বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল শুধু নদী ও বন্যার গল্পে সীমাবদ্ধ নয়; এখানে লুকিয়ে আছে শত বছরের জীবিকা ও সংগ্রামের অনন্য ইতিহাস। একসময় গোবরের লাকড়ি, খরস্রোতা নদীতে জেলেপেশা, কিংবা মৌসুমি কৃষিকাজ—এসবের ভেতরেই গড়ে উঠেছিল হাজারো মানুষের জীবনযাত্রা। আধুনিকতার ঢেউয়ে অনেক পেশাই আজ বিলুপ্তপ্রায়। সেই হারানো ঐতিহ্য ও টিকে থাকা সংগ্রামের গল্প নিয়ে শুরু হয়েছে নিকলীকেন্দ্রিক প্রথম অনলাইন সংবাদমাধ্যম “আমাদের নিকলী ডটকম”-এর ধারাবাহিক ফিচার প্রতিবেদন—“হাওরাঞ্চলের ব্যতিক্রমী জীবন ও জীবিকা”। আজ থাকছে “হাওরাঞ্চলের নদীভিত্তিক যোগাযোগ: জীবন ও জীবিকার উপাখ্যান”
আজমল আহছান ||
হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জলভূমিতে একসময় নদীই ছিল জীবন, নদীই ছিল পথ। সড়ক যোগাযোগের আগমনের বহু আগে ট্রলার ও লঞ্চনির্ভর নদীপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা ঘিরেই গড়ে উঠেছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবন, বাণিজ্য ও সামাজিক সম্পর্কের এক অনন্য কাঠামো। হাওরবেষ্টিত উপজেলাগুলো থেকে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া-আসা কিংবা বাণিজ্য সংযোগ—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিল জলপথ। সময়ের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন হলেও হাওরাঞ্চলের জীবন ও জীবিকার ইতিহাসে নদীভিত্তিক যোগাযোগের সেই অধ্যায় আজও স্মৃতি ও বাস্তবতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এখানকার প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো ঋতুভিত্তিক রূপান্তর। বছরের একটি দীর্ঘ সময়—বিশেষ করে বর্ষাকালে—এই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ থাকে থৈ থৈ পানির নিচে। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। বর্ষা বিদায় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে জেগে ওঠে বিস্তীর্ণ ভূমি। পানির নিচে চাপা পড়ে থাকা উর্বর মাটি তখন নতুন জীবনের বার্তা দেয়। শুরু হয় চাষাবাদ, মাঠে মাঠে ফলন ওঠে হরেক রকমের শস্য।
এখানে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট গ্রাম। আকারে ছোট হলেও এসব গ্রামের সামাজিক বন্ধন অত্যন্ত দৃঢ়। প্রতিটি গ্রামে সাধারণত ৪০ থেকে ১০০ পরিবারের বসবাস। পরিবারসংখ্যা কম হওয়ায় সবাই যেন আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ। সুখ-দুঃখ, উৎসব কিংবা সংকটে—প্রত্যেকে প্রত্যেকের খুব কাছের মানুষ। আবাসিক জমির স্বল্পতার কারণে এখানকার বাড়িঘর আকারে খুব বড় হয় না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও ভূমির সংকটের ফলে অনেক এলাকায় আবাদি জমি ভরাট করে নতুন ভিটা তৈরি করা হচ্ছে, যা হাওরের স্বাভাবিক পরিবেশ ও কৃষিনির্ভর জীবনব্যবস্থার জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
হাওরাঞ্চলের গ্রামগুলোর দৃশ্যপট প্রায় একই রকম। বাইরে থেকে দেখলে এক গ্রামকে আরেক গ্রামের সঙ্গে আলাদা করা কঠিন। বর্ষাকালে এই গ্রামগুলো যেন পানির বুকে ভাসমান ছোট ছোট দ্বীপ। চারপাশে যতদূর চোখ যায়, কেবল জলরাশি। তখন মানুষের যোগাযোগের একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠে নৌকা। কাছাকাছি গন্তব্যে যাতায়াতে ব্যবহৃত হয় ছোট ডিঙি নৌকা, আর দূরপাল্লার যাত্রায় বড় নৌকা, ইঞ্জিনচালিত ট্রলার কিংবা লঞ্চ।
ইটনা–মিঠামইন–অষ্টগ্রামকে সংযুক্তকারী দৃষ্টিনন্দন অলওয়েদার সড়ক নির্মাণের পর হাওরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। এই সড়ক হাওরের সৌন্দর্যকে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের সামনে নতুনভাবে তুলে ধরেছে। পর্যটনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বাহারি ট্রলার ও দৃষ্টিনন্দন পর্যটন বোট। শুধু ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম নয়, হাওরঘেরা প্রায় প্রতিটি এলাকাই বর্ষাকালে পর্যটকদের কাছে হয়ে ওঠে অনন্য দর্শনীয় স্থান। কিশোরগঞ্জের হাওরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত নিকলীও ব্যতিক্রম নয়। বর্ষার ঢেউ থেকে রক্ষার জন্য নির্মিত নিকলীর বেড়িবাঁধকে ঘিরে সারা বছরই দেশ-বিদেশের হাজারো পর্যটকের পদচারণায় মুখরিত থাকে এই এলাকা।
বর্তমানের এই সহজ যোগাযোগব্যবস্থা এক সময় কল্পনাও করা যেত না। তখন হাওরাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ছিল সময়নির্ভর ও সীমাবদ্ধ। এলাকার বাইরে কোথাও যেতে হলে কিংবা কাজের প্রয়োজনে শহর বা রাজধানীমুখী হতে হলে নির্দিষ্ট সময়ে ছেড়ে যাওয়া ট্রলার কিংবা লঞ্চের জন্য অপেক্ষা করতে হতো। কোনো কোনো এলাকা থেকে দিনে মাত্র একটি ট্রলার বা লঞ্চ চলাচল করত। আবার কোথাও একাধিক ট্রলার থাকলেও সময়সূচির বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। একবার যদি নির্ধারিত ট্রলার বা লঞ্চ মিস হয়ে যেত, তাহলে অপেক্ষা করতে হতো পরের দিন পর্যন্ত—অন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা তখন ছিল না।
এই ট্রলার ও লঞ্চগুলো শুধু মানুষের যাতায়াতের মাধ্যমই ছিল না, বরং হাওরাঞ্চলের অর্থনীতির প্রধান রক্তনালির মতো কাজ করত। ব্যবসায়ীদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ যাবতীয় মালামাল পরিবহন হতো এসব জলযানের মাধ্যমে। হাওরাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা মূলত ভৈরব ও কুলিয়ারচর থেকে পণ্য সংগ্রহ করতেন। বহু আগে থেকেই এই দুই এলাকায় গড়ে উঠেছিল বড় বড় আড়ত। তুলনামূলক কম দূরত্ব এবং সহজ নৌপথের কারণে এসব জায়গার সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেনে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন হাওরের ব্যবসায়ীরা।
অনেক সময় ব্যবসায়ীরা তাদের প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকা ও বিনিময় মূল্যের অর্থ ট্রলার বা লঞ্চের কর্মীদের কাছে আগেভাগেই দিয়ে দিতেন। লঞ্চের লোকজন সেই তালিকা ভৈরব বা কুলিয়ারচরের আড়তদারদের হাতে তুলে দিতেন। আড়তদাররা তালিকা অনুযায়ী পণ্য গুছিয়ে নির্দিষ্ট লঞ্চ বা ট্রলারে পৌঁছে দিতেন। প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে যখন লঞ্চ বা ট্রলার স্থানীয় ঘাটে ফিরে আসত, তখন ব্যবসায়ীরা নিজ নিজ দায়িত্বে তালিকা মিলিয়ে পণ্য বুঝে নিতেন। এই বিশ্বাসভিত্তিক লেনদেন ব্যবস্থা ছিল হাওরাঞ্চলের ব্যবসায়িক সংস্কৃতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
একইভাবে কারো রাজধানীমুখী যাত্রা কিংবা দূরের কোনো স্থানে বেড়াতে যেতে হলেও সেই নির্দিষ্ট সময়ে ছেড়ে যাওয়া লঞ্চ বা ট্রলারে চেপেই ভৈরব বা কুলিয়ারচরে পৌঁছাতে হতো। তখনকার দিনে সড়কপথে বাসে যোগাযোগ ছিল সীমিত ও অনিয়মিত। ফলে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম ছিল রেলপথ। ভৈরব কিংবা আশপাশের স্টেশন থেকে ট্রেনে চেপেই মানুষ পৌঁছে যেত পরবর্তী গন্তব্যে। এভাবেই পানি, নৌকা ও সময়ের সঙ্গে লড়াই করে গড়ে উঠেছে হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা—যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানই হয়ে উঠেছে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রধান উপায়।
হাওরাঞ্চলের নির্দিষ্ট রুট ও ঐতিহাসিক জলযান
কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর অধ্যুষিত চার উপজেলা—নিকলী, মিঠামইন, ইটনা ও অষ্টগ্রাম—দীর্ঘদিন ধরে জলপথনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল। এর মধ্যে মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের সঙ্গে সরাসরি সড়কপথে যানবাহন চলাচলের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় দূরবর্তী শহর-বন্দর কিংবা রাজধানীতে যাতায়াতের একমাত্র ভরসা ছিল নির্দিষ্ট সময়ে ছেড়ে যাওয়া ট্রলার ও লঞ্চ। এসব নদীপথের যানবাহন চলাচলের পথে নিকলীর মানুষজনও মাঝপথ থেকে এই সুবিধা নিতে পারতেন। ফলে ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের মানুষের জন্য ট্রলার ও লঞ্চই ছিল কার্যত একমাত্র যোগাযোগ মাধ্যম।
তবে তুলনামূলকভাবে নিকলী উপজেলার মানুষের যোগাযোগে কিছুটা বাড়তি সুবিধা ছিল। নিকলী থেকে কষ্টসাধ্য হলেও পায়ে হাঁটার একটি পথ বিদ্যমান ছিল। এ ছাড়া সীমিত পরিসরে রিকশাযোগে গচিহাটা ও মানিকখালি যাওয়া-আসার সুযোগও পাওয়া যেত। এসব স্থান থেকে ট্রেনে চড়ে কুলিয়ারচর, ভৈরব, জেলা শহর কিশোরগঞ্জ কিংবা রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করা সম্ভব ছিল। হাওরের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া হাঁটার মৌসুমী সড়ক বর্ষাকালে পানিতে ডুবে গেলে বিকল্প হিসেবে ছোট-বড় নৌকায় করেও এসব রেলস্টেশনে পৌঁছানোর ব্যবস্থা ছিল।
ভোরের আলো ফোটার আগেই মিঠামইন থেকে নিয়মিত ছেড়ে যেত কিছু ট্রলার এবং লঞ্চ। সবচেয়ে পরিচিত ও নিয়মিত ট্রলারটির মালিক ছিলেন নাজিম উদ্দিন নামের একজন স্থানীয় ব্যক্তি। তার নামানুসারেই ট্রলারটি মানুষের মুখে পরিচিত হয়ে ওঠে ‘নাজিমউদ্দিনের ট্রলার’ নামে, যদিও এর আনুষ্ঠানিক নাম ছিল ‘রাজহংশ’। তুলনামূলক কম পরিচিত এবং সেবাদানকারী একই ভ্রমণ রুটে “পঙ্খীরাজ” নামে আরেকটি ট্রলার চলতো। এর মালিকানা ছিল নাজিমউদ্দিনের আরেক ছোট ভাই চান মিয়ার। ট্রলারগুলো মিঠামইন থেকে ছেড়ে নিকলী ও দিঘিরপাড় হয়ে শেষ গন্তব্য কুলিয়ারচর পর্যন্ত।
এর কাছাকাছি সময়ে ‘এম এল সুরমা’সহ বেশ কয়েকটি লঞ্চ চলাচল করত সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনা থেকে ভৈরব পর্যন্ত। এই লঞ্চগুলোর কোনোটি মিঠামইন-অষ্টগ্রাম হয়ে, কোনোটি অষ্টগ্রাম হয়ে ভৈরব পর্যন্ত যাওয়া-আসা করত। জলবেষ্টিত উপজেলা মিঠামইন-অষ্টগ্রামের মানুষের কাছে এগুলো ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম।
ভোরবেলায় নিকলী থেকে ভৈরবের উদ্দেশে ছেড়ে যেত ‘বিশ্বদূত’ নামের একটি লঞ্চ। লঞ্চটি নিকলী উপজেলার মজলিশপুর ঘাট থেকে যাত্রা শুরু করে নিকলী সদর, দিঘিরপাড় ও কুলিয়ারচর হয়ে ভৈরব পৌঁছাত। যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা বিশেষ প্রয়োজনে ‘বিশ্বদূত’ লঞ্চের অনুপস্থিতির ঘাটতি পূরণের জন্য ভিন্ন রুট থেকে ‘এম এল সোহাগ’ ও ‘এম এল আনন্দপুর’ নামে লঞ্চ এনে সেবা দেওয়া হতো। নিকলী থেকে মিঠামইন রুটে চলাচল করত ‘এমভি সুরভী’ নামের আরেকটি ট্রলার। লঞ্চ এবং ট্রলারগুলো যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি পণ্য আনা-নেওয়ায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো।
এ ছাড়াও নিকলী, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম থেকে নিকটবর্তী বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় যোগাযোগ বজায় রাখতে সময়সূচি অনুযায়ী ছোটখাটো ট্রলার চলাচল করত। নিকলী থেকে করগাঁও, বারুক, সিংপুর, গোড়াদিঘা, আজমীরিগঞ্জ, আশুগঞ্জসহ আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত ট্রলার যাওয়া-আসা করত। এসব জলযানই হাওরাঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা, শিক্ষা ও চিকিৎসা–সংক্রান্ত যোগাযোগের প্রয়োজন পূরণে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান ভরসা হয়ে ছিল।

লঞ্চঘাট: অপেক্ষা, আড্ডা ও মিলনস্থল
ট্রলার ও লঞ্চঘাটকে ঘিরে প্রতিদিনই গড়ে উঠত এক ব্যতিক্রমী ও প্রাণবন্ত আয়োজন। নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষজন একে একে ঘাটে এসে জড়ো হতো। ভ্রমণের অপেক্ষায় থাকা যাত্রীদের বিশ্রামের জন্য অধিকাংশ ঘাটেই ছিল টিন বা কাঠের তৈরি ছোট ঘর। এসব ঘরে বসার জন্য পাতা থাকত বেঞ্চ ও চেয়ার। এই ঘরগুলো একদিকে যেমন বিশ্রামাগার হিসেবে ব্যবহৃত হতো, অন্যদিকে ছোট দোকানের ভূমিকাও পালন করত।
দোকানগুলোতে বিস্কুট, চানাচুর, পাউরুটি, কেক, কলা, চা, পানসহ নানা ধরনের হালকা খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাওয়া যেত। যাত্রার আগে অপেক্ষার সময় কিংবা বিশ্রামের ফাঁকে অনেক যাত্রী এখান থেকেই নাশতা সেরে নিতো। এসব বিশ্রামাগার ও দোকানকে কেন্দ্র করে জমে উঠত মানুষের আড্ডা। অপেক্ষার সময় গল্প, হাসি-ঠাট্টা আর সৌহার্দ্যপূর্ণ আলাপচারিতায় ঘাট এলাকা হয়ে উঠত মুখর ও প্রাণচঞ্চল। কত অজানা-অচেনা মানুষের সঙ্গে পরিচয়, কত ছোট ছোট জীবনের গল্প—সব মিলিয়ে ঘাট যেন হয়ে উঠত মানুষের মিলনস্থল।
কোনো কোনো এলাকার লঞ্চঘাটে এসব দোকানের আশপাশে ফলের পসরা সাজিয়ে বসতেন স্থানীয় বিক্রেতারা। ভ্রমণে যাওয়ার সময় কিংবা ফিরে আসার পথে যাত্রীরা বাড়ির জন্য কমলা, আপেল, নাশপাতি, আঙুর, কলা, পেঁপে, পেয়ারা কিংবা মৌসুমি ফল কিনে নিতেন। এতে একদিকে যাত্রীদের প্রয়োজন মিটত, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের জন্য তৈরি হতো ক্ষুদ্র আয়ের সুযোগ।
ট্রলার ও লঞ্চঘাটগুলোর ব্যবস্থাপনা স্থানীয়ভাবে ইজারা পদ্ধতিতে পরিচালিত হতো। নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ঘাট ব্যবহারের জন্য যাত্রীদের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টোকেন মানি বা ঘাটভাড়া পরিশোধ করতে হতো। এই টোকেন সংগ্রহের পরই যাত্রীদের ট্রলার বা লঞ্চে ওঠার অনুমতি দেওয়া হতো। ঘাটভিত্তিক এই শৃঙ্খলাবদ্ধ ব্যবস্থাপনা যাত্রী চলাচলকে যেমন সুশৃঙ্খল রাখত, তেমনি হাওরাঞ্চলের জলপথকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থাকে একটি সংগঠিত কাঠামোর মধ্যে ধরে রেখেছিল।
ঘাট ব্যবস্থাপনার ভেতরে আরেকটি নীরব কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর পেশা ছিল মালামাল বহনকারী, যাদের স্থানীয়ভাবে বলা হতো কুলি। ট্রলার বা লঞ্চে যাতায়াতকারী অনেক যাত্রীর সঙ্গেই থাকত এক বা একাধিক ভারী ব্যাগ, যা নিজের পক্ষে বহন করা সব সময় সহজ হতো না। এ সময় ঘাটে অবস্থানরত কুলিরা এগিয়ে এসে যাত্রীদের ব্যাগপত্র কাঁধে বা মাথায় তুলে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দিতেন। এর বিনিময়ে আগে থেকে নির্ধারিত কিংবা পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে ঠিক হওয়া পারিশ্রমিক দেওয়া হতো।
এই কুলিদের কাজ শুধু ব্যক্তিগত লাগেজ বহনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ট্রলার-লঞ্চঘাট দিয়ে প্রতিদিনই আনা-নেওয়া হতো নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা ধরনের পণ্য—চাল, ডাল, তেল, কাপড়চোপড়সহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক মালামাল। এসব পণ্য ওঠানো-নামানোর ক্ষেত্রে কুলিদের ভূমিকা ছিল অপরিহার্য। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কুলিদের সম্পর্কও ছিল বেশ ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বাসভিত্তিক। কারণ ব্যবসায়ীদের পণ্য নিয়মিত বহনের সুযোগ কুলিদের জন্য নিশ্চিত করত রোজকার আয়ের ধারাবাহিকতা, আর কুলিদের নির্ভরযোগ্য সেবার ওপর ভর করেই ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে তাদের মালামাল পরিবহন করতে পারতেন।
এইভাবে ট্রলার-লঞ্চঘাটকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কুলিদের শ্রমনির্ভর এই ক্ষুদ্র পেশা হাওরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে ছিল—যা নীরবে বহন করে চলত মানুষের যাত্রা ও জীবিকার ভার।
ট্রলার-লঞ্চের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা
হাওরাঞ্চলের দূরপাল্লার ট্রলার ও লঞ্চে যাত্রী পরিবহনের নিজস্ব কিছু নিয়ম ও ব্যবস্থাপনা ছিল। যাত্রীদের টিকিট সাধারণত ঘাটে নয়, বরং লঞ্চ বা ট্রলারে ওঠার পর চলতি পথেই দেওয়া হতো। এই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রতিটি বাহনে এক বা একাধিক ব্যক্তি নিয়োজিত থাকতেন, যাদের স্থানীয়ভাবে বলা হতো ‘কেরানি’ বা ‘টিকিট মাস্টার’। যাত্রাপথে যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া আদায়, টিকিট প্রদান এবং বসার জায়গা নির্ধারণ—সবকিছুই টিকিট মাস্টারের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হতো।
দূরপাল্লার ট্রলার ও লঞ্চগুলোর বসার ব্যবস্থাপনায় ছিল স্পষ্ট কিছু বৈচিত্র্য। সাধারণত এসব বাহন দুই তলাবিশিষ্ট হতো। নিচতলা বা ছাউনির ভেতরের অংশে বসতেন অধিকাংশ যাত্রী। দুই পাশে লম্বালম্বিভাবে বেঞ্চ বসানো থাকত এবং মাঝখানে সামনে-পেছনের দিকে সারিবদ্ধভাবে প্রশস্ত বেঞ্চ পাতা থাকত, যাতে একসঙ্গে অনেক যাত্রী বসতে পারেন। এই অংশটি ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি ভিড়পূর্ণ ও সাধারণ মানের।
দ্বিতীয় তলায় বসার জায়গা ছিল নিচতলার তুলনায় সীমিত, তবে আরামদায়ক। একেবারে সামনের অংশে বসতেন লঞ্চ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি, যাকে স্থানীয়ভাবে বলা হতো ‘সারেং’। এখান থেকেই তিনি বাহনের দিকনির্দেশনা দিতেন এবং নিচতলায় থাকা ইঞ্জিনরুমের কর্মীদের বেল বাজিয়ে সংকেতের মাধ্যমে গতি বাড়ানো-কমানোসহ প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতেন। সারেংয়ের কক্ষের পেছনে যাত্রীদের জন্য এক বা একাধিক আলাদা কক্ষ বানানো হতো।
দ্বিতীয় তলার এসব যাত্রীকক্ষের একটিতে সারিবদ্ধভাবে চেয়ার এবং অন্যটিতে বেঞ্চ বসানো থাকত। উপরের তলার বেঞ্চগুলো নিচতলার বেঞ্চের তুলনায় ছিল বেশি পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি ও আরামদায়ক। দ্বিতীয় তলার এই যাত্রীকক্ষগুলোকে বলা হতো ‘আপার’। বসার জায়গার মান ও সুবিধার পার্থক্যের কারণে টিকিটের ভাড়াতেও ছিল ভিন্নতা। নিচতলায় বসে ভ্রমণের ভাড়ার তুলনায় ‘আপারে’ বসে যাত্রার ক্ষেত্রে যাত্রীদের কিছুটা বেশি ভাড়া গুনতে হতো।
এইভাবে টিকিট মাস্টার, সারেং, যাত্রীকক্ষ ও ভাড়াভিত্তিক আসনবিন্যাস—সব মিলিয়ে হাওরাঞ্চলের ট্রলার ও লঞ্চভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল এক স্বতন্ত্র ও সুসংগঠিত কাঠামোয়, যা দীর্ঘদিন ধরে এ অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের প্রধান ভরসা হিসেবে কাজ করেছে।

হাওরের জলপথে নিরাপত্তা সংকট
ট্রলার ও লঞ্চগুলোর চলাচলের অনেক নদীপথই ছিল জনবসতি থেকে দূরে, কোথাও কোথাও একেবারেই নির্জন ও জনমানবশূন্য এলাকায় বিস্তৃত। দীর্ঘ জলপথের এই নিঃসঙ্গতা মাঝেমধ্যেই পরিণত হতো বড় ঝুঁকিতে। এমন পরিবেশের সুযোগ নিয়ে কখনো কখনো ট্রলার ও লঞ্চ পড়ত ডাকাতদের কবলে। এসব ঘটনায় যাত্রী, নৌযানের কর্মী কিংবা শহর-বন্দর থেকে পণ্য আনতে যাওয়া স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মারধরের শিকার হতেন, পাশাপাশি লুটপাট করা হতো নগদ অর্থ ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী।
বর্ষা মৌসুমে এই ঝুঁকি আরও বেড়ে যেত। আধুনিক সময়ের তারবিহীন যোগাযোগের মাধ্যম না থাকায় ট্রলার-লঞ্চ দুর্ঘটনায় পড়লেও তাৎক্ষণিক খবর পৌছানোর সুযোগ হতো না। চারদিকে থৈ থৈ পানি, অগণিত খাল-নদী আর বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলের মধ্যে দুর্ঘটনার খবর জানা যেমন অসম্ভব, তেমনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত উপস্থিতিও হয়ে উঠতো না। ফলে বর্ষাকালে ডাকাতির ঘটনা তুলনামূলকভাবে বেশি ঘটত এবং যাত্রীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা কাজ করত।
এই বাস্তবতায় ট্রলার ও লঞ্চ, যাত্রী এবং পরিবহনকৃত পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বাড়তি ব্যবস্থা নিতে হতো। এসব যানবাহনে অনেক ক্ষেত্রে সশস্ত্র আনসার বা পুলিশ সদস্য নিয়োগ করা হতো, আবার কোথাও নিজস্ব নিরাপত্তা কর্মী রাখা হতো নৌযানে। এসব নিরাপত্তা ব্যবস্থা একদিকে যাত্রীদের কিছুটা স্বস্তি দিলেও অন্যদিকে লঞ্চ ও ট্রলার পরিচালনার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিত। অতিরিক্ত এই ব্যয় শেষ পর্যন্ত পরিবহন ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করত, যা হাওরাঞ্চলের জলপথনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থার আরেকটি কঠিন বাস্তবতা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান ছিল।
লঞ্চ-ট্রলারকেন্দ্রিক বিকল্প জীবিকা
দূরপাল্লার যাত্রায় ব্যবহৃত ট্রলার ও লঞ্চগুলো কেবল যাতায়াতের মাধ্যমই ছিল না; এসব জলযানের ভেতর গড়ে উঠেছিল এক ধরনের ভাসমান ক্ষুদ্র বাজারব্যবস্থা। বিভিন্ন ঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রলার বা লঞ্চের ভেতর যাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে থাকত ছোট খাবারের দোকান। দীর্ঘ সময়ের ভ্রমণে যাত্রীদের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানোর উদ্দেশ্যে এসব দোকানে পাওয়া যেত চা, পান, বিস্কুট, চানাচুর, কেক, কলা, পাউরুটি, নাড়ু, চিড়া, মুড়িসহ নানা ধরনের শুকনো খাবার। কোনো কোনো লঞ্চে সীমিত পরিসরে ভাত ও সহজ রান্না করা খাবারের ব্যবস্থাও থাকত, যা দীর্ঘ যাত্রায় যাত্রীদের জন্য বিশেষ স্বস্তির কারণ হয়ে উঠত।
খাবারের দোকানের পাশাপাশি এসব যানবাহনে এক বা একাধিক হকারের উপস্থিতিও ছিল নিয়মিত দৃশ্য। তারা পান, সিগারেটের পাশাপাশি শিশুদের জন্য খেলনা, চিরুনি, টর্চলাইট, ছোটখাটো প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রি করতেন। ট্রলারের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে হাঁটতে হাঁটতে হকারদের ডাক যাত্রাপথে আলাদা এক জীবন্ত পরিবেশ তৈরি করত, যা ভ্রমণের ক্লান্তি কিছুটা হলেও লাঘব করত।
এই ভাসমান দোকান ও হকারদের কার্যক্রম শুধু যাত্রীদের প্রয়োজন পূরণেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি স্বল্প আয়ের অনেক মানুষের জন্য বিকল্প উপার্জনের সুযোগও সৃষ্টি করেছিল। কৃষিকাজ কিংবা মৌসুমি পেশার পাশাপাশি কেউ কেউ ট্রলার বা লঞ্চে দোকানদারি ও হকারি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ফলে হাওরাঞ্চলের জলপথনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠেছিল একটি স্বতন্ত্র ভাসমান অর্থনৈতিক চক্র—যা যাত্রী, ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে নীরবে সংযুক্ত করে রাখত।

ভ্রমণপথে গড়ে ওঠা সম্পর্ক ও সামাজিক বন্ধন
দূর-দূরান্তের সেসব যাত্রায় সময় থাকত অফুরন্ত। দীর্ঘ সময়টুকুতে চেনা-অচেনা নানা বয়স ও পেশার মানুষ একসঙ্গে ভ্রমণ করতেন। কেউ যাচ্ছেন আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে, কেউ দাফতরিক কাজে শহরমুখী, কেউবা প্রয়োজনীয় কেনাকাটার উদ্দেশ্যে। গন্তব্য ভিন্ন হলেও যাত্রাপথে সবাই হয়ে উঠতেন সহযাত্রী—একই নৌযানের ছাদের নিচে, একই সময়ের স্রোতে আবদ্ধ।
বসে থাকতে থাকতে স্বাভাবিকভাবেই শুরু হতো কথাবার্তা। একে একে উঠে আসত পারিবারিক গল্প, গ্রামের সুখ-দুঃখ, সামাজিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক প্রসঙ্গ কিংবা নিছক হাসি-রসাত্মক নানা আলাপ। কারো মুখে শোনা যেত ফসলের খবর, কারো কণ্ঠে সন্তানের পড়াশোনার চিন্তা, আবার কারো গল্পে থাকত জীবনের না বলা কষ্ট। এসব কথোপকথনে যাত্রাপথ কখন যে শেষ হয়ে যেত, অনেক সময় তা কেউ টেরই পেত না। আনন্দ-বেদনা মেশানো অসংখ্য স্মৃতি যেন ভেসে বেড়াত ট্রলার আর লঞ্চের প্রতিটি কোণে।
এই আলাপচারিতার মধ্যেই ঘটেছে অসংখ্য মানবিক ঘটনা। কথা বলতে বলতে কখনো কখনো পরস্পরের প্রতি জন্ম নিতো আলাদা এক ভালো লাগা। সেখান থেকেই শুরু হতো নতুন সম্পর্কের সূত্রপাত। অমুকের মেয়ে আর তমুকের ছেলের বিয়ের কথা উঠত সহযাত্রীদের আলোচনায়, পরে যা বাস্তব জীবনে রূপ নিত আনুষ্ঠানিক আত্মীয়তায়। কোনো সম্পর্ক গড়ে উঠত কাছাকাছি এলাকার মানুষের মধ্যে, আবার কোনো সম্পর্কের সূত্র ধরে একেবারে অপরিচিত, দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষের সঙ্গেও তৈরি হতো আত্মীয়তার বন্ধন।
সেই সময়ের যাত্রাপথ ছিল কেবল গন্তব্যে পৌঁছানোর মাধ্যম নয়; ছিল সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবিক বিশ্বাসে ভরপুর এক সামাজিক পরিসর। মানুষ সহজেই মানুষকে বিশ্বাস করত, নিঃসংকোচে আপন করে নিত। সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে তেমন দ্বিধা বা সংশয়ের জায়গা খুব একটা কাজ করত না। ট্রলার-লঞ্চের সেই ভ্রমণ তাই শুধু স্মৃতিতে নয়, হাওরাঞ্চলের সামাজিক ইতিহাসেও থেকে গেছে এক উষ্ণ ও মানবিক অধ্যায় হিসেবে।
স্থানীয়দের স্মৃতিকথা
সোহরাব উদ্দিন। সরকারি চাকরিতে থেকে অবসর জীবনের রয়েছেন। কথা প্রসঙ্গে পুরনো স্মৃতি ঘেঁটে জানালেন সেসব দিনের ট্রলার-লঞ্চ ভ্রমণের স্মৃতি। “আমরা যে উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা আজ দেখছি, আমাদের সেই সময়ে তার অস্তিত্ব প্রায় ছিলই না। তখন নিত্য যাতায়াতের প্রধান ভরসা ছিল নদী ও খাল। কাছাকাছি গন্তব্যে যেতে ডিঙি নৌকাই যথেষ্ট ছিল, আর দূরবর্তী ভ্রমণের জন্য নির্ভর করতে হতো ট্রলার কিংবা লঞ্চের ওপর। এসব যাত্রায় পরিবারের বড়রা সবসময় শান্ত, হিসেবি ও ধীরস্থির পরিকল্পনা করলেও শিশুদের মনে কাজ করত এক অদ্ভুত কৌতুহল ও আনন্দের উত্তেজনা। প্রতিটি ভ্রমণ যেন হয়ে উঠত উৎসবের মতো—কোথায় বসবো, কখন খাবো, জানালার পাশে জায়গা পাবো কি না—এসব নিয়ে চলত নানা ছক আর কল্পনা।
বিশেষ করে মৌসুমভিত্তিক স্কুল ছুটির আগে থেকেই শিশু-কিশোরদের মনে শুরু হতো দূরপাল্লার ভ্রমণের প্রস্তুতি। নানাবাড়ি, খালাবাড়ি, ফুফুর বাড়িসহ আত্মীয়স্বজনের সম্ভাব্য গন্তব্যের তালিকা একে একে পরিবারের বড়দের সামনে হাজির করা হতো—কোথায় যেতে চাই, কতদিন থাকতে চাই। এসব আবদার ও বাস্তবতা বিবেচনা করেই বাবা-মায়েরা চূড়ান্ত করতেন ভ্রমণ পরিকল্পনা। দীর্ঘ ছুটিতে প্রায়ই পুরো পরিবার একসঙ্গে বেরিয়ে পড়তাম।
যাত্রার প্রস্তুতিও ছিল সময়োপযোগী ও আন্তরিকতায় ভরা। স্বজনদের জন্য ঘরে তৈরি নানা রকম পিঠা বানানো হতো, আর দীর্ঘ পথের জন্য আগেভাগেই রান্না করে নেওয়া হতো ভাত, তরকারি বা শুকনো খাবার। কাছাকাছি কোথাও গেলে সঙ্গে থাকত মুড়ি, গুড়, চিড়া বা অন্যান্য হালকা খাবার। এমন পারিবারিক ভ্রমণগুলোই ছিল বছরের পড়াশোনার ক্লান্তি, একঘেয়েমি ও মানসিক চাপ থেকে মুক্তির বড় উৎস—যা আমাদের শৈশবকে উপহার দিত এক আকাশ প্রশান্তি, উষ্ণ স্মৃতি আর আজীবনের গল্প।”
রাজধানী ঢাকায় এক সময়ের ব্যস্ত ও সফল ব্যবসায়ী। সত্তরোর্ধ্ব বয়সে সন্তানদের ব্যবসার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে অবসর দিন কাটাচ্ছেন মাহমুদ রহমান। কথা বলতে বলতে তাঁর কণ্ঠে ফিরে আসে নদীপথের লঞ্চযাত্রায় কাটানো আনন্দময় দিনগুলোর উজ্জ্বল স্মৃতি। তাঁর বর্ণনায় ভেসে ওঠে এক সময়ের পারিবারিক ভ্রমণকেন্দ্রিক আনন্দ উপভোগের স্বর্ণালী অধ্যায়—যে সময়টায় ভ্রমণ মানেই ছিল পারিবারিক মিলনমেলা। তিনি বলেন, আমাদের কাছে একসঙ্গে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার আনন্দের সঙ্গে আর কিছুর তুলনা হতো না।
সরকারি ছুটি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাশকে কেন্দ্র করে ভ্রমণের পরিকল্পনা শুরু হতো অনেক আগে থেকেই। পরিবারের বড়রা নির্দিষ্ট কোনো সময়ে বসে ঠিক করতেন—এবার কোথায় যাওয়া হবে, কারা কারা যাবেন, কতদিন থাকবেন। কোন কোন এলাকায় আত্মীয়স্বজনের বাড়ি আছে, সেখানে কদিন কাটানো যাবে—এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হতো। পরিকল্পনার এই ধাপ শেষ হলে প্রস্তুতির দায়িত্ব এসে পড়ত পরিবারের নারীদের ওপর। কোথায় যাচ্ছি, কতদিন থাকবো—তার ওপর ভিত্তি করে ঠিক করা হতো কত রকম পিঠা বানানো হবে। দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য যেসব পিঠা, সেগুলো আগে বানানো হতো এবং পরিমাণেও বেশি রাখা হতো। দিনব্যাপী ভ্রমণের ক্ষেত্রে সঙ্গে নেওয়া হতো চিড়া, মুড়ি, গুড় কিংবা অন্যান্য শুকনো খাবার। এরপর চলত সাজপোশাক বাছাই ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নেওয়ার পালা। ধীরে ধীরে সময় ঘনিয়ে এলে ভ্রমণের ছোটখাটো বিষয়গুলোও চূড়ান্ত করা হতো।
নির্ধারিত দিনে চিরচেনা লঞ্চঘাটে পৌঁছেই সবকিছু যেন নতুন করে অনুভূত হতো—মনে হতো এই প্রথম সেখানে আসা। লঞ্চ ভিড়ত নির্দিষ্ট ঘাটে, যেটি চারপাশে বেড়া দিয়ে ঘেরা থাকত। ভেতরে প্রবেশের জন্য দিতে হতো টোকেন মানি বা ঘাটভাড়া। এরপর সারিবদ্ধভাবে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে যাত্রীরা একে একে লঞ্চে উঠত। আসন খালি থাকা সাপেক্ষে পরিবার একসঙ্গে নিচতলা কিংবা দ্বিতীয় তলায় রাখা বেঞ্চ বা চেয়ারে বসত। নিচতলার একটি বড় অসুবিধা ছিল ইঞ্জিনের প্রচণ্ড শব্দ। ইঞ্জিনরুমের কাছাকাছি বসলে কথা বলতে হতো বেশ জোরে, অনেক সময় কথাবার্তা ঠিকমতো শোনা যেত না—যা কিছুটা বিরক্তিকর লাগত। তবে দ্বিতীয় তলায় বসলে এই সমস্যার তেমন একটা মুখোমুখি হতে হতো না।
লঞ্চ ছাড়ার পর শুরু হতো গল্পের আসর। একের পর এক আলোচনায় উঠে আসত যেসব আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া হচ্ছে, তাঁদের সঙ্গে কাটানো পুরোনো দিনের স্মৃতি। শিশুরা নিজেদের মধ্যে খেলাধুলায় মেতে থাকত, আর বড়রা সবসময় সতর্ক দৃষ্টিতে তাদের ওপর নজর রাখতেন—দুর্ঘটনার আশঙ্কা মাথায় রেখে। এভাবেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত নদীপথের যাত্রায়। দীর্ঘ সময় ধরে ভ্রমণ চললেও ক্লান্তির কোনো ছাপ পড়ত না কারও মুখে। বরং সেই লঞ্চযাত্রাই হয়ে উঠত আনন্দ, স্মৃতি আর পারিবারিক বন্ধনের এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
নয়ন সাহা—নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের একজন পাইকারি ব্যবসায়ী। নিকলী বাজারের দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ; পুরোনো ব্যবসায়ীদের তালিকায় তাঁর নামটি স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে। সেকালের নদীপথনির্ভর জীবন ও ব্যবসা সম্পর্কে তাঁর স্মৃতিচারণায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে ট্রলার-লঞ্চে যাতায়াত এবং মালপত্র পরিবহনের নানা বাস্তব দিক—যেখানে সুবিধা আর ঝুঁকি পাশাপাশি চলত।
তিনি বলেন, একসময় নদীপথই ছিল যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের একমাত্র ভরসা। সেই ব্যবস্থায় যেমন কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল, তেমনি ছিল বেশ কিছু বড় সুবিধাও। সীমাবদ্ধতার কথা বলতে গিয়ে তিনি প্রথমেই উল্লেখ করেন যাতায়াতের স্বল্পতা ও সময়নির্ভরতা। দিনে সাধারণত একটি বা বড়জোর দুটি ট্রলার কিংবা লঞ্চ চলাচল করত। ফলে নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকত না। ব্যবসায়িক কাজেও চলতে হতো একেবারে ছকবাঁধা নিয়মে। ভৈরব, কুলিয়ারচরসহ বিভিন্ন বন্দর ও শহরের উদ্দেশে ভোরবেলা যাত্রা শুরু করলে পণ্য সংগ্রহ করে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যেত। ওই দিন আর অন্য কোনো কাজ করার সুযোগ থাকত না।
নদীপথের যাত্রা ছিল ঝুঁকিপূর্ণও। যাত্রী কিংবা মালপত্র পরিবহনের সময় ডাকাতির শিকার হয়ে ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ সর্বস্ব হারিয়েছেন। আবার কখনো কখনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ট্রলার-লঞ্চ ডুবে গিয়ে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। এসব ঝুঁকি মাথায় রেখেই নদীপথে চলাচল করতে হতো।
তবে এতসব সমস্যার মাঝেও নদীপথের সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল কম খরচে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহনের সুযোগ। নবারুণ সাহা জানান, অনেক সময় তারা নিজেরা না গিয়ে ট্রলার বা লঞ্চের দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকজনের হাতে প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকা ধরিয়ে দিতেন। সেই তালিকা অনুযায়ী নির্দিষ্ট আড়ত বা বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে দিন শেষে নিজেদের দায়িত্বেই মালপত্র এনে দিতেন তারা। এতে সময় ও শ্রম—দুটোই বাঁচত।
সবকিছুর ঊর্ধ্বে তিনি নদীপথের ভ্রমণের আরামদায়ক দিকটির কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষায়, সেকালের নদীপথ যেমন ছিল স্বস্তিদায়ক ও নির্ঝঞ্ঝাট, আধুনিক সড়ক যোগাযোগের এই সময়েও সেই আরামের সঙ্গে তুলনা চলে না। নদীর বুক চিরে এগিয়ে চলা ট্রলার-লঞ্চে বসে যাত্রা করার যে প্রশান্তি—তা আজও তাঁর কাছে অনন্য ও অতুলনীয়।
পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যবসায়ী ক্ষীরমোহন বৈষ্ণবের স্মৃতিচারণায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে সেকাল থেকে একাল পর্যন্ত মিঠামইনের ব্যবসায়িক গুরুত্ব ও যোগাযোগ ব্যবস্থার বিবর্তনের গল্প। তাঁর ভাষায়, মিঠামইন বরাবরই একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। আশপাশের গ্রাম ও এলাকা থেকে নিয়মিত ক্রেতা-বিক্রেতাদের আনাগোনা ছিল এখানে। অনেক ব্যবসায়ীই মিঠামইন থেকে পাইকারি দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনে নিজ নিজ এলাকায় নিয়ে গিয়ে খুচরা ব্যবসা করতেন।
শত শত বছর ধরে নিত্যদিনের বাজারের পাশাপাশি প্রতি মঙ্গলবার বসে বিশেষ হাট, যা মিঠামইনের বাণিজ্যিক জীবনে আলাদা গুরুত্ব বহন করে। এই হাটকে কেন্দ্র করে লেনদেনের পরিমাণ বহুগুণে বেড়ে যেত। হাটবারের দিনে শুধু আশপাশের এলাকাই নয়, বরং বিভিন্ন উপজেলা ও জেলা থেকেও ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা মিঠামইনে আসতেন। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই ছোট-বড় ট্রলার ও লঞ্চের আনাগোনা শুরু হতো ঘাটে। কেউ নিজেদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে আসতেন বিক্রির উদ্দেশে, আবার কেউ আসতেন প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী কিনে নেওয়ার জন্য। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলত জমজমাট বেচাকেনা। দিন শেষে সবাই নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যেতেন পণ্য ও অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরে।
হাটবারের দিন মিঠামইনের পরিবেশে থাকত এক ধরনের উৎসবমুখরতা—যেন পুরো এলাকা পরিণত হতো ছোটখাটো এক মেলায়। তখনকার সময়ে মিঠামইনের সঙ্গে আশপাশের অঞ্চলের কোনো সড়ক যোগাযোগ ছিল না। যাত্রী পরিবহন কিংবা পণ্য আনা-নেওয়ার একমাত্র মাধ্যম ছিল নদীপথের ট্রলার ও লঞ্চ। নদীই ছিল এই অঞ্চলের প্রধান যোগাযোগের শিরা।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থায় এসেছে পরিবর্তন। মিঠামইন–ইটনা–অষ্টগ্রাম এই তিন উপজেলার মধ্যে গড়ে উঠেছে সড়কপথের আন্তসংযোগ, যা বর্তমানে ‘অলওয়েদার সড়ক’ নামে পরিচিত। এই সড়ক নির্মাণের ফলে অঞ্চলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ অনেকটাই সহজ ও দ্রুত হয়েছে, ভৌগোলিক দূরত্বও যেন কমে এসেছে। তবে এখনো কুলিয়ারচর ও ভৈরবের মতো বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে মিঠামইনের সরাসরি সড়ক সংযোগ স্থাপিত হয়নি। ফলে এসব গন্তব্যে যেতে এখনো নদী পারাপারের প্রয়োজন হয়। ফেরিযোগে নদী পেরিয়ে নিকলী ও করিমগঞ্জ হয়ে কিশোরগঞ্জ, কুলিয়ারচর, ভৈরব কিংবা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করতে হয়।
সব মিলিয়ে বৈষ্ণবের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে একটি বাস্তব সত্য—সড়ক যোগাযোগ অনেক উন্নত হলেও পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে এখনো নদীপথের ট্রলার-লঞ্চকে মানুষ সবচেয়ে আরামদায়ক ও নির্ভরযোগ্য বাহন হিসেবেই এগিয়ে রাখেন। নদীপথের সঙ্গে মিঠামইনের বাণিজ্যিক জীবনের এই নিবিড় সম্পর্ক আজও অটুট।

যোগাযোগ ব্যবস্থার রূপান্তর
হাওরাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি গ্রামই এক সময় সড়ক যোগাযোগের দিক থেকে ছিল বিচ্ছিন্ন ও নির্ভরশীল প্রকৃতির ওপর। এক গ্রামের সঙ্গে আরেক গ্রামের সরাসরি সড়কপথ প্রায় ছিলই না। ছোট ছোট গ্রামগুলো খাল, নদী কিংবা বিস্তীর্ণ নিচু উন্মুক্ত জমির কারণে একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে থাকত। ফলে শুধু বর্ষাকালে পানি বেড়ে যাওয়ার সময়ই নয়, শুষ্ক মৌসুমেও বহু এলাকায় কার্যকর সড়ক যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। যেখানে খাল বা নদীর কোনো বাধা ছিল না, সেখানেও নিচু ভূমি ও জলাবদ্ধতার কারণে রাস্তা নির্মাণ সম্ভব হয়নি।
দূরবর্তী গন্তব্যে যেতে যেমন ট্রলার বা লঞ্চের ওপর নির্ভর করতে হতো, তেমনি নিকটবর্তী কোনো গ্রাম বা বাজারে পৌঁছাতেও প্রয়োজন হতো ছোট নৌকা বা ডিঙি নৌকার। বর্ষাকালে খাল বা নদী পার হতে মানুষ ব্যবহার করত ছোট নৌকা কিংবা গুদারা। নৌকা থেকে নেমে গ্রামের ভেতরের সরু কাঁচা পথ ধরে হেঁটে যেতে হতো গন্তব্যে। বর্ষা শেষে পানি সরে গেলেও অনেক সময় নদী বা খাল পারাপারের জন্য নৌকার বিকল্প থাকত না। এরপর উন্মুক্ত আবাদি জমির মাঝখান দিয়ে গড়ে ওঠা মৌসুমী কাঁচা রাস্তা বা “গোপাট” ধরে পায়ে হেঁটেই মানুষকে যাতায়াত করতে হতো। এই ধরনের সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে হাওরাঞ্চলের মানুষ ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। নৌকা, খাল আর কাদামাখা পথই ছিল তাদের দৈনন্দিন চলাচলের স্বাভাবিক অনুষঙ্গ।
গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থায় একটি পরিচিত ও বহুল ব্যবহৃত পথ ছিল গ্রাম থেকে সরাসরি নিচু জমির দিকে নেমে যাওয়া মাটির রাস্তা, যা স্থানীয়ভাবে পরিচিত ছিল “গোপাট” নামে। এসব গোপাট মূলত কোনো পরিকল্পিত সড়ক নয়; বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের চলাচলের ফলে তৈরি হওয়া স্বাভাবিক পথ। গ্রাম ও বিস্তীর্ণ চারণভূমির মধ্যে সংযোগ স্থাপন করাই ছিল এই পথগুলোর প্রধান উদ্দেশ্য।
“গোপাট” নামকরণের পেছনেও রয়েছে একটি বাস্তব ও জীবনঘনিষ্ঠ কারণ। হাওরাঞ্চলের কৃষিনির্ভর সমাজব্যবস্থায় গবাদি পশু পালন ছিল পরিবারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ও জীবিকার অংশ। প্রতিদিন ভোরে গৃহস্থরা তাদের গরু-ছাগল-মহিষ নিয়ে গ্রামের ভিটা থেকে নেমে যেতেন পাশের নিচু জমি কিংবা উন্মুক্ত চারণভূমিতে। সেই যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত সরাসরি মাটির পথই ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে ওঠে “গোপাট” নামে—যেখানে ‘গো’ শব্দটি গবাদি পশু এবং ‘পাট’ অর্থ চলার পথ বা গমনপথকে নির্দেশ করে।
বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুম—উভয় সময়েই গোপাটের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষাকালে যখন চারপাশের জমি পানিতে তলিয়ে যেত, তখন গোপাট হয়ে উঠত নৌকা ভেড়ানোর স্থান কিংবা পানিতে নামার সহজ পথ। আবার শুষ্ক মৌসুমে এই গোপাট দিয়েই মানুষ পায়ে হেঁটে যেত আবাদি জমি, মাঠ বা চারণভূমির দিকে। এভাবে গোপাট শুধু যাতায়াতের রাস্তা নয়, বরং হাওরাঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কৃষিকাজ ও পশুপালনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এক বিশেষ গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
বর্ষা মৌসুমে হাওরাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে সহজ ও স্বস্তিদায়ক হতো। চারদিকে বিস্তৃত জলরাশির কারণে প্রায় প্রতিটি গ্রামের ঘাটেই সহজে ভিড়তে পারত নৌকা, ট্রলার ও লঞ্চ। পানি থাকায় খাল-নদীর বাঁধা থাকত না; ফলে কাছে কিংবা দূরের যেকোনো গন্তব্যেই জলপথে সরাসরি পৌঁছানো সম্ভব হতো। এই সময় হাওর যেন একটি প্রাকৃতিক নৌপথে পরিণত হতো, যেখানে জলই ছিল সড়ক আর নৌকাই ছিল প্রধান বাহন।
তবে এই সুবিধার মাঝেও ছিল সময়নির্ভর এক ধরনের সীমাবদ্ধতা। প্রতিদিন নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ট্রলার বা লঞ্চ চলাচল করত। নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে গেলে আর কোনো বিকল্প বাহন পাওয়া যেত না। এর ফলে সড়ক যোগাযোগে বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলোর মানুষকে জরুরি প্রয়োজনে, হঠাৎ অসুস্থতা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ খবর আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে ভোগান্তিতে পড়তে হতো। বিশেষ প্রয়োজন দেখা দিলে অতিরিক্ত খরচের বিনিময়ে নৌকা বা ট্রলার ভাড়া করার সুযোগ থাকলেও তা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সাধারণ ও স্বল্পআয়ের পরিবারের পক্ষে এসব ব্যয় বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত।
বর্ষার তুলনায় শুষ্ক মৌসুমে হাওরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা আরও জটিল ও কষ্টসাধ্য হয়ে উঠত। পানি নেমে যাওয়ার ফলে হাওরের বিস্তীর্ণ উন্মুক্ত অংশ দিয়ে সরাসরি চলাচল সম্ভব হতো না। নিয়মিত ট্রলার বা লঞ্চগুলোকে তখন খাল ও নদীর আঁকাবাঁকা সংকীর্ণ পথ ধরে চলতে হতো। এতে যাত্রাপথ দীর্ঘ হয়ে যেত এবং সময়ও লাগত বর্ষাকালের তুলনায় অনেক বেশি। তবুও আঞ্চলিক যোগাযোগ, পণ্য পরিবহন ও ব্যবসায়িক প্রয়োজনের কথা বিবেচনায় নিয়ে ট্রলার ও লঞ্চগুলো নিয়মিত চলাচল অব্যাহত রাখত।
যান্ত্রিক ত্রুটি, বৈরী আবহাওয়া কিংবা কোনো বিশেষ সমস্যার কারণে কখনো কখনো এই নিয়মিত যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যেত। এমন পরিস্থিতিতে হাওরাঞ্চলের মানুষের দূরপাল্লার যোগাযোগ প্রায় সম্পূর্ণরূপে অচল হয়ে পড়ত। শহর, বন্দর কিংবা রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, চিকিৎসা, শিক্ষা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতো। এভাবেই ঋতুভেদে পরিবর্তিত জলপথনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থা হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করত—যেখানে প্রকৃতির অনুকূলতা মানেই স্বস্তি, আর প্রতিকূলতা মানেই চরম ভোগান্তি।
সময়ের প্রবাহে হাওরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। অনেক খাল ও নদীর ওপর নির্মিত হয়েছে ছোট-বড় সেতু ও কালভার্ট। এসব সেতু-কালভার্টের মাধ্যমে দুই পাড়ের মধ্যে স্থায়ী সংযোগ স্থাপিত হয়েছে, যা মানুষের চলাচলকে করেছে সহজ ও দ্রুততর।
সেতু ও সড়ক নির্মাণের ফলে হাওরাঞ্চলে সড়কপথে যোগাযোগের পরিধি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। রিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, বাস, মোটরসাইকেলসহ ছোট-বড় নানা যানবাহনের চলাচল এখন অনেক এলাকাতেই স্বাভাবিক দৃশ্য। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে নদীপথের ওপর। যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে নৌকা ও ট্রলারের ওপর মানুষের নির্ভরতা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এক সময় যে নদীপথ ছিল জীবন ও জীবিকার প্রধান ভরসা, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা এখন অনেক জায়গায় বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে—যা হাওরাঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
লেখক: ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, আমাদের নিকলী ডটকম। সমাজসেবক ও সমাজকর্মী

