বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল শুধু নদী ও বন্যার গল্পে সীমাবদ্ধ নয়; এখানে লুকিয়ে আছে শত বছরের জীবিকা ও সংগ্রামের অনন্য ইতিহাস। একসময় গোবরের লাকড়ি, খরস্রোতা নদীতে জেলেপেশা, কিংবা মৌসুমি কৃষিকাজ—এসবের ভেতরেই গড়ে উঠেছিল হাজারো মানুষের জীবনযাত্রা। আধুনিকতার ঢেউয়ে অনেক পেশাই আজ বিলুপ্তপ্রায়। সেই হারানো ঐতিহ্য ও টিকে থাকা সংগ্রামের গল্প নিয়ে শুরু হয়েছে নিকলীকেন্দ্রিক প্রথম অনলাইন সংবাদমাধ্যম “আমাদের নিকলী ডটকম”-এর ধারাবাহিক ফিচার প্রতিবেদন—“হাওরাঞ্চলের ব্যতিক্রমী জীবিকা”। আজ থাকছে “ড্যাফের নাড়ু—ঝলমলে রঙিন শৈশবের মিষ্টি প্রতিচ্ছবি”
মোহাম্মদ তোফায়েল আহছান ।।
বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা। একসময় হাওর, বিল, পুকুর, দিঘি কিংবা অজস্র জলাশয়ে চোখ রাখলেই দেখা মিলত সাদা ও লাল বা গোলাপি রঙের শাপলা ফুলের। বর্ষা থেকে শরৎকাল পর্যন্ত জলময় প্রকৃতিকে সাজিয়ে রাখত এই ফুল। এখন আর আগের মতো দেখা যায় না; কৃষিজমি সম্প্রসারণ, জলাশয় ভরাট, জমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে শাপলার বিস্তার অনেকটা সীমিত হয়ে পড়েছে। তবুও দেশের কিছু অঞ্চলে—বিশেষ করে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, গোপালগঞ্জ বা গাইবান্ধার হাওর ও বিলাঞ্চলে এবং দক্ষিণাঞ্চলের কিছু এলাকায়—এখনো বর্ষায় শাপলার দিগন্তজোড়া সৌন্দর্য মানুষকে টানে দূর-দূরান্ত থেকে। অনেকেই শুধু শাপলা দেখতে হাওরে নৌকাভ্রমণে বের হন, ছবি তোলেন, উপভোগ করেন প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম মুহূর্তগুলো।
শাপলা শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এটি গ্রামীণ জীবনের অংশ। শাপলার ডাঁটা খেতে যেমন সুস্বাদু, তেমনি পুষ্টিগুণেও ভরপুর। ডাঁটার বাইরের আঁশ ছাড়িয়ে কাঁচা খাওয়া যায়, আবার রান্না করেও খাওয়া হয়—চিংড়ি, শুটকি কিংবা সরিষার তেল-মসলা দিয়ে তৈরি করা হয় নানা পদ। এখনো গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত বাজারে শাপলার ডাঁটা বিক্রি হয়, যা দিয়ে মুখরোচক খাবার তৈরি করে বহু পরিবার। শাপলার ডাঁটা যেমন পরিচিত খাদ্য, তেমনি এর ফল—যাকে হাওরাঞ্চলে বলা হয় ‘ড্যাফ’, কিছু এলাকায় ‘ঢ্যাপ‘ বা ‘ভেট’—তা থেকেও তৈরি হয় এক বিশেষ ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘ড্যাফের নাড়ু’ বা ‘মোয়া’। স্থানীয়ভাবে বলা হয় ‘ড্যাফের লাড়ু’।

ড্যাফ ফল: জলের ভেতর জন্ম নেওয়া এক অনন্য উপহার
ড্যাফ দেখতে অনেকটা ছোট, গোলাকার ফলের মতো। কাঁচা অবস্থায় এর রঙ হালকা সবুজ, আর পেকে গেলে গাঢ় বাদামি বা ছাই রঙ ধারণ করে। পানির নিচে ডুবে থাকা এই ফলগুলোর মাথায় থাকে শুকনো ফুলের ডাঁটা, যা থেকে বোঝা যায় কোনটি নতুন আর কোনটি পাকা। সাধারণত বর্ষার শেষে, অর্থাৎ আশ্বিন-কার্তিক মাসে (সেপ্টেম্বর–অক্টোবর) যখন শাপলা ফুল ঝরে যায়, তখন এই ফল ধীরে ধীরে পরিপক্ব হয়ে ওঠে। জল কমে এলে গ্রামের নারী-পুরুষ, কিশোর-কিশোরীরা নৌকা নিয়ে হাওরে নামে—হাতে বাঁশের উড়া বা ঝুড়ি। পানির নিচে হাত ঢুকিয়ে ড্যাফ সংগ্রহ করে।
একটি ড্যাফ ফলের ভেতরে থাকে অগণিত ক্ষুদ্র বীজ, যা দেখতে অনেকটা সরিষা বা তিসি বীজের মতো। পাকা ফলের খোসা ছাড়ালে দেখা যায় ভেতরে সাদা মণ্ডের মতো এক প্রাকৃতিক শাঁস, যার মধ্যে ছড়িয়ে থাকে বীজগুলো। এই বীজই হলো হাওরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ‘ড্যাফ খই’ বা ‘ড্যাফ নাড়ু’ বানানোর মূল উপাদান।
সংগ্রহের পর ফলগুলো প্রথমে ভেঙে বীজ আলাদা করা হয়। তারপর পরিষ্কার করে বড় ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে মাদুরে মেলে রোদে শুকানো হয় দুই থেকে তিন দিন। রোদে শুকানোর সময় বীজগুলো ধীরে ধীরে চকচকে হয়ে ওঠে, আর তখনই সেগুলো ভাজার উপযুক্ত হয়। শুকনো বীজগুলো মাটির চুলায় বা লোহার কড়াইয়ে সামান্য বালু দিয়ে গরম করে ভাজা হয়। এই সময় চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে এক বিশেষ সুগন্ধ, যা গ্রামাঞ্চলের রান্নাঘরকে ভরে তোলে এক মিষ্টি ঘ্রাণে।
ভাজার সময় বীজগুলো ফুলে ওঠে, ছোট ছোট খইয়ের মতো মচমচে দানায় রূপ নেয়। হাওরাঞ্চলের স্থানীয় ভাষায় একে বলা হয় ‘ড্যাফের খই’। এই খই যেমন খেতে হালকা ও সুস্বাদু, তেমনি এতে থাকে প্রাকৃতিক প্রোটিন, খাদ্যআঁশ, ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স ও খনিজ উপাদান—যা শরীরের জন্য উপকারী। আগে গ্রামাঞ্চলে অনেক শিশু এই খই পকেটে ভরে সারাদিন খেলাধুলা করত, আর মুঠে মুঠে খেতো।
গ্রামীণ চিকিৎসক বা বয়স্করা বলতেন, “ড্যাফের বীজে আছে গরমে ঠান্ডা ভাব আনে এমন শক্তি, আর শরীরকে রাখে হালকা।” যদিও বৈজ্ঞানিকভাবে এখনো এর পূর্ণ পুষ্টিগত বিশ্লেষণ হয়নি, স্থানীয় অভিজ্ঞতা বলে—এটি একধরনের প্রাকৃতিক স্বাস্থ্যকর খাদ্য, যা দীর্ঘসময় সংরক্ষণ করা যায় এবং শিশুখাদ্য হিসেবেও নিরাপদ।
একসময় বর্ষা শেষে এ কাজে সংশ্লিষ্ট অনেকের বাড়ির উঠানে দেখা যেত ড্যাফ শুকানোর দৃশ্য—উঠানে মাটিতে বিছানো শীতলপাটি বা বড় পলিথিনের ওপর ছড়িয়ে রোদে শুকোচ্ছে বীজ, পাশে বসে গ্রামের নারীরা গল্প করছেন, শিশুদের কেউ কেউ বীজ নেড়েচেড়ে দেখছে। এ যেন এক জীবন্ত চিত্র—যেখানে হাওরের প্রকৃতি, খাদ্যসংস্কৃতি ও মানুষের জীবন একাকার হয়ে গেছে।

ড্যাফের নাড়ু তৈরির ঐতিহ্য
শুকনো বীজ ভেজে শুধু খই তৈরিই নয়, এসব বীজ দিয়েই তৈরি হতো ঐতিহ্যবাহী ‘ড্যাফের নাড়ু’ বা ‘মোয়া’। রোদে নিখুঁতভাবে শুকানো ড্যাফের বীজ প্রথমে মাটির চুলায় গরম তাওয়ায় ভেজে নেওয়া হতো। ভাজার সময় একে একে বীজগুলো ফুটে সাদা রঙ ধারণ করে তাওয়ার চারপাশে ছুটোছুটি করতো। গন্ধে আশপাশ ভরে উঠতো—সেই ঘ্রাণ পুরো উঠান পেরিয়ে আশপাশে ছড়িয়ে পড়ত। এরপর আলাদা করে তৈরি করা হতো ঘন গুড়ের সিরা। খেজুরগুড় বা আখের গুড় জ্বাল দিয়ে টানটানভাবে নামিয়ে নেওয়ার পর বড় মাটির পাত্রে খই মিশিয়ে দ্রুত দলা পাকানো হতো, কারণ সিরা ঠাণ্ডা হয়ে গেলে আর আঠালো থাকে না। চিড়া, মুড়ি কিংবা অন্য নাড়ু বা মোয়ার মতো গোলাকার করে বানানো হতো না ড্যাফের নাড়ু। কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ড্যাফের নাড়ু বানানোর ছিল ভিন্ন ধরন—এখানে ড্যাফের খই এবং গুড়ের সিরা মিশিয়ে বিশাল আকারের নাড়ুর দলা বানিয়ে টিনের বাক্স কিংবা পরিষ্কার পলিথিনে মুড়িয়ে রাখা হতো। পরে সেগুলো ছুরি দিয়ে কেটে টুকরো করে কেজি দরে কিংবা চোখের আন্দাজে বিক্রি করা হতো, যেন বড় এক মিষ্টির স্তূপ থেকে কেটে নেওয়া সুস্বাদু অংশ।
বর্ষা শেষে পানি কমতে শুরু করলে, শীত পড়ার আগেই এই অঞ্চলের কোনো কোনো পাড়ায় শুরু হতো ড্যাফের নাড়ু বানানোর ব্যস্ততা। গ্রামীণ সেই পরিবারগুলো পুরো মৌসুম ধরে এই কাজ করত—কেউ মনে করত এটি অতিরিক্ত আয়, আবার কারো কাছে এটি ছিল বংশ পরম্পরায় চলা এক ঋতুভিত্তিক পেশা। নিকলী, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও ইটনা উপজেলা—এই সব এলাকা একসময় ড্যাফের নাড়ু উৎপাদনের জন্য পরিচিত ছিল। স্থানীয় হাটে শীতকালের বাজারে নাড়ুর দলা পাকানো পলিথিনের প্যাকেট সাজানো থাকত, আর ক্রেতারা দূর-দূরান্ত থেকে এই বিশেষ মিষ্টি কিনতে আসতেন।

ড্যাফের নাড়ু: হাওরের মিষ্টি ঐতিহ্য ও মৌসুমভিত্তিক অর্থনীতি
একসময় হাওরাঞ্চলের অর্থনীতিতে ড্যাফের নাড়ু ক্ষুদ্র হলেও গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা পালন করত। বর্ষার শেষে, যখন জল ধীরে ধীরে কমে যেত, তখনই শুরু হতো ড্যাফ ফল সংগ্রহের মৌসুম। কিশোর-কিশোরী, নারী-পুরুষ অনেকেই নৌকা নিয়ে নামতেন হাওরে—কেউ ফল তুলছেন, কেউ রোদে শুকাচ্ছেন, কেউ আবার বাজারে বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এই ফল থেকেই তৈরি হতো হাওরের জনপ্রিয় মৌসুমি খাদ্য—‘ড্যাফের নাড়ু’।
ড্যাফ সংগ্রহ থেকে শুরু করে বীজ আলাদা করা, শুকানো, ভাজা, সিরা তৈরি এবং শেষ পর্যন্ত নাড়ু বানানো—পুরো প্রক্রিয়াই ছিল অত্যন্ত পরিবারকেন্দ্রিক। নারীরা সাধারণত বীজ পরিষ্কার, শুকানো ও নাড়ু বানানোর দায়িত্ব পালন করতেন; পুরুষরা জলাশয় থেকে ড্যাফ সংগ্রহ করতেন, বানানোর পর নাড়ু বাজারে বিক্রি করতেন; আর শিশু-কিশোররা বীজ আলাদা করা বা শুকানোর কাজে সাহায্য করত। তবে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ড্যাফ উৎপাদন বা সংগ্রহের পরিমাণ অপ্রতুল হওয়ায় দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে কিনে আনা হতো ড্যাফের বীজ। কাজের পরিবেশ ছিল উৎসবের মতো—গোটা পরিবারকে একসঙ্গে পাওয়া যেত উঠানে, মাটির চুলায় কড়াই বসানো, গুড় জ্বাল দেওয়া, বড় পলিথিনের প্যাকেট বা টিনে নাড়ু সাজানো—সবই গ্রামীণ জীবনের এক উষ্ণ, মায়ামাখা দৃশ্য।
ড্যাফের নাড়ু শুধু একটি খাবার ছিল না; এটি ছিল এক সামাজিক আনন্দ-আয়োজন। শীত আসার সঙ্গে সঙ্গে এই নাড়ু বিক্রি হতো স্থানীয় হাটে, মেলায়, পূজা-পার্বণে। মুড়ির নাড়ু, চিড়ার নাড়ু, মুড়ালি, কটকটি—এসবের সঙ্গে ড্যাফের নাড়ু ছিল আলাদা আকর্ষণ। বিশেষত কিশোরগঞ্জের নিকলী, মিঠামইন, ইটনা বা অষ্টগ্রামের গ্রামীণ বাজারে নাড়ুর দোকানগুলোতে সারিবদ্ধভাবে দেখা যেত ছোট ছোট টিনের বাক্সে সাজানো বা বড় পলিব্যাগের ভেতর দলা পাকানো ড্যাফের নাড়ু, যেগুলো একবার দেখলে কিনে না নিয়ে পারা যেত না।

ড্যাফের নাড়ু তৈরিতে বেশি মূলধন লাগত না; কিন্তু চাহিদা ছিল প্রচুর। তাই কোনো কোনো পরিবার মৌসুমে এই নাড়ু তৈরি করে বিক্রি করতেন, যা দিয়ে তারা কিছুটা বাড়তি আয় করতে পারতেন। এই নাড়ু বিক্রি করে পরিবারের দৈনন্দিন খরচ, সন্তানের পড়ালেখার উপকরণ, এমনকি শীতের পোশাকও জোগাড় হতো। এক অর্থে এটি ছিল হাওরাঞ্চলের নারীদের হাতে তৈরি এক ছোট উদ্যোক্তা উদ্যোগ—যেখানে শ্রম, ঐতিহ্য ও স্বাদ একসঙ্গে মিলেমিশে যেত।
শুধু অর্থনৈতিক নয়, আবেগিক দিক থেকেও ড্যাফের নাড়ু ছিল হাওর ও গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজও বয়স্ক মানুষদের মুখে শোনা যায়—“সেই সময়, শীতে উঠানে চুলার পাশে বসে গরম নাড়ু খাওয়ার মতো সুখ আর কোথাও ছিল না।” শিশুরা মুঠোভর্তি নাড়ু নিয়ে খেলতে খেলতে খেতো, মুখে মিষ্টি গুড়ের স্বাদ আর ভাজা বীজের ঘ্রাণ মিশে থাকত অনেকক্ষণ। স্থানীয়ভাবে তৈরি হলেও, এর স্বাদ ও পুষ্টিগুণের কারণে এটি ছিল একসময় হাওরাঞ্চলের প্রিয় ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোর একটি।
এখন হয়তো সেই চিত্র আগের মতো নেই—বড় হাট-বাজারে ড্যাফের নাড়ু খুব কমই দেখা যায়। তবুও, শীতের সকালে কোনো হাওরপাড়ের গ্রামে গেলে এখনো পাওয়া যায় সেই পুরনো গন্ধ—চুলার পাশে শুকোতে থাকা গুড়ের সিরা আর ভাজা বীজের মিষ্টি ঘ্রাণ, যা মনে করিয়ে দেয় এক সময়ের হাওরের জীবন্ত ঐতিহ্য, এক মিষ্টিমুখ স্মৃতি—ড্যাফের নাড়ু।

মিষ্টি গন্ধে ভরা শৈশবের স্মৃতি
শীতের আগমনে একসময় কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল ভরে উঠত গুড়ের মিষ্টি ঘ্রাণে। তার ঠিক আগেই শুরু হতো শাপলার ফল ড্যাফ সংগ্রহ করা, শুকিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে খই এবং নাড়ু বানানোর জন্য উপযুক্ত করে তোলা। এরপর উঠানে পাটের বস্তা বিছিয়ে নারীরা বসতেন নাড়ু বানাতে। পাশে জ্বলত মাটির চুলা, ফুটত গুড়ের সিরা, আর বাতাসে ভেসে বেড়ানো ভাজা ড্যাফ বীজের গন্ধ। আজও সেই স্মৃতি আঁকড়ে ধরে আছেন নিকলীর ৬৫ বছর বয়সী সবুজ মিয়া। তিনি বলেন, আমাদের ছোটবেলায় শীত এলেই পাড়া জুড়ে নাড়ুর গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত। সকালবেলা ড্যাফের বীজ ভেজে গুড়ের সিরা বানানো হতো। আমাদের বাড়িতে বানানো প্রথম গরম নাড়ুটা সব সময় আমিই পেতাম। সেই নাড়ুর স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে—গুড়ের মিষ্টি, ভাজা বীজের গন্ধ। তখন দোকানে কিছু কিছু চকলেট থাকলেও, ড্যাফের নাড়ুই ছিল আমাদের মিষ্টি।
ড্যাফ ফল শুকিয়ে বীজ ভাজা, তারপর গুড়ের সিরায় মিশিয়ে হাত দিয়ে গড়া—এই পুরো প্রক্রিয়াই ছিল স্থানীয় নারীদের মৌসুমি কাজ। কোনো কোনো পুরুষও এ কাজে হাত লাগাতেন। নিকলী সদরের পূর্বগ্রামের গৃহিণী শাহিদা খাতুন সেই সময়ের কথা মনে করে বলেন, বর্ষা শেষ হলে বাড়ির মহিলারা মিলে একসাথে নাড়ু বানাতাম। উঠানে বাঁশের কিংবা বেতের পাটি বিছিয়ে বসে সবাই মিলে কাজ করতাম। পোলাপান এসে ভিড় করত, কেউ নাড়ু খেতে চাইতো। বাড়ির পুরুষেরা বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে গেলে ভালো দাম পেতাম। নাড়ু বিক্রির টাকায় চাল, লবণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে পারতাম। তখন নাড়ু বিক্রির টাকা মানে ছিল বাড়তি আয়। স্থানীয়ভাবে তৈরি হলেও, ড্যাফের নাড়ুর ছিল বিশেষ চাহিদা। শীতের হাটে বা মেলায় মুড়ির নাড়ু, চিড়ার নাড়ু, কটকটির সঙ্গে এটি ছিল অন্যতম আকর্ষণ।

মিঠামইনের হাটে তখন ড্যাফের নাড়ু ছিল ক্রেতাদের প্রিয় খাবার। স্থানীয় ব্যবসায়ী রবি দাস বলেন, আমার দোকানে নানা রকম নাড়ু বিক্রি হতো—মুড়ির, চিড়ার, কটকটি—কিন্তু ড্যাফের নাড়ুর আলাদা কদর ছিল। অনেকে শুধু সেটাই কিনতে আসত। শীতের মেলায় আমার দোকানের সামনে ভিড় লেগেই থাকত। অনেকে হাওর থেকে শহরে ফেরার পথে উপহার হিসেবে প্যাকেট করে নিয়ে যেত। ড্যাফের নাড়ু সারা বছর পাওয়া যায় না। কারণ এটা শাপলার ড্যাফের ফল থেকে বানানো হয়। শাপলার ড্যাফ পাওয়া যায় মাত্র কয়েক মাস। তাও আবার একেবারে অল্প। এজন্য খুব কম সময় পাওয়া যেত। এখনো ড্যাফের নাড়ু বিক্রি হয়। আগের তুলনায় শাপলা যেমন কমে গেছে, তেমনি নাড়ুর পরিমাণও আরো অনেক কমে গেছে।
হাওরাঞ্চলের শিশুদের জন্য ড্যাফের নাড়ু ছিল একরকম পুরস্কার ও আনন্দের প্রতীক। মিঠামইনের স্কুলশিক্ষিকা সালমা আক্তার বলেন, শৈশবে শীতের ছুটিতে নানাবাড়ি যেতাম। নানু বাড়িতে আমাদের জন্য ড্যাফের নাড়ু বানাতেন। আমরা ভাইবোনেরা খেলতে খেলতে গরম কমে এলে তাজা নাড়ু খেতাম। হাতে লেগে থাকত গুড়ের আঠা, মুখে লেগে থাকত হাসি। এখনো সেই গন্ধ পেলেই মনে হয়, আমি আবার শৈশবে ফিরে গেছি।
ড্যাফের নাড়ু শুধু একটি মিষ্টান্ন নয়—এটি ছিল সামাজিক বন্ধনের প্রতীক। ইটনার প্রবীণ শিক্ষক হরিপদ বর্মণ বলেন, ড্যাফের নাড়ু আমাদের সংস্কৃতির অংশ ছিল। কারো বাড়িতে অতিথি এলে, পূজায় কিংবা বৈকালিক আড্ডায় নাড়ু দিয়েই শুরু হতো আপ্যায়ন। কেউ নাড়ু বানালে পাশের বাড়িতেও কিছু না কিছু পাঠাতো। স্কুলেও শিশুদের ভালো কাজ বা পড়াশোনার জন্য ছোট্ট পুরস্কার হিসেবে এক মুঠো নাড়ু দিতাম। শীতের কুয়াশায় উঠানে মেয়েরা নাড়ু বানাচ্ছে—ওই দৃশ্য ছিল হাওরাঞ্চলের জীবন্ত প্রতীক।
আজ হাওরের জলাশয় আগের মতো নেই। শাপলা ফুলের বিস্তার কমেছে, ফলে ড্যাফ ফলও আর তেমন সহজে মেলে না। তার সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে ড্যাফের নাড়ু বানানোর ঐতিহ্যও। তবুও, হাওরের প্রবীণদের স্মৃতিতে এই নাড়ু এখনো টিকে আছে—এক মিষ্টি গন্ধ, এক হারিয়ে যাওয়া স্বাদের গল্প হিসেবে। ড্যাফের নাড়ু শুধু খাদ্য নয়, এটি হাওরাঞ্চলের মানুষের শ্রম, সৃজনশীলতা ও সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। আধুনিকতার ঢেউ যখন পুরনো গ্রামীণ ঐতিহ্যগুলো মুছে দিচ্ছে, তখন ড্যাফের নাড়ু আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একসময় মাটির ঘ্রাণে, গুড়ের মিষ্টিতে, আর পরিশ্রমে গড়া ছিল জীবনের আসল স্বাদ।

বছরপ্রতি ড্যাফ বা ভেট সংগ্রহের পরিসংখ্যান!
সারা দেশে বা নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় প্রতিবছর কি পরিমাণ শাপলার ড্যাফ বা ভেট সংগ্রহ করা হয় তার কোনো তথ্য বা পরিমাপ জানা যায়নি। ড্যাফ বা ভেট সংগ্রহের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও জাতীয় পর্যায়ের পরিসংখ্যান না থাকার প্রধান কারণ হলো—এটি মূলত অবাণিজ্যিক, স্থানীয় এবং পরিবার-ভিত্তিক সংগ্রহপ্রক্রিয়া। হাওর, বিল, জলাশয় বা নিম্নাঞ্চলের মানুষ বহুকাল ধরে ড্যাফ সংগ্রহ করে এলেও এটি কখনোই কৃষিপণ্যের মতো বাণিজ্যিক ফসল বা মৎস্যসম্পদের মতো নিয়ন্ত্রিত সম্পদ হিসেবে নিবন্ধিত হয়নি। ফলে সরকারি কোনো সংস্থার বাধ্যতামূলক রিপোর্টিং, এলাকায় এলাকায় হিসাব সংগ্রহ বা বার্ষিক উৎপাদন হিসাব রাখার প্রয়োজন পড়েনি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিশু-কিশোর থেকে নারী–পুরুষ—স্থানীয় মানুষ নিজেরা খাওয়ার জন্য, কিছুটা বাজারে বিক্রি বা হাটে বিনিময়ের জন্য মৌসুমি ভিত্তিতে ড্যাফ সংগ্রহ করতেন; এই ক্ষুদ্র পরিসরের অর্থনীতিকে কখনোই আলাদা সেক্টর হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। এ কারণে পরিসংখ্যান বুলেটিন, কৃষি জরিপ, মৎস্য পরিসংখ্যান, কিংবা বন্যজ সম্পদ জরিপ—কোথাও ড্যাফের আলাদা ক্যাটাগরি তৈরি হয়নি।
আরেকটি বাস্তব কারণ হলো—জলাশয়ের প্রকৃতি, মৌসুমি পরিবর্তন ও শাপলার বিস্তৃতি প্রতি বছর ভিন্ন হয়। কোথাও পানির স্তর বাড়ে, কোথাও কমে; কোথাও শাপলা স্বাভাবিকভাবে জন্মায়, আবার কোথাও কৃষি বা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কমে যায়। স্থানীয়ভাবে ড্যাফ সংগ্রহের ধরনও অনিয়মিত—কখনো পরিবারভেদে সংগ্রহের পরিমাণ আলাদা, কখনো আবহাওয়ার কারণে উৎপাদন কম-বেশি হয়। বাজারেও এটি এমন কোনো পণ্য নয় যার বিপুল পরিমাণ যোগান–চাহিদা থাকে বা যার দাম ওঠানামা নজরদারি করা হয়। তাই গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা সরকারি পরিসংখ্যান ব্যুরো কোনো সময়ই এটিকে পরিমাপযোগ্য অর্থনৈতিক ফসল হিসেবে ট্র্যাক করেনি। ফলে ড্যাফ সংগ্রহের বার্ষিক পরিমাণ এখনো লোকজ জ্ঞানের অংশ হিসেবে রয়ে গেছে—কাগজে–কলমে, সরকারি ডাটায় বা গবেষণালব্ধ নথিতে স্থান করে নিতে পারেনি।

বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাবনা
বর্তমানে দেশে জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হওয়ায় শাপলার বিস্তার উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। কৃষিজমিতে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, জলাবদ্ধতা, জলাশয় ভরাট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া শাপলার পরিমাণ আগের তুলনায় অনেক কম। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শাপলার ফল ড্যাফ বা ভেট সংগ্রহে। যে হাওর ও বিলাঞ্চলে মৌসুমজুড়ে প্রচুর ড্যাফ পাওয়া যেত, সেসব জায়গায় এখন ফল সংগ্রহ মৌসুমি বৈচিত্র্য ও পরিবেশগত অনিশ্চয়তার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে ড্যাফের সহজলভ্যতা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ফল দিয়ে তৈরি ঐতিহ্যবাহী খাবার ড্যাফের নাড়ুও একটি বিলুপ্তপ্রায় লোকজ মিষ্টান্নে পরিণত হচ্ছে।
তবু কিছু অঞ্চলে এখনো বয়স্করা ঐতিহ্যের প্রতি টান থেকে নিজের হাতে ড্যাফ শুকিয়ে, ভেজে, গুঁড়ে মেখে নাড়ু তৈরি করেন। বেশিরভাগ সময় এগুলো স্থানীয় হাটে বা গ্রামের ভিতরের ক্ষুদ্র দোকানে সীমিত পরিসরে বিক্রি হয়। এটি গ্রামবাংলার অনেকের কাছে এখন একধরনের স্মৃতিকাতর খাবার—শৈশব, পরিবার ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্বাদের প্রতীক।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে উদ্যোগ নেওয়া হলে এই ঐতিহ্যকে নতুনভাবে বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব। স্থানীয় উদ্যোক্তারা যদি ড্যাফ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণকে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে পরিচালনা করেন, পাশাপাশি আধুনিক প্যাকেজিং, উপাদানের পুষ্টিগুণ প্রচার, অনলাইন–বাজারজাতকরণ এবং নিবন্ধিত ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোগের মাধ্যমে বাজারে আনেন—তবে ড্যাফের নাড়ু দেশীয় মিষ্টান্ন শিল্পে নতুন বৈচিত্র্য যোগ করতে পারে। ঐতিহ্য ও স্থানীয় কৃষিপণ্যের ওপর ভিত্তি করে সৃজিত এ ধরনের পণ্য শুধু অর্থনীতিকেই চাঙা করবে না, গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থানেও ভূমিকা রাখতে পারে।
শাপলা শুধু বাংলাদেশের জাতীয় ফুল নয়—এটি গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এক সাংস্কৃতিক স্মারক। সেই শাপলা থেকেই জন্ম নেওয়া ‘ড্যাফের নাড়ু’ হাওরাঞ্চলের লোকজ খাদ্যঐতিহ্যের একটি মিষ্টিমুখ ইতিহাস, যা আজো মানুষের স্মৃতিতে টিকে আছে স্বাদ, শ্রম আর আন্তরিকতার এক সরল রূপ হিসেবে। সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নেয়া হলে এর মাধ্যমে গ্রামবাংলার একটি পুরোনো খাদ্যসংস্কৃতি আধুনিকতার ছোঁয়া পেয়ে আবার ফিরতে পারে নতুন প্রজন্মের আকর্ষণীয় খাবারের ঝুলিতে।
লেখক: সংবাদমাধ্যম কর্মী



