্যার অনেক সময় ঘরের ফাঁকা দিয়ে ঘরে উঁকিও দিতেন। তাতে মাঝে মাঝে শুধু চোখগুলোই দেখা যেত। আমরা কখনো কখনো ভয়ও পেতাম। ভাবতাম, ভূত-প্রেত কি-না। আবার মাঝে মাঝে স্যারের কথা মনে করে ভয় কেটেও যেত।

১৯৬১ সালে আমরা মেট্রিক পাস করে স্কুল থেকে বের হয়ে গেলাম। আমাদের ক্লাসমেট ছিল সুনীল সাহা, দ্বীপক, হালিমা, আরশাদ উদ্দিন খান। মহামান্য রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদও স্যারের ছাত্র। আমাদের সময়ে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া ছাত্র ছিলেন আরশাদ উদ্দিন খান। তার এই ফার্স্ট ডিভিশন পাওয়ার পেছনে হেডমাস্টার আব্দুল হামিদ স্যারের অনেক অবদান রয়েছে। তিনি তাকে স্ক্রুটিনি করতেন। স্যার বিশেষ করে ইংলিশ ও অংকে দক্ষ থাকায় এসব বিষয়ে ছাত্রদের ক্লাস ও পড়াতেন খুব যত্ন সহকারে। মেট্রিক পাস করার পর যে যার মত করে বিভিন্ন কলেজে ভর্তি হয়ে গেল। এরই ধারাবাহিকতায় আমিও ভর্তি হলাম ঢাকা কলেজে। এক সময় সিএসএস (সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস) অফিসার হিসেবে পরীক্ষা দিই। যুদ্ধকালীন সময়েই রেজাল্ট বের হলে পাস করে চাকরিতে জয়েন করি।

১৯৭১ সাল। যুদ্ধ শেষে দেশ পুনর্গঠন শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ সাজানোর কাজে হাত দেয়া হয়। নিয়মানুযায়ী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের গভর্নিং বডির প্রেসিডেন্ট থাকতেন ব্রিগেড কমান্ডার এবং পদাধিকার বলে ক্যান্টনমেন্ট এক্সিকিউটিভ অফিসার ছিলেন সেক্রেটারি। জেড ফোর্সের কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ শেষে জিয়াউর রহমান ব্রিগেড কমান্ডার হিসেবে কুমিল্লা ব্রিগেডের দায়িত্ব নিলেন। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে অনেক শিক্ষক, প্রধান শিক্ষকসহ অনেকেই আর ফিরেননি। মূলত প্রধানশিক্ষক রিটায়ারমেন্টের আগেই চলে গিয়েছিলেন। উক্ত পদে নিয়োগের সার্কুলার দেয়া হয়। লোক নিয়োগের তারিখটি সম্ভবত ছিল ফেব্রুয়ারি মাসের ১৪/১৬। আবেদনের প্রেক্ষিতে আবদুল হামিদ স্যারকে ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকা হলে স্যার ইন্টারভিউ বোর্ডে হাজির হলেন। বোর্ডে আলাপচারিতায় জিয়াউর রহমান সাহেব স্যারের সাথে কথায় মুগ্ধ হলেন।

নিয়মানুযায়ী পদাধিকার বলে আমি তখন ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের গভর্নিং বডির সেক্রেটারি। জিয়াউর রহমান সাহেব স্যারকে সরাসরি এপয়েন্টমেন্ট দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানালেন। সঙ্গত কারণেই তিনি (জিয়াউর রহমান সাহেব) একবার জানতে চাইলেন, উনি (আবদুল হামিদ স্যার) পারবেন তো! যাই হোক, অফিসিয়াল প্রসেসিং শেষে ফেব্রুয়ারি মাসের ২৮ তারিখ স্যার প্রধান শিক্ষক হিসেবে জয়েন করলেন। পরবর্তীতে স্যার সম্ভবত ১০/১১ মাস এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। চাকরিটা ছেড়ে দেয়ার পেছনে স্যারের ব্যাখ্যা ছিল, ছেলে-মেয়ে সব বাড়িতে, এলাকার কথা মনে পড়ে। সব কিছুর জন্যই পেট-পুরে। আর এই মায়া থেকেই তিনি একদিন নিকলী ফিরলেন।

স্বাধীনতার পর পর আমাদের দেশ থেকে বিভিন্ন দেশে অনেক লোক পাঠানো শুরু হয়- লেবার, ইলেকট্রিশিয়ান, ড্রাইভার ইত্যাদি ক্যাটাগরিতে। ভাষার ভিন্নতায় এই শ্রেণির লোকজন বিদেশে সমস্যায় পড়তে থাকে। এই দিকটি বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ দেশগুলোতে দো-ভাষি নিয়োগের সরকারি সিদ্ধান্ত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আবদুল হামিদ স্যার সৌদি আরবের একটি বিখ্যাত তেল কোম্পানিতে দো-ভাষি হিসেবে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি প্রায় চার বছরের মতো চাকরি করলেন। এরপর দেশে ফিরে বেশ কিছুদিন বিরতি দিয়ে কিশোরগঞ্জের আজিমউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে জয়েন করলেন। সেখানে দুই বছরের মত চাকরি করেন।

আজিমউদ্দিন স্কুলে থাকাকালে লিবিয়ার ত্রিপোলিতে বাংলাদেশি কমিউনিটি স্কুলে প্রিন্সিপাল নিয়োগ হওয়ার খবর পেয়ে তিনি ওখানে দায়িত্ব নিয়ে চলে যান। সেখানে ২/৩ বছর ছিলেন। লিবিয়ায় অবস্থানকালে তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে এসব কারণে লিবিয়ার স্কুলের দায়িত্ব ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন।

আমি পিতৃহারা হই ১৯৫৪ সালের এপ্রিল মাসের দিকে। আমি তখনও প্রাইমারি স্কুল পার হইনি। প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে যখন আমি হাইস্কুলে ভর্তি হলাম তখন থেকেই হেডমাস্টার স্যার আমার পুরোপুরি দেখভাল শুরু করেন। স্যার সময়ে-সময়ে এসে আমার ও আমার বোনের পড়াশোনার খোঁজখবর নিতেন। পড়াশোনা সংক্রান্ত যাবতীয় পরামর্শ দিতেন। তিনি আমাদের স্কুলের বেতন নিয়ে যেতেন। যেহেতু আমরা পিতৃহারা, তাই কে বেতন দিয়ে আসবেন! এসব ভেবে তিনি নিজেই বেতন সংগ্রহ করে নিয়ে যেতেন।

আমার বড়ভাই ছিলেন তখন নিকলীতে দ্বিতীয় এমএ পাশ। আর প্রথম ছিলেন দামপাড়ার আতিকুল্লাহ চৌধুরী সাহেব। পরবর্তীতে তিনি গুরুদয়াল সরকারি কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল হয়েছিলেন। আমার বড়ভাইয়ের সাথে আমাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। কিছুদিন ঢাকায় থাকার পর আবার আমি নিকলী গোরাচাঁদ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে আব্দুল হামিদ হেডমাস্টার স্যারের হাতেই এসে পড়াশোনা শুরু করি।

আমার শিক্ষা জীবনে প্রাইমারি লেভেলে বড় ভূমিকা পালনকারী যদি বলি তাহলে প্রথমেই বলতে হবে মনিরুদ্দিন স্যার ও পরবর্তীতে হাইস্কুল জীবনে একক দায়িত্বই বলা চলে আবদুল হামিদ হেডমাস্টার স্যারের। এই দায়িত্ব তিনি (আবদুল হামিদ স্যার) নিপুণভাবে, সার্বিকভাবে ও খুব মনোযোগ সহকারে পালন করে গেছেন। উনার কারণেই আজকে আমরা “আলোকিত নিকলী” বলি বা বলতে পারি। নিকলীর আলোকিত ছেলেরাই আজকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। অনেকেই অবসর জীবনযাপন করছেন। আমাদের দেশের বর্তমান যে মহামান্য রাষ্ট্রপতি তিনিও তাঁর ছাত্র। এখনও যে তিনি আবদুল হামিদ স্যারের নাম উচ্চারণ করেন তা খুবই সমীহ করে ও শ্রদ্ধার সাথেই উচ্চারণ করেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি এখনও বলেন- আমার বর্তমান অবস্থানে আসার পেছনে মহান আল্লাহ পাকের অশেষ রহমত ও বিশেষ অবদান রয়েছে হেডমাস্টার আবদুল হামিদ স্যারের। এটি তিনি এখনও ভুলেন না। আবদুল হামিদ হেডমাস্টার স্যারের একটি বিশেষ গুণ ছিল। তিনি কাউকেই নামে ভুলতেন না। সকলকেই নাম ধরেই ডাকতে বা বলতে পারতেন।

নিকলী-করিমগঞ্জ সড়ক করার পেছনে অনেক কাজ করেন আমাদের বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি। তিনি ডেপুটি স্পিকার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতি হওয়া পর্যন্ত অনেক অবদান রাখেন। এই রাস্তা অনুমোদনের পর পরই রাষ্ট্রপতি নিকলী এসেছিলেন। তখন অনেক মানুষের জমায়েত হয়। সেই সময়ে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে সকলের সামনে আমি এই রাস্তাটির নাম “রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ সড়ক” করার বিষয়টি উপস্থাপন করি। তখন রাষ্ট্রপতি ওই মঞ্চেই আস্তে আস্তে আমার কাছে আসলেন ও আমাকে বললেন, তুমি রাস্তাটির নাম হেডমাস্টার স্যারের নামে দাওনি কেন? আমি তাঁকে বললাম আগে থেকেই এমন করে প্ল্যান করা ছিল, তাই তোমার নামেই ঘোষণা করেছি। জমায়েত সবাই একবাক্যে এই নামে রাজি হয়ে গেল। রাষ্ট্রপতি মহোদয় তখন আমাকে বললেন, এটি আমার নামে কেন, স্যারের নামে করলেই তো ভাল হতো।

আমি তখন রাষ্ট্রপতি মহোদয়কে বলেছিলাম- রাস্তাটি তোমার নামে ঘোষণা করার পেছনে আরেকটি চিন্তা আছে। তুমি বর্তমানে রাষ্ট্রপতি। এই রাস্তার জন্য তুমি অনেক খাটাখাটনি করেছো। তুমি যেহেতু চাচ্ছ তাই স্যারের নামে একটি ইনস্টিটিউট করতে চাই। নিকলীর অরক্ষিত ও সরকারি যে পাটগুদামগুলো রয়েছে সেখানে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করবো। যেহেতু স্যার ছিলেন শিক্ষার দূত। তাই তাঁর নামে একটি শিক্ষা/ প্রশিক্ষণ সেন্টার করার পরিকল্পনা রয়েছে। যেখানে ছয় মাস/ এক বছরমেয়াদি প্রশিক্ষণ হবে বিদেশগামী লোকদের। যার ফলে বিদেশগামীরা আর লেবার হিসেবে না গিয়ে টেকনিশিয়ান হিসেবে যাবার সুযোগ পাবে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে টেকনিশিয়ান হিসেবে গেলে দশ/ বিশজন লেবারের সমান বেতন পাবে।

মহামান্যকে আমি বললাম তুমি যে স্যারের কথা ভুলে যাওনি। তিনি বললেন- তুমি যেমন তাঁর হাতের সৃষ্টি, ঠিক তেমনি আমিও তাঁর হাতেরই সৃষ্টি। আমি আজ যে অবস্থানে আছি তার পুরো অবদানই এই আবদুল হামিদ হেডমাস্টার স্যারের। কিভাবে ভুলি বল! স্যারের এই অবদান যদি না থাকতো তাহলে আমিও এই অবস্থায়, আর তুমিও হয়তো এই অবস্থায় আসতে পারতে না। হয়তো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতাম। নিকলীর উন্নয়নে, চেতনায় আব্দুল হামিদ স্যারের নাম অবশ্যই থাকবে। বর্তমানে ৫৫-৬০ বছর বয়সী অনেকেই তাঁর ছাত্র। পরিশেষে তিনি আব্দুল হামিদ স্যারের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।

 

লেখক : সাবেক সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।