বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল শুধু নদী ও বন্যার গল্পে সীমাবদ্ধ নয়; এখানে লুকিয়ে আছে শত বছরের জীবিকা ও সংগ্রামের অনন্য ইতিহাস। একসময় গোবরের লাকড়ি, খরস্রোতা নদীতে জেলেপেশা, কিংবা মৌসুমি কৃষিকাজ—এসবের ভেতরেই গড়ে উঠেছিল হাজারো মানুষের জীবনযাত্রা। আধুনিকতার ঢেউয়ে অনেক পেশাই আজ বিলুপ্তপ্রায়। সেই হারানো ঐতিহ্য ও টিকে থাকা সংগ্রামের গল্প নিয়ে শুরু হয়েছে নিকলীকেন্দ্রিক প্রথম অনলাইন সংবাদমাধ্যম “আমাদের নিকলী ডটকম”-এর ধারাবাহিক ফিচার প্রতিবেদন—“হাওরাঞ্চলের ব্যতিক্রমী জীবিকা”। আজ থাকছে “হাওরাঞ্চলের খেয়া–গুদারা: নদীর বুকে হারানো জীবনরেখা”
মোহাম্মদ তোফায়েল আহছান ।।
জলবেষ্টিত ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে অনন্য কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল। বছরের প্রায় অর্ধেক সময় এ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ থাকে থইথই পানির নিচে। বর্ষা মৌসুমে হাওরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে অগাধ জলরাশি, আর সেই পানিতেই জন্ম নেয় জীবিকার নতুন সম্ভাবনা। নদী ও হাওর থেকে আহরিত বিপুল পরিমাণ দেশি মাছ স্থানীয় জেলে ও ব্যবসায়ীদের হাত ধরে পৌঁছে যায় আড়তদারদের কাছে। এসব আড়ত থেকে মাছ সরবরাহ করা হয় দেশের বিভিন্ন বড় শহরের বাজারে। হাওরের জল তখন শুধু প্রকৃতির রূপই নয়, হাজারো মানুষের জীবিকাও ধারণ করে।
বর্ষা শেষে ধীরে ধীরে পানি সরে গেলে হাওরের চেহারা আমূল বদলে যায়। জলমগ্ন বিস্তীর্ণ ভূমি রূপ নেয় উর্বর কৃষিজমিতে। তখন শুরু হয় ব্যাপক চাষাবাদ। ধান এই অঞ্চলের প্রধান ফসল হলেও ভুট্টা, বাদামসহ নানা ধরনের মৌসুমী ফসল চাষ করা হয়। পাশাপাশি শীতকাল জুড়ে উৎপাদিত হয় প্রায় সব ধরনের সবজি। শুকনো মৌসুমে হাওরাঞ্চলের মানুষের কর্মব্যস্ততা বহুগুণে বেড়ে যায়। মাঠে মাঠে দেখা যায় কৃষকের প্রাণচাঞ্চল্য, ফসল ঘরে তোলার তৎপরতা।
পানি সরে গিয়ে জমি উন্মুক্ত হলেও নদীগুলোতে তখনও পানি প্রবাহমান থাকে। যদিও বর্তমান সময়ে অনেক ছোট নদী নাব্য সংকটে পড়েছে, একসময় এই নদীগুলো ছিল পুরোপুরি সজীব ও প্রবহমান। সারা বছর নদীপথেই চলাচল করতো মানুষ। এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যাতায়াতের প্রধান ও প্রায় একমাত্র বাহন ছিল নৌকা। মালামাল পরিবহন, কৃষিপণ্য আনা–নেওয়া কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজনে নদীই ছিল সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য যোগাযোগ মাধ্যম।
শুকনো মৌসুমে কাছাকাছি গ্রামে যাতায়াতের ক্ষেত্রে অনেকেই নদী পার হয়ে মাটির রাস্তা ধরে হেঁটে চলতেন। এতে একদিকে খরচ কম হতো, অন্যদিকে সময়ও বাঁচতো। কারণ পানি কমে গেলে নদীপথ হয়ে নৌকায় চলাচল করতে হতো আঁকাবাঁকা পথে ঘুরে ঘুরে, যা তুলনামূলকভাবে সময়সাপেক্ষ ছিল। কষ্ট সত্ত্বেও হেঁটে যাতায়াত করে মানুষ কিছুটা অর্থ সাশ্রয় করতে পারতেন, যা গ্রামীণ জীবনে ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য।
গুদারা বা খেয়া, হাওরাঞ্চলের অনন্য বৃত্তিমূলক পেশা
নদী পারাপারের জন্য হাওরাঞ্চলে গড়ে উঠেছিল এক অনন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা—খেয়া পারাপার। স্থানীয় ভাষায় খেয়া নৌকাকে বলা হতো ‘গুদারা’। নদীর দুই পাড়ের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংযোগ নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট স্থানে গড়ে উঠেছিল খেয়াঘাট। সাধারণত একজন মাঝি গুদারা বা খেয়া নৌকাটি পরিচালনা করতেন। যাত্রীরা নদীর দুই পাড়ে বসে থাকা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির কাছে নির্ধারিত ভাড়া পরিশোধ করে নৌকায় উঠতেন।
খেয়া পারাপারের ভাড়ার ক্ষেত্রেও ছিল ভিন্নধর্মী ব্যবস্থা। যারা ঘাটসংলগ্ন এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা এবং নিয়মিত কৃষিকাজের প্রয়োজনে নদী পারাপার করতেন, তারা প্রতিবার আলাদা করে ভাড়া দিতেন না। এসব পরিবার নির্দিষ্ট হারে বাৎসরিক ভাড়া পরিশোধ করতেন। কেউ কেউ কৃষি মৌসুম শেষে সংগৃহীত শস্য দিয়ে, আবার কেউ নগদ অর্থের মাধ্যমে সারা বছরের খেয়া বা গুদারা পারাপারের মূল্য পরিশোধ করতেন। এই ব্যবস্থাটি শুধু যোগাযোগ নয়, বরং পারস্পরিক বিশ্বাস, সামাজিক সম্পর্ক ও গ্রামীণ অর্থনীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবেই বিবেচিত হতো।

গুদারাঘাট ব্যবস্থাপনা
খেয়াঘাট বা গুদারাঘাট পরিচালনার ক্ষেত্রে সাধারণত স্থানীয় প্রশাসন কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য লিজ গ্রহণ করতে হতো। এই লিজের মেয়াদ কোথাও এক বছর, আবার কোথাও একাধিক বছরের জন্য নির্ধারিত থাকতো। লিজপ্রাপ্ত ব্যক্তিই মূলত খেয়া পারাপার পরিচালনা, মাঝি নিয়োগ, ভাড়া নির্ধারণ ও ঘাটের সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করতেন। আনুষ্ঠানিক লিজ প্রথার ফলে একদিকে যেমন স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকতো, তেমনি খেয়াঘাট পরিচালনায় একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে উঠতো।
তবে সব এলাকায় এই নিয়ম সমানভাবে মেনে হতো না। কোনো কোনো প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলে সরকারি অনুমতি বা আনুষ্ঠানিক লিজ ছাড়াই গুদারা বা খেয়াঘাট পরিচালনা করা হতো। এসব ক্ষেত্রে স্থানীয় নিয়মিত নৌকার মাঝি বা দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা নিজ উদ্যোগেই খাল বা নদী পারাপারে খেয়া পরিচালনা করতো। ফলে খেয়াঘাট পরিচালনার অধিকারকে অনেকটা দাতব্য কাজ, ক্ষেত্রবিশেষে দরিদ্র পরিবারে উপার্জনের সুযোগ হিসেবেও বিবেচনা করা হতো।
কখনো কখনো তুলনামূলক ছোট ও প্রত্যন্ত এলাকার খেয়া পরিচালনার জন্য স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বার কিংবা প্রশাসনিক দফতরের মৌখিক অনুমতি নেয়া হতো। এর ফলে কাজের মাঝে কোনো ঝুট-ঝামেলায় পড়লে সমাধানের জন্য দাফতরিক সহযোগিতা পাওয়া যেত। এসব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই খেয়াঘাটকেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনা একদিকে যেমন চলমান থাকতো, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ, সহযোগিতা আর স্থানীয় উপার্জনের ভারসাম্যও বজায় রাখার চেষ্টা করা হতো।
কিছু গুদারা বা খেয়া পারাপার ছিল পুরোপুরি কৃষিকাজকেন্দ্রিক। এসব খেয়া প্রধানত বড় নদী অতিক্রম করে চরাঞ্চলে যাতায়াতের জন্য ব্যবহার হতো। কারণ গুদারায় করে নদী পার হলেই চোখে পড়তো বিস্তীর্ণ খোলা প্রান্তর—যেখানে সারি সারি আবাদি জমি, মৌসুমি ফসল আর শাক–সবজির ক্ষেত থাকলেও কোনো স্থায়ী আবাসিক জনপদ ছিল না। এসব চরাঞ্চল মূলত হাওরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ ভাণ্ডার।
এই খেয়াগুলো দিয়ে নিয়মিত যাতায়াত করতেন কৃষক ও গৃহস্থ পরিবারের সদস্যরা। ধান রোপণ, নিড়ানি দেওয়া, ফসল তোলা কিংবা জমির দেখাশোনার জন্য তাদের প্রতিদিনই নদী পার হতে হতো। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের আনাগোনাও ছিল উল্লেখযোগ্য। এসব ব্যবসায়ী হাওরের বাথান থেকে গরুর দুধ, শাক–সবজি এবং অন্যান্য কৃষিজ পণ্য পাইকারি দরে কিনে এনে স্থানীয় বাজার বা দূরবর্তী এলাকায় বিক্রির জন্য সংগ্রহ করতেন। ফলে এসব গুদারা বা খেয়া পারাপার শুধু কৃষকদের নয়, বরং পুরো অঞ্চলের কৃষিভিত্তিক বাণিজ্য ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল।
ভাড়া পরিশোধের ক্ষেত্রেও ছিল পৃথক ব্যবস্থা। কৃষক ও গৃহস্থ পরিবারের লোকজন এসব খেয়া পারাপারের জন্য বাৎসরিক নির্দিষ্ট হারে ভাড়া পরিশোধ করতেন, যাতে প্রতিবার যাতায়াতে আলাদা করে অর্থ দিতে না হয়। অন্যদিকে ব্যবসায়ীসহ অনিয়মিত যাত্রীদের ক্ষেত্রে প্রতিবার নদী পারাপারের সময় নির্ধারিত ভাড়া পরিশোধের নিয়ম ছিল। এই ভিন্নধর্মী ভাড়া কাঠামো স্থানীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও ব্যবহারিক প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই গড়ে উঠেছিল।
গুদারা পারাপারের ধরন, ভাড়া ও যাত্রী-মাঝি সম্পর্ক
খেয়া বা গুদারা পারাপারে মূল্য নির্ধারণ মূলত নদীর আকারের ওপর নির্ভর করতো। তুলনামূলক ছোট নদী পারাপারে ২৫ পয়সা থেকে ৫০ পয়সা এবং বড় নদী পারাপারে জনপ্রতি ভাড়া এক টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। এই ভাড়ার বিনিময়ে নদী পারাপার সম্ভব হলেও মাঝি সাধারণত একজন যাত্রী নিয়ে নৌকা ছাড়তেন না। নির্দিষ্টসংখ্যক যাত্রী জড়ো না হওয়া পর্যন্ত তাকে অপেক্ষা করতে হতো। ফলে অনেক সময় যাত্রীদের ঘাটে দাঁড়িয়ে অথবা খেয়া নৌকায় বসে কিছুটা সময়ক্ষেপণ করতে হতো, যা বিশেষ করে জরুরি প্রয়োজনে ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াত।
এই অপেক্ষাকে কেন্দ্র করে মাঝি ও যাত্রীর মধ্যে কোনো কোনো সময় কথা কাটাকাটিও হতো। কেউ তাড়াহুড়ো করে নদী পার হতে চাইলে মাঝি যাত্রীসংখ্যা পূর্ণ না হওয়ার যুক্তি দেখাতেন। আবার যাত্রী নিজের সময়ের গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করতেন। তবে এসব বিরোধ সাধারণত বড় আকার ধারণ করতো না। পারস্পরিক বোঝাপড়া ও গ্রামীণ সৌহার্দ্যের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিষয়টি অল্প কথাবার্তার মধ্যেই মিটে যেত।
বিশেষ প্রয়োজনে বা যাত্রীর জরুরি কাজের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মাঝি কখনো কখনো নির্ধারিত সংখ্যার অপেক্ষা না করেই দ্রুত খেয়া পার করে দিতেন। তখন বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করতো মাঝি ও যাত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক এবং পরিস্থিতির ওপর। এই অনানুষ্ঠানিক সমঝোতাই ছিল হাওরাঞ্চলের খেয়া পারাপার ব্যবস্থার একটি মানবিক দিক—যেখানে নিয়মের পাশাপাশি সহানুভূতি ও সামাজিক দায়বদ্ধতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো।
প্রতিবার খেয়া পারাপারে জনপ্রতি নির্ধারিত ভাড়া পরিশোধের পাশাপাশি হাওরাঞ্চলে চালু ছিল আরেকটি ভিন্নধর্মী ও সময়োপযোগী ভাড়া পরিশোধ পদ্ধতি। খেয়াঘাটের আশপাশে বসবাসকারী স্থানীয় মানুষদের জন্য বছরে একবার খেয়া বা গুদারার ভাড়া পরিশোধের ব্যবস্থা ছিল। এতে প্রতিবার নদী পারাপারে আলাদা করে ভাড়া দেওয়ার ঝামেলা থাকতো না, যা কৃষিনির্ভর জীবনে ছিল বেশ সুবিধাজনক।
হাওরাঞ্চলের জমিগুলো মূলত একফসলি। বছরের একমাত্র প্রধান ফসল ওঠে বৈশাখ থেকে জ্যৈষ্ঠ মাসের মধ্যে। এই সময় ধান কাটা ও সংগ্রহ শেষে কৃষকরা নির্ধারিত পরিমাণ ধান খেয়া বা গুদারার বাৎসরিক ভাড়া হিসেবে প্রদান করতেন। নগদ অর্থের পরিবর্তে ধানের মাধ্যমে ভাড়া পরিশোধের এই পদ্ধতি স্থানীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে ছিল সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ধান সংগ্রহ মৌসুম শেষ হলে খেয়াঘাটের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা বস্তা নিয়ে লোকজনের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নির্ধারিত ধান সংগ্রহ করতেন। কেউ নিজের উঠান থেকে ধান তুলে দিতেন, কেউ আবার গোলা থেকে বের করে দিতেন। এই প্রক্রিয়াটি ছিল নিয়মতান্ত্রিক হলেও অনানুষ্ঠানিকতায় ভরপুর—যেখানে লিখিত কাগজপত্রের চেয়ে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সামাজিক সম্পর্কই ছিল প্রধান ভিত্তি।
এই বাৎসরিক ধানভিত্তিক ভাড়া পরিশোধ ব্যবস্থা শুধু খেয়া পারাপারের অর্থনৈতিক কাঠামোই নয়, বরং হাওরাঞ্চলের গ্রামীণ সমাজব্যবস্থা, পারস্পরিক নির্ভরতা ও সহযোগিতার এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি হিসেবে বিবেচিত হতো।

পারাপারে আরো পদ্ধতি
খেয়া বা গুদারা পারাপারের পাশাপাশি গ্রামবাংলায় আরও কিছু সহজ ও অভিনব পারাপার পদ্ধতি চালু ছিল, যা ছিল সম্পূর্ণভাবে মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগের ফসল। খাল কিংবা ছোট নদী পারাপারের জন্য কোথাও রাখা হতো ছোট কাঠের নৌকা, আবার কোথাও মোটা ও শক্ত কয়েকটি বাঁশ সারিবদ্ধভাবে বেঁধে তৈরি করা হতো ভেলা। এসব নৌকা বা ভেলার সঙ্গে এপার-ওপারে বাঁধা থাকতো মোটা দড়ি, যা ধরেই যাত্রীরা নিজ হাতে টান দিয়ে ধীরে ধীরে খাল বা নদী পার হতেন।
মাঝি বা আলাদা কোনো পরিচালকের প্রয়োজন না থাকায় পারাপারটি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত ও নির্ভরশীল। বিশেষ করে স্কুলগামী শিশু-কিশোরদের কাছে এই নৌকা বা ভেলায় পার হওয়া ছিল নিছক যাতায়াত নয়, বরং এক ধরনের আনন্দঘন খেলা। দড়ি টানতে টানতে হাসি-ঠাট্টা, পানিতে ঢেউয়ের শব্দ আর ভেলার দুলুনি—সব মিলিয়ে তাদের প্রতিদিনের জীবনে যোগ হতো আলাদা এক রোমাঞ্চ।
এসব নৌকা বা ভেলায় পারাপারের জন্য কোনো ভাড়া বা অর্থ পরিশোধ করতে হতো না। পার্শ্ববর্তী গ্রামের মানুষজন পরস্পরের সহযোগিতায় অর্থ জোগাড় করে এগুলো তৈরি করতেন। সময়ের ব্যবধানে নষ্ট হলে কিংবা মেরামতের প্রয়োজন দেখা দিলে আবারও সবাই মিলে টাকা ও শ্রম দিয়ে সংস্কারের কাজ করতেন। এভাবেই এই নৌকা ও ভেলাগুলো শুধু পারাপারের মাধ্যম নয়, গ্রামীণ সমাজের পারস্পরিক সহযোগিতা, সম্প্রীতি ও সম্মিলিত দায়িত্ববোধের এক জীবন্ত নিদর্শনে পরিণত হয়েছিল।

গুদারা পরিচালনায় মাঝির দক্ষতা
খেয়া বা গুদারা পরিচালনায় মাঝিদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার বিশেষ প্রয়োজন হতো। নদীর ঘাটের যেসব অংশে পানির গভীরতা তুলনামূলক কম থাকতো, সেখানে মাঝিরা লগি ব্যবহার করতেন, যা স্থানীয়ভাবে ‘ছইর’ নামে পরিচিত। এই ছইর দিয়ে নদীর তলদেশে ভর দিয়ে নৌকাকে সামনে এগিয়ে নেওয়া হতো। অগভীর পানিতে নৌকা চালানোর ক্ষেত্রে এটি ছিল সবচেয়ে কার্যকর ও নিরাপদ পদ্ধতি।
অন্যদিকে, যেসব খেয়াঘাটের নদীতে পানির গভীরতা তুলনামূলক বেশি, সেখানে মাঝিরা ছোট বৈঠা কিংবা নৌকায় স্থায়ীভাবে আটকে রাখা বিশেষ আকারের বড় বৈঠা ব্যবহার করে খেয়া চালাতেন। কখনো কখনো স্রোতের গতি, পানির গভীরতা ও নৌকার ভারসাম্য অনুযায়ী বৈঠার ধরন ঠিক করে ব্যবহার করতে হতো। এসব কৌশল প্রয়োগে মাঝিদের থাকতে হতো অত্যন্ত সতর্ক, কারণ সামান্য ভুলে যাত্রী ও মালামাল নিয়ে নৌকা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারতো।
দীর্ঘদিন নদীপথে চলাচলের অভিজ্ঞতা থেকেই মাঝিরা এসব কৌশলে পারদর্শী হয়ে উঠতেন। বিশেষ প্রশিক্ষণ বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হতো না। নদীর তলদেশের প্রকৃতি, কোথায় পলি জমেছে, কোথায় হঠাৎ গভীরতা বেড়ে গেছে—সবই তাদের ছিল নখদর্পণে। ফলে খেয়া পারাপার শুধু একটি যাতায়াত ব্যবস্থা নয়, বরং মাঝিদের বংশপরম্পরায় অর্জিত দক্ষতা ও স্থানীয় জ্ঞানের এক জীবন্ত নিদর্শন।

গুদারাঘাটকেন্দ্রিক বিকল্প জীবিকা
গুদারাঘাটকে কেন্দ্র করে আশপাশের এলাকায় গড়ে উঠতো ছোট টঙ দোকান, যা ছিল যাত্রীদের জন্য এক ধরনের ক্ষণিকের আশ্রয়স্থল। নদী পারাপারের আগে বা পরে যাতায়াতে ক্লান্ত যাত্রীরা এসব টঙ দোকানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতেন। ঝড়-তুফান, গরম কিংবা শীতের প্রতিকূল পরিবেশে মাঝি এবং যাত্রীদের নিরাপদ আশ্রয় দিতো সেসব টঙ দোকান। দোকানে রাখা হতো যাত্রীদের নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা সামগ্রী—বিস্কুট, কেক, মুরালি, কটকটি, লজেন্স, নাড়ু, চানাচুরসহ সহজলভ্য শুকনো খাবার। পাশাপাশি চা, পান, বিড়ি কিংবা দৈনন্দিন ছোটখাটো প্রয়োজনীয় জিনিসও মিলত এখানে। বিশেষ বোতলজাত পানির প্রচলন তখন ছিলো না। এজন্য পিপাসা মিটাতে মাটির কিংবা সিলভারের বড় কলসিতে ভরে রাখা হতো টিউবওয়েলের সুপেয় পানি।
টঙ দোকানগুলোর ভেতরে ও বাইরে বিশ্রামের জন্য থাকতো বাঁশ দিয়ে তৈরি মাচা কিংবা সাধারণ কাঠের বেঞ্চ। যাত্রীরা সেখানে বসে বিশ্রাম নিতেন, গল্প করতেন, কখনো নদীর পানির গতিপ্রকৃতি আর খেয়া চলাচল দেখতেন। এই দোকানগুলো শুধু কেনাবেচার স্থানই ছিল না; বরং ঘাটকেন্দ্রিক সামাজিক যোগাযোগের এক অনানুষ্ঠানিক মিলনস্থল হিসেবেও কাজ করতো।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব টঙ দোকান পরিচালনার সঙ্গে খেয়া বা গুদারা পরিচালনায় যুক্ত লোকজন কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত থাকতেন। কেউ মাঝির পরিবারের সদস্য, কেউবা ঘাটের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি। ফলে খেয়া পারাপার ও টঙ দোকান—এই দুটো ব্যবস্থাই একে অপরের পরিপূরক হয়ে গুদারা ঘাটকেন্দ্রিক একটি ক্ষুদ্র গ্রামীণ জীবিকা গড়ে তুলেছিল, যা স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল।
হাওরাঞ্চল ছাড়াও দেশের অন্য অঞ্চলে খেয়ার প্রচলন
খেয়া পারাপারের এই বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে। কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল ছাড়াও দেশের প্রায় প্রতিটি বড় নদীর তীরবর্তী জেলাগুলোতে খেয়াঘাটের প্রচলন ছিল। কিছু কিছু জায়গায় এখনো এই ব্যবস্থা সীমিত আকারে বিদ্যমান। অঞ্চলভিত্তিক দেশের অন্য যেসব জেলায় খেয়া পারাপারের বেশি প্রভাবের তথ্য পাওয়া গেছে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলা নেত্রকোনা, সিলেট, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চল; দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর; উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাট (চর অঞ্চল) এবং মধ্যাঞ্চলের মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলা।
রাজধানী ঢাকা শহরের চারপাশের নদীগুলোতে এখনো খেয়া পারাপার ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সড়কপথে দীর্ঘ পথ ঘুরে শহরে যাতায়াত করতে গেলে যেমন সময় বেশি লাগে, তেমনি খরচও তুলনামূলকভাবে বেড়ে যায়। এ কারণে নিয়মিত যাত্রীরা নদী পারাপারের ক্ষেত্রে খেয়া নৌকাকেই বেশি সাচ্ছন্দ্যজনক মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন। স্বল্প সময়ে কম খরচে গন্তব্যে পৌঁছানোর সুবিধা এখনো ঢাকার আশপাশের বহু মানুষের দৈনন্দিন চলাচলে খেয়া ব্যবস্থাকে কার্যকর করে রেখেছে।

এছাড়া নগর জীবনের ভেতরেও ছোট পরিসরে খেয়া পারাপারের চিত্র চোখে পড়ে। ঢাকার প্রাণকেন্দ্র মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় থাকা ছোট ছোট জলাধার, খাল কিংবা ডোবা ডিঙিয়ে পারাপারের জন্য ব্যবহৃত হয় ডিঙি নৌকা। কর্মস্থলে যাওয়া, বাজার করা কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজনে এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যেতে সময় বাঁচানোর জন্য মানুষ এসব নৌকায় পার হন। নগরের ভেতরের এই জলাধার পারাপারে সাধারণত জনপ্রতি দুই থেকে পাঁচ টাকা ভাড়া পরিশোধ করতে হয়।
এই বাস্তবতা প্রমাণ করে, আধুনিক সড়কব্যবস্থা ও সেতু নির্মাণের পরও খেয়া বা নৌকাভিত্তিক পারাপার আজও গ্রাম ও শহর—উভয় ক্ষেত্রেই সময়, ব্যয় ও বাস্তব প্রয়োজনের কারণে একটি কার্যকর ও প্রয়োজনীয় যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে টিকে আছে।
খেয়া পারাপারে প্রচলিত কিছু পদ্ধতি ও নামকরণের রকমফের
সারা দেশে ভাড়া পরিশোধে বিভিন্ন পদ্ধতির মধ্যে অতি প্রচলিত যে তিনটি পদ্ধতি সম্পর্কে জানা যায় তা হলো—(ক) বাৎসরিক বা খোরাকি পদ্ধতি (Crop-based Payment); গ্রামের প্রতিটি পরিবার থেকে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে (সাধারণত ধান কাটার মৌসুমে বা বোরো মৌসুমে) মাঝি গিয়ে ধান সংগ্রহ করেন। (খ) হাটুরে বা সাপ্তাহিক পদ্ধতি (Hat-day Payment); সাধারণ দিনগুলোতে পারাপারের জন্য কোনো নগদ টাকা নেওয়া হয় না। তবে সাপ্তাহিক হাটের দিন যখন গ্রামবাসী পণ্য কেনা-বেচা করতে যান, তখন মাঝিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা বা পণ্যের (যেমন-সবজি, লবণ বা চাল) একটি অংশ দিতে হয়। অনেক সময় হাটে বিক্রি করা পণ্যের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাঝিকে দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। (গ) নগদ অর্থ বা খেয়া কড়ি (Cash Payment); এটি সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি। এই ব্যবস্থায় প্রতিবার পারাপারের সময় নির্দিষ্ট অংকের টাকা পরিশোধ করতে হয়।
উল্লিখিত ভাড়া আদায়ের ৩টি পদ্ধতির বাইরেও গ্রামবাসী ও মাঝির মধ্যে আরো একটি অনানুষ্ঠানিক রীতির প্রচলন ছিল। তা হলো উৎসবভিত্তিক বকশিশ (Festival Bonus)। অনেক এলাকায় মাঝি ও গ্রামবাসীর সম্পর্ক নিবিড় ও পারিবারিক হতো। সেক্ষেত্রে সারা বছর নির্ধারিত স্বল্প ভাড়ায় পারাপার হলেও দুই ঈদে বা পূজায় গ্রামবাসী সাধ্যমতো মাঝিকে নতুন কাপড়, বিশেষ খাবার-দাবার বা অতিরিক্ত টাকা উপহার দিতেন।
খেয়া পরিচালনার রকমফের এবং নামকরণেও সারা দেশে কিছু ব্যতিক্রমী তথ্য পাওয়া যায়—(১) দক্ষিণাঞ্চলের অনেক ছোট খাল পারাপারে নৌকায় কোনো বৈঠা বা লগি ব্যবহার করা হয় না। খালের এপার থেকে ওপার পর্যন্ত একটি শক্ত মোটা রশি বাধা থাকে। স্থানীয়ভাবে একে বলা হয় ‘সেহরা’ বা ‘গুণ’। সেহরায় পারাপারে যাত্রীরা নৌকায় উঠে নিজেরাই সেই রশি টেনে ওপারে যান। (২) ‘ডাক’ বা ‘হাঁক’ পদ্ধতি (চর ও দুর্গম অঞ্চল); যেসব এলাকায় জনবসতি খুব কম এবং নদী অনেক প্রশস্ত (যেমন কুড়িগ্রাম বা গাইবান্ধার চরাঞ্চল), সেখানে মাঝিরা সবসময় ঘাটে বসে থাকেন না। যাত্রীরা পাড়ে এসে উচ্চস্বরে মাঝির নাম ধরে বা নির্দিষ্ট কোনো শব্দে ‘হাঁক’ বা চিৎকার দেন। সেই ডাক শুনে মাঝি নৌকা নিয়ে আসেন। (৩) ‘পাস’ বা মাসিক টোকেন ব্যবস্থা (মুন্সীগঞ্জ ও ঢাকা সংলগ্ন এলাকা); নগদ টাকার আধুনিক সংস্করণের একটি মধ্যবর্তী পর্যায় ছিল এটি। যারা নিয়মিত অফিস বা বাজারে যাতায়াত করতেন, তারা মাসোহারা হিসেবে মাঝিকে নির্দিষ্ট টাকা দিতেন। এর বিনিময়ে মাঝিরা তাদের একটি ছোট কাঠের টুকরো বা বিশেষ চিহ্নযুক্ত কাগজ দিতেন (যা বিভিন্ন যানবাহন, ট্রেন কিংবা মেট্রোরেলের পাসের মতো)। (৪) বিনিময় প্রথা বা ‘ডালি’ ব্যবস্থা (উত্তরবঙ্গ); উত্তরবঙ্গের চরাঞ্চলে শুধু ধান নয়, বরং রবিশস্য যেমন—ভুট্টা, সরিষা বা কাউন দিয়েও বাৎসরিক ভাড়া মেটানো হতো। আবার মাঝির বাড়িতে বিয়ের মতো বড় কোনো অনুষ্ঠান হলে গ্রামবাসী মিলে উপহারের ‘ডালি’ (চাল, ডাল, সবজি) পাঠাতেন, যা ছিল ভাড়ার বাইরেও এক ধরনের সামাজিক দায়বদ্ধতা।

খেয়া পারাপারে স্থানীয়দের স্মৃতিকথা
কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী উপজেলা সদরের মীরহাটির মীর মোকাম্মেলের স্মৃতিচারণায় গুদারা বা খেয়া পারাপারের অনেক দিক উঠে আসে। “আমাদের ছোটবেলায় গুদারাঘাট ছিল মানুষের অবিরাম যাতায়াতের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিদিন সেখানে পারাপার করতো চেনা–অচেনা অসংখ্য মানুষ। কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাচ্ছেন, কেউ সরকারি বা দাফতরিক কাজে, কেউ হাট–বাজারের সদাই করতে, আবার কেউ শুধুই খবর আদান–প্রদানের উদ্দেশ্যে গুদারা বা খেয়া পারাপার করতেন। গুদারাঘাট তখন শুধু নদী পার হওয়ার জায়গা ছিল না; এটি ছিল মানুষের যোগাযোগ, সম্পর্ক আর জীবনের গল্প বিনিময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ মিলনস্থল।
মাঝে মাঝে দেখা যেত অসুস্থ রোগীকে নিয়ে স্বজনদের উৎকণ্ঠিত অপেক্ষা। চোখে-মুখে আতঙ্ক, কণ্ঠে তাড়াহুড়ো—কখন পার হবে গুদারা, কখন পৌঁছানো যাবে ওপারে। সেই সময় মাঝিদের তৎপরতা চোখে পড়ার মতো ছিল। তারা যত দ্রুত সম্ভব নৌকা ছাড়ার চেষ্টা করতেন, ঝুঁকি ও স্রোতের কথা মাথায় রেখেও মানবিক দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দিতেন। কারো কারো কণ্ঠে তখন শোনা যেত সাহস জোগানো কথা—‘ভয় নাই, তাড়াতাড়িই পার কইরা দিমু।’
খেয়া পরিচালনায় মাঝিদের মধ্যে এক ধরনের আত্মবিশ্বাস ও নীরব আনন্দ সব সময়ই লক্ষ্য করা যেত। যদিও এই কাজ ছিল শারীরিকভাবে কষ্টসাধ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ, তবু তারা তা উপভোগ করতেন। কারণ তাদের কাছে গুদারা চালানো ছিল কেবল পেশা নয়, বরং মানুষের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানোর একটি সামাজিক দায়িত্ব। মানুষজনকে নিরাপদে নদী পার করে দেওয়াকে মাঝিরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখতেন এবং এতে তারা এক ধরনের গর্ব ও আত্মতৃপ্তি অনুভব করতেন।
সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুদারা বা খেয়া পারাপার ব্যবস্থা ছিল ইতিবাচক ও মানবিক এক প্রথা—যেখানে জীবিকা, সেবা এবং পারস্পরিক নির্ভরতা একসূত্রে বাঁধা ছিল। সময়ের তাগিদে নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে সেতু নির্মাণ হয়েছে, মানুষের যাতায়াতে সময় কমে এসেছে। বৈচিত্র্য এসেছে যানবাহনে। কম সময়ে দূর-দূরান্তে পৌছে যাচ্ছে মানুষ। তবু খেয়াঘাট, খেয়া পারাপার আর নৌকায় চড়ে সেই সুন্দর, সৌহার্দ্যপূর্ণ ও আরামদায়ক ভ্রমণের স্মৃতি এখনো মনে গেঁথে রয়েছে। এগুলো ভুলে যাওয়ার মতো নয়।”
নিকলী উপজেলা সদরের বানিয়াহাটির গ্রামীণ নদীর ঘাট প্রাঙ্গণে একসময় একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌকা পারাপারের ব্যবস্থা ছিল। এই ঘাট দিয়ে ধোপাহাটি, বানিয়াহাটি, কামারহাটি, গোয়ালহাটি, মীরহাটিসহ নিকলী সদর এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষ নিয়মিত যাতায়াত করতেন। বিশেষ করে কৃষিজীবী মানুষের জন্য এই খেয়া পারাপার ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিকলী উপজেলা সদরের বানিয়াহাটি গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আবদুল মান্নান বলেন, “এই নৌকা পারাপারের ঘাটটা আমার শৈশব থেকেই দেখছি। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার আগের সময়েও এই ঘাট ছিল। কৃষিজমিতে যাওয়া, ফসল আনা–নেওয়া, এমনকি সদরের বাইরের লোকজনও তাদের বাজার–সদাই করা, এ-গ্রাম ও-গ্রাম যাতায়াত—সবকিছুতেই মানুষ এই খেয়াঘাটের ওপর নির্ভর করতো। তখন নৌকাই ছিল আমাদের একমাত্র ভরসা।”
তিনি আরো জানান, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নদীর বিভিন্ন স্থানে সড়ক নির্মাণ, খাল ভরাট এবং সেতু স্থাপনের কারণে ধীরে ধীরে নৌকা পারাপারের প্রয়োজনীয়তা কমতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের দিকে এই খেয়াঘাট দিয়ে যাত্রী পারাপার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
এলাকার অন্য অনেক বাসিন্দাও একই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তাদের দাবি, নদীর কয়েকটি স্থানে সেতু নির্মাণের ফলে কিছু এলাকার মানুষের যোগাযোগ সহজ হলেও বানিয়াহাটির এই ঐতিহ্যবাহী ঘাট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আশপাশের কৃষিনির্ভর মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। এখন অনেক দূর ঘুরে সেতু দিয়ে নদী পার হতে হয়।
স্থানীয়রা আরও জানান, নির্মিত সেতুগুলোর বেশিরভাগই অনেক সরু করে করা হয়েছে এবং সেতুর সঙ্গে সংযোগ সড়কের ঢালু অত্যন্ত খাড়া। এতে করে রিকশা, অটোরিকশা কিংবা কৃষিপণ্যবাহী যান চলাচল সম্ভব নয়। বিশেষ করে বৈশাখ মাসে কৃষিকাজের মৌসুমে জমিতে যাতায়াত ও ধানসহ ফসল পরিবহনে তারা নানামুখী সমস্যার মুখে পড়ছেন। তাদের দাবি, স্থানীয় বাস্তবতা ও কৃষিনির্ভর জীবনের প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে যোগাযোগ ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন—হোক তা বিকল্প খেয়া ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা, অথবা প্রশস্ত ও নিরাপদ সেতু নির্মাণ।

মাঝিদের স্মৃতিকথা: নদী, গুদারা আর নীরব জীবন
হাওরাঞ্চলের নদীগুলো একসময় শুধু জলধারা ছিল না, ছিল মানুষের জীবনের পথনির্দেশক। সেই নদীর বুকে ভাসমান গুদারা বা খেয়া নৌকাগুলো ছিল গ্রামের চলমান ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের সবচেয়ে নীরব অথচ সবচেয়ে প্রয়োজনীয় চরিত্র ছিলেন মাঝিরা। তারা কোনো দিন আলোচনায় আসেননি, কিন্তু প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে এক পাড় থেকে আরেক পাড়ে পৌঁছে দিয়ে নিজেদের জীবনটুকু নদীর হাতে তুলে দিয়েছেন।
আবদুল করিম মাঝি। বয়স এখন প্রায় সত্তর। চোখের কোণে জমেছে নদীর মতোই অসংখ্য ভাঁজ। তিনি জানালেন, একসময় ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘাটে পৌঁছে যেতাম। নৌকার দড়ি খুলতে খুলতে মনে হতো—আজ আবার কত মানুষের গল্প বয়ে নিয়ে যাবে এই গুদারা!
কেউ জমিতে, কেউ স্কুলে যাবে, কেউ বাজারে—আর কেউ জীবন বাঁচাতে ডাক্তার-হাসপাতালের পথে। নিয়ম ছিল কয়েকজন যাত্রী জড়ো না হলে নৌকা ছাড়বো না; কিন্তু মানুষের প্রয়োজন এবং সমস্যা দেখলে তখন আর নিয়মের তোয়াক্কা করতাম না। নিয়ম আর নদী দুটোকেই একপাশে রেখে গুদারা ছাড়তাম।
মোসলেম উদ্দিন। প্রায় ৩০ বছর গুদারা চালিয়েছেন। তার শরীরের শক্তি এখন কমে এসেছে; কিন্তু স্মৃতিগুলো এখনো অটুট। “এই কাজ সহজ ছিল না। অগভীর পানিতে লগি, গভীর পানিতে বৈঠা—দিন শেষে শরীর কুলাতো না। তবু মানুষের প্রয়োজনে গুদারাটা চালাতেই হতো। হ্যাঁ, গুদারা চালিয়ে আমাদেরও আয় হতো, এতেই সংসার চালাতাম। সময়-অসময় বলে আমার কিছু ছিল না। রাত-বিরাতেও ডেকে তুলে যাত্রী পারাপার হয়েছেন। কখনো মুখ গোমড়া করিনি, হাসি মুখেই কাজটা করেছি। আসল উদ্দেশ্যই ছিল মানুষের উপকারে লাগা।”
বয়সের ভারে এখন ন্যূব্জ শাহেদ মাঝি। ঝাপসা হয়ে আসা চোখে পথ চলতে কষ্ট হয় তার, তবু স্মৃতির দৃষ্টিতে কোনো অন্ধকার নেই। খেয়া পারাপারের দিনগুলো তার মনে এখনো ঝলমলে—একটির পর একটি জীবন্ত অধ্যায়ের মতো। কথা বলতে বলতে স্মৃতির খোঁজে হাতড়ান তিনি; কখনো নদীর স্রোতের শব্দ, কখনো মাঝরাতের ডাক, আবার কখনো মানুষের অসহায় মুখ ভেসে ওঠে তার চোখের সামনে।
তার ভাষায়, মাঝিদের জীবন বাইরে থেকে যতটা কষ্টের মনে হয়, ভেতরে ভেতরে ততটাই রঙিন। অর্থনৈতিক সচ্ছলতা খুব বেশি না থাকলেও মানুষের উপকারে লাগার তৃপ্তিই তাদের জীবনের বড় আনন্দ ছিল। গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় খেয়া মাঝিরা কেবল পেশাজীবী নন; তারা ছিলেন এক ধরনের ভরসার মানুষ। সাধারণ নিয়মে রাত ৯টার পর গুদারা বন্ধ করে দেওয়া হতো। কিন্তু বাস্তবে সেই নিয়ম সব সময় মানা যেত না। কারণ মাঝিরা জানতেন—মানুষের বিপদ সময় দেখে আসে না।
তাই রাত যত গভীরই হোক, শাহেদ মাঝিরা প্রস্তুত থাকতেন। মাঝরাতে হঠাৎ কোনো অসুস্থ রোগী, প্রসূতি নারী কিংবা দুর্ঘটনায় পড়া মানুষ নদী পার হওয়ার জন্য ডাক দিলে দেরি না করে গুদারা ছাড়তেন তারা। এমন অনেক রাত গেছে, যখন বিপদগ্রস্ত মানুষদের কাছ থেকে ভাড়া না নিয়েই পার করে দিয়েছেন। কারণ তখন তারা শুধু যাত্রী নয়—অসহায় মানুষ। পার হয়ে ওপারে পৌঁছানোর পর কৃতজ্ঞ মানুষের মুখে শোনা দোয়াই ছিল মাঝিদের কাছে সবচেয়ে বড় পারিশ্রমিক।
শাহেদ মাঝি জানান, তার মতো এমন অনেক মাঝি ছিলেন, যারা টাকার চেয়ে দায়িত্বকেই সবার আগে গুরুত্ব দিতেন। অবশ্য ব্যতিক্রম যে ছিল না, তা তিনি অস্বীকার করেন না। সমাজের সব পেশার মতো এখানেও কিছু ব্যতিক্রমী চরিত্র ছিল। তবে তার অভিজ্ঞতায়, অধিকাংশ মাঝিই ছিলেন মানবিক, দায়িত্বশীল ও মানুষকেন্দ্রিক। নদীর স্রোতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা শুধু নৌকাই চালাননি—চালিয়েছেন মানুষের ভরসা, সময়ের দাবি আর গ্রামীণ জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য দায়িত্ববোধ।
সেতু নির্মাণ, গুদারার বিলুপ্তি ও নতুন সম্ভাবনার হাতছানি
সময় বদলেছে, বদলেছে গুদারাঘাটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জীবনযাত্রার ধারা। এক সময় নদীর দুই পাড়ের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংযোগে যাতায়াতের একমাত্র ভরসা ছিল গুদারা বা খেয়া নৌকা। সেই সব ঘাটের অনেকগুলোতেই এখন দাঁড়িয়ে আছে ইট–সিমেন্টের সেতু। সেতু নির্মাণের ফলে একদিকে যেমন যোগাযোগ সহজ হয়েছে, তেমনি ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে ঘাটকেন্দ্রিক কর্মচাঞ্চল্য। যে ঘাটগুলোতে একসময় যাত্রীদের ভিড় লেগে থাকতো, মাঝিদের ডাকাডাকি শোনা যেত, সেখানে এখন নীরবতা। খেয়া পারাপার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হারিয়ে গেছে মাঝি, ঘাটের কর্মী, টঙ দোকানদারসহ সংশ্লিষ্ট নানা পেশার প্রয়োজনীয়তা।
সেতু নির্মাণের পর নদী পারাপারে আর কাউকে খেয়া নৌকার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। মানুষ সরাসরি হেঁটে কিংবা বিভিন্ন যানবাহনে সেতু পার হচ্ছেন। পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় বেড়েছে ছোট ছোট যানবাহনের চলাচল। রিকশা, অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত ভ্যানসহ নানা বাহনে এখন স্বাচ্ছন্দ্যে দূরযাত্রায় বের হচ্ছেন যাত্রীরা, যা একসময় ছিল কল্পনাতীত।
তবে সব জায়গায় সেতু নির্মাণের সুফল সমানভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত সেতু এলাকাবাসীর ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো কোনো সেতু এতটাই সরু করে নির্মাণ করা হয়েছে যে, একসঙ্গে দুই দিক থেকে যানবাহন চলাচল সম্ভব নয়। ফলে একটি রিকশা বা তিনচাকার যান পার হওয়ার সময় বিপরীত দিকের যানবাহনকে থেমে থাকতে হয়। এই সংকট সামাল দিতে স্থানীয় কেউ কেউ স্বেচ্ছায় নিশান বা হাতের ইশারা দিয়ে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের কাজ করছেন—এক পাশের যানবাহন থামিয়ে অন্য পাশের যান চলাচলের সুযোগ করে দিচ্ছেন।
অন্যদিকে, যেসব সেতু তুলনামূলকভাবে প্রশস্ত করে নির্মাণ করা হয়েছে, সেগুলোতে রিকশা, অটোরিকশা, পিকআপ, এমনকি বাসসহ মাঝারি আকারের যানবাহন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারছে। এসব সেতু ব্যবহারকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে এবং এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সেতুর দুই পাড়ে গড়ে উঠেছে বহু ছোট-বড় দোকান। সকালবেলা কিংবা সান্ধ্যকালীন আড্ডা জমে সেতুকেন্দ্রিক বিভিন্ন স্পটে; এসব জায়গায় মানুষের আনাগোনার কারণে বসছে বাহারি রকমের খাবারের দোকান।

সেতু নির্মাণে আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব ও নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রীর ব্যবহারে। এর ফলে অনেক সেতুতেই স্বল্প সময়ের মধ্যেই দেখা দিচ্ছে ফাটল, ভাঙন ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা। একই সঙ্গে সেতুর সঙ্গে দুই পাড়ের সংযোগ সড়কগুলো অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ সমন্বয় ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও সেতুর ঢাল এতটাই খাড়া যে, হেঁটে ওঠানামা করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে, রিকশা বা অটোরিকশায় উঠতে গিয়ে মাঝেমধ্যে ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।
সব মিলিয়ে, সেতু নির্মাণে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও পরিকল্পনার ঘাটতি, নির্মাণে অনিয়ম ও তদারকির অভাবে প্রত্যাশিত সুফল পুরোপুরি মিলছে না। গুদারাঘাটকেন্দ্রিক অতীত জীবনের অবসান যেমন বাস্তবতা, তেমনি টেকসই ও নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে প্রয়োজন আরও দায়িত্বশীল পরিকল্পনা ও মানসম্মত বাস্তবায়ন।
লেখক: সংবাদমাধ্যম কর্মী
নোট:
➤ স্মৃতিকথাগুলো পুনঃলেখন করা।
➤ লেখার পরিধি বিবেচনায়, সংগ্রহ করা হলেও কিছু স্মৃতিকথা উল্লেখ করা যায়নি। পূর্ণাঙ্গ সংস্করণে সবার স্মৃতিই সংযোজন করা হবে।
➤ তথ্য সংগ্রহে সহযোগিতা করেছেন “আমাদের নিকলী ডটকম” ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আজমল আহছান, স্থানীয় সাংবাদিক হাবিব মিয়া।


