বাড়ছে তারকাদের আত্মহত্যা

তামিম হাসান

আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে আত্মহত্যার প্রবণতা। নারী-পুরুষ, উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণী, স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী থেকে শুরু করে শিশুরা পর্যন্ত বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার পথ। সামান্য অজুহাত বা হতাশা থেকে তাদের ভেতর জন্ম নিচ্ছে আত্মহত্যা নামক ভয়ঙ্কর অপরাধের উপসর্গ। এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি পিছিয়ে নেই সমাজের উচ্চশিক্ষিত, বিত্তবান পরিবারের সদস্য বা শোবিজ তারকারা। আর হঠাৎ করে এ প্রবণতা বৃদ্ধির নেপথ্যে সমাজ ও মনোবিজ্ঞানীরা ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাওয়া ও স্যাটেলাইট আগ্রাসনকে দায়ী করেছেন।
শোবিজ তারকাদের আত্মহত্যা : প্রতিনিয়ত বাড়ছে শোবিজ তারকাদের আত্মহত্যার হার। তারকাদের হঠাৎ খ্যাতি, বিপুল অর্থবিত্তের মালিকানা, উচ্চাভিলাষী জীবন, পারিবারিক শান্তিহীনতা ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করার প্রবণতাই তাদের একপর্যায়ে হতাশ করে তুলছে। এর চরম পরিণতি হচ্ছে আত্মহত্যা। আর তারকাদের আত্মহত্যা সমাজের সাধারণ মানুষ তথা তাদের ভক্ত ও দর্শকদের ওপর কুপ্রভাব বিস্তার করছে।
নব্বই দশকের শুরুর দিকে বাংলাদেশী চলচ্চিত্রকে নিয়ে যখন দর্শক নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল, ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবির মাধ্যমে শোবিজে পা রাখা সালমান শাহ যখন একের পর এক দর্শকপ্রিয় ছবি উপহার দিচ্ছিলেন; তখনই তার পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার খবরে বজ্রপাতের মতো হঠাৎ থমকে গিয়েছিলেন তার ভক্তরা। কেউ বিশ্বাসই করতে চাননি সালমান শাহ আর কোনো দিন ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবেন না। যার কথা, পোশাক, চলন, অভিনয় ক্রমেই তরুণ প্রজন্মের কাছে হয়ে উঠছিল অনুকরণীয়, তার কেন ‘আত্মহত্যার’ মধ্য দিয়ে সবার কাছে থেকে বিদায় নিতে হবে? সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো তারা করে ভক্তদের। তবে তার পরিবার ও ভক্তকুলের কেউই বিশ্বাস করতে চান না তিনি ‘আত্মহত্যা’ করেছেন।
২০১৩ সালের ২২ মার্চ রাতে মোহাম্মদপুরের চান মিয়া হাউজিংয়ের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় লাক্স তারকা সুমাইয়া আসগর রাহার লাশ। পুলিশের তথ্য, পারিবারিকভাবে আর্থিক সঙ্কটে থাকা রাহা একপর্যায়ে বিভিন্ন প্রলোভনে প্রলুব্ধ হয়েছিলেন। রহস্যময় সম্পর্কের দুর্ভেদ্য জালে জড়িয়ে ছিলেন রাহা। বিচরণ শুরু করেছিলেন অন্ধকার জগতে। মিডিয়ায় কাজ করার পথগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যায় তার। উচ্ছৃঙ্খলতার কারণে প্রেমিকের সাথেও সম্পর্কের অবনতি ঘটে। হতাশাগ্রস্ত হয়ে রাহা বেছে নেন আত্মহত্যার পথ।
রাহার মৃত্যুর মাত্র পাঁচ দিন পর ২০১৩ সালের ২৭ মার্চ রাতে আত্মহত্যা করেন মডেল ও অভিনেতা অলি। ঢাকার মালিবাগের নিজ বাসায় স্ত্রী ও অন্যদের সাথে ঝগড়া করে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন বলে জানা যায়। পরিবারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বেশ কয়েক মাস অলির সাথে ঝগড়া চলছিল। এতে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। মানসিক বিপর্যয় তিনি আর কাটিয়ে উঠতে পারেননি। আর এ জন্যই তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। আত্মহত্যার সময় তার হাতে জ্বলন্ত সিগারেট ছিল। সিগারেটের আগুন থেকে তার পরনের কাপড়েও আগুন লেগে যায়। কাপড় পোড়া গন্ধ পেয়েই অলির বাবা-মা রুমে গিয়ে তাকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান।
অলির আত্মহত্যার কয়েক মাস পর ২০১৩ সালের ১ জুলাই গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী মিতা নূর। এই অভিনেত্রীর বাবা ফজলুর রহমানের দাবি, স্বামী শাহনূর রহমান রানার অত্যাচার-নির্যাতনেই তার মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, স্বামী শাহনূরের সাথে মিতার প্রায়ই ঝগড়া হতো। গুলশান-২ এ অবস্থিত ১০৪ নম্বর রোডের ১৬ নম্বর হোল্ডিংয়ের ‘প্রাসাদ লেকভ্যালি’ অ্যাপার্টমেন্টের ছয়তলার বাসা থেকে মিতা নূরের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। অলিম্পিক ব্যাটারির ‘আলো আলো বেশি আলো’ বিজ্ঞাপন করে সবচেয়ে বেশি খ্যাতি পেয়েছিলেন মিতা নূর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত এসব তারকা ব্যক্তিজীবনের নানা টানাপড়েন, উচ্চাভিলাষের বিপরীতে জীবনের বাস্তবতার হিসাব না মেলাতে পেরেই হয়ে পড়েন হাতাশাগ্রস্ত। এ হতাশাই তাদের ঠেলে দেয় নির্মম পরিণতির দিকে। তার সাথে সামাজিক, পারিবারিক মূল্যবোধকে ধারণ করতে না পারাও আত্মহত্যার কারণ।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার আত্মহত্যা করেন জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক এই সব দিন রাত্রির অভিনেত্রী নায়ার সুলতানা লোপা। গুলশানের ১২৬ নম্বর সড়কের ১২ নম্বর বাড়ির সি-৩ ফ্যাট থেকে লোপার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও হতাশা থেকেই দুই সন্তানের জননী লোপা আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।
নায়ক রাজ রাজ্জাক : এ সম্পর্কে নায়ক রাজ রাজ্জাক নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘এটি তো অবশ্যই মানসিক সমস্যাজনিত কারণে হয়ে থাকে। স্বাভাবিক, সুস্থ জীবনযাপন করতে না পারলেই এ ধরনের সমস্যায় পড়তে হতে পারে।’ মানুষ পরকালের কথা চিন্তা করছে না। এ জীবনের পর যে অনন্তকাল পড়ে রয়েছে তা মাথায় রাখলেই এ রকম পরিস্থিতিতে পড়তে হয় না কাউকেই। বিভিন্ন সমস্যা, দুঃখকষ্টের মধ্যেও যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার নামই জীবন। জীবন সুন্দর। আর এ জীবনকে নিজ হাতে শেষ করা দুনিয়ার সবচেয়ে ঘৃণিত কাজ।
নায়িকা ববিতা : কিংবদন্তি নায়িকা ববিতা এ সম্পর্কে বলেন, ‘অনেক সময় আমাদের দেশের মেয়েরা বিভিন্নভাবে নিগ্রহের শিকার হয়। এ জন্যও অনেক শোবিজের মেয়েকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয়। তবে বর্তমানে এ হার বাড়ছে। এর জন্য ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব আর অস্থির জীবনযাপনই প্রধানত দায়ী।’
চিত্রনায়ক আলমগীর : নায়ক আলমগীরের মতে, ‘মানুষ তার নিজের জীবনকে বুঝতে না পারাই এই আত্মহত্যার কারণ। আর মানুষ যখন সব ধরনের স্বাভাবিকতা বর্জন করে চলতে শুরু করে, তখনই নিজেকে হারিয়ে ফেলে।’
চিত্রনায়িকা মৌসুমী ঃ মৌসুমী মনে করেন, ধর্মীয় মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিতে না পারাও শোবিজ কর্মীদের আত্মহত্যা করতে চাওয়ার একটা কারণ। তিনি বলেন, ‘ধর্মীয় মূল্যবোধ মেনে চললে বড় ধরনের সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের দেশের শোবিজ কর্মীরা সেটি পারেন না।’
চিত্রনায়ক সাকিব খান : সাকিব খান বলেন, ‘জনপ্রিয়তা একজন শোবিজ কর্মীর সামাজিক দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়। তাকে অনেক চিন্তাভাবনা করে কাজ করা উচিত। নইলে আত্মহত্যার মতো ক্ষতিকারক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে সমাজে তার বাজে প্রভাব পড়বে।’
গায়ক হাবিব ওয়াহিদ : একই রকমের কথা বললেন হাবিব ওয়াহিদ। তার মতে, আত্মহত্যা কখনোই ভালো কাজ নয়, এটি শোবিজ কর্মীরা তখনই ভুলে যান যখন ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। আর এর জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জীবনাচারও দায়ী। সুতরাং এ দিক থেকে সতর্ক হওয়া দরকার।’ অভিনেত্রী আফসান আরা বিন্দু : অভিনেত্রী আফসান আরা বিন্দু মনে করেন, প্রত্যেক শিল্পীরই তার জীবন নিয়ে একটা পরিকল্পনা থাকা উচিত। তা না হলে জীবনে ঝড়ঝাপটা এলে নিজেকে সামলাতে পারা কষ্টকর হয়ে পড়ে। তখনই আত্মহত্যার মতো সিদ্ধান্তগুলো চলে আসে। জীবনের সঙ্কটময় পরিস্থিতিগুলো, দুঃসময়গুলো যখন মানুষ শক্ত হাতে সাহসের সাথে মোকাবেলা করতে পারে, তখনই সে হয়ে ওঠে প্রকৃত মানুষ। যারা আত্মহত্যা করে বা করার চিন্তাটুকুও করে আমার কাছে তাদের প্রকৃত মানুষ বলে মনে হয় না। বিন্দু বলেন, ‘পরিকল্পনায় শিল্পীত জীবনযাপনের বিষয়টি থাকতে হবে। শিল্পীর জীবনে অনেক দায়বদ্ধতা থাকে। নিজের প্রতি, দেশের প্রতি ও সাধারণ মানুষে প্রতি থাকে সেসব দায়বদ্ধতা। সেসব মাথায় তাকলে আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটতে পারে না।’
কয়েকটি আত্মহত্যার চেষ্টা : মৃত্যু ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে অনেকেই আত্মহত্যা চেষ্টা করে বেঁচে গেছেন। বেঁচে যাওয়া তারকার ক্ষেত্রে সাধারণত ঘটনা প্রকাশ হয় না। তবে বিভিন্ন সময়ে অনেক জনপ্রিয় শিল্পীরই আত্মহত্যা চেষ্টার খবর ছড়িয়ে পড়ে। এ তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হওয়া নামটি নাজমুন মুনিরা ন্যান্সি। গত ১৬ আগস্ট নেত্রকোনায় অতিরিক্ত ঘুমের বড়ি খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন ন্যান্সি। সুস্থ হওয়ার পর তিনি ঘটনাটিকে অতিপ্রচার বলে আখ্যায়িত করেন।
এর আগে জীবনের চরম হতাশা থেকে মৃত্যুর পথে পা বাড়িয়েছিলেন লাক্স তারকা জাকিয়া বালী মম। মিডিয়ায় গুঞ্জন উঠেছিল, স্বামীর সাথে দাম্পত্য দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ২০১৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর রাতে মম আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। মম অবশ্য এটিকে গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। ওই দিন মম রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, মম অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। অচেতন অবস্থায় রাত ১০টায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। মধ্য রাতে তার জ্ঞান ফেরে। জানা গেছে, যথাসময়ে হাসপাতালে নেয়ায় তিনি রা পেয়েছেন।
শোবিজ তারকারা তাদের ভক্ত ও অনুসারীদের কাছে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তাই সাধারণ মানুষ নিজের অজান্তেই তাদের অনুসরণ করতে থাকেন। তারকাদের হেয়ার স্টাইল, পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে খাবার-দাবার এমনকি কথা বলার ধরন ভক্তরা নিজের অজান্তেই তাদের মধ্যে ধারণ করতে শুরু করেন।
এমনই একজন তারকা যখন আত্মহত্যার মতো ভয়ঙ্কর একটা সিদ্ধান্তের দিকে যায়, খুব স্বাভাবিকভাবেই সে বিষয়টি তার লাখ লাখ ভক্ত-অনুসারীদের জীবনে প্রভাব ফেলে। আত্মহত্যার মতো ঘৃণিত একটি কাজকে তারা খুব স্বাভাবিক একটি বিষয় ভাবতে শুরু করে। সমাজে বাড়তে থাকে আত্মহত্যা প্রবণতা। তাই একজন শিল্পীকেই সবচেয়ে বেশি সচেতন থাকতে হবে, কারণ তার দিকেই মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে তার লাখ লাখ ভক্ত-অনুসারী। সেই মুগ্ধ দৃষ্টিতে শিল্পীর কোনো ভুল ধরা পড়ে না। তার পর সব আচরণই তখন তার কাছে ঠিক মনে হয়। এমনকি আত্মহত্যাও।