হুট করেই একদিন খেলা ছেড়ে দেবো : মাশরাফি

আপন তারিক ।।

মাশরাফি বিন মর্তুজা শুধু একজন ক্রিকেটারের নামই নয়, লাখো মানুষের প্রেরণার বাতিঘরও। মাঠ এবং মাঠের বাইরের কোনো বিতর্কই তার ১৫ বছর ছাড়িয়ে যাওয়া ক্যারিয়ারে সামান্য কলঙ্কটুকুও লাগতে দেয়নি। টাইগারদের রঙিন পোশাকের অধিনায়ক সর্বজন শ্রদ্ধেয় এক চরিত্র। মাশরাফি নামটাই যেন একটা মিথ। দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ব্যক্তিত্ব অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে মুখোমুখি হয়েছিলেন পরিবর্তন ডটকমেরআমাদের নিকলী ডটকম-এর পাঠকদের জন্য তার হুবহু তুলে ধরা হলো।

মিরপুরে নিজের নতুন ফ্ল্যাটে প্রাণ খুলে বলেছেন নানা কথা। যেখানে আশরাফুল, মুস্তাফিজ থেকে শুরু করে ফেসবুক প্রজন্মের কথাও উঠে এসেছে। তিন পর্বের দীর্ঘ সেই সাক্ষাতকারের তৃতীয় ও শেষ কিস্তি পড়ুন আজ।

mashraf-home03

দীর্ঘ এক ক্যারিয়ার আপনার। ১৫ বছর পেরিয়ে এলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। এতোটা সময় কিভাবে বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিলেন?
-বিতর্ক হওয়া না হওয়া এটা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। সবকিছু সহজ করে দেখলে আসলে অনেক বিতর্ক পেছনে ফেলা যায়। নিজের মতো করে চলা, নিজের বিবেক যা ভাল মনে করে সেটা করা- এসবই গোটা ক্যারিয়ারে আমি করতে চেয়েছি। বাসা থেকে পরিবার যে শিক্ষা দিয়েছে, সেটা বাইরের জগতে মেনে চলার চেষ্টা করেছি। সবচেয়ে বড় কথা নিজের বিবেককে সব সময় গুরুত্ব দিয়েছি। স্বাভাবিক পথটাই বেছে নিয়েছি বলেই হয়তো আপনি যেটা বলেছেন, বিতর্ক স্পর্শ করেনি।

টেস্ট খেলছেন না সেই ২০০৯ সাল থেকে। ফেরার কোন পরিকল্পনা আছে?
-না, ফিরব না। বিশেষ করে এখন তো নয়ই। সবচেয়ে বড় কথা টেস্টে ফিরতে হলে সবার আগে আমাকে কিছু চারদিনের ম্যাচ খেলা উচিত। নিজের কাছেও বুঝতে হবে যে আমি টেস্ট খেলার জন্য প্রস্তুত। এখন ৫ দিনের ম্যাচ খেলতে নামলে সেটা হয়তো বা অন্যায় হবে।

mashrafe03-2

একটা সময় তো থামতেই হয়? সেটা কখন, এমন কোন পরিকল্পনা কি করেছেন?
-দেখুন, হুট করেই একদিন খেলা ছেড়ে দেবো। কিন্তু সেটা কখন বলতে পারব না। তবে এটুকু জানি সেই দিন খুব বেশি দুরেও নেই!

টেস্ট, ওয়ানডে আর টি-টুয়েন্টি। আপনাকে যদি বলা হয় একটা বেছে নিতে, কোনটা নেবেন?
-অবশ্যই প্রথমে টেস্ট। তারপর ওয়ানডে। সত্যি বলতে টি-টুয়েন্টি তো ফানি গেম।

গল্পের বই পড়েন?
-না, সেই সময় কোথায়?

গান শোনা হয়?
-খুবই কম। তবে সময় পেলে জেমস, আইয়ূব বাচ্চু আর হাসানের সেই পুরনো গানগুলোই শুনি। রবীন্দ্রসংগীতও ভাল লাগে।

টেলিভিশন দেখার সময় পান?
-অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ থাকে না। তবে লাইভ ক্রিকেট ম্যাচ থাকলে দেখি।

mashrafe03-1

দৈনিক পত্রিকা কিংবা অনলাইন নিউজপেপারে চোখ রাখেন?
-পড়ি, খেলার পাতাতেই চোখ থাকে। অন্য কোন খবর সেভাবে চোখ রাখা হয়ে ওঠে না।

খেলোয়াড়দের জীবনের গল্প নিয়ে ভারতে সিনেমা নির্মাণের হিড়িক পড়েছে। মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের পর মহেন্দ্র সিং ধোনির জীবন নিয়েও মুভি হল। আপনার জীবনটাও তো কম বৈচিত্র্যময় নয়। বায়োপিক নির্মাণের কোন প্রস্তাব নিয়ে প্রযোজক কিংবা পরিচালক আসলে রাজী হবেন?
-না, আমি আমার জীবন নিয়ে সিনেমা নির্মাণের অনুমতি দেব না। এনিয়ে আমার কোন আগ্রহও নেই।

ক্রিকেট ছেড়ে দেয়ার পর বিসিবি যদি আপনাকে ‘মেন্টর’ হয়ে জাতীয় দলের সঙ্গে থেকে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়, কিংবা কোন কাজে যুক্ত করে আপনি তখন কী করবেন?
-না, ক্রিকেট ছেড়ে দেয়ার পর সেটা আমি ভাববোই না। যদিও মাথায় আনি, সেটা কিছুদিন পর। ছাড়ার পরই আবার আমি জড়াতে চাই না। আবার একেবারেই সেই প্রস্তাবকে ‘নো’ বলে দেয়া ঠিক না। কারণ সেটা হয়তো সময়ই বলে দেবে। তাছাড়া সব সিদ্ধান্তই যেহেতু আমি হুট করে নেই, সেটা কি হয় সময়ই বলে দেবে।

আপনার জীবনের দর্শন কি?
-স্বাভাবিক চলতে হবে, এটাই নিয়ম। আর দুঃখ, কষ্ট, ব্যর্থতা এমন কী আনন্দ সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে নেয়া। এটাইতো, সিম্পল ইজ দ্য বেস্ট!

নড়াইল সব সময়ই আপনাকে টানে। অবসরের পর কি সেই স্মৃতির শহরে ফিরে যাবেন?
-সম্ভাবনা ফিফটি-ফিফটি। যেতেও পারি। ঠিক নেই আসলে। তাছাড়া সন্তানদের কথাও তো ভাবতে হতে পারে। ওদের স্কুল, পড়াশোনা আছে। হয়তো যাওয়া আসার ব্যাপারটা আরেকটু বাড়তে পারে।

এখন ইনজুরি নিয়ে কোনো সমস্যা আছে?
-না, আপাতত নেই আলহামদুলিল্লাহ।

mashrafe03-3

নতুন যে তারকারা আসছে সবার কাছেই আপনি আদর্শ। মুস্তাফিজ থেকে এখনকার মেহদী হাসান মিরাজ। সবার মুখেই আপনার কথা। ওদের কিভাবে মোটিভেটেড করেন?
-এইসব আসলে হিসেব করে কখনো করিনা। এটা ভেবে কখনো কারো সঙ্গে মিশি না যে ওরা আমাকে ভালোবাসবে, পছন্দ করবে। যখন যেটা মনে হয়, তখন সেটা বলি। খারাপ হলেও বলি, ভালো হলেও বলি। বলি একারণে যে আমি তাদের মতো সময়টা পেছনে ফেলে এসেছি। আমি জানি একটা ছেলে যখন জাতীয় দলে ঢোকে, ড্রেসিংরুমে কিংবা হোটেলে ওঠে, তখন তাদের মনের মধ্যে কি ঘুরতে থাকে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ওদের সঙ্গে কথা বলি। সময় দেই। এক্ষেত্রে ওরা ভালো কিছু করলে প্রশংসা করি। আবার খারাপ কিছু করলে আটকানোর চেষ্টা করি।

তারা আপনার কথা মন দিয়েই শোনে…
-সত্যি কথা বলতে কী খেলোয়াড়দের জীবনটা অনেক কঠিন। বিশেষ করে ওদের অনেক কিছু দেয়ার আছে। আমি সেই বয়সে ইনজুরির কারণে অনেক কিছুই করতে পারিনি। দেশকে কিছুটা দিতে পারতাম, সেটা ইনজুরির কারণে তখন হয়ে ওঠেনি। ওরা যদি সুস্থ থাকে তবে পারবে। তাছাড়া এখন ক্রিকেটে ফ্যাসিলিটিজ অনেক ভাল। সব মিলিয়ে ওদের সময়টা সামনে পড়ে আছে। ওরা যদি ভালভাবে থাকে, আরো ভাল করবে একসময়।

এখন এই প্রজন্ম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতি বেশ ঝুঁকেছে। ফেসবুক, টুইটার কিংবা ইনস্টাগ্রামে অনেক সময় ব্যয় করছে। আপনার কাছে কেমন লাগে ব্যাপারটা?
-এটা তো চাইলেই আপনি আটকাতে পারবেন না। ফেসবুক আটকানোর কোন সুযোগও নেই। আর এটা শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা দুনিয়াতেই হচ্ছে। এজন্য অবশ্যই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে ভাল জিনিসটা গ্রহণ করার কথা বলা উচিত। ফেসবুক, টুইটারে তো আর সব জিনিস খারাপ না। সেখানে অনেক ভালো অনুসঙ্গও আছে। সেসব গ্রহণ করা উচিত। ব্যক্তিগতভাবে সবারই ভালোভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা উচিত। ভালো পৃথিবীর যেকোনো কিছুই ভালো। আর সেটা নেয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান সময়ের যে ক্রিকেটাররা আছেন তাদের মধ্যে কে আপনার সবচেয়ে পছন্দের?
-আমার দলের সবাই আমার প্রিয়। এখানে কাউকে আমি আলাদা করতে পারব না। ওরা সবাই আমার চোখে এক সমান।

বাংলাদেশের বাইরে এ সময়ে কার খেলা মনে ধরে?
-আমি এখন আমার দেশের খেলার দিকেই বেশি দৃষ্টি রাখি।

বাংলাদেশে আপনার চোখে সর্বকালের সেরা ৩ জনকে যদি বেছে নিতে বলা হয় কাদের নাম নেবেন?
-সত্যি বলতে তিনজনকে বেছে নিতে পারবো না। ৫ জনের নাম বলি?

তাহলে আপনার পছন্দের সেই ৫ জনের নামই বলুন।
-সাকিব, তামিম, মুশফিক, হাবিবুল বাশার সুমন এবং মোহাম্মদ আশরাফুল।

মুস্তাফিজও তো নিশ্চয়ই একসময় আপনার গড়া একাদশে আসবে?
-ও বড় প্রতিভা। খুব ভাল করছে, আলহামদুলিল্লাহ। ওর সামনে অনেক সুন্দর একটা ভবিষ্যৎ অপেক্ষায় আছে। যদিও দুর্ভাগ্যজনকভাবে একটা ইনজুরিতে পড়েছে। আমি চাই ও যেন নিজের প্রতি আরো যত্নবান হয়। নিজে বুঝে সব কিছু করুক। যদি সুস্থ থাকে তবে বাংলাদেশ ক্রিকেট অনেক এগিয়ে যাবে। তার সেই যোগ্যতা আছে। আর একাই ও বেশ কয়েকটা ম্যাচও জিতিয়েছে।

সবার সঙ্গে এতো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। ক্রিকেটার, মিডিয়া, সাংবাদিক, নেটে বল করা বোলার, নড়াইলের বন্ধু, পরিবার, স্ত্রী-সন্তান এতো কিছুর সঙ্গে ক্রিকেট মাঠের চাপ, নেতৃত্ব। সবার সঙ্গে এতো সুন্দর যোগাযোগ, বিস্ময়কর! সবকিছু কীভাবে ঠাণ্ডা মাথায় ম্যানেজ করেন?
-চেষ্টা করি সবার সাথে মিলে-মিশে থাকার। আমরা মানুষ সবাই তো আসলে কষ্ট করেই চলি। এতো সমস্যা আশপাশে। তার মধ্যে যদি আমার একটু সহযোগিতা কারো উপকারে আসে তাতে খুব ভাল লাগে। আমার কাছ থেকে কেউ কিছু পেয়ে যেন তার উপকার হয়, সেই চেষ্টাটাই করি। কিন্তু সবসময় তো আর সেটা পারিনি। আমার তো একটা নিজস্ব জীবন আছে। যেমন এতো ব্যস্ততার মধ্যেও আপনার মুখোমুখি হলাম। সাক্ষাতকার দেবো না বলে ‘না’ ‘না’ করছিলাম। তারপরও নিজেই আপনাকে বাসায় ডেকে এনে মুখোমুখি হলাম।

আমি জানি এজন্য আপনি ধন্যবাদ শুনতে চাইবেন না। আপনি আসলে এমনই। নিউজিল্যান্ড সিরিজের জন্য পরিবর্তন ডটকমের পক্ষ থেকে শুভ কামনা থাকল।
-দোয়া করবেন আপনারা। দল যেন ভাল খেলতে পারে। আর সবাই যেন সুস্থভাবে খেলে সিরিজ শেষ করে দেশে ফিরতে পারি।

(এই হলেন মাশরাফি। মহাতারকা হলেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কোন অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে দেননি। সেলেব্রেটি অনেকেই, কিন্তু মাশরাফি একজনই। সবশেষে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এসে আবারো দোয়া চাইলেন টাইগারদের রঙিন পোশাকের অধিনায়ক। এমন একজনের জন্য শুভ কামনা সহজাতভাবেই চলে আসে।)

 

প্রথম কিস্তি পড়ুন : আশরাফুলকে এখনো বন্ধু জানেন মাশরাফি

দ্বিতীয় কিস্তি পড়ুন : ভালো কিছু করতে চাইলে ক্রিকেটের বাইরেও সুযোগ আছে

mashrafe03-4

সূত্র : সেই দিন খুব দূরে নেই মাশরাফির (পরিবর্তন ডটকম)