হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ৮

শেখ মোবারক হোসাইন সাদী ।।

গত পর্বে আমরা আলোচনা করেছিলাম হাওরপাড়ের সংস্কৃতির বিয়ের কিছু লোকাচার নিয়ে। বর যখন সকল প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তার অধিকার নিয়ে নেয় তখন শুরু হয় অন্দরমহলের দুধভাত খেলা। দুধভাত খেলা দুধভাত খেলার মাধ্যমে বর কনেকে প্রথমবারের মত দুধভাত খাওয়ায়। আবার কনেও বরকে প্রথমবারের মত দুধভাত খাওয়ায়। তারপর বর-কনেকে একে অপরের সাথে দেখার সুযোগ করে দেয়। আর এ পর্বেই ঘটে এক আশ্চর্য ঘটনা। হাওরপাড়ের বিয়েতে বরের সাথে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি উপস্থিত থাকেন, যাকে ছাড়া বিয়ে অসম্পূর্ণ বলে ধরে নেওয়া হয়। আর ব্যক্তিটি হচ্ছে বরের দোস্ত। দোস্ত তার (বরের) স্ত্রীকে তখনই (দুধ ভাত খাওয়ানোর পর) দেখে। এর আগে বা এর পরে আর কখনো তাদের দেখা মিলে না। হাওরপাড়ের বিয়ের লোকাচার নিয়ম অনুযায়ী দোস্ত তার দোস্তের স্ত্রীকে এই প্রথমবার দেখবেন। আর এ দেখাই হবে তার জন্য শেষ দেখা। সে কোনদিন চাইলেও তার অর্থাৎ বরের স্ত্রীর সামনে যেতে পারবে না। দেখার পর্ব শেষ হলে নিয়ম অনুযায়ী কনেকে বরের পক্ষ হতে কিছু অর্থকরি বা উপঢৌকন দেওয়া হয়। কনে এ উপহারসামগ্রী গ্রহণ করার জন্য তার (কনের) দু’টি হাত বরের দিকে বাড়িয়ে দেয় কনের সাথে থাকা শইয়েরা (বান্ধবী)। কনে যেন সারাজীন তার স্বামীর কাছ থেকে সারাজীবন হাত বাড়িয়ে নিতে পারে এবং কনে যেন কখনো খালি হাতে না ফেরে স্বামীর কাছ থেকে এ বিশ্বাসেই এমনটা করা হয়। এ উপহারসামগ্রী দুইবার মাটিতে ফেলে দেয় এবং তৃতীয়বার তা গ্রহণ করে। মাটিতে ফেলে দেওয়ার কারণ হিসেবে জানা যায়, কখনো যদি কনের কোনো কিছু পছন্দ না হয় তাহলে যেন তা মুখ খুলে বলতে পারে বা ফেলে দিতে পারে এমন বিশ্বাসেই এমনটা করা হয়। কনে বিদায় কিছুক্ষণ আগেও যে বাড়ি আনন্দে ভরপুর ছিল, বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে তা করুণ সুরে পরিণত হয়। কনের মা-বাবা তাদের মেয়েকে সারাজীবনের জন্য শঁপে দেয় বরের হাতে। কন্যাও শেষ কাঁদা কাঁদে। কোনো কোনো কন্যাকে দুইদিন পর্যন্ত কাঁদতে দেখা যেত। বরন ডালা কনেকে নিয়ে বাড়িতে ফেরার পর (আগে থেকেই প্রস্তুত থাকত বরের মা) বরের মা ধান, দুবরা, ঘটিজল ও এর মধ্যে আম পাতা দিয়ে বরন ডালা নিয়ে এসে নতুন বউকে বরন করত। কনেকে পানিতে পা ভিজিয়ে (খালি পায়ে) ঘরে তোলা হতো। কোথাও কোথাও মিনা রঙের পানিতে (লাল রং মেশানো পানি) পা ভেজাত বলে জানা যায়। কাল রাইত কনেকে তুলে আনার পরদিন বরের বাড়িতে বউভাতের আয়োজন করা হত। আত্ময়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীকে বউভাতে দাওয়াত করে খাওয়ানো হত, যা এখনো হাওরপাড়ের বিয়েতে বিদ্যমান। দাওয়াতি মেহমানগণ বউভাতে সামর্থ্য অনুযায়ী বর-কনের জন্য উপঢৌকন নিয়ে আসেন। আর কনের বাড়ি থেকা আসা মেহমানগন প্রথমে বরের সাথে কোষকলাচাষ বিনিময় করে। কনের মেহমানের পক্ষ হতে একজন তাদের (কনের পক্ষ হতে আসা) কাছ থেতা টাকা সংগ্রহ করত এবং তা (টাকা) মালা তৈরি করে বরের গলায় পরিয়ে দিত। বউভাত শেষ করে ঐ রাতে নবদম্পতিকে একঘরে থাকার সুযোগ করে দেয়। এই সহ-রাত্রী যাপনকে শুদ্ধজনের ভাষায় “বাসর ঘর” বলা হয়। তবে হওরপাড়ের ভাষায় একে “কাল রাইত” বলে। ঘরের চালে গিট্টু দেওয়া কনেকে নিয়ে বর যে ঘরে বাসর করবে, সে ঘরের চালের যে কোন এক কোণে (বরের বড়ভাই বা কাছের কেউ) একটা পাটের দড়ি দিয়ে একটা গিট্টু (বাঁধ) দেয়া হতো। কোনো কোনো এলাকায় এই নিয়মটি এখনো প্রচলিত আছে। বাঁধন দেওয়ার মাধ্যমে ভাই-বোন, অভিভাবক, আত্মীয়-স্বজনসহ সংসারের সবার মাঝে সম্পর্ক অটুট থাকার আশা প্রকাশ করা হয়। মাডি পাড়ানি স্বামীর বাড়িতে বউভাত শেষে “কাল রাইত” যাপন করে। তিন দিন থেকে পাঁচ দিনের মাথায় বরসহ বাপের বাড়িতে আনার একটা চমৎকার নিয়ম প্রচলন এখনো রয়েছে। বিয়ের পর স্বামীর বাড়ি থেকে মেয়ের বাপের বাড়িতে আসার এই রীতিকে হাওরপাড়ের ভাষায় বলে “মাডি পাড়ানি”। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে বরের এই প্রথম আগমনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রথা। তাই হরেক রকমের পিঠা তৈরি করে বরকে খাওয়ানোর জন্য। এখানে নিয়মের কথা জানা যায়- নতুন জামাই যতক্ষণ নিজ থেকে শ্বশুরবাড়িতে মাছ কিনে না আনবে, ততক্ষণ জামাইকে মাছ খেতে দেয়া হয় না। কিংবা জামাইকে শ্বশুরবাড়িতে মাছের তরকারি পরিবেশন করা যাবে না। প্রথাটির কারণে কোনো কোনো জামাই শ্বশুরবাড়িতে একনাগাড়ে মাংস ভক্ষণের আশায় সহজে মাছ কিনে আনতে চায় না। দাদী বা নানীশাশুড়ির পীড়াপীড়িতে এক সময় নতুন জামাই শ্বশুরবাড়িতে মাছ কিনে এনে মাছ খাওয়া শুরু করে। এই তথ্যগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে মিঠামইন উপজেলার কেওয়ারজোর ইউনিয়নের কুড়াকান্দি গ্রামের বাউলশিল্পী বাউল আ: রহমানের কাছ থেকে।

বাউলশিল্পী বাউল আ: রহমানের সাথে লেখক

### ছোট শিশুকে গোসল করানোর সময় কান্নাকাটি করে। অনেক শিশুকে গোসল করানো হতো নানান ছড়া শুনিয়ে। শিশুরা সে ছড়া শুনে কান্না থামিয়ে দিত এবং মায়ের দিকে থাকিয়ে থাকতো। হাওরপাড়ের কিছু গোসলের ছড়া সংগ্রহ করা হয়েছে। ছড়াগুলো নিম্নরূপ: আমার আবু গোসল করে সোনার কাডে বইয়া আবুর নানী চাইয়া লইছে দুধের বাডি লইয়া। আবুর গোসল অইয়া গেছে আপদ বালাই দূরে গেছে, গাঙের পানি গাঙে গেছে, আবুর সইল শুকাইয়া গেছে। জিও জিও জিও। আদরের শিশুকে আরো আদর বাড়িয়ে দিত নিচের গীতগুলোর মাধ্যমে। খোকন আমার নয়ন মনি ঝলমল করে পাঁচ কলসের পানি দিয়া খোকন গোসল করে। আমার খোকন গোসল করে পান করি ছা আয় রে আয় সূরুজমামা একটু দেইক্কা যা। হাবুৎ হুবুৎ গোসল করে আমার যাদু মনি হাত নারাইয়া পাও নারাইয়া কতই টানাটুনি, গোসল করে হাইস্যা পানির উপর ভাইস্যা, বেঙ্গা বেঙ্গী কাইন্দা মরে খোকার গোসল দেইখ্যা। হাওরপাড়ের শিশুরা বেড়ে উঠে মায়ের কোমল আদরে। শিশুর কোনো প্রকার যেন যত্নের কমতি না হয় সে দিকে মায়ের নজর প্রখর। এমনই একটা প্রমাণ পাওয়া যায় নিমচার ছড়ার মাধ্যমে। আত হানি মাতাত হানি, হানি ঢালে গায়, খোকন আমার গোসল করে কেমন দেই যায়? গামছা দে শরীল মাঝে কমরে তার ঘুংঘুর বাজে চান্দের মতো ঝলমল করে আমার সোনামনি, কে আছরে দুধের বাডি লইয়্যা আয় এক্ষুণি। শিশু গোসলের ছড়াগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে মিঠামইন উপজেলার, কেওয়ারজোর ইউনিয়নের কুরাকান্দি গ্রামের বাউল শিল্পী আঃ রহমানের সহধর্মিণীর কাছ থেকে। হাওরপাড়ের শিশুরা বড় হয় মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজনদের আদরে। সংসারে প্রথম শিশুসন্তান হলো তো তার আদর কেমন? এরই উত্তর পাব নিচের ছড়াগুলোর মাধ্যমে। আবু লতি আবু লতি কাইন্দ না সাধের গলা ভাইংগ না। ভাই গেছে রসুলপুর বাবা গেছে সাজনপুর, কিনা আনব চাম্পা ফুল। চাম্পা ফুলের গন্দে জামাই আইছে আনন্দে। দেও জামাইরে বাটার পান সু্ন্দরীরে কর দান। সুন্দরী কাইকা তেল সাবান মাইকা। আডের মানুষ পাগল অইছে সুন্দরীরে দেইখা। তবে অঞ্চলভেদে এ ছড়ার পার্থক্য দেখা যায়। আবু লসি আবু লসি কাইন্দ না মায়া গেছে গোপাড আইয়ে না। বাজান গেছে উজানে কাউয়ার বাচ্চা আনব নে কা কা করবনে। দেইখ্যা আয়গা লাল টুপি মাথাত দিয়া নাইচ্যা আয়গা। এ ছড়া দুটি সংগ্রহ করা হয়েছে নিকলী উপজেলার জারইতলা ইউনিয়নের কামালপুর গ্রামের শেখ মোশারফ হোসাইন-এর কাছ থেকে। তার কাছ থেকে সংগ্রহ করা আরো দু’টি ছড়া: ১। আমার আবু নান্দে বারে হাওর বাড়িৎ যাইত আম দেম কাডল দেম চ্যাইট্টা চ্যাইট্টা খাইত। রেশমি একটা রুমাল দেম আট্টাত পুছত। উইল্যা একটা বিলাই দেয়াম কাডা কুডা খাইত। ২। আয়নার ভিত্তে কেলা গো রুজিনা কি মাছ একাডেমি গো দারহিনা। কচু হাতার শাড়ি আনবা? পিনতাম না রিক্সা ছাড়া আমি যাইতাম না। ঠেলাগাড়ি ছাড়া আমি আইতাম না। শব্দার্থ : ১. আবু লতি= আদরের বাবু/আদরের সন্তান। ২. সাধের গলা= সুকণ্ঠ ৩. রসুলপুর= জারইতলা ইউনিয়নের একটি গ্রামের নাম। এবং এ গ্রামে একটি হাট-বাজার আছে। ৪. বাটা= পানের কৌটা। ৫. কাইকা= নায়িকা। ৬. মাইকা= ফেসওয়াশ। ৭. আড= হাট/ বাজার। ৯. আট্টাত= দুই হাত ১০. পুছত= মুছত/পরিষ্কার।

হাওর গবেষক (অপ্রকাশিত) খাইরুল আলম বাদলের সাথে লেখক ও সহযোগী কারার বদরুল মোমেন হিমেল

হাওরপাড়ের শিশুরা যখন কান্না করে তখন তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য নানান রকমের ছড়া শুনিয়ে থামানো হতো। এ ছড়াগুলো বলার সময় শিশুকে কোলের মধ্যে দোল খাওয়ানো হয়। ছড়াগুলো শুনে শিশুও কান্না থামিয়ে দিত। ছড়াগুলো নিম্নরূপ: মায়া গো মায়া চাল ভাইজ্যা দে চাউল ভাজা খাইতাম না কলসি আইন্না দে। কলসির ভিত্তে ভমরা ভন ভন করে। এই বাড়ির ছ্যারাডা বোল মাছ ধরে। বোল মাছের লেঙ্গুর দে বৌ বাানাইছে। বৌয়ের ঘরতে ছ্যারা অইছে ছ্যারি অইছে নাম রাখবাম কি?? শিশু যতক্ষণ পর্যন্ত শান্ত না হয়েছে ততক্ষণ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ছড়া বলতে থাকে। যেমন: মায়া গো মায়া বুনি দে কাই লাল বাজার ধনু উঠছে তামশা দেখতাম যাই আইল্যার আগুন জ্বইল্যা উঠছে পুইরা অইতাম ছাই। হাওরপাড়ের শিশুদেরকে ঘুম পাড়ানোর সময়ও অনেক রকমের ছড়া বলতে শোনা যায়। যেমন: আমার আবু ঘুমা রে কাডের লুডি খাইয়া নানা অইলে কইয়া দেয়াম বাইন্দ্যা নিত আইয়া। আগেকার সময়ে যখন শিশুদের মাথা ন্যাড়া করা হতো তখন অন্য ছেলেরা চ্যাতাত এই বলে: মাথা ছিলা টিন টিন এক পয়সা দে বউ কিন যাইব গা তর বছর তিন। এ ছড়াগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে হাওর গবেষক (অপ্রকাশিত) খাইরুল আলম বাদল। আমার নিজের জানা একটা ছড়া বলছি যা আমি শিখেছিলাম আমার মায়ের কাছ থেকে: আবু গো কাইন্দো না লাচু দেমেনে ইলইচ্চার বাজারো কুইপ্পা থয়ামনে। সংগ্রহ সূত্র : হাওর গবেষক (অপ্রকাশিত) খাইরুল আলম বাদল, মিঠামইন উপজেলার কেওয়ারজোর ইউনিয়নের কুড়াকান্দি গ্রামের বাউলশিল্পী বাউল আ: রহমান ও তার সহধর্মিনী, জারইতলা ইউনিয়নের কামালপুর গ্রামের শেখ মোশারফ হোসাইন। সহযোগিতায় : কারার বদরুল মোমেন হিমেল, মোঃ সাইদুর রহমান, মোঃ জুনাঈদ হাসান রাজু।

সকল পর্ব :

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ১

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ২

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ৩

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ৪

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ৫

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ৬

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ৭

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ৮

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ৯

হাওরপাড়ের সংস্কৃতি : পর্ব ১০