আব্বার দেয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবনঘনিষ্ট শিক্ষাগুলো

তোফায়েল আহছান ।।

চলতি বছরের জুন মাসে বাড়ি গিয়ে প্রথমবারের মতো একটা তথ্য জানলাম। আমার এক আত্মীয় ডায়রি লিখেন নিয়মিত। শুধু ডায়রিই নয়, তিনি বিশেষ বিশেষ এতসব বিষয়ের খোজখবর রাখেন! ভাবলেও অবাক লাগে। আলাপ-আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি আমাকে ডায়রির একটা পাতা দেখালেন। যেখানে উল্লেখ রয়েছে তাদের প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের দায়িত্ব নেয়ার সময় ও শিক্ষা ব্যবস্থার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা।

১৯৫৬ সালের ১ এপ্রিল। নিকলী উপজেলার কারপাশা ইউনিয়নের সহরমূল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন মো: কুতুব উদ্দীন মীর। ২৫ জুলাই ১৯৫৬ তারিখে ডায়রি লেখক তার সংক্ষিপ্ত মূল্যায়নে তিনি উল্লেখ করেছেন, “গত ১লা এপ্রিল মো: কুতুব উদ্দীন মীর উক্ত স্কুলে প্রধান শিক্ষক পদে কাজে যোগদান করেন। তাঁহার নিয়োগের পর হইতে স্কুলের ক্রমোন্নতি হইতেছে দেখিয়া আনন্দিত হইলাম।” পরের তিন লাইনের প্যারায় তিনি সদ্য বিদায়ী প্রধান শিক্ষক সম্পর্কে কিছু মূল্যায়নও লিখে রেখেছেন।

উল্লিখিত প্রধান শিক্ষক আমার “আব্বা”। আমার দেখা সেরা শিক্ষক। আব্বার দেয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবনঘনিষ্ট শিক্ষাগুলো প্রতিটি ক্ষেত্রে বার বার মনে পড়ে। যদিও তাঁর আদর্শের পথে হাঁটতে পারিনি। তাঁর ছড়ানো আলোয় আলোকিত হতে পারিনি। তিনি শিক্ষা দিয়েছেন স্কুলের বেঞ্চে বসে থাকা শিক্ষার্থীদের। আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হয়েছেন স্কুল থেকে ঝরে পরাদেরও। নতুন নতুন ছাত্রছাত্রীকে নানান কৌশলে উদ্বুদ্ধ করেছেন শিক্ষার ছায়াতলে আশ্রয় নিতে।

অনুপ্রাণিত করা আব্বার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবনঘনিষ্ট শিক্ষাগুলো
(এক)
সে সময় নিকলী উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল সহরমূলে শিক্ষার হার খুবই কম ছিল। বর্ষা মৌসুমে যাতায়াত ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙে পড়তো। হাতে বাওয়া ছোট ছোট ক’টা ডিঙি নৌকা ছাড়া বাহন বলতে কিছুই ছিলো না। স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের এ সময় হাজিরা একেবারেই কমে যেত। আব্বা তখন পরিকল্পনা করলেন কিভাবে ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানো যায়। স্থানীয় মুরুব্বিদের সাথে পরামর্শ করে নিজেই নিলেন এ গুরুদায়িত্বটা। বর্ষা মৌসুমের জন্য একটি ডিঙি ভাড়া করে একজন মাঝি নিলেন। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘাটে গিয়ে ঘণ্টি বাজানো হতো। ছেলেমেয়েদের নিয়ে নৌকা বোঝাই করে স্কুলে ফিরতেন। কখনো মাঝির সঙ্গী হতেন স্কুলের কোনো স্টাফ। কখনো কখনো আব্বা নিজেই ঘণ্টি বাজানোর কাজটি করতেন। তিনি এ কাজগুলো খুবই আন্তরিকতার সাথে করতেন; যেন নিজ পরিবারের খুদে সদস্যদের প্রতি দায়িত্ব পালন করছেন।

(দুই)
শিক্ষক হওয়ায় গ্রামাঞ্চলে আব্বার একটা বিশেষ মর্যাদা ছিলো। সম্মান পেয়েছেন অনেক। কখনো কখনো গরিব অনেকেই আসতেন সাহায্য-সহযোগিতার জন্য। তিনি আর্থিক সহযোগিতার বেলায় একটু হিসেবি ছিলেন। এক্ষেত্রে কয়েকটি দিক তাঁর বিবেচনায় থাকতো সব সময়। স্বল্প আয়ের মানুষ। তার চেয়েও বড় কথা, অল্প কিছু সাহায্য পেলে একবার খাওয়ার বেশি ভাবা যায় না। এই ভাবনার বাইরে গিয়ে তিনি গড়েছেন কিছু সুন্দর দৃষ্টান্ত। প্রচার না চাওয়ায় পরিবার ও ঘনিষ্ট কয়েকজন ছাড়া তেমন কেউ জানতেন না।

আমাদের গ্রামের বাড়িতে ধানের জমি ছিলো অনেক। বড়মাপের “এক গোয়ালভরা” গরু ছিলো। সবকিছু দেখাশোনার জন্য ৪/৫ জন রাখাল বছরব্যাপী কাজ করতেন। এই সুযোগটা আব্বা কাজে লাগিয়েছেন। সহযোগিতা চাওয়াদের মধ্য থেকে কয়েকজনকে রাখালের কাজে লাগিয়েছেন (তাদের আগ্রহ বিবেচনায়)। এরা বহু বছর আমাদের বাড়িতে থেকেছেন। বলা চলে, সামর্থ্যের মধ্যে নিজেদের পরিবারটা গুছিয়ে নেয়ার আগ পর্যন্ত। আরো ক’জন ছিলেন; যাদেরকে সহযোগিতার ধরনটা একটু ভিন্ন ছিলো। তাদেরকে স্থানীয়ভাবে ছোট পরিসরে ব্যবসায় ধরিয়ে দিয়েছিলেন। সেই সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছিলো শর্ত। ব্যবসায় খাটানো টাকা কিস্তিতে ফেরত দিতে হবে। (পাওনা পরিশোধের তাগিদে কর্মমুখী হওয়ার চাপ বাড়ানোর জন্য) তারা প্রত্যেকেই ব্যবসায় সফল হয়েছিলেন। পরিবারগুলো সচ্ছল হয়েছিলো। চেয়ে-চিন্তে খাওয়ার মানসিকতা ছেড়ে নিজের উপার্জন দিয়ে সংসার চালাতে সক্ষম হয়েছিলেন। পরবর্তীতে টাকা ফেরত নিয়েছিলেন কিংবা দিয়েছিলেন কি-না জানা যায়নি।

(তিন)
আব্বার বুনন করার হাত খুবই ভালো ছিলো। তিনি নিজ হাতে কত কিছুই না গড়তেন। আমাদের টিনের চালঅলা ঘরের বেড়াগুলো দেয়া হতো “মুলি বাঁশ” ফাটিয়ে বুনন করে। ঘরের ভেতর রুমের সেপারেটর দেয়া হতো বাঁশ থেকে চিকন বেতের মতো করে কঞ্চি দিয়ে বুনন করে। নানান কারুকাজ করা হতো এই বেড়াগুলোয়। উঠোনে একটু ফাঁকা জায়গা থাকলে এক পাশ করে শাক-সবজির বীজ বুনতেন আব্বা। সারা বছরই এখান থেকে কিছু না কিছু শাক-সবজি আমরা পেতাম। আব্বা এগুলো খুব আনন্দের সাথে করতেন এবং আমাদেরকেও উৎসাহ যোগাতেন।

আমাদের নিকলী সদরের মীরহাটির বাড়িতে অনেক স্মৃতিই আছে আব্বার সাথে। আমি ভাইদের সব থেকে ছোট হওয়ায় ছোটখাটো কাজগুলোয় আমাকে সাথে রাখতেন। একেবারে ধরে ধরে শেখানোর চেষ্টা করতেন। একদিন মুলি বাঁশের বেড়া বুনন করার জন্য উঠোনের মাটিতে বসেছিলেন আব্বা। তখন আব্বার পোস্টিং ছিলো নিকলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। হঠাৎ এক বিশেষ কাজে এই স্কুলের একজন শিক্ষক আসলেন আব্বার কাছে। তিনি আমার সরাসরি শিক্ষক (তবে আমার স্যার আব্বার ছাত্র। নাম বলা যৌক্তিক মনে না হওয়ায় উল্লেখ করছি না)। আব্বা আমাকে বললেন স্যারকে যেন বসতে দেই। তৎক্ষণাৎ একটি চেয়ার এনে স্যারের সামনে দিয়ে অনুরোধ করি বসার জন্য। আমার স্যার দেরি না করে বসে যান; এবং আব্বার সাথে সমস্যা নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন। কী মনে করে যেন আব্বা স্যারকে বলে উঠলেন, “… তুমি স্কুলে যাও, আমি আসছি”। কেন যেন স্যারকে আর দেরি করতে দিচ্ছিলেন না। আমি কিছুটা হকচকিয়ে উঠলাম। কারণ, কোনো মেহমান আসলে এমনভাবে তাড়াহুড়ো করতে কখনো দেখিনি আব্বাকে।

কয়েকবার বলার পর স্যার স্কুলে ফিরে গেলেন। আব্বা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, স্যারকে বসার জন্য চেয়ার দিলাম কেন? আমি মাথা নিচু করে জানতে চাইলাম, আমার কি ভুল হয়েছে? আব্বা তৎক্ষণাৎ পরিস্থিতিটা বুঝতে পারলেন এবং বললেন, আসলে তোর কোনো ভুল না। তুই তোর স্যারকে সম্মান দেখিয়ে চেয়ার দিয়েছিস বসার জন্য। কিন্তু তোর স্যার তার স্যারকে (আব্বাকে) সম্মান না দেখিয়ে চেয়ারে বসে দিব্বি কথা বলে যাচ্ছে!

এই পরিস্থিতিতে আমার করণীয় কি? সহজ সমাধান দিলেন আব্বা। চেয়ারের বদলে যদি জল চৌকি (পিড়ি থেকে একটু বড় ও উঁচু) দেয়া হতো তবে আমি এবং স্যার, দু’জনেরই নিজেদের স্যারকে সম্মান দেখানোয় কোনো ঘাটতি থাকতো না। সাথে সাথে এটাও বলে দিলেন, আমি যেন নিজের স্যার কিংবা গুরুজনদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা ও সম্মান বজায় রাখি। বইয়ের বাইরের এমন অসংখ্য ছোট ছোট বিষয় আমাদের শেখানোর চেষ্টা করতেন আব্বা।

তিনি আমার আব্বা। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। আব্বার কাছ থেকে কিছু শিক্ষা নিতে হয়, এটুকু পুরোপুরি বুঝে ওঠার আগেই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আব্বার কাছ থেকে জীবনঘনিষ্ট এমন শিক্ষাগুলো ভালো কাজে উৎসাহ যুগিয়ে চলে এখনো। আল্লাহ আমার আব্বাকে জান্নাত দান করুন।