মহিবুর রহিম-এর একগুচ্ছ কবিতা

অসুখ-এক

সারারাত ঘুম নেই কী একটা শব্দে আমার ঘুম আসে না
চোখের পাপড়িগুলো ভিজে ওঠে ব্যথা করে চোখ
ব্যথাটা চোখের থেকে নিচে নামে কখনো থামে না
স্থানান্তর হয় শুধু চোখ থেকে কাঁধে বুকে এই নির্দয় অসুখ
নিয়ত ঘুরতে থাকে। কখনো পায়ের দিকে নেমে যায়
তারপর আবার চোখেতে। ব্যথাটা অস্পষ্ট গূঢ় দেখাও যায় না
দেখানো যায় না শুধু একটা নির্দয় শব্দ শোনা যায়
প্রশ্ন করে কোথায়? এর উত্তর আমিও জানি না

সমস্ত দিকেই এর উত্থান ধারণা আমাকে চিন্তিত করে
আমার চিন্তার জাল দ্রবীভূত হলে আবার ব্যথাটা বাড়ে
এবং চোখের মাঝে নিশ্চল, নির্মম তারপর জল হয়ে ঝরে
সারারাত ঘুম নেই ঘুমোতে পারি না এই ব্যর্থ সংহারে

মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্নে দেখি ম্লান ভূগোলের বিবর্ণ পৃষ্ঠায়-
ব্যথাটা ছড়িয়ে আছে মৃত লাশে, ব্যর্থ স্বাধীনতা আর মিথ্যা সান্ত্বনায়।
অসুখ-দুই

সারারাত পাতা ঝরার শব্দ
অঘুমে পেন্ডুলাম হয়ে অন্তরাত্মায় দোলে
বাতাসের কান্না, জলের ছলাৎ ছলাৎ অক্ষম কাতরানি
সারারাত অস্পষ্ট জীবন ঘষে
কাঁচের জানালা গলে শিশির ঝরে পড়ে

তবু মাঝে মাঝে মৌসুমী স্বপ্নের সেই সবুজ মনে পড়ে যায়
উড়ালের মত উল্লাস আর মত্ত জীবন মনে পড়ে যায়
শস্যের অন্তরালে এক রাখাল
ফসলের তরঙ্গ তার সুরধ্বনি লুফে নেয়, ছড়ায় দূরান্তরে
সারামাঠ এত সবুজ কী নীরব আনন্দঘন!

মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ ঝলসে ওঠে চোখের অপটিক কাঁচে
ক্ষণস্থায়ী রেশ তার মনে আনে মৎস্যঘ্রাণ, অজস্র নদী
পাখির প্রচণ্ড লোভ বালকের কলার খামচে ধরে
জল আর জলের আদর, ডোরাসাপ
নুনুতে মাছের ঠুকর দেয়া, অদ্ভূত অজানাঘ্রাণ মনে পড়ে

মাটিতে ফসল বুনে দিতে গেলে এক নারীর শীৎকার
আমার মর্মমূল রক্তাক্ত করেছিল, তবু তার সোঁদাগন্ধ বুকে
ধরে, একদিন বাড়ি ফেরা ভুলে গিয়েছিলাম
সবুজের কোরোফিলে আমার রক্ত গ্রুপ মিলিয়ে দেখতেই
প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক শক এ আমার বালক খোলস ছিন্নভিন্ন হয়ে
যায়, আর সারারাত কার এক অদ্ভূত হাসি
আমাকে দীর্ঘকাল ঘুমুতে দেয়নি, আমি আর ঘুমুতে পারিনি।
অতিরিক্ত চোখ

চোখ নিয়ে আমারো রয়েছে এক অকথ্য যন্ত্রণা
উজ্জ্বল আলোয় ভরা ধাবমান অস্থির শহরে
বাষ্পভেজা দুটি চোখ যেন নীল আকাশ আনমনা
গ্রামের স্মৃতির মতো কখনো যা স্বপ্ন হয়ে ঝরে

কতদিন দিব্যি দিয়ে বলেছি হে আর দেখবো না
চোখের অলীভ অর্থ আমকেও আগুনে পোড়ায়
নিরস্ত্র নিস্তেজ করে ভেঙ্গে আনে সমস্ত যন্ত্রণা
কবিতাও নত এই অনির্বায চোখের ভাষায়

তাড়িত পাখির মতো উড়ে এই শহরে এলাম
ঘাসের গলিত ঘ্রাণ লেগে আছে চিন্তা চেতনায়
বুকে আছে নীল এক খামে লেখা ছদ্মসবেশী নাম
মেঘের বারির মত স্বপ্ন উড়ে চোখের বিভায়

অর্থবহ কিছু নয়, আছে দুটি অতিরিক্ত চোখ
তার নীল অপটিকে ছলকায় কবির দ্যুলোক।
মাতৃময় জঠরের মতো

অনাদি মাটির মোহে আসে কতো
ঝাঁক ঝাঁক পাখি
প্রাণ ও প্রকৃতির মাঝে উঠে আসে
জীবনের দুরন্ত শ্লোগান
আর কত স্বপ্নে স্বপ্নে পথ চেয়ে থাকি
অনিবার্য প্রতীক্ষায় নীলকন্ঠ হয়ে থাকে প্রাণ

মাটি কী আজন্ম কোন মাতৃময় জঠরের মতো
কেবলি সে নিয়ে আসে জীবনের ধারাবাহিকতা
আসঙ্গ উষ্ণতায় সোঁদালো গন্ধের কাছে নত
রক্তের কেলাসে সুপ্ত অবিরল প্রাণের মমতা

মমতা স্নেহ ছিঁড়ে সোঁদা গন্ধে
জেগে উঠে প্রেম
হৃদয়ের করিডোরে দু’বাহু বাড়িয়ে দেয়
কত গাছপালা
যেন বা সে অনন্তকালের এক বীজের খাদেম
মাটির মহত্বে আনে প্রাকৃতিক জীবন নির্জলা।
স্মৃতিচিহ্ন

সভ্যতার অশ্রু ঝরে প্রত্ন হয়ে থাকে ইতিহাস
দুরন্ত গতির ঘোড়া রেখে যায় কিছু কিছু বেদনা নিঃশ্বাস
পাথর বিদীর্ণ করে ফোটে কত স্বপ্নরঙ্গ ফুল
সেই সাথে ঝরে কিছু ব্যথাতুর শেফালী বকুল

অনন্ত নদীর গতি অনন্তে নিয়ত বহমান
সময়ের তটে থাকে তার কিছু স্বাক্ষর প্রমাণ
মৃত্যুর শশ্মান থেকে জেগে উঠে কত গাছপালা
তারপর আজীবন বুকে ধরে প্রকৃতির অনিঃশেষ জ্বালা

নিভে যায় প্রকৃতির সোঁদা গন্ধ বুকে
কিন্তু তার স্মৃতিচিহ্ন থেকে যায় বীর্যে বীর্যে এই গ্রহলোকে।
সূর্যকরোজ্জ্বল

খুলে দেখলে দেখতে পাবে ভেতরে আমার
সমগ্রটাই সূর্যকরোজ্জ্বল
তার পাশে আছে এক বিস্তীর্ণ সবুজ দ্রাঘিমা
পানি ও প্রাণের স্বচ্ছল মাখামাখি
পাখি ও প্রকৃতির সমৃদ্ধ বসবাস
দেখতে পাবে অনন্তের মতো বিস্তৃত ভেতরে আমার

যদিও জন্মমাত্র সংশয় ও অন্ধত্বের অভিশাপ আমাকে গ্রাস করে
মিথ্যার বলয়ে আমাকে পরানো হয় শ্মশানের কাফনের ও ক্ষুধার যন্ত্রণা
আমার ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল অহংকার
বাতাসের ঝাপটায় একটা কাগজের ঘুড্ডি যেন তছনছ করা হয়
কিন্তু লাশ ও রক্তের অঙ্কুর কি কখনো দমানো যায়?

দুর্মর কিছু নয়, জীবনের মৃত্যুই আমার সুপেয় আরক
ক্রমান্বয়ে মৃত্যু শিক্ষা অভিজ্ঞতা আমাকে মৃত্যুশীল করে
আমার স্বপ্ন পানি ও প্রকৃতি সঞ্চারে অনিঃশেষ প্রাণ পেয়ে যায়
মাটি ও মৃত্তিকা কী অদ্ভূত সঞ্জীবিত জীবন হয়ে ওঠে

খুলে দেখলে দেখতে পাবে ভেতরে আমার
সমগ্রটাই অপরাজেয়
আকাশের মিনারের মতো মতো উঁচু আমার সীমানা
দেখতে পাবে, আমাকে পরাজিত করা
এতটা সহজ না।

 

ভয়ের বীভৎস মুখ

ভয়ের বীভৎস মুখ ছিন্নভিন্ন করে দেয় কবিতার কথা
বিদীর্ণ করে দেয় কবিতার কল্পিত মুখখানা
নৃশংস ভয়ের আঁচড় দেখি কবিতার অগোছালো চুলে
দ্বিধাগ্রস্ত তার প্রেম দুরারোগ্য ভয়ের সন্ত্রাসে

অথচ একদা কবিতাকে ভালবেসে নিয়েছি দুর্নাম
অঢেল, নিঃসঙ্কোচে। কবিতা কবিতা বলে সবুজের আল পথে
রক্ত দিয়ে লিখেছি ঠিকানা। শস্যের শয্যায়
শুয়ে কবিতার আলিঙ্গনে পেয়েছি স্বর্গের ঠিকানা

এই কবিতার জন্যে কতোবার পথে পথে হারিয়েছি পথ
ব্যাকুল বাউল হয়ে একতারা সুরে সুরে
মুখর করেছি কতো জনপদ, জনাকীর্ণ পথ
কবিতা কবিতা বলে কতোবার হয়েছি পাগলপারা!

জানি না কী করে যে ভয়ের বীভৎস মুখ বসে যায় কবিতার মুখে
ঘুণের কর্তনের মতো ভয় এসে কেটে ফেলে মোহনীয়
সতেজ আবেগ। বৃদ্ধি পেতে থাকে ত্রাসে উৎকন্ঠা, উদ্বেগ
ভয়ের উৎকট বোধে লুপ্ত হয়ে যেতে থাকে কবিতা আমার

কবিতার চাঞ্চল্য ভরা গন্ধবহ শব্দগুলো যেন আজ মৃত মৌমাছি
কবিতার ছন্দ যেন চন্দ্রিমার বুকে বিদ্ধ কৃষ্ণমেঘ ছুরি
আহত উৎপেক্ষার মাঝে দেখা যায় হাঙ্গরমুখো চরের ভাঙ্গন
চিত্রকল্প ছুঁয়ে আছে তাপদগ্ধ খরার রোদন

ভযের বীভৎস মুখ বসে আছে কবিতার কাতর গ্রীবায়
আমার কবিতা তাই মর্মান্তিক আহত, অন্তর্বেদনায়।

Similar Posts

error: Content is protected !!