সভ্যতার সংকটে রবীন্দ্রনাথ

rabindranath tagore

মহিবুর রহিম ।।

পাঠকদের উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় দিতে গিয়ে প্রায়শ বিব্রত হয়ে পড়ি। এক বিশাল বিস্তৃত জগতের মধ্যে তাঁর অধিষ্ঠান। কোনো একদিক থেকে তাঁকে বুঝাও দুঃসাধ্য। তবু আমি তাঁর কবিতার জগতেই আশ্রয় নিই। কবিতার নদীপথে তাঁকে হৃদয়ঙ্গম করার একটা পথ অন্তত পাওয়া যায়। জলজ সরোবরের গন্ধ শুঁকে প্রকৃতিকে বোঝবার মতো উপলব্ধির পথ। রবীন্দ্রনাথেরও এ রকম একটা অভীপ্সা ছিল বোধ করি। সর্বদাই কবিতার মধ্যে নিজেকে অধিষ্ঠিত করতেন এবং কবিতার চারপাশে প্রকৃতির একটা বেড়া তৈরি করতেন। এমনটিই ধারণা হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কালান্তর’ পাঠ করে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধেও ডামাডোল তখন চারদিকে। দুঃসময় থেকে হানা দিচ্ছিল চারদিক থেকে। মানুষের হাজার বছরের অর্জিত মূল্যবোধগুলো মুখ থুবড়ে পড়ছিল। উদ্বিগ্ন রবীন্দ্রনাথ ঢুকে পড়লেন পুরাণের জগতে, কেননা সেখানে আবহমান মূল্যবোধের আহবান এবং প্রকৃতির ঘনিষ্ট সান্ত্বনা খুঁজে পাওয়া যায়। সেখানে থেকেই তিনি আনলেন অভয়ের বাণী, সভ্যতার সংকটে দেখি সে বাণীই তাঁর অবলম্বন।
‘বীরের এ রক্তস্রোত, মাতার এ অশ্রুধারা
এর যতমূল্য সেকি ধরার ধূলায় হবে হারা ?
স্বর্গ কি হবে না কেনা
বিশ্বের ভাণ্ডারী শুধিবে না
এত ঋণ ?
রাত্রির তপস্যা সেকি আনিবে না দিন ?’

rabindranath tagore

‘ঝড়ের খেয়া’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথের প্রশ্নটি আমাদের কানে বাজে। দিকভ্রান্ত নৈরাশ্যের অপনোদনে এ প্রশ্ন আমাদের মনে একটা স্বতস্ফূর্ত বাঁধ তৈরি করে, ভাঙনের স্রোতের পাশে অবিচল আশ্বাসকে জাগ্রত করে। রবীন্দ্রনাথ পশ্চিমের বিপর্যয়কে প্রত্যক্ষ করেছিলেন কিন্তু কোনোমতেই তা মেনে নিতে পারছিলেন না। নিজের মননেও একে স্থান দিতে পারছিলেন না। ইউরোপ আমেরিকা যা অনায়াসে মেনে নিয়েছিল, নৈরাশ্য আর অবিশ্বাসকে নতুন পাটাতন করে উলঙ্গ এক বাস্তবতার জন্ম তারা দিয়েছিল কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কাছে তা ছিল বিব্রতকর বিপর্যয়। বোদলেয়ারের নগ্ন চৈতন্য, নৈরাশ্য, নেতিবোধ তাঁকে আকৃষ্ট করেনি বরং দেখি ‘কল্পনা’ (১৩০৭) কাব্যের ‘দুঃসময়’ কবিতায় তিনি আশ্বাসকেই অবলম্বন করেছেন :
‘যদি সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে,
সব সঙ্গীত ইঙ্গিতে গেছে থামিয়া,
যদিও সঙ্গী নাহি অনন্ত অম্বরে,
যদিও ক্লান্তি আসিছে অঙ্গে নামিয়া,
মহা-আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্তরে,
দিক-দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা-
তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,
এখনি, অন্ধ, বন্ধ করো না পাখা-
(দুঃসময়/ কল্পনা)

কিন্তু আমরা এই ‘কল্পনা’ কাব্যের ‘স্বপ্ন’ কবিতায় একটা অন্যরকম আবহ দেখতে পাই। কবি ফিরে গেছেন সহস্র বছর পূর্বের উজ্জনিয়নী পুরে। ফিরে গেছেন প্রকৃতি আর নির্মল সুন্দরের হৃদয়িক পরশে :
‘দূরে, বহুদূরে
স্বপ্নলোকে উজ্জয়িনীপুরে
খুঁজিতে গেছিনু কবে শিপ্রানদীর পারে
মোর পূর্ব জনমের প্রথম প্রিয়ারে !
মুখে তার লোধ্ররেণু, লীলাপদ্ম হাতে,
কর্ণমূলে কুন্দকলি, কুরুবক মাথে,
তণু দেহে রক্তাম্বর নীবীবন্দে বাঁধা,
চরণে নূপুরখানি বাজে আধা-আধা।
—————————–
হেন কালে হাতে দীপশিখা
ধীরে ধীরে নামি এল মোর মালবিকা।
দেখা দিল দ্বারপ্রান্তে সোপানের’ পরে
সন্ধ্যার লক্ষ্মীর মতো, সন্ধ্যাতারা করে
অঙ্গের কুঙ্কুমগন্ধ কেশধূপবাস
ফেলিল সর্বাঙ্গে মোর উতলা নিঃশ্বাস।
——————————–
সুকোমল হাতখানি লুকাইল আসি
আমারদক্ষিণ করে, কূল্যায় প্রত্যাশী
সন্ধ্যার পাখির মতো। মুখখানি তার
নতবৃন্ত পদ্ম-সম এ বক্ষে আমার
নামিয়া পড়িল ধীরে।
(স্বপ্ন/ কল্পনা)
এ কবিতাটির উল্লেখ করেছি রবীন্দ্রনাথের মনোজগতের নিজস্ব আশ্রয়টি বোঝাবার জন্য। দার্শনিক রুশো বলেছিলেন, ‘মানুষ মাত্রেরই উচিত যতোটুকু সম্ভব প্রকৃতির ও প্রাকৃতিক আবেগ অনুভূতির কাছাকাছি থাকা।’ দর্শনের ইতিহাসে এ মত পরিচিত রোমান্টিকবাদ নামে। রোমান্টিকবাদ মানুষের উচ্চতর আবেগ অনুভূতির উপর জোর দেয় এবং মহিমান্বিত করে মানুষের নান্দনিক চিন্তাধারাকে। কিন্তু আধুনিক সভ্যতায় এ চিন্তাধারা অসার প্রতিপন্ন হয়। যুদ্ধ বিপর্যস্ত পৃথিবীতে চিরন্তন মূল্যবোধগুলো ধসে পড়ে, ক্ষুধা-রিরংসা-নৃশংসতা সর্বোপরি এক মহাবিপর্যয় ধেয়ে আসে, যা যুদ্ধের বিপর্যয়ের চেয়েও ভয়াবহ।

‘নির্বাণ নভে গৃধ্নু রাহুর গ্রাস
তুমি অনিকেত নির্বাক নাস্তিতে;
কে জবাব দেবে, নিখিল সর্বনাশ
কোন অবরোহী পাতকের শাস্তিতে ?
(১৯৪৫, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত)
দু’ দুটো বিশ্বযুদ্ধ, আঞ্চলিক যুদ্ধ, রাষ্ট্রবিপ্লব এবং ঔপনিবেশিক লুটতরাজের জঘন্যতায় দুর্ভিক্ষে, মন্বন্তরে সভ্যতার যে কুৎসিত কঙ্কালটি বেরিয়ে আসে বাস্তবাদের যৌক্তিক আবহে তাকে গ্রহণ করা হয়। চিরকালীন মূল্যবোধের স্থলে সে স্খলন, পতন অবক্ষয়, শিল্প-সাহিত্যের ভূমি অধিকার বসে। শার্ল বোদলেয়ারের লেখায় তার পরিচয় রয়েছে-
দূরে, অস্থির কুক্কুরী এক রুষ্ট চোখে
আমাদের করে লক্ষ্য,
কখন ফিরিয়ে নেব কঙ্কালপি- থেকে
তার খণ্ডিত ভক্ষ্য।
আর তবু তুমি, তুমিও হবে এ বিষ্ঠাধারা,
জঘণ্য কীট পঙক্তি,
আমার স্বভাবী সূর্য, আমার চোখে তারা,
দেবদূত, সংরক্তি !’
(শব / শার্লবোদলেয়ার, অনুবাদ-সুধীন্দ্রনাথ দত্ত)

রবীন্দ্রনাথ আধুনিক সভ্যতার মনোজগতের এই সর্বগ্রাসী বিকার আগ্রসনটি মেনে নিতে পারেন নি। এই মহাদুর্যোগে তাঁর স্বপ্নভঙ্গ ঘটেছে, সেটি এই উৎকর্ষ সভ্যতার প্রতি গড়ে ওঠা তাঁর আস্থা। রবীন্দ্রনাথের নিজের ভাষায়, ‘তখন আমরা স্বজাতির স্বাধীনতার সাধনা আরম্ভ করেছিলাম, কিন্তু অন্তরে ছিল ইংরেজ জাতির ঐদার্যের প্রতি বিশ্বাস। মানবমৈত্রীর বিশুদ্ধ পরিচয় দেখেছি ইংরেজ চরিত্রে। তাই আন্তরিক শ্রদ্ধা নিয়ে ইংরেজকে হৃদয়ের উচ্চাসনে বসিয়েছিলাম। তখনো সাম্রাজ্যবাদের মদমত্ততায় তাদের স্বভাবের দাক্ষিণ্য কলুষিত হয়নি।’

কিন্তু রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নভঙ্গ ঘটে যখন তিনি দেখলেন গোটা সভ্যতা নগ্নতা আর জঘন্যতার পঙ্কিল আবর্তে ডুবে গেল। পাশব উন্মত্ততায় সকল হীনকর্মকে সম্ভব করতে পারল। রবীন্দ্রনাথের নিজের ভাষায়-
‘দেখা গেল, সমস্ত ইউরোপে বর্বরতা কী রকম নখদন্ত বিকাশ করে বিভীষিকা বিস্তার করতে উদ্যত। এই মানব পীড়নের মহামারী পাশ্চত্য সভাতার মজ্জার ভেতর থেকে জাগ্রত হয়ে উঠে আজ মানবাত্মর অপমানে দিগন্ত পর্যন্ত বাতাস কলুষিত করে দিয়েছে।’

জার্মান দার্শনিক নীটশে একদা বলেছিলেন, ‘ইউরোপের শক্তিগুলো সাম্রাজ্য গড়েছে তাদের চরিত্রেরই অনুরূপ। তাদের চরিত্র হ’ল শিকারী জন্তুর চরিত্র।’ নীটশে সাম্রাজ্যবাদকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একথা বলেছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দী আর পুরো বিংশ শতাব্দী জুড়ে রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী পাশ্চাত্য শক্তিগুলোর জঘন্যতা ও বর্বরতার হাজার ইতিহাস। বার্টান্ড রাসেল, রঁমা রোঁলা, জর্জ বার্নার্ড শ’, নীটশে, রবীন্দ্রনাথের মতো মনীষীদের সে দুঃসময়ে নীরব থাকা সম্ভব ছিল না। তাই রবীন্দ্রনাথ ইউরোপ থেকে দেশে প্রত্যাবর্তনের সময় লেখেন-
‘নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে
বিষাক্ত নিঃশ্বাস
শান্তির ললিত বাণ শোনাইবে
ব্যর্থ পরিহাস’

পাশ্চাত্যের নৈতিক পতনে নিরাশ হলেও রবীন্দ্রনাথ মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানোকে পাপ মনে করতেন। এই সত্যটি তিনি প্রাচ্য ধারণা থেকেই অর্র্জন করেছিলেন এবং রোমান্টিসিজমে তাঁর প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল বলে রবীন্দ্রনাথ বরং ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন। ‘সভ্যতার সংকট’ নামক প্রবন্ধের উপসংহারে তাই তাঁর উদ্ধৃতি-
‘অধর্মে নৈধতে তাবৎ ততো ভদ্রানি পশ্যতি।
ততঃ সপত্মান জয়তি সমূলন্ত বিনশ্যতি।’

 

মহিবুর রহিম : কবি, প্রাবন্ধিক, লোকসংস্কৃতি গবেষক। বিভাগীয় প্রধান বাংলা বিভাগ, চিনাইর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অনার্স কলেজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

Similar Posts

error: Content is protected !!