শিক্ষার দূত আবদুল হামিদ স্যার

আবদুল হামিদ স্যারকে নিকলীর মানুষ ভুলবে না। জীবনের চলার পথটি তিনি আলোকিত করেছিলেন শিক্ষার স্পর্শে। সেই আলোয় পথ দেখে এগিয়ে গেছি আমরা।

মাটির পিলসুজে প্রদীপের মতো ক্ষীণ আলো জ্বালিয়ে সমাজকে যারা আলোকিত করেন, তারা চিরকাল বেঁচে থাকেন। মানবতার সেবায় নিবেদিত নিকলীর তেমনই একজন মহৎপ্রাণ ব্যক্তি হলেন সুন্দরের আরাধক, প্রকৃত মানুষ সৃষ্টির কারিগর নিকলী গোরাচাঁদ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক প্রয়াত স্যার আবদুল হামিদ।

মানুষ মরে গেলে কিছুকাল হয়তো তাকে মনে রাখে মানুষ। কিন্তু অনেক মানুষ মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকেন। আমাদের হামিদ স্যারও সে রকম একজন মানুষ। আবদুল হামিদের মতো সত্যনিষ্ঠ, কল্যাণমুখী, মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ সৃজনশীল ব্যক্তিরা দেহাবসানের পরও অক্ষয়। নিকলীবাসী তার নাম আজও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।

আবদুল হামিদ কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার সদর ইউনিয়নের পুকুরপাড় গ্রামে ১৯২৬ সালে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা কারার এনতাজ উদ্দিন ছিলেন একজন সফল কৃষক। ১৯৪৭ সালে নিকলীর গোরাচাঁদ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তিনি প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাস করেন। ১৯৪৮ সালে কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট পাস এবং ১৯৫০ সালে ওই কলেজ থেকেই দ্বিতীয় বিভাগে বিএ পাস করেন। ১৯৫৫ সালে বিএড এবং ১৯৬৪ সালে এমএড প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন।

আর্থিক দৈন্যের কারণে উচ্চতর শিক্ষালাভের যে দুর্দমনীয় আগ্রহ, তার রাশ টেনে ধরতে হয় তাকে। শিক্ষাজীবন শেষ করার আগে পারিবারিক কারণে তিনি চাকরি খুঁজতে থাকেন।

এদিকে বিএ পরীক্ষার পরপরই আবদুল হামিদ নিকলী গোরাচাঁদ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এর কয়েক বছরের মধ্যেই ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিয়ে শিক্ষকতা পেশায় আত্মোৎসর্গ করে বিদ্যালয়ের হারিয়ে যাওয়া সুনাম পুনরুদ্ধার করেন। শিক্ষকতা পেশার পাশাপাশি সৎ জীবন যাপন করার লক্ষ্যে সংসারের ব্যয় নির্বাহের জন্য তিনি নিজে হাল চাষ করেছেন।

শিক্ষক হিসেবে তিনি ছিলেন সৎ, কর্তব্যনিষ্ঠ ও আদর্শবান। তিনি রাতে না ঘুমিয়ে হারিকেন নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্রদের পড়াশোনার খোঁজখবর নিতেন এবং ছাত্রদের অভিভাবকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করতেন। দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রদের বিনা বেতনে পড়াতেন। দূর-দূরান্তের শিক্ষার্থীদের জায়গিরের ব্যবস্থা করার জন্য এলাকার সহৃদয় ব্যক্তিদের দ্বারে দ্বারে তিনি ঘুরেছেন।

ইংরেজি ও আরবিতে ছিল তার বিশেষ দক্ষতা। তার হাতে গড়া অনেক ছাত্র বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদে কর্মরত। অনেকে হয়েছেন সফল রাজনীতিবিদ।

তিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবন যাপন করতেন। নিজের ও পরিবারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা তিনি কখনো চিন্তা করতেন না। পরোপকার করাই ছিল তার একমাত্র চিন্তা ও সাধনা। নিজের সন্তানদের জন্য জীবদ্দশায় তিনি একটিমাত্র বাড়ি ছাড়া কিছুই রেখে যেতে পারেননি। আবদুল হামিদ ১৯৭২ সালে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড হাইস্কুলে দুই বছর প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তার হাতেগড়া ছাত্র তৎকালীন এমএনএ বর্তমানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এবং প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য মুঞ্জুর আহম্মেদ বাচ্চু মিয়ার অনুরোধে আবার নিকলীতে ফিরে এসে শিক্ষকতা করেন।

১৯৭৮ সালে শিক্ষকতা শেষে নিকলীতে আদর্শ কুঁড়ি নামে একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। আশির দশকে তিনি কিশোরগঞ্জের আজিমুদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ে দুই বছর প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন।

এরপর তিনি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে পাড়ি জমান। লিবিয়ার ত্রিপোলিতে বাংলাদেশ কমিউনিটি স্কুলে প্রিন্সিপাল হিসেবে দুই বছর দায়িত্ব পালনের পর অসুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আসেন। ১৯৯০ সালে গচিহাটা মহাবিদ্যালয়ের ইংরেজির প্রভাষক হিসেবে দুই বছর অধ্যাপনা করেন।

নিকলীর প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ আবদুল হামিদ ২০০৪ সালের ২১ জুলাই ৭৮ বছর বয়সে নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল করেন। কিন্তু তিনি আজও সবার হৃদয়াকাশে ধ্রুবতারার মতো দেদীপ্যমান। তার কর্মজীবনের সুফল এখনো নিকলীকে প্রজ্বলিত করে রেখেছে। নিকলীর শিক্ষার আলোকবর্তিকা প্রয়াত এই শিক্ষাবিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রতিবছর ২১ জুলাই আবদুল হামিদ কল্যাণ ট্রাস্টের উদ্যোগে সেখানে আয়োজিত হয় মিলাদ ও আলোচনা সভা।

কৃতী মানুষের স্মরণ কেবল তাদের প্রতি সমাজের কৃতজ্ঞতার প্রকাশই নয়, নতুন প্রজন্মের মনে এসব মানুষের আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্যও। যাতে তাদের পথ ধরে নতুনেরাও এগিয়ে যায়, দেশ এগিয়ে যায়।

 

সূত্র : প্রথম আলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *