ডাস্টবিনে পাওয়া ‘ঐশ্বর্য’ এখন স্কুলে ভর্তির অপেক্ষায়

আমিনুল ইসলাম >>
২০১০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা এলিফ্যান্ট রোডের একটি ডাস্টবিন। যেখানে শত মানুষের উৎসুক চোখ কাগজে মোড়ানো একটি পোটলার দিকে। কী আছে এর মধ্যে। পোটলাটি মাঝে মধ্যে নড়েচড়ে উঠছে। হঠাৎ লোকজন দেখাতে পান তার এক কোনায় বেরিয়ে আছে ছোট্ট একটি নবজাতকের মুখ। চোখ দুটো মাঝে মধ্যে মিট মিট করে খুলছে। আবার বন্ধ করে দিচ্ছে। শত মানুষের দৃষ্টি তার দিকে থাকলেও কেউ শিশুটিকে কোলে তুলে নিচ্ছে না। ঠিক ওই সময় নিউ মার্কেট থেকে শপিং করে ফিরছিলেন শওকত আরা মিলকী ওরফে আনা নামের এক গৃহবধূ। অন্যদের মতো তিনিও উঁকি দিলেন ডাস্টবিনের দিকে। দেখলেন কাগজে মোড়ানো একটি পোটলার মধ্যে নবজাতক একটি শিশু ক্ষীণ স্বরে কাঁদছে। শত মানুষের মাঝে তিনি কোলে তুলে নিলেন শিশুটিকে। বাসায় নিয়ে পরম যত্নে লালন পালন করতে শুরু করলেন। নাম দিলেন ‘ঐশ্বর্য’। প্রকৃত বাবা-মায়ের সন্ধান আজো পাওয়া না গেলেও শওকত আরা মিলকী ও তার স্বামী ফজলুল বাসেত খান মিলকী এখন ঐশ্বর্যের বাবা-মা। ডাস্টবিনে কুড়িয়ে পাওয়া সেই ঐশ্বর্য নতুন বাবা-মায়ের সংসারে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে। সাড়ে চার বছরের ঐশ্বর্য এখন স্কুলে ভর্তির অপেক্ষায়। তবে কোন স্কুলে ভর্তি হবে ঐশ্বর্য- তাই নিয়ে ভাবছে মিলকী পরিবার। ঐশ্বর্যকে কুড়িয়ে পাওয়ার সময় ব্যবসায়ী মিলকী পরিবার যতটা সচ্ছল ছিলেন সময়ের ব্যবধানে সেই সচ্ছলতায় কিছুটা ভাটা পড়েছে। বিশেষ করে শেয়ারবাজারের ক্রামাগত পতনে তার অর্থিক অবস্থা এখন আর আগের মতো নেই। তাই যত দুশ্চিন্তা তার।
ফজলুল বাসেত খান নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘ঐশ্বর্যকে অনেক স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে বড় করা হয়েছে। অভাব কী জিনিস তাকে বুঝতে দেয়া হয়নি। সে জানে তাকে ঢাকার বড় কোনো স্কুলে ভর্তি করা হবে; কিন্তু বর্তমানে আমার অর্থিক অবস্থা আগের মতো সচ্ছল নয়। যার কারণে নামী-দামি স্কুলে ভর্তি করার জন্য ডোনেশন বা ভর্তি ফি দেয়ার মতো সামর্থ্য এই মুহূর্তে হারিয়ে ফেলেছি’। তিনি বলেন, বিবেকের সাথে অনেক যুদ্ধ করেছি। ভেবেছিলাম, কাউকে কিছু না জানিয়ে যেভাবে পারি মেয়েটিকে বড় করব; কিন্তু সেটা করতে যথেষ্ট কষ্টের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যার কারণে ঐশ্বর্যকে বেড়ে উঠতে সহযোগিতা করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
ফজলুল বাসেত বলেন, ঐশ্বর্য স্বাভাবিক শিশুদের মতো নয়। সে অনেক ভাগ্যবতী। তাকে এক নজর দেখতে তার খোঁজ-খবর নিতে অনেক হৃদয়বান ব্যক্তি ছুটে এসেছেন। তাকে একটু কোলে তুলে নিতে বাসায় এসেছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও। তিনি ঐশ্বর্যকে কোলে নিয়ে প্রায় ৪৫ মিনিট কথা বলেছেন। ঐশ্বর্যকে নিয়ে একটি জাতীয় পত্রিকায় ‘দেখেছি এক ঐশ্বর্য’ শিরোনামে একটি কলামও লিখেছেন। শিশুটিকে নিয়ে কথা বলেছেন দেশের আরো এক সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানও। মৃত্যুর আগে তিনি ঐশ্বর্যকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে যান। এমন ভাগ্য ক’জন শিশুর কপালে জোটে।
ফজলুল বাসেত বলেন, তারা পুরান ঢাকার বকশীবাজারের ১৮/২ নম্বর বাসায় বাস করছেন। ঐশ্বর্য ছাড়াও তার দুই সন্তান রয়েছে। ঐশ্বর্যকে পাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে কলেজপড়ুয়া বড় মেয়ে ডিবি লটারি পেয়ে আমেরিকা চলে যায়। ছেলেটি আইকম পড়ছে। আর ঐশ্বর্য সাড়ে চার বছর অতিক্রম করে এখন স্কুলে ভর্তির অপেক্ষায়। পুরনো স্মৃতি মনে করে তিনি বলেন, যে দিন ঐশ্বর্যকে পাওয়া যায় সে দিন তিনি ছিলেন ব্যবসায়িক কাজে অফিসে। তার স্ত্রী রাস্তার ওই ডাস্টবিনের কাছে দাঁড়িয়ে তাকে ফোনে বলেন, ‘কারা যেন ফুটফুটে একটি নবজাতক শিশুকে কাগজে মুড়িয়ে ডাস্টবিনে ফেলে গেছে। এখানে অনেক মানুষ শিশুটিকে দেখছে; কিন্তু কেউ তুলে নিচ্ছে না। আমি কি শিশুটিকে বুকে তুলে নিবো?’ আমি খুব বেশি সময় নিইনি। তাকে বলেছিলাম ‘তুমি শিশুটিকে কোলে নিয়ে নিকটস্থ পুলিশের সাথে যোগাযোগ করো।’ তাই করলেন শওকত আরা মিলকী। কিছু সময়ের মধ্যে ফজলুল বাসেত খান মিলকীও থানায় পৌঁছেন। সেখানে লিখিত দিয়ে তার পর শিশুটিকে বাসায় নিয়ে যান। তিনি বলেন, শিশুটিকে নিয়ে বাসায় গেলে তার দুই সন্তান রাগে গাল ফুলিয়ে রাখে। ইউনিভার্সিটিতে পড়া মেয়ে ও স্কুলপড়ুয়া ছেলে জানতে চায় ‘একে কী পরিচয় দেবে’? তাদের বললাম আজ থেকে এই শিশুটিও আমার একটি সন্তান। সেই থেকে ঐশ্বর্য তাদের সন্তান হয়ে বড় হচ্ছে। মা-বাবাকে ছাড়া কিছুই বোঝে না। এমনকি বড় দুই ভাই-বোনের প্রিয় ছোট বোন হয়ে ওঠে ঐশ্বর্য।

 

সূত্র : নয়া দিগন্ত