পহেলা বৈশাখ ও বাংলা সনের কথা

মহিবুর রহিম ।।

এসো হে বৈশাখ এসো এসো
তাপস নিঃশ্বাস বায়ে
মুমূর্ষু রে দাও উড়ায়ে
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক…

রবীন্দ্রনাথের এই প্রার্থনা সঙ্গীতের মাধ্যমে প্রতি বছর বাংলা বর্ষবরণ শুরু হয়। পহেলা বৈশাখ এখন বাংলাদেশ তথা বাংলাভাষীদের সবচেয়ে বড় সামাজিক উৎসব। বাংলা সনের প্রথম দিনটিকে বরণের মাধ্যমে এ উৎসব পালিত হয়। ঢাকায় চারুকলা ইনস্টিটিউট যে মঙ্গল শোভাযাত্রা চালু করে তা এখন জনপ্রিয় এক উৎসবে রূপ নিয়েছে। এ শোভাযাত্রাকে ইউনেস্কো বিশ্ব হ্যারিটেজ এর অন্তর্ভুক্ত করেছে। এটিকে দেশের সর্ব বৃহৎ অসাম্প্রদায়িক উৎসবও বিবেচনা করা হয়। সকালে রমনার বটমূলে ‘ছায়ানট’ এর বর্ষ আবাহনসহ নানা আনুষ্ঠানিকতা আর পান্তা খাওয়া, বৈশাখী মেলা দিনটিকে ভিন্নমাত্রা দেয়। এই উৎসব এখন দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লোকজ ঐতিহ্যের অনেক উপাদান। ফলে একটি স্বদেশীয় আমেজ বর্ষবরণ উৎসবকে দিচ্ছে ভিন্নমাত্রা। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এই উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছে। শহর থেকে গ্রাম কোথাও কমতি নেই পহেলা বৈশাখের আনন্দ। অনেকে মনে করেন বিশ্বায়ন থেকে নগরায়ন অনেক কিছুরই প্রভাব পড়েছে এই উৎসবে। যুক্ত হয়েছে অনেক অপসংস্কৃতিও। উন্মূল মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকৃত বিনোদন আকাঙ্ক্ষা এর স্বাভাবিকতাকে ভারাক্রান্ত করে চলেছে। তবে মূল বিষয়টি যে বর্ষবরণ তা অস্বীকার করার জো নেই। আর এই বর্ষবরণ আদিকাল থেকেই চলে আসছে। বিশেষত উৎসব প্রিয় বাঙালি জাতি নানা মাত্রায় বর্ষবরণের উৎসব পালন করে এসেছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে বঙ্গাব্দ উৎসব পালনে একটি নতুন প্রেরণা আসে। এই প্রেরণাই পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণ উৎসবের প্রাণশক্তি। একটি জাতি তার সাংস্কৃতিক সত্তার পূর্ণতা অর্জন করে রাজনৈতিক বিজয়ের মাধ্যমে। ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক বিজয় বাঙালি জাতিকে দিয়েছে চেতনার এক স্থায়ী ভিত্তি। আজ বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন পেয়েছে স্বকীয়তার উৎস।

বাঙালি জাতির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্যে বঙ্গাব্দ, বাংলা সন বা বাংলা বর্ষপঞ্জি অন্যতম। এ অঞ্চলের মানুষের ভাষা ও সাহিত্যের মতোই তাদের একটি নিজস্ব সন বা বর্ষপঞ্জিকা আছে তা কম গৌরবের বিষয় নয়। বঙ্গাব্দ একটি ঐতিহ্যমণ্ডিত সৌর পঞ্জিকাভিত্তিক বর্ষপঞ্জি। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সৌরদিন গণনা শুরু হয়। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরে আসতে মোট ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড সময়ের প্রয়োজন হয়। এই সময়টাই এক সৌর বছর। গ্রেগরীয় সনের মতন বঙ্গাব্দেও মোট ১২ মাস। এগুলো হল বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র। আকাশে রাশিমণ্ডলীতে সূর্যের অবস্থানের ভিত্তিতে বঙ্গাব্দের মাসের হিসাব হয়ে থাকে। যেমন- যে সময় সূর্য মেষরাশিতে থাকে সে মাসের নাম বৈশাখ। বাংলাদেশ এবং পূর্ব ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, অসম ও ত্রিপুরা অঞ্চলে এই বর্ষপঞ্জি ব্যবহৃত হয়। বঙ্গাব্দ শুরু হয় পহেলা বৈশাখ বা বৈশাখ মাসের প্রথম দিনে। এ সন সময়ই গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জীর চেয়ে ৫৯৩ বছর কম।

সভ্যতার বিকাশের আদি যুগ থেকেই মানুষ কাল বা সময় বিভাজনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে আসছে। সে প্রয়োজনের তাগিদেই বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাবে বছর, মাস, সপ্তাহ ইত্যাদি গণনার প্রথা প্রচলিত হয়। তারই ফলে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন অব্দের প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন অব্দের উদ্ভব হয়। বাংলায় বিভিন্ন সময়ে আমরা বিভিন্ন অব্দের প্রচলন লক্ষ্য করেছি। যেমন- শকাব্দ, লক্ষণাব্দ, পালাব্দ, নশরত শাহী সন, চৈতন্যাব্দ ইত্যাদি লক্ষণীয় বিষয়। এসব অব্দ প্রচলনের পিছনে রাজ রাজড়ার নাম জড়িত রয়েছে। কিন্তু বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন প্রচলনের পিছনে যারই অবদান থাকুক না কেন, এর নামের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে বাঙালি জাতির নাম। সুতরাং বাংলা সন হচ্ছে বাঙালি জাতির একান্ত নিজস্ব অব্দ।

১৫৭৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ (সুবে বাঙ্গালা) মুঘল সাম্রাজ্যের শাসনভুক্ত হয়। সামাজিক ক্ষেত্রে ও ফসলের মতো মওসুমের দিকে লক্ষ্য রেখে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে হিজরি সনের পরিবর্তে ঋতুভিত্তিক সৌরসনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তখনকার প্রচলিত হিজরি সনকে ‘ফসলী সন’ হিসাবে চালু করার মাধ্যমে বর্তমান বাংলা সন বঙ্গাব্দের জন্ম হয়। ১২০১ খ্রিষ্টাব্দে বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গ জয়ের পর মুসলমান শাসন আমলে বাংলাদেশ তৎকালীন প্রচলিত শকাব্দ ও লক্ষণাব্দ সনের পাশাপাশি শাসনতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডে হিজরি সনের প্রচলন শুরু হয় এবং ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ রাজত্বকালের পূর্ব পর্যন্ত হিজরি সনই প্রচলিত ছিল। মাঝে সম্রাট আকবরের রাজত্ব কালের (১৫৫৬-১৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে) কিছু সময় ব্যতিরেকে বাদশাহি আমলে সব সময় শাসন কার্যে হিজরি সনই বহাল ছিল।

সন শব্দটি আরবি থেকে আগত, অর্থ-বর্ষ, বর্ষপূঞ্জি-বছরের দিনক্ষণের বিবরণ। আর বাংলা সন নিয়ে রাজা শশাঙ্ক (১৯৩-৬৩০), সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯) এবং সম্রাট আকবরের মধ্যে কে বাংলা সনের প্রবর্তক সে বিষয়টি নিয়ে ঘোরতর বিতর্ক আছে। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও পণ্ডিত মনে করেন যে মহামতি আকবরই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে বাংলা সন প্রবর্তন করেন। তবে এই মতের বিরোধীদের মধ্যে প্রধান হলেন সুলতানী আমলের ইতিহাসকার অধ্যাপক সুখময় মুখোপাধ্যায়। তিনি লিখেছেন- বঙ্গাব্দের উদ্ভব কীভাবে হয়েছিল, সে প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাওয়া যায় না। সাম্প্রতিক কালে এ বিষয়ে একটা মত চালু হয়েছে। সেটি এই- আগে এদেশে সবাই হিজরি সন ব্যবহার করত; ফলে ফসল কাটার খুব অসুবিধা হতো, কারণ বাকীরা আগের বছর যে তারিখে ফসল কেটেছিল, পরের বছর সে তারিখ ১১ দিন এগিয়ে গেছে। তাই আকবর হিজরি যে সাল তখন ছিল সেই সময় থেকেই এক সৌর সন প্রবর্তন করেন। এটিই আমাদের বঙ্গাব্দ। এই মতটি এখন বহুল প্রচার লাভ করেছে এবং অনেকে একে ঐতিহাসিক সত্য বলেও মনে করেছেন। কিন্তু এই মতের প্রবল ভিন্ন মতও রয়েছে।

আকবরের সময়কার প্রামাণিক ইতিহাস গ্রন্থ ‘আইন-ই আকবরী’ বা আকবরনামাতে অথবা অন্যান্য সমসাময়িক ঐতিহাসিকদের লেখা বইগুলোতে কোথাও আকবর কর্তৃক হিজরিকে সৌর বৎসরে পরিবর্তিত করার উল্লেখ পাওয়া যায় না। আকবরের আমলে শুধু যে হিজরিই ব্যবহৃত হতো তাই নয়, হিন্দুরা শকাব্দ, বিক্রম, সংবত প্রভৃতি ব্যবহার করতেন। মুসলমানদের অনেকেই ফার্সি পঞ্জিকা ব্যবহার করতেন, এ সমস্তরই বছর ৩৬৫ দিনের সৌর বছর। চাষীরা তারিখ অনুসারে ফসল কাটে না, তারা নির্দিষ্ট ঋতুতে ফসল কাটে। সুতরাং তাদের মধ্যে হিজরিকে সৌর সনে পরিবর্তিত করার কোনো কারণ নেই। হিজরি থেকে বঙ্গাব্দ হয়েছে এই মত এসেছিল, কয়েকজন আধুনিক ঐতিহাসিকের মাথা থেকে। এদের মধ্যে যার কন্ঠস্বর সবচেয়ে জোরালো ছিল, তাঁর নাম কে. পি. জয়সোয়াল। প্রধানত তারই প্রচারের ফলে এই মত আজ ঐতিহাসিক সত্যের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। কিন্তু এই মতের ভিত্তি কী? এই মতের ভিত্তি হল আকবরের সিংহাসন আরোহনের বছর ছিল ১৫৫৬ খ্রিঃ বা ৯৬৩ হিজরি এবং ৯৬৩ বঙ্গাব্দের সমান। এই তথ্যকে কেন্দ্র করেই এই মত চালু হয় যে হিজরি থেকেই বঙ্গাব্দ চালু হয়েছে এবং তা চালু করেছিলেন আকবর।

যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য এই অঞ্চলের সাল-তারিখ সম্বন্ধে একজন বড় বিশেষজ্ঞও ছিলেন। বঙ্গাব্দ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন। ‘সুলতান হোসেন শাহের সময় এই সন প্রচলিত হয়’ (বাংলা পুঁথির তালিকা সমন্বয় (১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা-৩৭৮)। কোন বিষয় বা সূত্র থেকে যতীন্দ্র বাবু এই সিন্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, তা তিনি উল্লেখ করেননি। সে জন্যই, এ মতকে গ্রহণ করতে আমাদের অসুবিধা আছে। এটা ঠিক যে, কোনো কোনো পুঁথিতে বঙ্গাব্দকে যবনে নৃপতে শকাব্দ’ বলা হয়েছে, রাম গোপাল দাসের রসকল্প বল্লীর পুঁথিতেও বঙ্গাব্দকে ‘যাবনী বৎসর’ বলা হয়েছে। কিন্তু এর থেকেই মনে করা চলে না যে জনৈক মুসলমান রাজা বঙ্গাব্দ প্রবর্তন করেছিলেন এবং তিনি হোসেন শাহ (সুখময় মুখোপাধ্যায়, এক্ষণ, শারদীয় সংখ্যা-১৪০৯)।

ঐতিহাসিক সুখময় মুখোপাধ্যায় ওপরে যেসব যুক্তি উপস্থাপন করেছেন তা প্রণিধানযোগ্য। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত যে উপসংহার টেনেছেন তা অনেকাংশেই ইতিহাস সম্মত নয়। তিনি বলেছেন, বঙ্গাব্দের প্রবর্তক যে কে তা যখন জানা যাচ্ছে না, তখন তাকে বাংলার প্রথম প্রতাপশালী রাজা শশাঙ্কের নামে চিহ্নিত করলে ক্ষতি কি?

অন্যদিকে অতিসম্প্রতি প্রকাশিত ‘বঙ্গাব্দের উৎস কথা’ বইয়ের লেখক সুনীল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় নানা ভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে শশাঙ্কই আসলে বাংলা সনের প্রবর্তক এবং তার রাজত্বকালের ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দের ১২ এপ্রিল সোমবার বৈশাখ বঙ্গাব্দের শুরু। এই মত সম্পর্কে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ভূতপূর্ব কারমাইকেল অধ্যাপক ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় বলেন : এই মতের স্বপক্ষে কিছু বলতে গেলে প্রথমেই প্রমাণ করতে হবে যে শশাঙ্ক ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে এক স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, অন্তত ঐ সময়ে স্বাধীন ভাবে রাজত্ব করেছিলেন এর কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই যদিও খ্রিস্টীয় ৭ম শতাব্দীর প্রথম ভাগে তার রাজত্ব সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য আমাদের আছে।’ অতএব, ৭ম শতাব্দীর আগে তার রাজত্বের প্রমাণ না থাকলে তিনি কীভাবে ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গাব্দের প্রবর্তন করতে পারেন?

তাহলে কি নিশ্চিত ভাবে বলা যায় যে, সম্রাট আকবরই বাংলা সন বা বঙ্গাব্দের প্রচলন করেছিলেন। ঐতিহাসিক তথ্য বিচারের নিরিখে আরো সুস্পষ্ট কোন প্রমাণাদি না পেলে তা বলা যুক্তিসঙ্গত হবে না, তবে আকবরের পক্ষে বেশ জোরালো পরোক্ষ প্রমাণ আছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ‘ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মোঘল সাম্রাজ্যের সর্ববিধ সীমানার মধ্যে বা নিকটবর্তী ভূ-খণ্ডে ৫৯৩-৫৯৪ বা তার কাছাকাছি সময় থেকে গণনীয় বেশ কয়েকটি অব্দের উৎস আকবরের ফসলী (সৌর হিজরি) সনের সঙ্গে সম্পর্কিত বা বাংলা সনের মতো পৃথক অব্দ হিসেবে সৃষ্টি। এদের মধ্যে আমরা উত্তর পশ্চিমের ফসলী সন (চান্দ্র-সৌর) (৫৯২-৫৯৩), পশ্চিম বাংলার বিলায়েতী অব্দ (৫৯২-৫৯৩ খ্রিষ্টাব্দ) মল্লাব্দ (৬৯৪ খ্রিষ্টাব্দ) ইত্যাদির নাম উল্লেখ করতে পারি। (‘বাঙলা সন, বঙ্গ, বাঙালা ও ভারত’ ব্রতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় পৃ; ৮৭ কলকাতা ২০০০) অন্যদিকে গোটা বিশ্বের সাল তারিখ নিয়ে ঘাটাঘাটি করেছেন এমন একজন লেখকের অভিমত হচ্ছে : ‘কেউ যুক্তি দিতে পারেন-শশাঙ্ক যেহেতু বাংলারই রাজা ছিলেন তাই তার আমলে একটা অব্দ চালু হলে সেটার-‘বঙ্গাব্দ’ নাম হওয়া অসম্ভব নয়। কিন্তু আকবরের প্রতিষ্ঠিত অব্দের নাম বঙ্গাব্দ হবে কেমন করে? এ যুক্তি ধোপে টেকে না, কেননা ‘বঙ্গাব্দ’ কথাটার ব্যবহার খুব আধুনিক। গত কুড়ি পঁচিশ বছরের আগে বঙ্গাব্দ কথাটার চল ছিল না, তখন বলা হতো শুধুই ‘সাল’ বা ‘সন’। পশ্চিম ভারতে কেউ বিক্রম = সংবতকে বিক্রম মালু বা বিক্রম সন বলে না। নেপালে যুদ্ধ সংবতকে কেউ যুদ্ধ সাল বলে না, বাংলায় তাহলে সাল বা সন হয় কেন? এখানে মনে রাখতে হবে ‘সাল’ কথাটা ফার্সি, সন কথাটা আরবি। আগেও উল্লেখ করেছি। এ থেকে মনে হয়, হিজরি ক্যালেন্ডার থেকেই কোনো ভাবে উদ্ভুত আমাদের বাংলা অব্দ বা বাংলা সাল। তা যদি হয় তাহলে আকবর থিউরির চেয়ে বিশ্বাস্য অন্য কোনো থিউরির সন্ধান পাওয়া মুশকিল।’ আসলে ষষ্ঠ বা সপ্তম শতকে ‘বঙ্গাব্দ’ ‘বাংলা সন বা বাংলা সাল’ ব্যবহৃত হওয়া অসম্ভব ছিল। এত আগে বঙ্গাব্দের মতো আধুনিক শব্দের ব্যবহার যেমন সম্ভব ছিল না তেমনি আরবি বা ফার্সি শব্দ ‘সন’ বা ‘সাল’-এর ব্যবহার একেবারেই অবিশ্বাস্য। এই সব কারণেই রাজা শশাঙ্কের সঙ্গে ‘বঙ্গাব্দ’ বা ‘বাংলা সনের’ সম্পর্ক ইতিহাস সম্মত প্রত্যয় বলে মনে হয় না। ঐতিহাসিক ছাড়াও অন্য দুজন জগত বিখ্যাত মনীষীও আকবরকেই বাংলা সনের প্রবর্তক বলে মনে করেন। এদের একজন হলেন বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা ও অন্যজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন।

সবচেয়ে জনপ্রিয় মত হচ্ছে, সম্রাট আকবরের (১৫৫৬-১৬০৯) নির্দেশে তার বিজ্ঞ রাজ জ্যোতিষী ও পণ্ডিত আমীর ফতেহ উল্লাহ সিরাজীর গবেষণার ফলে বাংলা সনের উৎপত্তি-৯৯২ হিজরি = ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দ। হিজরি সনের শুরু হযরত মোহাম্মদ (স.) এর হিজরতের সময় (৬২২ খ্রিস্টাব্দ) থেকে। হিজরতের স্মৃতি রক্ষার্থে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমরের (রা.) খিলাফত কালে হিজরি সনের সৃষ্টি। এই সনের শুরু ১৬ জুলাই ৬২২ খ্রিষ্টাব্দ ধরা হলেও আসলে হিজরতের তারিখ কিন্তু রবিউল আওয়াল মাসের ১২ তারিখ সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ৬২২ খ্রিষ্টাব্দ; এখানে আরব দেশের নিয়মানুযায়ী বছরের প্রথম মাস মহররমের ১ তারিখ থেকে বছর গণনা শুরু হয়েছে। হিজরি চান্দ্রবর্ষ। চান্দ্রবর্ষের হিসাবে হিজরি সন ও তারিখের হেরফের হত অর্থাৎ সৌর বছরের হিসাবে দিন তারিখ মাসের গরমিল হত প্রচুর; আমীর ফতেহ উল্লাহ সিরাজী মোটামুটি তাই ৯৬৩ হিজরি = ৯৬৩ বাংলা সন সমন্বয় করে গণনা শুরু করেন। এভাবে ৯৬৩ হিজরি = ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ এর ১১ এপ্রিল। সম্রাট আকবরের সিংহাসনারোহনও পহেলা বৈশাখ, ৯৬৩ বাংলা সন। অন্যদিকে নবী করিমের (স.) হিজরতের (৬২২ খ্রিস্টাব্দ), বাংলা সনের শুরু ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে এবং সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহন, (১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ) এর স্মৃতিবহ। খ্রিষ্টাব্দ সন থেকে ৫৯৩ বছর ৩ মাস ১১ দিন কম অর্থাৎ মোটামুটি বাংলা সনের সঙ্গে ৫৯৩ যোগ দিলেই খ্রিষ্টাব্দ সন মিলতে পারে। আকবর অবশ্য তাঁর রাজত্বকালের ২৯তম বর্ষে ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে এই সন চালু করেন। কাজেই বুঝতে হবে বাংলা সনের জন্ম হিজরির জন্ম বছরে ৬২২, তাঁর নবযাত্রা ৯৬৩ হিজরি = ৯৬৩ বাংলা সন = ১১ এপ্রিল, ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ।

দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই সনে তদুপরি কিছু সমস্যা ছিল। তাই বাংলা একাডেমি কর্তৃক বাংলা সন সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয় ১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৬৬ সালে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র নেতৃত্বে এ কমিটি বিভিন্ন বাংলা মাস ও ঋতুতে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থ-সাংস্কৃতিক জীবনে কিছু সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতাকে নির্ণয় করে সেগুলো হতে উত্তরণের প্রস্তাবনা প্রদান করেন। বাংলা সনের ব্যাপ্তি গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জীর মতনই ৩৬৫ দিনের। যদিও সেখানে পৃথিবীর সূর্যকে প্রদক্ষিণের পরিপূর্ণ সময়কেই যথাযথভাবে নেয়া হয়েছে। এই প্রদক্ষিণের মোট সময় ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড। এই ব্যবধান ঘোচাতে গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জীর প্রতি চার বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি অতিরিক্ত দিন যোগ করা হয়। ব্যতিক্রম হচ্ছে যে শতাব্দীকে ৪০০ দিয়ে ভাগ করা যায় না বা বিভাজ্য। জ্যোতির্বিজ্ঞান নির্ভর হলেও বাংলা সনে এই অতিরিক্ত দিনকে আত্মীকরণ করা হয়নি। বাংলা মাস অন্যান্য সনের মাসের মতনই বিভিন্ন পরিসরের হয়ে থাকে। এই সমস্যাগুলোকে দূর করার জন্য ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কমিটি বাংলা একাডেমির কাছে কতকগুলো প্রস্তাব পেশ করে। এগুলো হচ্ছে- ১.বছরের প্রথম পাঁচ মাস অর্থাৎ বৈশাখ হতে ভাদ্র হবে ৩১ দিনের; ২.বাকী মাসগুলো অর্থাৎ আশ্বিন হতে চৈত্র হবে প্রতিটি ৩০ দিনের মাস; ৩. প্রতি চতুর্থ বছরের ফাল্গুন মাসে অতিরিক্ত একটি দিন যোগ করে তা হবে ৩১ দিনের। বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৬ সালে বাংলা পঞ্জিকার ক্ষেত্রে ড. শহীদুল্লাহ কমিটির সুপারিশ গ্রহণ করে, তবে ১৪ এপ্রিল বছর শুরুর দিন ধার্য করা হয় এবং খ্রিষ্টীয় পঞ্জিকায় অধিবর্ষের বছরে চৈত্র মাসে একদিন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গ্রহীত হয়।

আমাদের আজকের জাতীয় জীবনে বাংলা পঞ্জিকার গুরুত্ব অপরিসীম। এই পঞ্জিকা হিজরি থেকে ভিন্ন জাতের, শকাব্দ থেকে ভিন্ন ঐতিহ্যের এবং খ্রিষ্টাব্দ থেকে ভিন্ন ঋতু বৈচিত্র্যের। বাংলা সন বাংলাদেশের মানুষের নিজস্ব সন। এর উৎপত্তি ও বিকাশের ইতিহাস আমাদের নিজস্ব উত্তরাধিকার সঞ্জাত। এই সনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আমাদের ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যগত অনুভব। তাই বাংলা সন আমাদের গৌরবময় এক অনন্য সাংস্কৃতিক উপাদানে পরিণত হয়েছে। বাংলা নববর্ষ পয়লা বৈশাখ এলে আমরা আনন্দ উল্লাসে বিমোহিত হই। আমাদের মহান ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধসহ হাজার বছরের গৌরবময় ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিত হয়েছে বাংলা সন বা বঙ্গাব্দ। চিনাইর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অনার্স কলেজ বাংলা নববর্ষ উদযাপনকে নিজস্ব কর্মসূচি হিসেবেই গ্রহণ করে থাকে। ছাত্র-শিক্ষক-সংস্কৃতিকর্মীদের সমন্বয়ে সারম্ভরে এই উৎসব পালিত হয়ে আসছে। প্রতি বছরের এই অনুষ্ঠানে থাকে ঐতিহ্যবাহী আনন্দ ও উচ্ছ্বাস।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, লোকসংস্কৃতি গবেষক। বিভাগীয় প্রধান বাংলা বিভাগ, চিনাইর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অনার্স কলেজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।