হাটহাজারীতে নির্বিচারে কাটা হচ্ছে পাহাড় : দেখার কেউ নেই

মাহমুদ আল আজাদ, হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি ।।

হাটহাজারী পৌরসভা, ফতেপুর, মির্জাপুর, পশ্চিম ধলয়, ফহদাবাদ সহ ১নং দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডে নির্বিচারে পাহাড় কেটে বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেট চক্র দিবারাত্রী পাহাড়ের মাটি বিক্রি করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নির্বিচারে পাহাড় কাটার কারণে উজার হচ্ছে বনজ সম্পদ। পাহাড় কাটার কারণে ভায়বহ পাহাড় ধসের আশংকা করছে স্থানীয়রা। সিন্ডিকেট চক্রটি প্রশাসনের নাকের ডগায় এক্সকেলেটার দিয়ে দিবারাত্রী পাহাড় কেটে মাটি ট্রাকে ট্রাকে করে প্রকাশ্য উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন স্থানে পুকুর, ডোবা, বিল ভরাট করছে। বন, পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদের নিজ উপজেলায় দিন রাত পাহাড় কাটা হলেও দেখার কেউ নেই পাহাড় কাটা বন্ধে? পাহাড় কাটা বন্ধে গত বুধবার (২৫ জুলাই ২০১৮) ঢাকায় ডিসিদের সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, পাহাড় কাটা, বনের জমি লিজ নেয়া, বনভূমির অবৈধ দখল, নদী দখল, নদী দূষণ নিয়ে  ডিসিদেরকে আরো কঠোর হওয়ার জন্য বলেন। এরপরেও হাটহাজারীতে পাহাড় কাটা বন্ধের কোনো আলমত নেই।

হাটহাজারী উপজেলার বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা যায়, মির্জাপুর ইউনিয়নের চারিয়া, সরকারহাট, পশ্চিম উদলিয়া ধলয় ও ফরহাদাবাদ, হাটহাজারী পৌরসভার পশ্চিমে ও ১ নং দক্ষিণ পাহাড়তলী নন্দীহাটের পশ্চিমে, চৌধুরী হাট সন্ধীপ কলোনি এলাকা ও ফতেয়াবাদ কলেজের পশ্চিমের বিশাল বিশাল পাহাড়গুলো কাটার দৃশ্য চোখে পড়ে। স্থানীয়রা জানান, যারা পাহাড় কাটার সাথে সরাসরি জড়িত তারা পাহাড়ের কাটার অবস্থানগুলোতে থাকে না। মূলত তারা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ ব্যাপারে দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন বিশেষজ্ঞরা।

এলাকাবাসি সূত্রে জানা যায়, উপজেলার এসব স্থানে পাহাড় কাটার সাথে জড়িত সরকারদলীয় ও কিছু ভূমিদস্যু হওয়ায় তারা স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এসব পাহাড় কাটছে। আর এসব পাহাড় কাটা মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে ভিটে ও জলাধার, নিচু জায়গা ভরাট করার কাজে। একই সাথে ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন ইটভাটায়। ১নং পাহাড়তলী ওয়ার্ডের সন্দীপ কলোনী, মসজিদসংলগ্ন এলাকা, আমতল, দুবাই ব্রিকফিল্ড সংলগ্ন এলাকা, নন্দিরহাটের পশ্চিম পাশে ঢিলাভূমি প্রভৃতি এলাকায় দেদারসে টিলাভূমি ও পাহাড়ের পাদদেশ সংলগ্ন এলাকাসহ ফতেয়াবাদ কলেজের পশ্চিমে ফকির তাকিয়া মাজারের দক্ষিণে ও পশ্চিমে প্রকাশ্য দিন রাত মাটি কেটে বড় বড় ড্রাম ট্রাক করে বিভিন্ন স্থানে এসব মাটি পাচার করা হচ্ছে। সম্প্রতি নন্দীহাট এলাকার সিএনজি গ্যাস পাম্পের উত্তর পাশের বিশাল এক নিচু জায়গাকে রাতারাতি পাহাড়ের মাটি দিয়ে ভরাট করে তেলের পাম্প করা হচ্ছে।

উল্লেখিত এলাকার বিভিন্ন শক্তিশালী সিন্ডিকেট এসব টিলাভূমি পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি ও বসতি স্থাপন করছে। কর্তনকৃত পাহাড়ের মধ্যে বেশিরভাগ সরকারি, খাস খতিয়ানভুক্ত ও বনভূমি। দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ এসব দেখেও অজ্ঞাত কারণে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। তবে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের সাথে টিলাভূমি ও পাহাড় কর্তনকারী সিন্ডিকেট সদস্যদের গোপন সমঝোতার কথা জনশ্রুতি রয়েছে। পাহাড় কাটার মাটি বড় বড় ট্রাকে করে পরিবহনের কারণে ফতেয়াবাদ ঠাণ্ডাছড়ি সড়ক, ফতেয়াবাদ সন্দীপ কলোনী সড়ক, ছড়ারকুল সড়ক, নন্দিরহাটের পশ্চিম পাশের সড়কসহ প্রভৃতি সড়ক চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

একটি সূত্রে জানা গেছে, এসকেবেটর দিয়ে পাহাড় ও টিলার মাটি কেটে প্রতিট্রাক মাটি এক হাজার টাকা করে বিক্রি করে। ভোর সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এসব এলাকা থেকে শত শত ট্রাক মাটি পাচার করা হচ্ছে। পাহাড়, টিলার মাটি কাটার সাথে সাথে চক্রটি কৃষিজমির টব সয়েলও কেটে বিক্রি করছে। অসহায় নিরীহ জমির মালিককে টাকার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে কমদামে মাটি কিনে চড়াদামে তারা বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে। রাতে মাটি পরিবাহিত ট্রাকগুলো যাতে কেউ আটকাতে না পারে এসব সিন্ডিকেট সদস্যরা মোটরসাইকেল দিয়ে মাটির গাড়িকে মোটর সাইকেল এসকট করে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে থাকে। শুধু পাহাড় কাটায় সীমাবদ্ধ নেই সিন্ডিকেটটি। তারা পাহাড়ের পাদদেশে কলোনী তৈরি করে ভাড়া দিচ্ছে। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের লাগোয়া হাটহাজারী উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ে ও পাহাড়ের পাদদেশে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে লক্ষেরও অধিক মানুষ।

নন্দিরহাটের পশ্চিমে এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যক্তি বলেন, ১নং পাহাড়তলী ওয়ার্ডের সন্দীপ কলোনী, মসজিদসংলগ্ন এলাকায় মনসুরসহ বেশ কয়েকজন একটি সিন্ডিকেট দিনে রাতে পাহাড় কাটছে।

নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক এলাকার এক ব্যক্তি জানান, কিছু অসাধু ব্যক্তি প্রশাসনের নাকের ডগায় প্রশাসনের সাথে সঙ্গ রেখে এসব কাজ করছে।

এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তরে ফোনে কথা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অফিসের এক কর্মকর্তা জানান, আমরা পাহাড় কাটার ব্যাপারে অবহিত নই। এখন যখন খবর পেয়েছি তখন বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আকতার উননেছা শিউলী বলেন, বেশ কিছু দিন ধরে পাহাড় কাটাসহ নানান অপকর্ম করে আসছে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেট। আমরা যত দ্রুত সম্ভব পাহাড় কাটা বন্ধের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেব। তিনি বলেন, বিগত কয়েক মাস আগে নন্দিরহাটের পশ্চিমে মসজিদসংলগ্ন এলাকায় পাহাড় কাটা ও পাহাড়ের এক প্রকার বালি তুলে বিক্রি করার অভিযোগে মনসুর নামে এক ব্যক্তিকে জরিমানাসহ মামলা দেয়া হয় এবং মালামাল জব্দ করা

হয়।

Similar Posts

error: Content is protected !!