আমাদের সংস্কৃতি ও পহেলা বৈশাখ

মহিবুর রহিম ।।
সংস্কৃতি একটি সর্বব্যাপী ধারণা। সংস্কৃতিকে বলা হয় জাতির ভূষণ বা পরিচ্ছদ। একটি জাতির জীবনাচরণের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দিকগুলোই সংস্কৃতি। সংস্কৃতির সংজ্ঞা বা পরিধি নির্ধারণ এক অর্থে প্রায় অসম্ভব। এখানে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। তবে এ সকল অভিমত সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ ধারণা আমাদের দেয়, সংস্কৃতির বিশালত্বকে বুঝতে সহায়তা করে। প্রতিটি জাতির বা সম্প্রদায়ের বা গোত্রের মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। আবার প্রতিটি ধর্ম সম্প্রদায়ের বা অঞ্চলভিত্তিক মানুষের নিজস্ব সংস্কৃতির কথা আমরা জানি। এভাবে সংস্কৃতির বিশাল বিস্তৃত প্রেক্ষাপট আমাদের সম্মুখে উন্মোচিত হয়। তবু সংস্কৃতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ কেউ মনে করেন মানুষের ধীশক্তির ফল তার সংস্কৃতি। তারা মনে করেন সংস্কৃতি মানুষের বাঞ্চিত আচরণ। মানুষের চিন্তাধারা, মূল্যবোধ, আচার-বিশ্বাস, শিল্পকলা, আইন-কানুন, অনুশীলন ও অভ্যাস এবং তার সমগ্র সৃষ্টির সমষ্টিই তার সংস্কৃতি। এদিক দিয়ে সংস্কৃতি হচ্ছে একটি জাতি বা জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণের মৌলিক ধারণা বা পরিচয়। সংস্কৃতি একটি অবস্তুগত বিষয়। ধরা বা ছোঁয়ার ধারণার মধ্যে তাকে পাওয়া যায় না। তবু চেতনাসম্পন্ন মানুষ সংস্কৃতিকে উপলব্ধি করেন। সংস্কৃতি একটি বিমূর্ত বিষয় এবং উপলব্ধির বিষয়। হৃদয় বৃত্তি দিয়ে অনুভবের বিষয়। ই বি টেইলর সংস্কৃতি সম্পর্কে যে ধারণা দিয়েছেন তা বিশেষ ভাবে উপলব্ধির বিষয়-‘সংস্কৃতি হচ্ছে জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্পকলা, নীতি, নিয়ম, সংস্কার ও অন্যান্য দক্ষতা যা মানুষ সমাজের সদস্য হিসাবে অর্জন করে।’ আবার সমাজ বিজ্ঞানী নর্থ- সংস্কৃতির ধারণা দিয়েছেন এভাবে- ‘কোন সমাজের সদস্যরা বংশ পরম্পরায় যে সব আচার, প্রথা ও অনুষ্ঠান উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করে তাই সংস্কৃতি।’

সংস্কৃতি কোনো কৌলিন্যের বিষয় নয়। সমাজ জীবনের মতোই তা ক্রম বিবর্তনশীল। যুগে যুগে সংস্কৃতি নিজস্ব মাত্রায় বদলে যায়। এই বদলে যাওয়ার মধ্যেও আবার একটি আবহমান ধারা বর্তমান থাকে। যা তার মৌলিকতাকে ধরে রাখে। সংস্কৃতির মধ্যে গ্রহণ বর্জনের বিষয় আছে। অনেক বৈশ্বিক ও পারিপার্শ্বিক বিষয়কে সংস্কৃতি গ্রহণ করে থাকে। আবার নিজস্ব প্রাণ শক্তিতে অন্যকে প্রভাবিত করতে পারে। এই উদারতা, গ্রহণযোগ্য ও প্রভাবিত করার ক্ষমতার মধ্যেই সংস্কৃতির রূপান্তর ঘটে।

বাংলাদেশের মানুষের সংস্কৃতিও এর থেকে পৃথক নয়। সুদীর্ঘ কালধরে এদেশের মানুষের সংস্কৃতি নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। আদিতে প্রাকৃতিক পরিবেশে বসবাসকারী মানুষের জীবনকে ধীরে ধীরে প্রভাবিত করেছে আগত বৈদিক সংস্কৃতি। আবার হয়তো নতুন বাস্তবতায় বিস্তার লাভ করেছে উদার বৌদ্ধ সংস্কৃতি। এর ফলে এই তিন ধরণের সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটেছে এখানে। এই জটিল সাংস্কৃতিক বাস্তবতার মধ্যেই এখানে স্থান করে নিয়েছে ইসলাম। বলা চলে সুদূর প্রসারি প্রভাব বিস্তার করেছে আগত এই ধর্ম বিশ্বাস। অন্যান্য ধর্ম চেতনার মতোই ইসলাম তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তৈরি করেছে। আচার, অভ্যাস, বিশ্বাস, পোষাক-পরিচ্ছদ, রীতি-নীতি সর্বত্রই যার মৌলিক স্বাতন্ত্র রয়েছে। যা আদি ধর্ম সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে পাওয়া যাবে না। এই সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্রের কথাই লিখেছেন কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী তার বিখ্যাত ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে।

ফজর সময়ে উঠি      বিছাই লোহিত পাটী
পাঁচবেরী করয়ে নমাজ,
সোলেমানী মালা ধরে     জপে পির পেগাম্বরে
পিরের মোকামে দেই সাঁজ।
দশ বিশ বিরাদরে       বসিয়া বিচার করে
অনুক্ষণ পড়য়ে কোরান,
বেসাইয়া কেউ হাটে     পিরের শিরনি বাটে
সাঁজে বাজে দগড়ি নিশান।
বড়ই দানিশমন্দ         কারেও না করে মন্দ
প্রাণ গেলে রোজা নাহি ছাড়ে।
ধরয়ে কম্বুজ বেশ        শিরে নাহি রাখে কেশ
বুক আচ্ছাদিয়া রাখে দাড়ী।

এভাবে বিভিন্ন সময়ে এদেশের সংস্কৃতিতে পরিবর্তন এসেছে। আবার এই পরিবর্তনের মধ্যেও কিছু সার্বজনীন অভিন্নতা রয়েই গেছে। একথা অস্বীকার করা যাবে না।এদেশের প্রকৃতি, পরিবেশ, ভৌগোলিক অবস্থান, ভাষা, জনপদ থেকে উৎপন্ন বিষয় সমান ভাবে সব ধর্ম মতাদর্শের মানুষকে প্রভাবিত করছে। এই প্রভাব কোন অঞ্চলের মানুষই কাটিয়ে উঠতে পারে না। ফলে অঞ্চল ভেদে মানুষের ঐক্যও সংস্কৃতিরই একটি দান। বাংলার হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান মুসলমান সবাই সমান ভাবে ঋতুর বৈচিত্র্যকে উপভোগ করে। শীতের পিঠা-পুলি কিংবা মাছ ভাতের সংস্কৃতিতে সব ধর্ম সম্প্রদায়ের লোকজনের সমান অংশগ্রহণ থাকা অসম্ভব নয়। শুধু তাই নয় ধর্মীয় সংস্কৃতিরও ব্যাপক লেন-দেন আছে। যা পরস্পরকে ব্যাপক ভাবে প্রভাবিত করে। হিন্দু বা বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব মুসলমানদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে না এমন নয়। ঠিক তেমনিভাবে ইসলামের প্রভাব এদেশের অন্যান্য ধর্মমতের মধ্যে প্রবল ভাবেই বিস্তার লাভ করেছে। যা কাটিয়ে উঠা সহজ নয়।এই বিস্তৃত জটিল পরিসরের মধ্যে খুঁজতে হবে সংস্কৃতির নিজস্বতাকে।

সংস্কৃতি নিয়ে আমরা অনেক বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারি, কিন্তু সংস্কৃতি চলে তার নিজস্ব গতিতে। ধর্ম সংস্কৃতিকে ব্যাপক প্রভাবিত করে। আবার সংস্কৃতিতে পরিবেশের প্রভাবও কম নয়। সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে এই প্রভাবে হ্রাস বৃদ্ধি ঘটে থাকে। কেননা মানুষ সামাজিক ও রাজনৈতিক জীব। অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনেই মানুষ সমাজ ও রাজনীতির উদ্ভাবন ঘটিয়েছে। আবার সম্প্রীতি ও দ্বন্দ্ব মানব চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এই বৈশিষ্টের মধ্য দিয়ে মানব সমাজ এগিয়ে চলে। এই সার্বিক বাস্তবতার নির্যাসটুকু নিয়েই গড়ে উঠেছে সংস্কৃতি।

মানুষের মধ্যে আনন্দ ও শোক সমানভাবেই প্রভাব বিস্তার করে আছে। মানুষের আনন্দের ভাগ থেকে উৎসবের জন্ম হতে পারে। সকল জাতির মানুষই কখনো কখনো উৎসব মুখর হয়। বাঙালি জাতিও উৎসব প্রিয়। ধর্মীয় উৎসব যেমন তারা পালন করে, তেমনি লোক সমাজে সৃষ্ট সার্বজনীন উৎসবেও সমানভাবেই অংশগ্রহণ করে। যেমন- বিভিন্ন মেলা, খেলা-ধূলা, গান পরিবেশন ইত্যাদিতে এদেশের মানুষ ব্যাপক অংশগ্রহণ করে থাকে। এর মধ্যে বর্ষবরণ উৎসব একটি নতুন মাত্রা যুগ করেছে। আদিতে এই উৎসবের ধরন এমন ছিল না। কালের বিবর্তনে তা অনেকটা বৈশ্বিক রূপ ধারণ করেছে। অনেকটা ইংরেজি বর্ষবরণের আদলেই এই বর্ষবরণ উৎসব। যা সম্প্রতি দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

বর্ষবরণের এই উৎসব নতুন নয়। পৃথিবীতে বহু জাতি বর্ষবরণের এই উৎসব আদিকাল থেকেই উদযাপন করে আসছে। যেমন ইরানের নওরোজ উৎসবের কথা আমরা জানি। বাংলাদেশেও এই উৎসবের কিছু আদি স্তর আছে। বঙ্গাব্দ সনের প্রবর্তন ঘটে সম্রাট আকবরের শাসনামলে। সে সময়ে আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজী হিজরি সনকে সৌর সনে রূপান্তর করে বঙ্গাব্ধ সনের প্রবর্তন ঘটান। এর উদ্দেশ্য ছিল সে কালে ফসল উত্তোলনের শেষে রাষ্ট্রীয় কর আদায়ের প্রবর্তন করা। কালে সেই ব্যবস্থারই বর্তমান রূপ বাংলা সন। যুগে যুগে বাংলা সনই এদেশের মানুষের ফসল রোপন ও উত্তোলন, ব্যবসা বাণিজ্যের নতুন হিসাব হালখাতা নবায়ন, পারিবারিক দিক থেকে নতুন ফসল ঘরে উঠানো- এভাবে নানা তৎপরতার মধ্যে বিকশিত হয়েছে। এখন পহেলা বৈশাখ উদযাপনের যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে তা আমাদের আদি সংস্কৃতির কোন অংশ বলে মনে হয় না। উত্তর ঔপনিবেশিক জীবন বাস্তবতার মধ্যে তার জন্ম। ফলে তার রূপটিও উন্মুল উন্মাতাল।
বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক ব দ্বীপ। এদেশে কত হাজার নদী, খাল-বিল, জলাশয়ের ছড়াছড়ি। এই ভূ-প্রাকৃতিক বাস্তবতা এদেশের মানুষকে দিয়েছে কিছু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নিজস্বতা। নানা প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা এদেশের মানুষের মনে জন্ম দিয়েছে স্থায়ী এক অমঙ্গল বোধ। জন্তু-জানোয়ার, জরা-ব্যাধি, ঝড়-ঝঞ্ঝা নিত্য তাদের তাড়া করে ফিরেছে। তাই সম্ভবত আদিকাল থেকেই মানুষকে নানা আনুষ্ঠানিকতায়, জাগ-যজ্ঞে মঙ্গলের আরাধনা করতে হয়েছে। সংক্রান্তিকে সমীহ করে চলতে হয়েছে। হতে পারে এই থেকে নতুন বছরকে শুভ আকাঙ্ক্ষার মধ্যে বরণ করে নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

আজকের বর্ষবরণ উৎসব ইতিহাসের এইসব অধ্যায় অতিক্রম করে এসে নিত্য নতুন বাস্তবতায় মিশ্রিত হয়েছে। এখন দেখা যায় বৈশাখী উৎসবে পণ্য প্রচারণার অপসংস্কৃতি, নাগরিক যান্ত্রিকতার মানসিক বিকার। আমাদের প্রাকৃত সংস্কৃতির মধ্যে এখন ভূতের নৃত্য করছে তথাকথিত আকাশ সংস্কৃতি। কল্যাণ ও শুভ চেতনার পরিবর্তে দুর্নীতিগ্রস্ত লুটেরা, ভোগীদের পোশাকী আলখেল্লা গায়ে বৈশাখী উৎসব বেমানান রূপ ধারণ করেছে। ঐতিহাসিক ভাবে পহেলা বৈশাখের এই উৎসবটির শেকড় শহরে নয় গ্রামে। হাজার বছরের লালিত চেতনায় আউল-বাউলের মরমী সঙ্গীতে, হৃদয় আলোড়িত করা পুঁথি ও পালাগানে। কারণ হাজার বছরের ঐতিহ্য তো এগুলোই। আজকের পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণ উৎসব বৈশ্বিক সংস্কৃতির একটি খোলস মাত্র। যেখানে ঢামাঢুলে দিন পার করা যায়, কিন্তু প্রাণের সংযোগ কিছু পাওয়া যায় না। এদেশে যারা সংস্কৃতির সন্ধান করেন, তারা জানেন আমাদের লোক সংস্কৃতির কী বিশাল আয়োজন উপেক্ষার ধুলো বালিতে ঢাকা পড়ে আছে। একতারা আর বেহালার সুরে আমাদের লোক প্রকৃতি লোক পোশাক লোক আহার্য ছাড়া বৈশাখের উৎসব কী প্রাণ লাভ করতে পারে?

পহেলা বৈশাখ, বাংলা বছরের প্রথম দিন। সাধারণ মানুষের এই দিনটি উদযাপনের মধ্যে নিহিত আছে একটি নতুন বছরের শুভ কামনা। অভাব, দারিদ্র্র্য, অপুষ্টি, রোগ-ব্যাধি, শোষণ-বঞ্চনা পীড়িত এই জাতি নতুন বছরে শুভ ও কল্যাণকে কামনা করতেই পারে। কেননা সংক্রান্তি বা অশুভ সময় এখনো তাকে পিছু ধাওয়া করছে।

 

মহিবুর রহিম : কবি, প্রাবন্ধিক, লোকসংস্কৃতি গবেষক। বিভাগীয় প্রধান বাংলা বিভাগ, চিনাইর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অনার্স কলেজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

Similar Posts

error: Content is protected !!