সংসদীয় আসন কী তাহলে বাড়ছে কিশোরগঞ্জের!

আমাদের নিকলী ডেস্ক ।।

জাতীয় সংসদের নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণে ভোটার সংখ্যার পাশাপাশি এলাকার আয়তন বিবেচনায় আনতে আগ্রহী নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ বিষয়ে কমিশনের বক্তব্য, ‘সীমানা নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় শুধু জনসংখ্যার ওপর ভিত্তি না করে ভোটার সংখ্যা এবং সংসদীয় এলাকার আয়তন বিবেচনায় নেয়ার জন্য আইনি কাঠামোতে সংস্কার আনা প্রয়োজন।’ বৃহস্পতিবার ৬ জুলাই নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক সভায় সংলাপের দিনক্ষণ ও নির্বাচনকেন্দ্রিক খসড়া কর্মপরিকল্পনার সর্বশেষ সংশোধনীতে বিষয়টি সম্পর্কে কমিশনের ওই বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে।

আইন অনুযায়ী সংসদীয় আসনের সীমানা পুননির্ধারণের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক অখণ্ডতা, প্রশাসনিক যোগাযোগ ও জনসংখ্যার হার এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হয়। কিন্তু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সংসদীয় আসনের সীমানা পুননির্ধারণের নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশন এবার জনসংখ্যা বাড়লেও বড় শহরগুলোতে আসনসংখ্যা নির্দিষ্ট করে দিতে চাইছে। এতে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরসহ বড় সিটি করপোরেশন এলাকার আসন সংখ্যা কমতে পারে। তেমনটি হলে বাড়তে পারে কিশোরগঞ্জ জেলার আসন সংখ্যা। জেলার ছয়টি আসনের স্থলে পুনরায় ৭টি কিংবা ৮টি আসন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন পরিকল্পনায় কমিশনের চেষ্টা থাকবে গ্রামাঞ্চলের আসন বাড়ানো। সেটা সম্ভব না হলেও শহরে কোনোভাবেই বাড়ানো হবে না। আসনভিত্তিক উন্নয়ন বৈষম্য ঠেকাতেই এমন পরিকল্পনার কথা জানান কর্মকর্তারা। তাদের মতে, শহরাঞ্চল যেহেতু ঘনবসতিপূর্ণ, তাই ভোটার সংখ্যা বা জনসংখ্যার বিবেচনায় আসন নির্ধারণ করলে একসময় দেখা যাবে একটি জেলার সমান ঢাকা সিটির একটি ওয়ার্ড হয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলের আসন কমে যাবে এবং সেখানে উন্নয়ন বরাদ্দ কম হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন প্রশাসনিক এলাকা এবং বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোকে সমন্বয় করতে একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্বিন্যাস করতে হচ্ছে। সর্বশেষ আদমশুমারি প্রতিবেদন অনুযায়ী পরবর্তী জাতীয় সংসদের আসনগুলোর সীমানা পুনর্বিন্যাসে আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দশম সংসদ নির্বাচনের সময় ৫৩টি আসনের সীমানা পরিবর্তন করা হয়েছিল। এরপর আর আদমশুমারি হয়নি। সংসদের বাইরে থাকা বিএনপির পক্ষ থেকে সম্প্রতি ১৯৮৪ সালের পদ্ধতিতে আসন বিন্যাসের প্রস্তাব দেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন ইসির জন্য সহজ হচ্ছে না বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে. এম. নুরুল হুদা বলেছেন, আঞ্চলিক অখণ্ডতা বজায় রাখা এবং প্রতিটি সংসদীয় এলাকার জন্য ভোটারসংখ্যার যথাসম্ভব সমতার ভিত্তিতে নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়া হবে। গ্রামের আসন যাতে না কমে সেদিকে নজর দেয়া হবে।

কে. এম. নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান ইসির প্রস্তাবিত রোডম্যাপে চলতি বছরের আগস্ট থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে সীমানা পুননির্ধারণের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ কাজ শুরুর আগে সীমানা নির্ধারণ আইন ও বিধিমালায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে কমিশন। বিশেষ করে নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ অধ্যাদেশ-১৯৭৬, বিদ্যমান ইংরেজি আইনটি বাংলায় রূপান্তর ও এর প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হচ্ছে। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী আদালতে বাতিল হয়ে যাওয়ার ফলে সীমানা নির্ধারণের নতুন আইন প্রণয়নও জরুরি।

নির্বাচন কমিশন সচিব মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, বিগত পাঁচ বছরে নতুন উপজেলা, পৌরসভাসহ সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়ন পরিষদে কিছু প্রশাসনিক এলাকা যুক্ত হয়েছে। বিদ্যমান প্রশাসনিক ইউনিটও পরিবর্তন হয়েছে। আবার ২০১৫ সালে ঐতিহাসিক বাংলাদেশ-ভারত স্থলসীমানা চুক্তির ফলে ছিটমহলগুলো বিলুপ্ত হয়ে নতুন কিছু ইউনিয়ন জন্ম নিয়েছে। এসব বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সংসদীয় আসনগুলোতে ভোটারসংখ্যায় ব্যাপক তারতম্য রয়েছে। এবারের সীমানা পুননির্ধারণে এই তারতম্য যতদূর সম্ভব কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, বড় সিটিগুলোতে মানুষ বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যমান আইন অনুসারে জনসংখ্যা বা ভোটারসংখ্যার সমতা রেখে সংসদীয় আসনে পরিবর্তন আনতে গেলে ঢাকা জেলায় বর্তমানের ২০টি থেকে আসন কয়েকটি বাড়াতে হতে পারে। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলায়ও তাই। অন্যদিকে কমতে পারে পটুয়াখালী, পিরোজপুরসহ কয়েকটি জেলার আসনসংখ্যা। এছাড়া একই জেলার মধ্যে অনেক আসনের সীমানাও পাল্টে যেতে পারে।

এসব বিবেচনায় নিয়ে কমিশন মনে করছে, মহানগর এলাকা এবং গ্রামাঞ্চলের জন্য আসনপ্রতি ভোটারসংখ্যা একরূপ হবে না। মহানগরী এলাকার একটি আসনের জন্য পাঁচ লাখ ভোটার নির্ধারিত হলেও গ্রামের একটি আসনের জন্য এই সংখ্যা হবে সর্বোচ্চ তিন লাখ। এতে শহর ও গ্রামের আসনে ভারসাম্য আনা সম্ভব হবে। উন্নয়ন বরাদ্দের বৈষম্যও কমানো যাবে। শহরে সরকারি-বেসরকারি নানা উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হলেও গ্রামাঞ্চলের আসনগুলোতে একই পরিমাণ বরাদ্দ থাকে না।

সাবেক সিইসি ড. এটিএম শামসুল হুদাও বর্তমান কমিশনের এই পরিকল্পনা সমর্থন করে বলেছেন, গ্রামাঞ্চলের মানুষ তাদের কর্মসংস্থানসহ নানা কারণে বড় শহরে চলে আসে। এ কারণে বড় শহরগুলোর জনসংখ্যা ও ভোটার ক্রমশ বাড়ছে। তাই বিদ্যামান আইন সংশোধনের পক্ষে মত দিয়ে তিনি বলেন, জনসংখ্যাকে গুরুত্ব দিতে গেলে বড় শহরে আসনসংখ্যা বাড়বে। কমবে গ্রামের আসন। কিন্তু উন্নয়নের স্বার্থে গ্রামের আসন কমানো উচিৎ নয়। এ সমস্যা সমাধানের জন্য সংসদের আসন সংখ্যা আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

এ ব্যাপারে পূর্ববর্তী কমিশনের সদস্য মোঃ শাহনেওয়াজ বলেন, দশম সংসদ নির্বাচনের আগেও একই বিবেচনায় গ্রামের আসন যাতে না কমে তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসন পুনর্বিন্যাস করা হয়েছিল। বিদ্যমান আইন সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা সমর্থন করে তিনি বলেন, এই আইনটি যুগোপযোগী করা প্রয়োজন। কেননা আসনবিন্যাসের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিৎ সমহারে সবার প্রতিনিধিত্ব যাতে সংসদে নিশ্চিত করা যায়।

১৯৭৩ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ৮টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ জেলার সাতটি আসন ছিল। এর মধ্যে হোসেনপুর ও পাকুন্দিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত ছিল কিশোরগঞ্জ-১ আসন, কটিয়াদী উপজেলা নিয়ে গঠিত ছিল কিশোরগঞ্জ-২ আসন, কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত ছিল কিশোরগঞ্জ-৩ আসন, করিমগঞ্জ ও তাড়াইল উপজেলা নিয়ে গঠিত ছিল কিশোরগঞ্জ-৪ আসন, ইটনা, অষ্টগ্রাম ও মিঠাইন উপজেলা নিয়ে গঠিত ছিল কিশোরগঞ্জ-৫ আসন, নিকলী ও বাজিতপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত ছিল কিশোরগঞ্জ-৬ আসন এবং ভৈরব ও কুলিয়ারচর উপজেলা নিয়ে গঠিত ছিল কিশোরগঞ্জ-৭ আসন।

কিন্তু ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জেলার ঐতিহ্যবাহী কিশোরগঞ্জ-১ আসনটি বিলুপ্ত করে দিয়ে তৎকালীন নির্বাচন কমিশনার জেলার নির্বাচনী এলাকাকে পুনর্বিন্যাস করার নামে ৭টির পরিবর্তে ৬টি সংসদীয় আসনে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

আসন কমাতে গিয়ে পূর্ববর্তি কিশোরগঞ্জ-১ আসনের দুইটি উপজেলার মধ্যে হোসেনপুরকে কিশোরগঞ্জ সদরের সাথে যুক্ত করে পুনর্বিন্যস্ত কিশোরগঞ্জ-১ আসন এবং পাকুন্দিয়া উপজেলাকে কটিয়াদী উপজেলার সাথে যুক্ত করে কিশোরগঞ্জ-২ আসন করা হয়।

সূত্র : বাড়তে পারে কিশোরগঞ্জের সংসদীয় আসন সংখ্যা  [কিশোরগঞ্জ নিউজ, ৮ জুলাই ২০১৭]