জাতীয় দলে ফিরতে মরিয়া অলক কাপালি

আপন তারিক ।।

তিনি হতে পারতেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের সেরা অলরাউন্ডারদের একজন। ব্যাট-বল দুটোই যে সমান তালে কথা বলতো অলক কাপালির। কিন্তু জীবন তো আর ফুলে ফুলে সাজানো কোনো গল্প নয়। এখানে পথ চলতে কতো-শত কাঁটার আঘাত উঁৎ পেতে থাকে। ১৭ টেস্ট আর ৬৯ ওয়ানডেতেই আটকে আছে জাতীয় দলের এই অলরাউন্ডারের ক্যারিয়ার। কিন্তু তিনি থামেননি। থামেনি তার ব্যাট। ৩৩ পেরিয়ে যাওয়া অলক এবারের জাতীয় ক্রিকেট লিগের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। সিলেটের এই ব্যাটসম্যান শনিবার মুখোমুখি হলেন পরিবর্তন ডটকমের। বললেন, সুখ-দুঃখের নানা কথা। সেই আলাপচারিতার চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো এখানে-

alak-kapali01

৬ ম্যাচে ডাবল সেঞ্চুরির সঙ্গে ৫৯৮ রান। ঈর্ষণীয় গড় ৬৬.৪৪। ব্যক্তিগতভাবে আপনি দারুণ সফল। জাতীয় লিগে সর্বোচ্চ রান আপনার। ভাবতে কেমন লাগছে?
অলক কাপালি : পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে অবশ্যই ভালো লাগে। অনেক বছর ধরেই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে খেলছি। গত বছরও ব্যাটে রান ছিল আমার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংগ্রাহক হয়েছিলাম। সত্যি বলতে কী প্রতি বছরই একটা লক্ষ্য থাকে। যে করেই হোক রান পেতে হবে। অন্য টুর্নামেন্টেও একই চেষ্টা থাকে। কিন্তু বিপিএল কিংবা প্রিমিয়ার ক্রিকেটে সীমিত কয়েকজনই সাফল্য পায়। জাতীয় লীগে থাকে ধৈর্যের পরীক্ষা। সেই পরীক্ষাতে ভালো করে পাশ হতে পারলে অন্যরকম ভালো লাগা ছুঁয়ে যায়।

ঘরোয়া ক্রিকেটকে বলা হয় জাতীয় দলে উঠার সিঁড়ি। আপনি সেখানে শতভাগ সফল…
অলক কাপালি : ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই আমার লক্ষ্য ছিল- যেখানেই খেলি ব্যাটে রান করতে হবে। সেটা জাতীয় লিগ কিংবা আমাদের সিলেটের ঘরোয়া ক্রিকেটই হোক। এই রান করলে কিংবা উইকেট পেলে কী পাবো এতোসব ভাবিনি। এই পথ চলতে চলতেই তো প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৮ হাজার রান আর ২০০ উইকেট হয়ে গেল। রান সংগ্রহে আমার ওপরে আছেন শুধুই তুষার ইমরান।

বয়স ৩৩ পেরিয়েছে। আবারো জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন দেখেন না?
অলক কাপালি : মিথ্যে বলবো না। খারাপ তো লাগেই। যখনই মাশরাফি কিংবা মুশফিকরা মাঠে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে তখন কষ্ট লাগে। বিশেষ করে বাংলাদেশের খেলা থাকলেই মনটা বিষণ্ণ হয়ে ওঠে। ভাবি- আমিও তো তাদের সঙ্গে থাকতে পারতাম। কিন্তু আমি তো ছিটকে গেছি। সর্বশেষ ২০১১ সালে যখন সুযোগ পেয়েছিলাম, তখন সেটা ঠিকঠাক কাজে লাগাতে পারিনি। যেমনটা বলছিলেন, স্বপ্ন তো দেখিই। আমি চেষ্টা করে যাবো। কার জীবনে কখন সুযোগ আসে কেউ জানে না! তবে ফের জাতীয় দলে খেলার সুযোগ আসুক কিংবা না-ই আসুক আমি খেলে যাবো। ক্রিকেট আমার অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

alak-kapali04

কতদিন সেই অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে মাঠে লড়তে চান?
অলক কাপালি : দেখুন, ফিটনেস যতদিন ধরে রাখতে পারি খেলা চালিয়ে যাবো। পাকিস্তানের মিসবাহ-উল-হকের কথাই ধরুন। ৪২ পেরিয়ে গেলেও দাপটের সঙ্গে জাতীয় দলে তিনি খেলে যাচ্ছেন। সেই হিসেবে আমার সামনে লম্বা সময় পড়ে আছে। মাত্র ৩৩ শেষ হলো। তারপরও যতদিন ফিট থাকতে পারবো খেলা চালিয়ে যাবো।

নিউজিল্যান্ডে মাশরাফি-সাকিবদের খেলা নিশ্চয়ই দেখছেন?
অলক কাপালি : দেখছি। নিউজিল্যান্ডের কন্ডিশনে ওরা তেমন একটা সুবিধা করতে পারছে না। ওয়ানডের পর টি-টুয়েন্টিতেও ধুঁকছে ব্যাটসম্যানরা। আমি অবশ্য এমন কিছুতে বিস্মিত হইনি। ওদের আবহাওয়া-উইকেটে আমরা কেন, পাশের দেশ অস্ট্রেলিয়াও বড় পরীক্ষা দেয়। আমি পুরো ব্যাপারটা ইতিবাচকভাবেই দেখি। দেখবেন, মুশফিকরা টেস্টেই ফিরে আসবে। এ বছর ব্যস্ত সূচি। সামনে আরো ভালো দিন আসছে। অনেক প্রাপ্তি আছে।

তাহলে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন আপনি?
অলক কাপালি : দেখুন, বাংলাদেশ ক্রিকেট যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এখন আর নিচে তাকানোর কিছু নেই। ওয়ানডেতে সাত নম্বরে আছি আমরা। দলে সিনিয়র ক্রিকেটারের অভাব নেই। মাশরাফি, মুশফিক, সাকিব, তামিমরা ঠিক পথেই নিয়ে যাবে মোসাদ্দেক-মোস্তাফিজদের।

আপনার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে চোখ রাখি। মাঝপথে এসে এভাবে ছিটকে গেলেন। কী ভুল ছিল, বুঝতে পেরেছেন?
অলক কাপালি : ভুল একটাই- বাজে সময়ে আমার অভিষেক হয়েছিল। ২০০২ সালে আমার আন্তর্জাতিক অভিষেক। মনে হয় একটু তাড়াতাড়িই সুযোগ পেয়ে গিয়েছিলাম। ২০০৫ সালে হলে ভালো হতো। নিজেকে আরেকটু প্রস্তুত করে মাঠে নামতে পারতাম।

alak-kapali03

ক্যারিয়ারে ফর্মে থাকা অবস্থায় গেলেন ভারতের বিদ্রোহী লিগ আইসিএলে। দেশের কথা না ভেবে সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা কি ঠিক ছিল?
অলক কাপালি : না, আমি এই সিদ্ধান্তের পেছনে ভুল খুঁজে পাই না। তখনকার প্রেক্ষাপটে সেটা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। তাছাড়া আইসিএলে বেশ ভালো খেলেছিলাম। সেঞ্চুরি এসেছিল আমার ব্যাটে। এরপর আইপিএলেও ডাক এসেছিল। কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক সুযোগ কাজে লাগানো হয়নি। দেখুন, তখন নির্বাচকদের অবমূল্যায়নের শিকার হয়েই আমি ওই নিষিদ্ধ লিগে খেলতে পা বাড়িয়েছিলাম। ২০০৭ বিশ্বকাপের আগে ৫টি সেঞ্চুরি করেছিলাম। তারপরও নির্বাচকদের মন গলাতে পারিনি। এমনকি তারা বলেছে যে আমি নাকি চলি না। আমাকে দিয়ে আর হবে না! তাদের অবজ্ঞাই সেই পথে ঠেলে দিয়েছিল আমাকে।

alak-kapali02

কিন্তু অনেকেই বলেন, তখন নাকি টাকার লোভেই হাবিবুল বাশারের নেতৃত্বে আপনারা আইসিএলে খেলতে গিয়েছিলেন?
অলক কাপালি : মোটেও না। আমি কিন্তু সেখানে খেলে তেমন মোটা অঙ্কের টাকা পাইনি। যা পেয়েছি সেটা উল্লেখ করার মতো কিছু নয়। এমন অভিযোগ শুনলে হাসি পায়। সত্যি বলতে কী খেলার সুযোগ আছে, জবাব দেয়ার মঞ্চ আছে বলেই গিয়েছিলাম। আমি ভালোবাসা থেকেই ক্রিকেট খেলি। ব্যাট-বলের মঞ্চে এতসব বাণিজ্যের হিসাব করি না। করলে এখনো এতোটা মনোযোগ দিয়ে লিগ ক্রিকেটটাও খেলতে পারতাম না।