স্মৃতিকথা ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা

মহিবুর রহিম ।।
১৯৮৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে বন্ধুবর সৈয়দ আমিনুল হুদা ওরফে টিটু ভাইয়ের মাধ্যমে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। টিটু ভাই ছিলেন বাজিতপুরের ছাত্র ইউনিয়ন নেতা। তার কাছে বামপন্থী সাহিত্যের একটা আলাদা মূল্য ছিল। রুশ সাহিত্যের পাশাপাশি সুভাষ ও নির্গুণের কবিতার ভক্ত ছিলেন টিটু ভাই। তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে মানিকুজ্জামান মনিরের মাধ্যমে। তিনি ছিলেন ছাত্র ফেডারেশন ও লেখক শিবিরের কর্মী। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ধারণা নিয়ে লেখক শিবির তখন বাজিতপুরে খুবই সক্রিয় সংগঠন। কিন্তু ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্র ফেডারেশনের মধ্যে চিন্তা ধারার দূরত্ব ছিল অনেক। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে এই দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। সে এক ভিন্ন প্রেক্ষাপট।

টিটু ভাইয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর থেকে কয়েক বছর বেশ জমে উঠেছিল। সে হয়তো সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক তৎপরতা ও চর্চার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল। রাজনীতির প্রতি খুব বেশি আগ্রহ না থাকা সত্ত্বেও সাহিত্যের কারণেই সে সময়ে টিটু ভাইয়ের বেশ ঘনিষ্ট হয়ে উঠেছিলাম। তার প্রধান সূত্র ছিলেন মানিকুজ্জামান মনির। আমরা দুজনে প্রায় একই সময়ে কবিতা লেখার মাধ্যমে সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা শুরু করেছিলাম। দুজনই প্রায় এক সঙ্গে দীর্ঘদিন বসবাস করেছি। সম্পর্কে তিনি আমার মামা হন। ভাটি অঞ্চলের প্রায় বিচ্ছিন্ন গ্রাম ছাতিরচরে আমাদের জন্ম। আশির দশকের শুরুতে নদী ও হাওর অঞ্চলের উদার প্রকৃতির মতই আমাদের দু’জনের মনে এক স্বপ্নের জগত গড়ে উঠেছিল। আমরা নিরষ্কুশ সাহিত্যের প্রতি ঝুঁকে পড়লাম। দুজনের নিয়তিও প্রায় অভিন্ন হয়ে উঠল।

সে সময়ে বলা যায় আমি ছিলাম এক স্বপ্ন তাড়িত মানুষ। পাঠক এবং নবীন লেখক হিসেবে কবিতার প্রতি ছিল অকল্পনীয় ঝোঁক। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, আবুল হাসান, আসাদ চৌধুরী, আবদুল মান্নান সৈয়দ, নির্মলেন্দু গুণসহ চল্লিশ পঞ্চাশ ষাট ও সত্তর দশকের লেখকদের বই নিয়ে এই স্বপ্নিল জগত গড়ে ওঠেছিল আমার। ফলে প্রায় দৈব ভাবেই যেন নিত্য নতুন বইয়ের সঙ্গে, সংস্কৃতি মনষ্ক মানুষদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠতে লাগলো। এদের মধ্যে টিটু ভাই ছিলেন অন্যতম। আমাকে কিছুদিনের জন্যে ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছিলেন এবং সেই সাথে কবিতার এক আশ্চর্য জগতের সঙ্গেও। নিরলস এই রাজনৈতিক কর্মী আমাকে কিছু দিনের জন্যে তার প্রায় প্রিয়পাত্র করে নিয়ে ছিলেন। প্রায় প্রতিদিন তিনি আমার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন এবং আমার জন্যে দরকারি বইগুলো নিয়ে আসতেন। ধারণা করা হয় নব্বইয়ের গণ অভ্যুত্থানে ঢাকার পুরানা পল্টনে তিনি পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছেন। তাঁর সেই আত্মহুতির তিন চার দিন পূর্বে সম্ভবত তার সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাৎ হয়েছিল। সত্যিকার এক বিপ্লবী চরিত্র রূপেই তাঁকে আমি দেখেছি। সাহিত্যানুরাগী সদাচারী একজন সহনশীল মানুষ। এই টিটু ভাই ১৯৮৬ সালের দিকে আমার জন্য সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ নিয়ে এলেন। আমার রুমে প্রবেশ করার মুহুর্তেও তাঁর মুখে ছিল সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা :
প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা,
চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য
কাঠ ফাটা রোদ সেঁকে চামড়া।
চিমনির মুখে শোনো সাইরেন শঙ্খ,
গান গায় হাতুড়ি ও কাস্তে
তিল তিল মরণেও জীবন অসহ্য
জীবনকে চায় ভালবাসতে।

আমি তাকিয়ে ছিলাম টিটু ভাইয়ের মুখের দিকে-‘টিটু ভাই কার কবিতা? আমি বার বার করে জিজ্ঞাসা করতে লাগলাম। টিটু ভাই বললেন তুমি পড়নি? সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা। বলেই যথারীতি পেছনে রাখা হাতের বইটি আমাকে ধরিয়ে দিলেন। সেদিন প্রথম সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা পাঠ করেছিলাম। মনে পড়ে, সারারাত সুভাষের কবিতায় নিমগ্ন, সুভাষিত হয়েছিলাম। জানিনা রাজনৈতিক কারণে কিনা, সুভাষের হাল্কা মেজাজের লিরিক কবিতায় মজে গিয়েছিলাম। এক ভিন্ন আকুল আনন্দকে মনে করে তাঁর কবিতা উচ্চ স্বরে আবৃতি করতে শুরু করলাম :
জাগুন জাগুন পাড়ায় আগুন
বাড়ে হু হু
মগজে প্রভুত দম্ভ, তবু তো,
আহা-উহু।
মনের মহল দিচ্ছে টহল
মিঠে কুহু
এখনো জাগুন পাড়ায় আগুন
বাড়ে হু হু।

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার বৈপ্লবিক চেতনাটি আমাকে বিমোহিত করল। তাঁর ‘পদাতিক’ (১৯৪০) আমাকে এনে দিল এক নতুন চৈতন্য। মনে পড়ে, আমার বেশ কয়েকটি কবিতায়- তাঁর প্রভাবও পড়েছিল। তাঁর গদ্য কবিতার আকর্ষণ তো আরও হৃদয়ভেদী :
‘একটি কবিতা লেখা হবে। তার জন্যে
দেয়ালে দেয়াল এঁটে দেয় কারা
অনাগত এক দিনের ফতোয়া,
মৃত্যুভয়কে ফাঁসিতে লটকে দিয়ে
মিছিল এগোয়,
আকাশ বাতাস মুখরিত গানে-
গর্জনে তার,
নখ দর্পণে আঁকা-
নতুন পৃথিবী…..’

আমাদের প্রতিদিনকার ব্যবহারে শ্লোগান হয়ে গিয়েছিল তাঁর কিছু কবিতার লাইন। লেখক শিবির দেয়ালেও চিকা মেরে দিয়েছিল- ‘ফুল ফুটুক আর না ফুটুক আজ বসন্ত’। কিন্তু আমি গড়িয়ে যেতে লাগলাম তাঁর কবিতার গভীরে। বিশেষ করে তাঁর গল্প বলার ঢঙে লিখিত আপাত সুবোধ্য কবিতা গুলোর ইন্দ্রাজাল আমাকে মুগ্ধ করল :
‘তার পর যে-তে যে-তে যে-তে
এক নদীর সঙ্গে দেখা।
পায়ে তার ঘুঙ্গুর বাঁধা
পরনে
উড়ু উড়ু ঢেউয়ের
নীল ঘাগড়া।’

কিংবা
‘সারাণ
সে আমার পায়ে পায়ে
সারাণ
পায়ে পায়ে
ঘুর ঘুর করে।
তাকে বলি: তোমাকে নিয়ে থাকার
সময় নেই
হে বিষাদ, তুমি যাও
এখন আমার সময় নেই
তুমি যাও।’

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘চিরকুট’; ‘যতদূরে যাই’; ‘কাল মধুমাস’; ‘ছেলে গেছে বনে’; ‘একটু পা চালিয়ে যাই’; ‘জল সইতে’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের মন ও মেজাজ খুবই অদ্ভুদ। বিচিত্র ইজেলে তিনি কবিতাকে সাজিয়েছেন। কবিতাকে ভিন্ন এক চৈতনিক আলোড়নের মধ্যে নিয়ে এসেছেন। চল্লিশ দশকেই তিনি অগ্রজ সমর সেন দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন। (চল্লিশ দশকে পুরো বাংলাসাহিত্যে একটি বৈপ্লবাত্মক যুগকে আমরা বহমান পাই। ফররুখ আহমদ, সুকান্ত ভট্টাচার্য, সৈয়দ আলী আহসান, সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ এই ঘরানার বর্ণিল নক্ষত্রপুঞ্জ)। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের এ্যান্টিরোমান্টিক আবহ অতীব সরল সৌন্দর্যে গড়া। যদিও শেষ জীবনে তিনি তাঁর ‘গাঁথা সপ্তশতী’তে অন্য একরকম রোমান্টিক আবেদনই পরিবেশন করেছেন। সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে ধ্বস নেমে এলে সুভাষ মুখোপাধ্যায় স্বপ্নভঙ্গের নীরবতায় নিমজ্জিত হন। কিন্তু সমর সেনের মতো লেখনিকে গুটিয়ে নেননি। মূলত সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখে গেছেন অবিরাম। ‘গাঁথা সপ্তশতী’ তে তাকে ভিন্ন স্বভাবে এবং ভিন্ন স্বাদে অবলোকন করি:
৯৩.
দেবতারা প্রিয়তমার অধর
করেনি আস্বাদন
নইলে অমৃত পেতে করে কেউ
সমুদ্র মন্থন?

৯৮
যাতে না হরিণ চোখের আড়াল হয়
হরিণীও সেই সুখে
চেয়ে ছিল ঠায়, তখনই মৃত্যুবান
সজোরে বিধল বুকে ॥

৯৯
মনে পড়ে নাকি মেঘলা রঙের অন্ধকার সে’ কুঞ্জ
পাতা দিয়ে বোনা দৃঢ়
ঘন ছায়াতল, হে অকৃতজ্ঞ, মনে পড়ে নাকি হায় রে,
রে বা-নীর রেবা-নীরও?

৫৬
হৃদয়ের পটে বাসনার রঙ-তুলিতে
এঁকে ছিলাম যে ছবি
বালক সুলভ ঠোঁট দিয়ে হেসে নিয়তি
মুছে দিয়ে গেল সবি ॥

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯১৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার দর্শনাতে। কিছুকাল নদীয়াতে ছিলেন। ১৯৪১ সালের পরে স্থায়ীভাবে কলকাতায় বসবাস করেন। কবিতা ছাড়াও অনুবাদ, প্রবন্ধ, উপন্যাস, ভ্রমণ কাহিনী ও শিশু সাহিত্য মিলিয়ে তাঁর বইয়ের সংখ্যা ৭০। একদা তাঁর হাফিজের গজল তরজমা বিপুল ভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। নাজিম হিকমতের কবিতাও তাঁর অনুবাদেই বাঙালি পাঠকের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়।

মহিবুর রহিম : কবি, প্রাবন্ধিক, লোকসংস্কৃতি গবেষক।

Similar Posts

error: Content is protected !!