বাংলা ছড়া সাহিত্যের গতি প্রকৃতি

মহিবুর রহিম ।।

বিশেষজ্ঞগণ নিশ্চিত হয়েছেন বাংলা সাহিত্যেরও আদি নিদর্শন প্রচলিত লোকছড়া। সৃজ্যমানকালের বাংলা ভাষার প্রাঞ্জল সাহিত্যরূপ খুঁজে পাওয়া যায় লোকমুখে প্রচলিত ছড়াগুলোয়। এ থেকে সাহিত্যের এ শাখাটির প্রাচীনত্ব, গুরুত্ব ও মর্যাদা অনুধাবন করা যায়। চর্যাপদের ভাষা বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে অনেকে ধারণা করেন চর্যা প্রচলনের বহু পূর্বেই হয়তো এখানে কথ্য ছড়ার প্রচলন ঘটে। যা কালে কালে নানা বিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বর্তমান অবধি সাহিত্যে ব্যাপক প্রভাব নিয়ে টিকে আছে।
বিশেষজ্ঞগণ দেখেছেন যে কোন ভাষার প্রবহমান প্রাণশক্তিকে ধারণ করতে পারে কেবল সিলেবলিক ছন্দের ছড়াগুলো। কেননা সাধারণের প্রয়োজনে স্বতস্ফূর্ত এক ছন্দে রচিত হয় ছড়া। ছন্দের এই স্বতস্ফূর্ততাই ছড়াকে করেছে যুগোত্তীর্ণ। তাছাড়া গভীর কোন ভাবার্থ নয়, ছড়ার বিষয় হচ্ছে ছন্দের আনন্দ। জীবনের বিভিন্ন প্রয়োজনে এ আনন্দ পরিবেশিত হয়। আনন্দের এই সার্বজনীনতা ছড়াকে ছড়িয়ে দিয়েছে সর্বত্র এবং এর মধ্যে প্রবেশ করেছে বর্ণিল বৈচিত্র্য। সম্ভবত সে কারণেই মহাকালের পরিক্রমায় ছড়া হয়ে উঠেছে আত্মপ্রকাশ ও আত্মপরেও প্রতিবাদী হাতিয়ার।

পৃথিবীর সব ভাষাতেই লোকছড়ার প্রচলন ল্য করা যায়। এ সকল লোকছড়ায় এক ধরণের মিলও খুঁজে পাওয়া যায়। স্বত:স্ফূর্ত ভাষায় এগুলোর প্রকাশ। বিষয়ের নেই কোন জটিলতা। ছন্দের দ্যোতনা সর্বত্রই সমান। যেমন-
টুইঙ্কেল টুইঙ্কেল লিটল স্টার
হাউ আই ওয়ান্ডার ওয়াট ইউ আর
আপ এভব দ্য ওয়ার্ল্ড সো হাই
লাইক এ ডাইমন্ড ইন দ্য স্কাই

অথবা

আগ ডুম বাগ ডুম
ঘোড়া ডুম সাজে
ডাক ঢোল ঝাঝর বাজে
বাজতে বাজতে চলল ঢুলি
ঢুলি গেল কমলা ফুলি…..

এ রকম অসংখ্য ছড়া পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় প্রচলিত হয়েছে। একটা স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে স্থান করে নিয়েছে সমাজে ও সাহিত্যে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছড়ার এই আন্তর্জাতিকতায় বিস্মিত হয়েছিলেন। তিনি দেখেছেন লোকসাহিত্যে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি মাধ্যম ছড়া। সব দেশেই এর গুরুত্ব প্রায় সমান। তিনি দেখেছেন বিষয়ের মিলও বিস্ময়কর। পরবর্তীতে ড. আশরাফ সিদ্দিকী, শামসুজ্জামান খান, ড. ওয়াকিল আহমদ সহ অনেকে লোকছড়া নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন।

আমরা দেখেছি আধুনিক সাহিত্যের যুগে ছড়া নতুন মাত্রায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ছড়ার ছন্দকে নানা প্রকরণে প্রকাশ করেছেন। এর ফলে শুরু হয় ছড়ার বহুমাত্রিক যাত্রা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) ছড়ার এই সম্ভাবনাময় দিকগুলো নিয়ে ভেবেছিলেন। তিনি লিখেছেন – ‘আমি ছড়াকে মেঘের সহিত তুলনা করিয়াছি। উভয়ই পরিবর্তনশীল , বিবিধ বর্ণে রঞ্জিত , বায়ুস্রোতে যদৃচ্ছাভাসমান। দেখিয়া মনে হয় নিরর্থক। ছড়াও কলাবিচার শাস্ত্রের বাহিরে , মেঘবিজ্ঞানও শাস্ত্রনিয়মের মধ্যে ভাল করিয়া ধরা দেয় নাই। অথচ জড়জগতে এবং মনোজগতে এই দুই উচ্ছৃঙ্খল পদার্থ চিরকাল মহৎ উদ্দেশ্য সাধন করিয়া আসিতেছে। মেঘ বারিধারায় নামিয়া আসিয়া শিশু শস্যকে প্রাণদান করিতেছে এবং ছড়াগুলিও স্নেহরসে বিগলিত হইয়া কল্পনা বৃষ্টিতে শিশু হৃদয়কে উর্বর করিয়া তুলিতেছে।’ রবীন্দ্রনাথ কালজয়ী বহু ছড়া রচনা করেছেন। ছড়া নিয়ে তাঁর পরীা নিরীার কথা আমরা জানি।
মনে করো যেন বিদেশ ঘুরে
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।
তুমি যাচ্ছ পালকিতে, মা, চড়ে
দরজা দুটো একটুকু ফাঁক করে,
আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার পরে
টকবগিয়ে তোমার পাশে পাশে…

ছড়ার ছন্দে এমনি অনেক কিশোরকাব্য কিংবা কাহিনীকাব্য রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমে আমরা পেয়েছি। নিরেট ছড়া রচনাতেও রবীন্দ্রনাথের জুড়ি নেই। সে সকল রচনায় অসাধারণ শিশু মনস্কতার পরিচয় রবীন্দ্রনাথ দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের একটি ছড়া লিমেরিক-
ইতিহাসবিশারদ গণেশ ধুরন্ধর
ইজারা নিয়েছে একা বম্বাই বন্দর।
নিয়ে সাতজন জেলে
দেখে মাপকাটি ফেলে
সাগর মথনে কোথা উঠেছিল চন্দর,
কোথা ডুব দিয়ে আছে ডানাকাটা মন্দর।

অথবা

ঘাসে আছে ভিটামিন, গরু ভেড়া অশ্ব
ঘাস খেয়ে বেঁচে আছে, আখি মেলে পশ্য।

অনুকূল বাবু বলে, ‘ঘাস খাওয়া ধরা চাই,
কিছুদিন জঠরেতে অভ্যেস করা চাই,
বৃথাই খরচ করে চাষ করা শস্য।

সেকালে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮২-১৯২২) ছন্দ নির্ভর প্রাঞ্জল পদ্য রচনা করেছেন। তাঁর লেখাগুলো উৎকৃষ্ট শিশুসাহিত্যেরও নিদর্শন। ছন্দের ঝংকারময় প্রয়োগে তাঁর আনন্দ ও শিামূলক ছড়া কবিতা অসাধারণ। ‘পালকির গান’;‘ট্যাপা দোপাটি’;‘ মেয়ে বড় সুলণা’;‘পারুল পারুল! দোল দোলা’ তাঁর প্রভৃতি লেখার কথা আমাদের স্মরণে আছে। তিনি বিদেশি ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন ছড়ার ছন্দে। ফার্সি ভাষার মহাকবি শেখ সাদীর লেখা থেকে তিনি প্রাঞ্জল ছড়া উপহার দিয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত লেখাটি –
‘কুকুর আসিয়া এমন কামড়
দিল পথিকের পায়,
কামড়ের চোটে বিষদাঁত ফোটে
বিষ লেগে গেল তায়….

কুকুরের কাজ কুকুরে করেছে
কামড় দিয়েছে পায়,
তাই বলে কি কুকুরে কামরানো
মানুষে শোভা পায় ?……’

বাংলা ছড়া সাহিত্যের আরও এক দিকপাল সুকুমার রায় (১৮৮৭-১৯২৩)। যোগীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথের পরে তিনি বাংলা ছড়া সাহিত্যে এনেছেন নতুন বৈচিত্র্য। অসাধারণ কল্পনা শক্তিতে তিনি উদ্ভট বিষয়কে ছড়ার উপজীব্য করেছেন। শুধু ব্যঙ্গাত্মক বিষয় নয়, ছন্দের নিটোল আনন্দও পরিবেশিত হয়েছে তাঁর লেখায়। তাঁর বিখ্যাত উদ্ভট ছড়ার মধ্যে অন্যতম-
‘হাট্টিমা টিম টিম
তারা মাঠে পাড়ে ডিম
তাদের খাড়া দুটো শিঙ
তারা হাট্টিমা টিম টিম’

ছড়া নিয়ে তিনি বহু রকমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। কোথাও প্রয়োগ করেছেন বিপরীত কল্পনা ও চিন্তাকে। আবার কোথাও লোকজ কথ্য ভঙ্গিকে ছড়ার ছন্দে কাজে লাগিয়েছেন। যেমন-
মাসি গো মাসি পাচ্ছে হাসি
নিম গাছেতে হচ্ছে শিম
হাতির মাথায় ব্যাঙের ছাতা
কাকের বাসায় বকের ডিম।

সুকুমার রায়ের ছড়ায় দ্বিরুক্ত শব্দের ব্যবহার ছন্দের গতিকে বৃদ্ধি করেছে। যেমন-

চলে হন হন ছুটে পন পন
ঘোরে বন বন কাজে ঠন ঠন
বায়ু শন শন শীতে কন কন
কাশি খন খন ফোড়া টন টন
মাছি ভন ভন ঝন ঝন।
তাঁর বিখ্যাত ছড়াগ্রন্থ ‘আবল-তাবোল’; ‘হ-য-ব-র-ল’; ‘পাগলা দাশু’; ‘বহুরূপী’; ‘খাইখাই’; ‘অবাক জলপান’। সুকুমার রায়ের পিতা উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীও একজন প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক। পিতার মৃত্যুর পর তিনি দীর্ঘদিন ‘সন্দেশ’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন।
বাংলা ছড়া সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) এর আছে স্বতন্ত্র অবস্থান। বাংলা সাহিত্যের এই যুগস্রষ্টা কবি শিশু সাহিত্যেও রেখেছেন মৌলিক অবদান। হাস্যরস কিংবা শিক্ষামূলক প্রচুর ছড়া তিনি রচনা করেছেন। তাঁর ‘ঝিঙেফুল’, ‘চন্দ্রবিন্দু’ সহ বহু গ্রন্থাদিতে ছড়াগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। দুটি উদ্ধৃতি দেয়া যায়-
‘ চলব আমি হালকা চালে
পলকা খেয়ায় হাওয়ার তালে
কুসুম যেমন গন্ধ ঢালে
তরল সরল ছন্দে রে।
যেমন চলার ছন্দ লুটে
চন্দ্র ডোবে সূর্য ওঠে
সন্ধ্যা সকাল সমীর ছুটে
যেমন সে আনন্দে রে।’
(চলব আমি হালকা চালে)
অথবা
‘কম্বলের অম্বল
কেরোসিনের চাটনি
তামচের আমচুর-
খাইছনি নাতনি?
আমড়ার- দামড়া
কান দিয়ে ঘষে নাও
চামড়ার বাটিতে
চটকিয়ে কষে খাও!’
(নতুন খাবার)
নজরুলের ‘প্রভাতী’;‘খুকী ও কাঠবিড়ালি’;‘লিচু চোর’;‘খাদু-দাদু’;‘পিলে-পটকা’;‘সংকল্প’ প্রভৃতি লেখার কথা আমাদের স্মরণ করতেই হয়।

রবীন্দ্র-সুকুমার-নজরুল উত্তর যুগে ছড়া সাহিত্য নিয়ে নতুন এক ধরণের উদ্দীপনা তৈরি হয়। ত্রিশ ও চল্লিশের দশকের কবিরা ছড়াকে প্রাঞ্জল শিশু সাহিত্যের মাধ্যম এবং ছড়ার ছন্দে বহু সিরিয়াস কবিতাও লেখায় সচেষ্ট হয়েছেন। এর ফলে শুরু হয় নতুন এক ছড়াসাহিত্য আন্দোলন। চলিশের দশকে ঢাকা কেন্দ্রিক সাহিত্য ধারায় ছড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের আবেগ অনুভূতিকে ধারণ করে এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ছড়াসাহিত্য আন্দোলন সাহিত্যের এক বেগবান ধারায় পরিণত হয়। পঞ্চাশের দশক থেকেই ছড়া জীবন ঘনিষ্ট চলমান বাস্তবতাকে অকপট স্বীকারুক্তিতে বাক্সময় করে তুলছে। সম্ভবত সে কারণেই আমাদের রাজনৈতিক চেতনার মূল প্রবাহটি ছড়া সাহিত্যে উঠে এসেছে। শিশু সাহিত্যের পাশাপাশি ছড়ার এই নতুন উদ্বোধন এর বিকাশকে আরও বেগবান করেছে। এ পর্বে এসে বাংলা ছড়াসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন কাজী আবুল কাশেম, আহসান হাবীব,ফররুখ আহমদ, হাবীবুর রহমান, রোকনুজ্জামান খান , ফয়েজ আহমদ (১৯৩২-) প্রমুখ।
এদের মধ্যে আহসান হাবীব (১৯১৭-১৯৮৫) ত্রিশোত্তর আধুনিক কাব্য ধারায় আত্মমগ্ন এক গভীর জীবনবোধকে ধারণ করেছিলেন। আহসান হাবীবের কবিতায় শিল্প নান্দনিকতার একটি নিজস্ব ধারা আছে। তাঁর শিশু কিশোর উপযোগী কবিতাগুলো সুখপাঠ্য ও স্বতন্ত্র ভাবধারায় উৎদ্ভাসিত। শিশুতোষ রচনাগুলোতেও তাঁর বিষয় ও ছন্দেও আধুনিকতা উপভোগ্য। তাঁর সারা জাগানো ছড়াগ্রন্থ ‘বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’ (১৯৭৭),‘ছুটির দিন দুপুরে’ (১৯৭৮),‘পাখিরা ফিরে আসে’ (১৯৮৪) প্রভৃতি।
ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪) বাংলা সাহিত্যে এক স্বতন্ত্র ধারার মৌলিক কবি। প্রধানত তিনি ইসলামি ভাবধারার কবি হিসেবে সমধিক খ্যাতি পেয়েছেন। তিনি প্রচুর সংখ্যক শিামূলক ছড়া রচনা করেছেন। তাঁর বিখ্যাত ছড়াগ্রন্থ গুলো হচ্ছে-‘পাখির বাসা’, ‘হরফের ছড়া’, ‘চিড়িয়াখানা’ প্রভৃতি। একটি ছড়ার উদ্বৃতি দেয়া যেতে পারে-
‘আয় গো তোরা ভাই বোনেরা ফুলের দেশে যাই
ফুল ঝুরঝুর ফুলের দেশে ফুলের খবর পাই।
রঙিন পলাশ, পারুল, শিমুল, সাঝ সকালে হাসে
তারার মতো শিউলী বকুল যায় ছড়িয়ে ঘাসে,
রঙের সাথে গন্ধ ফুলের পাইরে যেখানে
দল বেঁধে ভাই আয় গো সবাই যাই রে সেখানে।’

অথবা

‘বাপরে সে কী ধুম ধারাক্কা
দিচ্ছে ধাক্কা . খাচ্ছে ধাক্কা,
গুঁতোর চোটে হয় প্রাণান্ত
হাঁপিয়ে ওঠে ক্যাবলা কান্ত!
লাগল যখন বিষম তেষ্টা
কেবলা করে ডাবের চেষ্টা।
তাকিয়ে দেখে পকেট সাফ
ভিড়ের ভিতর দেয় সে লাফ।’

সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬-১৯৪৭) নজরুল পরবর্তী সমাজ সচেতন সাহিত্যধারার অন্যতম রূপকার। নজরুলের মতো তিনি সাহিত্যে বিদ্রোহী ভাবাদর্শের অনুসারী। বাংলা শিশু সাহিত্যেও সুকান্তের অবদান অসামান্য। সুকান্তেও ‘মিঠেকড়া’র ছড়াগুলো বাংলা শিশু সাহিত্যে উজ্জ্বল সংযোজন। তাঁর স্বভাব সুলভ প্রতিবাদী চেতনায় তিনি শিশু সাহিত্যেও এনেছেন বৈচিত্র্য। তাঁর বিখ্যাত ‘পুরনো ধাঁধা’য় সুকান্ত লিখেছেন-
‘বলতে পারো বড় মানুষ মোটর কেন চড়বে?
গরীব কেন সেই মোটরের তলায় চাপা পড়বে?
বড় মানুষ ভোজের পাতে ফেলে লুচি-মিষ্টি
গরীবরা পায় খোলামকুচি , একী অনাসৃষ্টি?
ঊলতে পারো ধনীর বাড়ি তৈরি যারা করছে,
কুঁড়ে ঘরেই তারা কেন মাছির মতই মরছে?
বলতে পারো ধনীর মুখে যারা যোগায় খাদ্য,
ধনীর পায়ের তলায় তারা থাকতে কেন বাধ্য?
‘হিং-টিং-ছট’ প্রশ্ন এসব মাথার মধ্যে কামড়ায়,
বড় লোকের ঢাক তৈরি গরীব লোকের চামড়ায়।।’
চল্লিশোত্তর বাংলা কবিতার বরেণ্য কবি শামসুর রাহমান (১৯২৯-২০০৬) তাঁর ‘এলাটিং বেলাটিং’ (১৯৭৫) , ‘ধান ভানলে কুঁড়ো দেবো’ (১৯৭৭), ‘গোলাপ ফোটে খুকীর হাতে’ (১৯৭৭), ‘স্মৃতির শহর’ (১৯৭৯); ‘রঙধনু সাঁকো (১৯৯৫); ‘নয়নার জন্য’ (১৯৯৭);‘আমের কুঁড়ি,জামের কুঁড়ি’ (২০০৪) প্রভৃতি ছড়া পুস্তকের জন্য নি:সন্দেহে বাংলা ছড়াসাহিত্যে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। এ সকল ছড়াগ্রন্থে তাঁকে নানা মাত্রায় পাওয়া যায়। প্রথমত তিনি অনেক সার্থক রূপকধর্মী ছড়া রচনা করেছেন। দ্বিতীয়ত তিনি লোকজ বিষয় ও ভাষাভঙ্গিকে অবলম্বন করেছেন। তাঁর স্মরণীয় ছড়ারগুলোর মধ্যে আছে ‘আজব শহর’; ‘পণ্ডশ্রম‘;‘ট্রেন’; । দুটি লেখার উদ্বৃতি দেয়া যেতে পারে-
‘এই নিয়েছে এই নিল যা কান নিয়েছে চিলে
চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে
কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে কাটছি সাতার বিলে…’

অথবা
‘নয়না তার বোনকে বলে, শোন দীপিতা
দিচ্ছি তোকে বলে
আমার ছড়ায় কান না দিলে চিমটি খাবি
কানটা দেব মলে।

ঐ যে দূওে নীল আকাশে উড়ছে নানা
মেঘ-পরীদেও শাড়ি,
সেখানটাতে আছেওে শোন চোখ-জুড়ানো
চন্দ্রমামার বাড়ি।

চন্দ্রমামার নাম শুনিস নি? হদ্দ বোকা,
চাঁদমামা তো তিনি,
তার বাগানে তারাগুলি বাজনা বাজায়
মধুর রিনিঝিনি।’

বাংলা শিশু সাহিত্যে আল মাহমুদ (১৯৩৬) একটি নিজস্ব প্রাঞ্জল জগত গড়ে নিয়েছেন। তাঁর ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ (১৯৮০) , ‘একটি পাখি লেজ ঝোলা’ (২০০৮), ‘ মোল্লাবাড়ির ছড়া’ (২০১০) প্রভৃতি ছড়াগ্রন্থ শিশুসাহিত্যে তাঁকে দিয়েছে স্বতন্ত্র স্থান। রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা শিশুসাহিত্যে ভাষার এমন সহজ সাবলীল গতি একমাত্র আল মাহমুদই আয়ত্ব করতে পেরেছেন। যেমন-

‘লিয়ানা গো লিয়ানা
সোনার মেয়ে তুই
কোন পাহাড়ে তুলতে গেলি-
জুঁই ?

বন-বাদারে যাইনি মাগো
ফুলের বনেও না ,
রাঙা খাদির অভাবে মা
পাতায় ঢাকি গা।’
কিংবা
‘ ট্রাক ! ট্রাক ! ট্রাক !
ট্রাকের মুখে আগুন দিতে
মতিয়ুরকে ডাক
কোথায় পাব মতিয়ুরকে
ঘুমিয়ে আছে সে !
তোরাই তবে সোনামানিক
আগুন জ্বেলে দে।’
এ ধরনের ছড়াগুলো ছাড়াও ‘ ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ / দুপুর বেলার অক্ত / বৃষ্টি নামে বৃষ্টি কোথায় ? / বরকতের রক্ত’ কিংবা ‘আম্মা বলেন পড়রে সোনা / আব্বা বলেন মন দে / পাঠে আমার মন বসে না / কাঁঠালচাঁপার গন্ধে/ আমার কেবল ইচ্ছে করে নদীর ধারে থাকতে/ বকুল ডালে লুকিয়ে থেকে/ পাখির মতো ডাকতে’ আল মাহমুদের এ সকল ছড়া এক অর্থে তুলনাহীন।

বিংশ শতকের সত্তর দশক থেকে বাংলা ছড়াসাহিত্য একটি নতুন যুগের সন্ধান পায়। এ সময় থেকে আবির্ভূত হতে থাকেন বিপুল সংখ্যক ছড়াকার। মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের প্রেরণা এ সময়ের ছড়াকে দিয়েছে বিশেষ গতি ও মহিমা। ছড়া সাহিত্যের মূল ভুবন অধিকার করে নিয়েছে রাজনৈতিক ছড়া। এ সময়ের অন্যতম ছড়াকার হচ্ছেন- আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দীন (১৯৩৪-),দিলওয়ার (১৯৩৭-২০১৩), বেগম রাজিয়া হোসাইন (১৯৩৮-) সুকুমার বড়–য়া (১৯৩৮-), এখলাসউদ্দিন আহমদ (১৯৪০-), আসাদ চৌধুরী (১৯৪৩-), সিরাজুল ফরিদ (১৯৪৩-), মাহমুদউল্লাহ (১৬৪৪-), আখতার হুসেন (১৯৪৫-) মসউদ উস-শহীদ (১৯৪৫-), আবু সালেহ (১৯৪৮-), সাজ্জাদ হোসাইন খান (১৯৪৮-) আবিদ আনোয়ার (১৯৫০-) প্রণব চৌধুরী (১৯৫০-), দীপংকর চক্রবর্তী (১৯৫১-), খালেক বিন জয়েনউদ্দীন (১৯৫৪-), সুবীর বসাক (১৯৫৪-), হাসান হাফিজ (১৯৫৫-), শাহাবুদ্দীন নাগরী (১৯৫৫-), দেলওয়ার বিন রশিদ (১৯৫৫-), জয়দুল হোসেন (১৯৫৫-), তপংকর চক্রবর্তী (১৯৫৫-), আলম তালুকদার (১৯৫৬-) মহিউদ্দিন আকবর (১৯৫৬-) কাজী রাশিদা আনওয়ার, ফারুক নওয়াজ (১৯৫৮-), আবু হাসান শাহরিয়ার (১৯৫৯-), সৈয়দ আল ফারুক (১৯৫৯-), রহীম শাহ (১৯৫৯-), সুজন বড়ুয়া (১৯৫৯-), ফেরদৌস চৌধুরী (১৯৬০-), জাহাঙ্গীর আলম জাহান (১৯৬০-), লুৎফর রহমান রিটন (১৯৬১-), ফারুক হোসেন (১৯৬১-), সালেম সুলেরী (১৯৬১-), আশরাফুল মান্নান, বদরুল হায়দার (১৯৬১-), খালেদ হোসাইন (১৯৬৪-), আমীরুল ইসলাম (১৯৬৪-), আশরাফুল আলম পিন্টু (১৯৬৪-), রাশেদ রউফ (১৯৬৪-), আনজীর লিটন (১৯৬৫-), মানসুর মুজাম্মিল (১৯৬৬-), তপন বাগচী (১৯৬৮-), রোমেন রায়হান (১৯৬৯-), ওবায়দুল গনি চন্দন (১৯৭০-), জাকির আবু জাফর (১৯৭১-) প্রমুখ।

বাংলা ছড়াসাহিত্যে সুকুমার বড়ুয়া একটি উজ্জ্বল নাম। মৌলিকতা ও প্রাঞ্জলতায় তার একটি নিজস্ব অবস্থান আছে। সুকুমার বড়ুয়া ছড়ার ছন্দেও নিজস্ব ধরণের বৈচিত্র্য এনেছেন। তার উল্লেখযোগ্য ছড়াগ্রন্থ ‘পাগলা ঘোড়া’ (১৯৭০), ‘ভিজে বেড়াল’ (১৯৭৬), ‘এলোপাতাড়ি’ (১৯৭৯), ‘চিচিং ফাঁক’ (১৯৯২), ‘কিছু না কিছু’ (১৯৯৫), ‘ঠিক আছে ঠিক আছে’ (২০০৬) প্রভৃতি। ছড়া সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৭), বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৭), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৯) প্রভৃতি পুরস্কার লাভ করেছেন।

সিরাজুল ফরিদ সত্তরের দশক থেকেই একজন আলোচিত ছড়াকার। শিশু সাহিত্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক সচেতনতামূলক ছড়া লিখে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাঁর ‘ লাগাম টেনে ধর’ (১৯৮২) উল্লেখযোগ্য একটি ছড়াগ্রন্থ। তাঁর অন্যান্য ছড়া গ্রন্থগুলো হলো ‘লড়াই গণতন্ত্রের’ (২০০৬); ‘বৈরী সময়’ (২০০৭); ‘স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ছড়া’ (২০০৮);‘ফটাটিং ফটাটিং ফট’ (২০০৮) ও ‘টেকো বুড়োর গল্প’ (২০০৯)। তিনি ছড়া সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ‘সুকুমার রায় সাহিত্য পদক ও সম্মাননা’ ২০০৭ লাভ করেছেন।

‘যখন ঘোড়ার পাখনা গজায় গায়
আকাশ পানে উড়াল দিতে চায়
যখন ঘোড়া কামড়ে ধরে মাটি
তখন ঘোড়া পাগলাটে হয় খাঁটি
পাগলা ঘোড়া ভাঙে সবার ঘর
সময় আছে লাগাম টেনে ধর।’
(লাগাম টেনে ধর)

সাম্প্রতিক বাংলা ছড়া সাহিত্যে আবু সালেহ একটি শক্তিশালী নিজস্ব পরিমণ্ডল গড়ে তুলেছেন। বিশেষত রাজনৈতিক সচেতনতা মূলক ছড়ায় তাঁর অবদান সকলের সমীহ আদায় করে নেয়। তার উল্লেখযোগ্য ছড়াগ্রন্থ গুলো হচ্ছে- ‘পল্টনের ছড়া’ (১৯৭৫), ‘গ্রামের নাম চৌগাছি’ (১৯৭৭), ‘তাড়িং মারিং’ (১৯৮১), ‘চিরকালের খোকা’ (১৯৮৭),‘পুরোভাগে জনতা’ (১৯৮৭), ‘হাজার ছড়া বৈরী ছড়া’ (২০০২), ‘খুকু গেল ঢাকা’ (২০০৬) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। ছড়াসাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (২০০৩), জসীমউদদীন স্বর্ণপদক (২০০৪), একুশে পদক (২০০৫) লাভ করেছেন।
দেলওয়ার বিন রশিদ দেশের উল্লেখযোগ্য ছড়াকারদের অন্যতম। আশির দশকের এই আলোচিত ছড়াকার বহু সংখ্যক ছড়াগ্রন্থের রচয়িতা। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে –‘ইস্টিশনে বিষ্টি’; ‘খুকুর মুখে চাঁদের হাসি’; ‘ভেন্না পাতায় দই’; ‘শাপলা পাতা শীতল পাটি’; ‘খুকু সোনা চাঁদের কণা’ ও ‘আল্লাহপাক স্রষ্টা মহান’।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক ছড়া আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব জাহাঙ্গীর আলম জাহান। শিল্প সফল ছড়ার দ কারিগর জাহাঙ্গীর আলম জাহান সম্প্রতি দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক সমকাল,যুগান্তর,নয়াদিগন্ত প্রভৃতি পত্রিকায় রাজনৈতিক ছড়া লিখে দেশের বিদগ্ধজনদের দৃষ্টি কেড়েছেন। বহুলপ্রজ এই ছড়াকার এরই মধ্যে রচনা করেছেন দশটি ছড়াগ্রন্থ। তার উল্লেখযোগ্য ছড়াগ্রন্থের মধ্যে আছে-‘রাজা মশায় চিৎপটাং’,‘মগজ ধোলাই’ (১৯৮৯),‘রাজাকার রাজা হয়’ (১৯৯৪), ‘বাছাই করা একশ ছড়া’ (২০০২), ‘ফুলের দেশে পরীর বেশে’ (২০০২), ‘তেরে মেরে ডাণ্ডা’ (২০০৮), ‘ওপেন্টি বায়োস্কোপ’ (২০০৮), ‘টুম্পা রাণী ঘুম পাড়ানি’ (২০১১), ‘টেক্সো ছড়া একশো ছড়া’ (২০১১) ও ‘ছড়া কত কড়া রে’ ২০১৩) প্রভতি।

আমাদের ছড়া সাহিত্যে একটি অনিবার্য নাম লুৎফর রহমান রিটন। আশির দশক থেকেই ছড়া সাহিত্যে তার জয় জয়কার। তার উল্লেখ ছড়াগ্রন্থ হচ্ছে- ‘ধুত্তুরি’ (১৯৬২), ‘ঢাকা আমার ঢাকা’ (১৯৮৪), ‘হিজিবিজি’ (১৯৮৭), ‘নাই মামা কানা মামা’ (১৯৯৩), ‘হ্যান করেংগা ত্যান করেংগা’ (১৯৯৫), ‘হালুম মানে বাঘ’ ১৯৯৯)’ ,‘রিটন গেল পালিয়ে’ (২০০১) প্রভৃতি।

সাম্প্রতিক বাংলা ছড়াসাহিত্যে আরও যাদের নাম অনিবার্য ভাবে উঠে আসবে তারা হলেন- অরুনাভ সরকার, গোলাম সারওয়ার, ইমরান নূর, পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়, আল মুজাহিদী,শামসুল হক দিশারী, আ স ম বাবর আলী, রোকেয়া খাতুন রুবী, আবু জাফর সাবু, লুলু আবদুর রহমান, নাসের মাহমুদ, আহসান মালেক, আসাদ বিন হাফিজ, বিলু কবীর, আলী হাবীব, শফিক ইমতিয়াজ, বিপুল বড়ুয়া, আবদুল খালেক বকশী, ইউসুফ আলী এটম, বাতেন বাহার, সৈয়দ নাজাত হোসেন, হাসান হাফিজ, রুহুল আমিন বাবুল, আহমাদ উল্লাহ, জসীম মেহবুব, সুজন বড়ুয়া, টিপু কিবরিয়া, আইয়ুব সৈয়দ, ওবায়দুল গণি চন্দন, রাশেদ রউফ, আহমাদ মাযহার, মিহির কান্তি রাউত, জ্যোতির্ময় মল্লিক, প্রত্যয় জসীম, সোহেল মল্লিক, জগলুল হায়দার, আনোয়ারুল কবীর বুলু, মতিউর রহমান মনির, নজরুল ইসলাম শান্তু, মালেক মাহমুদ, জয়নাল আবেদীন বিল্লাল, দুখু বাঙাল, বেণীমাধব সরকার, মঈনুল হক চৌধুরী, মিজানুর রহমান শামীম, মানজুর মোহাম্মদ, কামাল হোসাইন, পরিতোষ বাবলু, সোহেল সৌকর্য, শাজু রহমান, বশীর আহমেদ জুয়েল, মাহফুজুর রহমান আখন্দ, নূরুন্নবী খান জুয়েল, জাইদুর রহমান, অদ্বৈত মারুত, আদিত্য রূপু, তুষার কর, আরিফ নজরুল, মঈন মুরসালিন, কাজী রাশিদা আনওয়ার, জাহানারা রশীদ ঝর্ণা, কাজী দিনার সুলতানা বিন্তী, বকুল হায়দার, শাফিকুর রাহী, মাসুম হাবিব, মাসুম আওয়াল, সত্যজিৎ বিশ্বাস, হারুন আল রশীদ, জাহানারা জানী, আনোয়ার মোস্তফা, রমজান মাহমুদ, কাদের বাবু, শাহ মোহাম্মদ মোশাহিদ,জুলফিকার শাহাদাৎ, মিলন সব্যসাচী, নবী হোসেন, সিরাজুল মানিক, কাজী নূরুল ইসলাম, আবুল হোসেন আজাদ, মহিবুর রহিম, মিলু বাসেত, মো. কবিরুল ইসলাম, সৈয়দ এনাম উল আজিম, সুফিয়ান আহমদ চৌধুরী, উৎপল কান্তি বড়ুয়া, সরকার জসীম, অরুন শীল, স্বপন ধর, বিজন কান্তি বণিক, রইস মনরম, এস কে দাস অপু, আতাউল করিম শফিক, হাসনাত আমজাদ, চন্দন কৃষ্ণ পাল, হাসনাত লোকমান, মো. মারুফুল, শাহাদত বখ্ত শাহেদ, অঞ্জন চৌধুরী, ব্রত রায়, বাতেন বাহার, সরদার আবুল হাসান, কাদের বাবু, বিনয় বর্মন, সামিউল হক মোল্লা, নাগর হান্নান, এখলাসুর রহমান, গোলাপ আমিন প্রমুখ।

Similar Posts

error: Content is protected !!