বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল শুধু নদী ও বন্যার গল্পে সীমাবদ্ধ নয়; এখানে লুকিয়ে আছে শত বছরের জীবিকা ও সংগ্রামের অনন্য ইতিহাস। একসময় গোবরের লাকড়ি, খরস্রোতা নদীতে জেলেপেশা, কিংবা মৌসুমি কৃষিকাজ—এসবের ভেতরেই গড়ে উঠেছিল হাজারো মানুষের জীবনযাত্রা। আধুনিকতার ঢেউয়ে অনেক পেশাই আজ বিলুপ্তপ্রায়। সেই হারানো ঐতিহ্য ও টিকে থাকা সংগ্রামের গল্প নিয়ে শুরু হচ্ছে নিকলীকেন্দ্রিক প্রথম অনলাইন সংবাদমাধ্যম “আমাদের নিকলী ডটকম”-এর ধারাবাহিক ফিচার প্রতিবেদন—“হাওরাঞ্চলের ব্যতিক্রমী জীবিকা”। আজ থাকছে “গোবর টুহানি”
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে কৃষিকাজের পাশাপাশি মানুষের জীবনজুড়ে জড়িয়ে ছিল এক বিশেষ পেশা—গরুর গোবর সংগ্রহ ও তা দিয়ে জ্বালানি লাকড়ি তৈরি। চরাঞ্চল প্রকৃতিগতভাবে বন্যাপ্রবণ। বর্ষাকাল শেষ হলেই মূল গ্রাম থেকে দূরে চর এলাকায় কৃষকেরা অস্থায়ী বসতি গড়ে তুলতেন। স্থানীয়ভাবে এই অস্থায়ী ঘরকে বলা হয় “বাথান”।

বাথানে বসবাসরত মানুষ কৃষির পাশাপাশি গবাদিপশু পালন করতেন। গরুর যত্ন, দুধ বিক্রি কিংবা গোবর সংগ্রহ—সবকিছুই তখন ছিল জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গরু থেকে প্রতিদিন দুধ সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করতেন। একই সাথে গবাদিপশুর একেবারে ভিন্নধর্মী এক উপাদানকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল ব্যতিক্রমী এক জীবিকা বা পেশা। সেই ব্যতিক্রমী উপাদান গরুর ‘গোবর’কে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠেছিল গ্রামীণ অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ ধারা—গোবর টুহানি (গোবর কুড়ানি)।
গোবর সংগ্রহের রীতি-নীতি
চরের মাঠ থেকে গোবর সংগ্রহ করা ছিল কিছু অস্বচ্ছল পরিবারের সদস্যদের এক ধরনের সামাজিক-অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। অনেকে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ মিনিট হাঁটাপথ অতিক্রম করে, তারপর খরস্রোতা ঘোড়াউত্রা নদী নৌকায় পাড়ি দিয়ে চরাঞ্চলে যেতেন গোবর সংগ্রহ করতে। ভোর থেকে দুপুর ২টা-৩টা পর্যন্ত চলত এই কাজ। সঙ্গে নিয়ে যেত সকালের নাশতা ও দুপুরের খাবার। সন্ধ্যা নাগাদ সবাই ফিরে আসতো বাড়িতে।

ব্যতিক্রমী গোবর কুড়ানোর কাজে প্রাপ্তবয়স্করা সাধারণত খুব একটা যেতেন না। কিশোর ছেলে-মেয়েরাই ছিল প্রধান শ্রমশক্তি। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা কম কষ্টে বেশি গোবর সংগ্রহ করতে পারতো। এই পার্থক্য গোবরভিত্তিক জীবিকার এক অদ্ভুত সামাজিক দিক তুলে ধরে।
গোবর দিয়ে লাকড়ি তৈরির কারিগরি
সংগ্রহ করা গোবর দিয়ে তৈরি হতো তিন ধরনের জ্বালানি লাকড়ি—
গই: পাটখড়ির চারপাশে হাতে চেপে চেপে গোবর আটকে রোদে শুকানো হতো। এটাকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় “গই”।
মুইট্ঠা: হাতের মুঠোয় গোবর চেপে বিশেষ আকার বানিয়ে শুকানো হয়। এটাকে বলা হয় মুইট্ঠা।
চটা: ধানের খড় বিছিয়ে তার ওপর গোবর মেখে তৈরি করা হয় সমতল আকারের লাকড়ি। এটি আবার দুই আকারে পাওয়া যেত—একটি বড়, অন্যটি খাবার রুটির আকারের।

এগুলো শুধু রান্নার জ্বালানি হিসেবেই ব্যবহৃত হতো না; একই সাথে গ্রামীণ নারীদের জন্য গোবরের লাকড়ি তৈরি ছিল অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার একটি হাতিয়ার।
বিপণন ও স্থানীয় অর্থনীতি
গোবরের লাকড়ি সাধারণত তিনভাবে বাজারজাত হতো: (১) প্রস্তুতকারীর বাড়ি থেকে সরাসরি ক্রেতারা কিনে নিয়ে যেতেন। (২) পরিবারের কোনো সদস্য মাথায় বা ভার বয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াতেন। হাঁক ছেড়ে আহ্বান করতেন লাকড়ি কেনার জন্য এবং (৩) পরিবারের কোনো সদস্য গ্রামীণ হাটে বা বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতেন।
এগুলো বিক্রি হতো “প্রতি পিস” হিসেবে। দাম নির্ভর করত এলাকার চাহিদা, মৌসুম ও পরিবহনের ওপর। এভাবেই গোবরের লাকড়ি গ্রামীণ অর্থনীতিতে ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা করে নিয়েছিল।

সময়ের পরিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য
কালের পরিক্রমায় এই পেশায় এসেছে পরিবর্তন। নানা অনিশ্চয়তা, বন্যার ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে চরাঞ্চলে গবাদিপশু পালন ক্রমে হ্রাস পেয়েছে। ফলে গোবরভিত্তিক লাকড়ি বানানোর ঐতিহ্যও কমে এসেছে।
বর্তমানে গরু পালন মূলত খামারকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। খামার মালিকরা গোবর দিয়ে করছেন আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বায়োগ্যাস উৎপাদন। অনেক পরিবার নিজেরাই পাইপের মাধ্যমে রান্নার কাজে সেই গ্যাস ব্যবহার করছেন। কেউ কেউ আবার অতিরিক্ত বায়োগ্যাস প্রতিবেশীদের কাছে বাণিজ্যিকভাবে সরবরাহ করছেন।
তবে একদল খামারি এখনও ঐতিহ্য ধরে রাখতে গোবর দিয়ে বানাচ্ছেন গই, মুইট্ঠা ও চটা। পরিমাণে তা খুবই কম এবং মূলত প্রতীকী চর্চা হিসেবেই রয়ে গেছে।

সমাজ-সংস্কৃতিতে প্রভাব
গোবরভিত্তিক লাকড়ি শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডই ছিল না, এটি চরাঞ্চলের মানুষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ। গ্রামীণ নারীরা আড্ডা দিতে দিতে লাকড়ি বানাতেন। শিশু-কিশোররা গোবর শুকাতে সাহায্য করত। রান্নার চুলায় লাকড়ি জ্বলার গন্ধ, ধোঁয়া—এসব চরাঞ্চলের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে ছিল। আজ যখন গ্যাস সিলিন্ডার বা বায়োগ্যাস রান্নাঘর দখল করছে, তখন সেই স্মৃতিগুলো নস্টালজিয়ায় পরিণত হচ্ছে।

কুড়িয়েদের স্মৃতি
মুন্নি (ছদ্মনাম)। এখন তিনি বিয়ে করে সংসারি। রয়েছে দুই ছেলে, এক মেয়ে। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। জানালেন তার শৈশবের সেই স্মৃতির কথা। শুনি তার কাছেই। “অনেক ভোরে মা খাওন রাইন্দা কাপড় দিয়া বাইন্দা দিতো। সব নিয়া সূর্য ওডার আগেই ছরে যাইতাম। গরুর ফিছে ফিছে ঘুরতাম। লেদা দিলেই টুহায়া খাচাতে উডাইতাম। সারাদিন কাম কইরা খাচা ভইরা যাইতো। কুনুদিন ভরতও না। কষ্ট অইতো। অবাবের সংসার। টেহা-ফয়সা নাই, এই কষ্টের কামই করন লাগত। তবু শান্তি ফাইতাম, বামা-মা একটু টেহার মুক দেকত।” সেদিনকার কষ্টের স্মৃতি বলতে বলতে আবেগতাড়িত হয়ে ওঠেন মুন্নি। চোখ ভিজে যায় জলে।
গোবর কুড়ানো বাবুল (ছদ্মনাম)। আজ পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। তিনিও বললেন মুন্নির মতো স্মৃতিকথা। “আমরা ছেরাইনতে নাওয়ে কইরা চরে যাইতাম। সারাদিন গরুর লেদা টুহাইতাম। একটা জিনিস খারাপ লাগত, মাইয়ারা আমরার তে বেশি লেদা ফাইত। কিছু টুহাইতো। কিছু বন্দের মাইনসেরা গোয়াল থেইকাও দিয়া দিতো। আমার কাছে কামডা এক রহমের খেলার লাগান মনে অইত। ভাবতাম, মা-বাপের ডাক-দোহাই নাই। ফরালেহা নাই। ইশকুলে যাওন লাগে না(!)। সারাদিন খেইলা লেদা নিয়া বাড়িত আইতাম। মাও খুশি অইত লেদা দেইক্কা।”

এমন আরও অনেক গোবর কুড়ানো মানুষের স্মৃতি সংগ্রহ করা হয়। সবার বক্তব্য প্রায় একই রকম। ওটা ছিল তাদের কাছে আনন্দ-বেদনা মিশ্রিত এক ভিন্নরকম জীবন; যেখানে খেলা, মুক্ত জীবনের পাশাপাশি সংসারের উপার্জনক্ষম সদস্যদের সাহায্য করা। বড় হয়ে উপলব্ধি অনেক বদলেছে। নিজের সন্তান, নাতি-নাতনিদের নিয়ে খেলছেন। সময় বেশ ভালো যায়। কেউ কেউ অবশ্য আর্থিক দৈন্য কাটিয়ে উঠতে পারেনি এখনো। আফসোস তাদের তাড়া করে বয়সের এই পড়ন্ত সময়ে। “আহ! যদি কষ্টমষ্ট কইরা ফরাডা অইত। ইশকুলডাত যাইতাম!”
সময় পেরিয়ে যখন হিসাবের খাতা মেলে ধরেন, সেই জীবন পেরিয়ে তারা আর ভুল করতে চান না। চেষ্টা করেছেন নিজেদের সন্তানদের স্কুল-মাদ্রাসায় দিয়ে শিক্ষিত করার। অনেকেই সফল হয়েছেন। বাকিরাও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য চেষ্টা করছেন সাধ্যমত।
স্থানীয়রা কিভাবে দেখছেন
স্থানীয় বাজারে ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমানের সাথে কথা হয়। তিনিও বললেন সে সময়ের কথা। তিনি বললেন, আমাদের সময়ে গোবরের লাকড়ি ছাড়া চুলায় আগুন জ্বালানোর উপাদান খুব কম ছিল। মাঠে গিয়ে ছেলেমেয়েরা ঝুড়ি ভরে গোবর আনত। বাজারের একপাশে গই-মুইট্টা, চটা নিয়ে বসতো লোকজন। কখনো এখান থেকে কিনতাম, কখনো ওদের বাড়ি থেকেই আনতাম। ভালোই ছিল ওই জীবনটা।
ষাটোর্ধ্ব ছিদ্দিক আলী। শৈশব-কৈশোর গ্রামে কাটিয়ে পড়াশোনা করে শহরমুখী। রাজধানীর নামকরা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিনি বলেন, চরাঞ্চলে কৃষিকাজের পাশাপাশি গরুর ওপরেই জীবন নির্ভর করত অনেক পরিবারের। গরুর দুধ, গোবর—সবই কাজে লাগত। গোবর দিয়ে শুধু লাকড়ি নয়, জমির সারও হতো। এখন আর কেউ চরে গরু চরায় না, কেউ গোবর কুড়ায় না। এগুলো এখন শুধু গল্প হয়ে গেছে।

শিক্ষকদের অভিমত
হালিমা খাতুন (ছদ্মনাম)। নিকলীর একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তিনি বলেন, “আমাদের ছোটবেলায় স্কুলে যেতে যেতে দেখতাম বাড়ির আঙিনায় গই আর মুইট্ঠা শুকানো হচ্ছে। আজকের শিশুদের অনেকেই এসব দেখে না, জানেও না। তাই ক্লাসে সুযোগ পেলেই আমি তাদের বলি—গোবরের লাকড়ি একসময় গ্রামীণ জীবনের অংশ ছিল। শিশুদের ইতিহাস জানানো জরুরি, যাতে তারা শেকড় ভুলে না যায়।”
স্কুলশিক্ষক নূরুল ইসলাম বললেন, আমাদের শিক্ষার্থীরা জানে গ্যাসের চুলা, সিলিন্ডার বা বায়োগ্যাস কী; কিন্তু গরুর গোবর থেকে কীভাবে লাকড়ি বানানো হতো—সেটা জানে না। অথচ এটা আমাদের লোকজ ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত। আমি মনে করি, স্থানীয় ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে বা সহপাঠ কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। একই সাথে তিনি বললেন, সে সময় সুবিধাবঞ্চিত গোবর কুড়ানো শিশু-কিশোরদের শিক্ষা বিষয়ে মুরুব্বিদের কাজ করা দরকার ছিল। তাহলে কাজের পাশাপাশি অন্তত শিক্ষাটা হতো।

কলেজে ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপনা করেন আব্দুল করিম। তিনি বললেন, “গোবরভিত্তিক লাকড়ি তৈরি ছিল দারিদ্র্যপীড়িত পরিবারের বেঁচে থাকার একটি হাতিয়ার। আজ সেটি বিলুপ্ত, কিন্তু এর সামাজিক গুরুত্ব ইতিহাসে লিখে রাখা দরকার। ছাত্রছাত্রীদের এসব জানানো আমাদের দায়িত্ব। আমরা নকশিকাঁথা, মাটির হাড়ি-পাতিলকে লোকঐতিহ্য হিসেবে দেখি, গোবরভিত্তিক লাকড়িও তেমনি একটি ঐতিহ্য। এটাকে কেবল ময়লা বা কষ্টকর কাজ ভেবে দূরে সরিয়ে দেওয়া উচিত নয়। গবেষণামূলক কাজেও এগুলো অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এতে এই প্রজন্ম গ্রামীণ জীবনের প্রকৃত চিত্র জানতে পারবে।”
উপসংহার
গোবর কুড়িয়ে লাকড়ি বানানো একসময় চরাঞ্চলের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি মানুষের জীবনধারার অপরিহার্য অংশ ছিল। কিন্তু আধুনিকতার চাপে, জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় ও খামারকেন্দ্রিক পশুপালনের কারণে “গোবর কুড়ানির” এই পেশা এখন বিলুপ্তির পথে। তবু ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ হিসেবে গোবরের লাকড়ি আজও মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে আছে—গ্রামীণ জীবনের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে।

লেখক: মোহাম্মদ তোফায়েল আহছান, সংবাদমাধ্যম কর্মী


